(প্রিয় সহপাঠী বন্ধু সদ্য প্রয়াত বাবলুর স্মৃতিকে ধারণ করছি এগল্পে)
শুভর মৃত্যুর খবর পেলাম এইমাত্র।
ওর নিজের ফেসবুক থেকে ভাগ্নে তমাল হাসান জানাল, মামা আর নেই। আজ দুপুর বারোটায় বারডেম হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়ান্নাইলাহি রাজিউন।
বিশ্বাস করিনি। তবু কেন যে তৎক্ষাণাৎ বুকটা ধ্বক করে উঠল, কে জানে! দিলুকে রিং দিলাম। ও ধরতেই চিৎকার দিয়ে নিজের ভেতরকার ক্ষুব্ধ বিস্ময় প্রকাশ করি,’ দোস্ত, শুভ কি পাগল হয়ে গেছে? নিজেকে নিয়ে কেউ এরকম রসিকতা করে বেড়ায় নাকি? এখনও ভার্সিটির পোলাপান রয়ে গেছে? শালা একটা উদ্ভট গাধা ছাড়া কিছু নয়।’ একনিশ্বাসে এতগুলো কথা বলে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলাম। অপেক্ষা করছি, দিলু কিছু বলবে। সে পেশায় একজন চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা। সিরিয়াস চেহারা করে কেবল শোনার অভ্যাস, বলে কম। তাই বন্ধুদের ভেতর মান-অভিমানের পালাবদল ঘটলেও ওর সঙ্গে সবার ভারসাম্য বজায় থাকে। কেউ ওকে ছেড়ে যায় না। আমি রসিকতা করে বলি, সুবিধাবাদী।’ দিলু উত্তর দিল, সত্যি সত্যি শুভ আর নেই রে দোস্ত। কচি ওর ভাগ্নেকে চেনে। একটু আগে সে কনফার্ম করল। শুভ তো বোনের বাড়িতেই থাকত, জিকাতলায়। ওর বোনাইকে তো চিনিস? বিখ্যাত লিটু খন্দকার, বড় গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। রাজনীতিও করেন। তিনিই সব সামলাচ্ছেন। দেখি, আমি কথা বলব। শেষ দেখাটা দেখতে যেতেও পারি। ‘ দিলু থামে, মোবাইলের ভেতর দিয়ে দীর্ঘশ্বাসের দমকা এক হাওয়া ভেসে এসে ধাক্কা লাগাল আমার কানে।
আমি হতভম্ব হয়ে দিলুর কথা শুনছি। বিশ্বাস হচ্ছে না। এই তো কদিন আগেও শুভ রিং দিল আমাকে, আচমকা বলে উঠল, যাবি দোস্ত?’
‘কোথায়?’ চমক দিয়ে কথা বলা শুভর ধরন। একটু অন্যরকম, সচরাচর যা অনুমান করা মুশকিল, বরাবর ব্যতিক্রমী এক সাসপেন্স উহ্য থাকে ওর প্রশ্নের গভীরে। তাই ওর উত্তরের জন্য অপেক্ষায় থাকি।
‘চর কুকড়ি-মুকড়ি।’
‘এটা আবার কোথায়?’ কখনও নামই শুনিনি। বিস্ময় প্রকাশ পায় প্রতিটি শব্দে।
‘আরে বেটা, এটাও জানিস না। ভোলার চরফ্যাশনে। ওখান থেকে কয়েক ঘণ্টা। স্পীডবোটে চলে যাবো। মিশে যাবি প্রকৃতির সঙ্গে। এই ফালতু পৃথিবীটাকে টাটা বাইবাই বলে ভুলে যাবি সবকিছু। দেখিস, ফিরতে ইচ্ছে হবে না। কেবলি ফিশিং ট্রলারে করে নদীতে-নদীতে মাছ ধরতে ইচ্ছে হবে আর গলা ছেড়ে গান গাইবার সাধ জাগবে মনে, চক্ষে আমার তৃষ্ণা, ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে। হাহাহা।’ বলে নিজেই তৃরীয় আনন্দে গান গাইতে শুরু করে দেয় মোবাইলের ওপাশ থেকে। আমি ঠিক ওর ধাতের নই। কখনোই বানভাসি আবেগের ভেতর ডুবোডুবি করিনি। আমি মেপে চলা ও দুনিয়াদারি বোঝা মানুষ। নইলে ব্যাংকের এসিস্ট্যান্ট হয়ে চাকরিতে ঢুকে এখন ভিপি হতে পেরেছি? এমনি এমনি? পাহাড়ি চড়াই-উতরাই পেরোবার মতো কত ব্যাংক বদল করে এখানে পৌঁছেছি। কোথায় কতটুকু লবণ আর কোথায় কতটুকু চিনি মিশিয়ে স্বপদে টিকে থাকতে হয় তা আমার ভালোই জানা রয়েছে। কিন্তু শুভ ভিন্ন কিসিমের মানুষ। এককালে আমার মতো ব্যাংকের চাকরি করেছে। বসের মাত্রাতিরিক্ত খবদারি পছন্দ না হওয়ায় দুর্মূল্যের বাজারে অমল-ধবল চাকরিটা আনায়াসে সে ছেড়ে দিল। নিজেবাজে ব্যবসা করবে বলে অন-লাইনে মাথা ঢুকাল। কিন্তু সময় ও মান দুটোর একটাও সে ধরে রাখতে পারেনি। অগত্যা সেখান থেকেও ফিরে এল। বিয়ে করল অজপাড়াগাঁর এক অশিক্ষিত মেয়ে আসমা বেগমকে। ভেবেছিল, পোষা ময়নার মতো শিখিয়ে পড়িয়ে নিজের করে নেবে। কিন্তু মহিলা এতই মুখরা ও দজ্জাল যে দুবছরের মাথায় ওদের সম্পর্ক উড়ে পালাল। মেয়েটি এখন গার্মেন্টেসে কাজ করে। বিয়ে করে গাজিপুরের দিকে থাকে। দেখা হয়েছিল আমার সঙ্গে। হাসিতেই বোঝা গেল, সুখে রয়েছে। শুভ আসলে উড়ে বেড়ানো পুরুষ। যাযাবরবৃত্তি তার নেশা। নিত্য-নতুনকে জানার আগ্রহ প্রবল। রূপের মোহ যেমন তীব্র, প্রকৃতির কোলে দোল খাওয়ার ইচ্ছেও উদগ্র। সে কবি নয়, চিত্রশিল্পী নয়। তবু সে সুরের জালে বন্দি এক আত্মা। ভাল গান শুনলেই সে থমকে যায়। ভাল নৃত্যকলা প্রদর্শিত হলে সবার পিছনে নিরিবিলি সে বসে থাকে।
সেতার-সরোদের আসরে সে নিয়মিত শ্রোতা। অথচ আমি তাজ্জব হয়ে ভাবি, একজন মুদি-দোকানদার বাপের ঘরে এমন সুসংস্কৃত মানসিকতা বেড়ে উঠল কিভাবে? সে ভাসতে জানে, আবার অন্যকে ভাসাতেও পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রথম যেদিন পরিচিত হলাম, সেদিনই আচমকা শুভ বলে উঠল,’ এ শহরে আকাশ মেলা ভার। আকাশ দেখবে ?’
তখন রাত সাড়ে এগারোটা। আশির দশকের রাজপথগুলোও তখন নির্জন-নিরিবিলি, গেটবদ্ধ হল থেকে বেরুনোটাই রীতিমতো মুশকিল। তাছাড়া, হলের মাঠে ওর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। কথা শুনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। গ্রামের ছেলে হিসাবে আমিও আকাশ দেখে দেখেই বড় হয়েছি। আমগাছের ডালে চড়ে লোভী কাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমিও পাকা আম-গয়াম খেয়েছি দেদার। তাকালেই মাথার উপর ঝকঝক করত উচ্ছ্বসিত অপার এক আকাশ। সেই চেনা আকাশটাই এখানে বিশেষভাবে বলে-কয়ে দেখার মতো হয়ে গেছে?
