ভারতে পেট্রলের সঙ্গে বেশি মাত্রায় ইথানল মিশিয়ে জ্বালানি ব্যবহারের সরকারি উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আমদানি করা তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো ও কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য সামনে রেখে দেশজুড়ে ই২০ জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হলেও বিজ্ঞানী, বিশ্লেষক ও গাড়ির মালিকদের একাংশ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
মূল উদ্বেগের জায়গা হলো জ্বালানির কার্যকারিতা কমে যাওয়া, পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশে অতিরিক্ত ক্ষয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। বিশেষ করে যেসব গাড়ি বেশি মাত্রার ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির উপযোগী করে তৈরি হয়নি, সেগুলো নিয়ে উদ্বেগ তুলনামূলক বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির মান ও দূষণ নিয়েও গাড়ি নির্মাতাদের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ প্রকাশ্যে এসেছে।
কেন ইথানলের দিকে ঝুঁকছে ভারত
ভারতের জ্বালানি নীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক উৎপাদন থেকে তৈরি ইথানলকে জ্বালানিতে ব্যবহার করে কৃষকদের জন্য নতুন বাজার তৈরি এবং পরিবেশগত চাপ কমানোর চেষ্টা করছে সরকার। সরকারি নীতিতে ইথানল মিশ্রিত পেট্রলকে জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, ধান ও আখের মতো কৃষিপণ্য থেকে অতিরিক্ত ইথানল উৎপাদনের নীতি খাদ্য ও পানিসম্পদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে কি না। বিশেষ করে কৃষি উৎপাদন, জ্বালানি চাহিদা ও খাদ্যনিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুরোনো গাড়ি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ
ইথানলের পরিমাণ বাড়লে জ্বালানিতে প্রতি একক আয়তনে শক্তির পরিমাণ পেট্রলের তুলনায় কমে যায়। ফলে গাড়ির ধরন, ইঞ্জিনের নকশা ও ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে জ্বালানি সাশ্রয়ে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। ভারতের সরকার অবশ্য বলছে, ই২০ ব্যবহারের উপযোগী গাড়িতে এই প্রভাব সীমিত।
কিন্তু পুরোনো গাড়ির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত জ্বালানি ব্যবস্থা, রাবারের উপাদান, জ্বালানি পরিবহন নল ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ বেশি মাত্রার ইথানলের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে না পারলে রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন বাড়তে পারে।
জ্বালানির মান নিয়েও উঠছে প্রশ্ন
ইথানল নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে জ্বালানির দূষণ ও মান নিয়ে সাম্প্রতিক উদ্বেগের কারণে। ভারতের কয়েকটি বড় গাড়ি নির্মাতার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে বিভিন্ন নমুনায় অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও ক্লোরাইডের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। এসব উপাদান জ্বালানি ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।

তবে এ নিয়ে শিল্পখাতের পক্ষ থেকে ই২০ উপযোগী গাড়ির যথাযথ পরীক্ষা করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে এখন শুধু ইথানলের মাত্রা নয়, বরং জ্বালানির সংরক্ষণ, পরিবহন ও সামগ্রিক মান নিয়ন্ত্রণও চলে এসেছে।
পরিবেশ বনাম ভোক্তার খরচ
ইথানল ব্যবহারের মাধ্যমে তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো ও পরিবেশগত সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ভোক্তার জ্বালানি ব্যয়, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুরোনো যানবাহনের ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের বিভিন্ন মহল তাই ই২০ নীতি নিয়ে আরও স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, স্পষ্ট তথ্য এবং ভোক্তাদের জন্য জ্বালানি বেছে নেওয়ার সুযোগের দাবি তুলছে। (
বিশেষজ্ঞদের বিতর্কের মধ্যেই ভারতকে এখন এমন একটি নীতির ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে, যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি কোটি কোটি গাড়ির মালিকের অর্থনৈতিক স্বার্থও উপেক্ষিত না হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















