আজকের পৃথিবীতে মহাদেশ থেকে মহাদেশে মুহূর্তের মধ্যে তথ্য পৌঁছে যাওয়া এতটাই স্বাভাবিক যে এর পেছনে থাকা বিপুল প্রযুক্তিগত সংগ্রামের কথা আমরা প্রায় ভুলেই যাই। অথচ একসময় আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ দিয়ে একটি তার টেনে ইউরোপ ও আমেরিকাকে যুক্ত করার চিন্তাই ছিল প্রায় অসম্ভব এক কল্পনা। সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিল উনিশ শতকের একদল দুঃসাহসী প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী ও নাবিক।
১৮৬৬ সালে প্রথম সফল আন্তঃমহাসাগরীয় টেলিগ্রাফ তার স্থাপনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর তথ্যপ্রবাহের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। শিল্পবিপ্লবের ইস্পাত ও বাষ্পনির্ভর পৃথিবী ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে শুরু করে এমন এক যুগে, যেখানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান।
এই অসাধারণ অভিযানের কাহিনি নতুন করে তুলে ধরেছেন লেখক জেমস ট্যাবর তাঁর বই ‘সমুদ্রের নিচে বিদ্যুৎ’-এ। বইটিতে প্রযুক্তির জটিল তত্ত্বের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মানুষের সাহস, ভুল, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ব্যর্থতা এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার এক দুর্দান্ত অভিযাত্রা।
এক ব্যবসায়ীর মাথায় অসম্ভব চিন্তা
এই প্রকল্পের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন মার্কিন ব্যবসায়ী সাইরাস ফিল্ড। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে বিপুল অর্থ উপার্জন করে ব্যবসা থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি নতুন কোনো বড় উদ্যোগের সন্ধান করছিলেন। কাগজের ব্যবসায় তাঁর সাফল্যের পেছনে ছিল দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সস্তা সংবাদপত্রের ব্যাপক চাহিদা। অর্থাৎ তথ্যের বিস্তারের সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার একটি সরাসরি সম্পর্ক ছিল।
সে সময় টেলিগ্রাফ প্রযুক্তি দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল। ফিল্ড নিউফাউন্ডল্যান্ড পর্যন্ত একটি টেলিগ্রাফ সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগে যুক্ত হন। এতে আটলান্টিকের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সংবাদ পৌঁছাতে কয়েক দিন সময় কমে আসত।
কিন্তু একদিন পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ফিল্ডের মাথায় আরও বড় প্রশ্ন আসে—যদি আংশিক পথ নয়, সরাসরি আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ দিয়ে একটি তার বসানো যায়?
এই চিন্তাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম উচ্চাভিলাষী প্রযুক্তিগত অভিযানের দিকে নিয়ে যায়।
সমুদ্রের নিচে তার বসানোর দুঃসাহস
সেই সময় সমুদ্রের তলদেশে টেলিগ্রাফ তার বসানোর প্রযুক্তি ছিল একেবারেই শৈশব অবস্থায়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে এবং ভূমধ্যসাগরের কয়েকটি অঞ্চলে অল্প কিছু পানির নিচের তার বসানো হয়েছিল। কিন্তু আটলান্টিকের গভীর সমুদ্রে এত দীর্ঘ তার স্থাপনের চেষ্টা আগে কেউ করেনি।
ফিল্ড দ্রুত তাঁর পরিকল্পনার পক্ষে সমর্থন সংগ্রহ করেন। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ ম্যাথিউ মরি এবং বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফের অগ্রদূত স্যামুয়েল মোরসও তাঁর উদ্যোগকে সমর্থন দেন।
এরপর শুরু হয় অর্থ সংগ্রহ ও সরকারি অনুমোদনের দীর্ঘ প্রচেষ্টা। শেষ পর্যন্ত মার্কিন ও ব্রিটিশ সরকারও এই প্রকল্পের পাশে দাঁড়ায়। ব্রিটিশ পক্ষ থেকে অর্থ ও নৌবাহিনীর জাহাজ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ব্রিটিশ কোষাগারের তৎকালীন আর্থিক কর্মকর্তাদের।
এই পর্যায়ে ইতিহাসের আরেকটি আকর্ষণীয় যোগসূত্র তৈরি হয়। প্রকল্পটির ব্রিটিশ সমর্থকদের একজন ছিলেন জেমস উইলসন—যিনি পরবর্তীতে এই সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাতাও হন। ফলে আটলান্টিকের নিচে সেই ঐতিহাসিক তারের সঙ্গে এই সংবাদপত্রেরও এক ধরনের ঐতিহাসিক আত্মীয়তা তৈরি হয়।
ভুল, ঝড় আর বিপর্যয়ের দীর্ঘ পথ
প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বাধা ছিল শুধু সমুদ্র নয়, মানুষের ভুলও। এর অন্যতম বিতর্কিত চরিত্র ছিলেন প্রকল্পের প্রধান বৈদ্যুতিক কর্মকর্তা এডওয়ার্ড ‘ওয়াইল্ডম্যান’ হোয়াইটহাউস। দীর্ঘ দূরত্বে টেলিগ্রাফ সংকেত পাঠানোর সমস্যাকে তিনি অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব বলে মনে করতেন।
কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এত সরল ছিল না। তাঁর ভুল সিদ্ধান্ত প্রকল্পের জন্য গুরুতর পরিণতি ডেকে আনে।
তার বসানোর জাহাজগুলোকে মোকাবিলা করতে হয়েছে ভয়াবহ ঝড়, যান্ত্রিক সমস্যা এবং সমুদ্রের অনিশ্চয়তার সঙ্গে। কখনো তার ছিঁড়ে গেছে, কখনো বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সময় নষ্ট হয়েছে। আবার কখনো সমুদ্রের গভীর থেকে ছিঁড়ে যাওয়া তার উদ্ধার করাই হয়ে উঠেছে অসম্ভবের মতো একটি কাজ।
তবু প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে নতুন কৌশল তৈরি হয়েছে। নতুন যন্ত্রপাতি এসেছে, পদ্ধতি উন্নত হয়েছে এবং ধীরে ধীরে যে কাজকে একসময় অসম্ভব মনে হয়েছিল, সেটিই বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে।
১৮৬৬ সালের সেই ঐতিহাসিক সাফল্য
অবশেষে ১৮৬৬ সালে সফলভাবে আটলান্টিকের তলদেশ দিয়ে টেলিগ্রাফ সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়। এর অর্থ ছিল ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের গতি নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়া।
এর আগে একটি বার্তা সমুদ্র পাড়ি দিতে জাহাজের ওপর নির্ভর করতে হতো। ফলে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক খবর পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগত। নতুন তার সেই বাস্তবতাকে বদলে দেয়।
তৎকালীন সংবাদপত্রগুলো এই সাফল্যকে বিপুল উচ্ছ্বাসের সঙ্গে স্বাগত জানায়। এমনকি কেউ কেউ মনে করেছিলেন, দ্রুত যোগাযোগ পৃথিবীর দেশগুলোর মধ্যে বোঝাপড়া বাড়াবে এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা কমিয়ে দেবে।
কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সেই আশাবাদকে সত্য প্রমাণ করেনি।
যোগাযোগ বাড়লেই কি শান্তি আসে?
আটলান্টিকের তার প্রকল্পের অন্যতম স্বপ্ন ছিল পৃথিবীকে দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যমে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসা। বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ রাজপরিবার ও মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে পাঠানো অভিনন্দনবার্তাতেও শান্তি ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার আশাবাদ প্রকাশ পেয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তী ইতিহাস দেখিয়েছে, দ্রুত যোগাযোগ একাই সংঘাতের কারণ দূর করতে পারে না। মানুষের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভুল বোঝাবুঝি শুধু যোগাযোগের গতির ওপর নির্ভর করে না।
আজকের ইন্টারনেট-নির্ভর পৃথিবী সেই সত্য আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। মানুষ এখন কয়েক সেকেন্ডে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, অথচ সেই পৃথিবীতেই বিভাজন, সংঘাত ও ভুল তথ্যের বিস্তারও দ্রুত ঘটে।
অসম্ভবকে সম্ভব করার শিক্ষা
আটলান্টিকের তারের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত প্রযুক্তি নয়, মানুষের অধ্যবসায়।
প্রকল্পটি এগোতে থাকলে দেখা যায়, একসময় যে কাজকে অবাস্তব মনে হয়েছিল, নতুন প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার ফলে সেটিই ধীরে ধীরে সম্ভব হয়ে উঠছে। ছিঁড়ে যাওয়া তার সমুদ্রের তলদেশ থেকে উদ্ধার করার মতো দুঃসাহসী কাজও একসময় নিয়মিত প্রযুক্তিগত দক্ষতার অংশ হয়ে যায়।
এই পরিবর্তন আধুনিক বিশ্বের অনেক বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের কথাও মনে করিয়ে দেয়। নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক সংযোজন, কোয়ান্টাম গণনা কিংবা বারবার ব্যবহারযোগ্য মহাকাশযানের মতো প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও আজকের অসম্ভব হয়তো আগামী দিনের স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে।
আটলান্টিকের সেই তার তাই শুধু দুটি মহাদেশকে যুক্ত করেনি। এটি মানুষের প্রযুক্তিগত কল্পনার সীমানাকেও আরও দূরে ঠেলে দিয়েছিল। ইস্পাত, বাষ্প ও শিল্পশক্তির যুগ থেকে অদৃশ্য তথ্যের যুগে প্রবেশের পথে এটি ছিল এক ঐতিহাসিক সেতু।
সমুদ্রের অন্ধকার তলদেশে স্থাপিত সেই তার আজ হয়তো প্রযুক্তির দিক থেকে প্রাচীন। কিন্তু তার ঐতিহাসিক শিক্ষা এখনও অত্যন্ত আধুনিক—অসম্ভব বলে মনে হওয়া কোনো কাজের সীমা অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে মানুষের কল্পনাই বেশি শক্ত করে বেঁধে রাখে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