তবে এ কদিনে ঢাকায় আমার অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। এখানে গাড়ির কালো ধোঁয়া আর বিশাল অট্টালিকা আকাশকে মাটিতে পা রাখতেই দেয় না। খুব অহংকারী আর পর্দানশীন এই আকাশ। এর পুরো সৌন্দর্য শহুরে ব্যস্তবাগীশ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষবন্দিদের জন্য রীতিমতো অধরা এক অভিজ্ঞতা। তাই এরা শখ করে ছাদে পূর্ণিমার চাঁদ দেখার পার্টি দেয়। বৃষ্টি দেখার জন্য ফার্মহাউজে সবাই জমায়েত হয়। বারবিকিউর নামে বুনো আনন্দে মেতে ওঠে। এমন কি কনকনে শীত কিংবা ফুলের সৌরভে মাতোয়ারা মিষ্টি বসন্তকেও ওরা নেচে-গেয়ে পিঠা-পুলি মুখে পুরে উদযাপন করে। জীবন থেকে যা কিছু অপহৃত হয়েছে, অবজ্ঞা, অবহেলা আর নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে যা কিছু মুঠোর বাইরে বহুকাল আগে পালিয়ে গেছে, নির্লজ্জ-বেহয়ার মতো সেগুলোর ঘ্রাণ-স্বাদ আবারও ফিরিয়ে আনতে উতলা হয়ে ওঠে এরা। এগুলো তখন অত বুঝিনি। এখন আমিও তাদের একজন। একটুখানি দমকা মিঠা বাতাসের জন্য আমিও তৃষ্ণার জিহ্বা মেলে তাকিয়ে থাকি আকাশপানে।
অথচ শুভ তখনই শহুরে রিক্ত-নিঃস্ব শূন্যতাগুলো ধরতে পেরছিল। সে আমাকে নিয়ে চলে এল ওয়াইজ ঘাটে। একটি নৌকা ভাড়া করে ঘুরে বেড়াল গভীর রাত পর্যন্ত। মাথার উপর পূর্ণিমার চাঁদ। পাড়ে আহসান মঞ্জিল। চাঁদের আলো নদীর উপর অঝোরধারায় ঝরে পড়ছে। শুভ বলল,’ রূপার থালা দেখছিস? আমি দেখছি। নদীটা এখন একটা রূপার থালা হয়ে গেছে। আহসান মঞ্জিল ভাসছে সেখানে। মনে অয়, রূপার থালায় একটা সন্দেশ এই মঞ্জিলটা। ভাল করে তাকা। বুঝতে পারবি।’ প্রথম টের পেলাম, সে কবি না হয়েও কবি, শিল্পী না হয়েও শিল্পীর মন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওর কাছে বসলে কখনও মন খারাপ হয়না। অনর্গল কথা বলে চলেছে। গল্প-গুজব আর স্বপ্ন-সাধে ভরা এক অন্তর। শুধু স্থির হতে পারেনি কোথাও। যখন-তখন আবেগ-ভঙ্গ ঘটে। অর্থকষ্টে থেকেও তুমুল আনন্দে বলে বেড়ায়, জীবন তো একটাই। যেখানে যেটুকু পাও, তুলে নাও দোস্ত। পরে পস্তাতে হবে।’
‘বিয়ে করবি না? হ্যান্ডসাম পুরুষ তুই। করে ফেল। জীবনে স্থির হবি।’
‘সেখানেই মুশকিল। আমি কখনও স্থির হব না। বিয়ে নামের একটা এক্সপেরিমেন্ট তো হল। আর নারে দোস্ত। তাতে কেবল শত্রুতাই বাড়ে। বিয়ে ব্যাপারটাই বুজরুকি। আমি আমার মতো। অন্যকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে সুখ কেনার বদলে অশান্তিকে জাগিয়ে তোলা কোন কাজের কাজ নয় দোস্ত।’
‘রাইট পার্টনার পেয়েও যেতে পারিস। ট্রাই কর।’
ওগুলো বইর বানানো কথা। বুজলি? বাস্তবে এর কোন মানে নাই। জীবন চাহিদা ও যোগানে চলা একখান নৌকা। আবেগ হল বিশাল এক-একখান ঢেউ। সেই ঢেউ এনজয় করার জন্য একলা অওন লাগে। একলা থাকনের মজাডা যে কি, তুই বুজবি না রে দোস্ত। হাহাহা।’
স্বভাবে খানিকটা দার্শনিকও বটে এই শুভ। কথায় কথায় এধরনের আপ্তবাক্য আওড়াত বলে বন্ধুদের অনেকেই এড়িয়ে চলত ওর সঙ্গ। সবার ধারণা ছিল, শুভ উদ্দাম গল্প-গুজব করে ফেরার সময় ঠিক’ কিছু টাকা দে তো দোস্ত’ ধরনের আব্দার করে বসবে। চক্ষু লজ্জার খাতিরে টাকা দিতে হয়। টাকা পাওয়ার পর নির্মোহ গলায় বলত,’ চিন্তা করিস না। পুষিয়ে দেব।’ এমনভাবে বলত যে মনে হবে, দাতাকে করুণা করছে গ্রহীতা।
এই পুষিয়ে দেয়াটা যে কি, কেউ তা জানে না। শুধু বোঝে, টাকাটা আর ফেরত আসবে না নিজের পকেটে। ইদানীং সে তদ্বির ব্যবসা শুরু করেছে। বেশিরভাগ সময় সেক্রেটারিয়েটে পড়ে থাকে। এক-দুজন বন্ধুর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সে বেঁচে থাকার লড়াই করছে। তবে এধরনের ব্যবসা চালাবার জন্য যেরকম চতুরালি জানতে হয় কিংবা সাবলীল ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন হয় তা ওর নেই।
তাছাড়া, শুভ বিশ্বস্তভাবে মিথ্যে বলতে পারে না যখন-তখন। ওর শিক্ষা ও রুচিতে বাধে। অগত্যা এখানেও ফেল মেরে গেল। আমাকে জানাল, প্রচুর মিথ্যা বলতে হয় এসব কাজে। এখানে ঠকাতে ও ফাঁসাবার জন্য তদ্বির-বাণিজ্য চলে। আমাকে দিয়ে হবো না দোস্ত। শুরু থেকে তোর মতো একটা ব্যাংকের চাকরি করলেই ভাল হত। একটা চাকরি, একটা বউ, দুটো বাচ্চা আর নিরঙ্কুশ সুখের অন্বেষণ। ছাপোষা হিসাব-নিকাশ, হাহাহা।’
‘মন্দ কি? তুইও এ পথে চলে আয়। এখনও সময় তোকে পুরো ছেড়ে যায়নি শুভ।’
‘বাদ দে। বৃষ্টি দেখবি?’
‘কোথায়?’
‘জেনেও না বোঝার ভান করিস কেন? চর কুকড়ি-মুকড়ির বৃষ্টি। ফিশিং ট্রলারে মেঘনার মোহনায় ঘুরে বেড়াবি, ঢেউ দেখবি, ঢেউর সঙ্গে পাল্লা দিবি আর জুলাইর বৃষ্টিতে বেদম ভিজবি। ভয়, ত্রাস আর রোমাঞ্চ, একসঙ্গে। যাবি?’ ‘বৃষ্টি দেখতে অতদূর? পাগল বলবে সবাই।’
‘কৃষ্ণাঙ্গ সেই গায়ক, কী যেন নাম, বব মারলে, কী যেন বলেছিল? সাম পিপল ফিল দ্য রেইন, সাম পিপল জাস্ট গেট ওয়েট। সুতরাং আমেরকিান কবি ল্যাংস্টন হাগসের মতো বলে ফেলো দোস্ত, ‘লেট দ্য রেইন কিস য়্যু। লেট দ্য রেইন বিট আপন ইয়োর হেড ওইথ সিলভার লিকুইড ড্রপস। লেট দ্য রেইন সিং লুলেবি। হাহাহা।’
শেষ পর্যন্ত আমি ওর কথার যাদুয় পটে গেলাম। ছাপোষা কেরানি হঠাৎ ক্ষেপে গেলে যা হয়, তাই হল। কেরানি-মন আমার মাতালের মতো লাফাতে থাকে; তড়পাতে থাকে বৃষ্টি ভেজার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে গভীর রাতে বুড়িগঙ্গায় ভাসার কথা খুব মনে পড়ে গেল। কতকিছু ভুলে গেছি। কিন্তু এই নাটকীয় স্মৃতিটা কখনও ভুলতে পারি নি। নদীর কথা এলে শুভর হাত ধরে মাঝরাতের সেই অনন্য নৌকাবিহারের কথা মনে পড়ে। স্বর্গপ্রাপ্তির মতো এক আনন্দ, যা বয়সের সঙ্গে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে চলৎশক্তিরহিত পঙ্গু ও সীমাবদ্ধ এই জীবনে।
শুক্তি বলল,’ এই পাগলের কথায় তুমি নাচছো?’
‘ছুটির দিনে ঘরেই তো বসে থাকি। যাই না একবার, ঘুরে আসি।’
সে আর প্রতিবাদ করেনি। দুই বাচ্চাকে নিয়ে নিজের জগতে সেঁধিয়ে যায়।
আজ সন্ধ্যায় ভোলার লঞ্চে রওয়ানা দেবার কথা। একটা ট্যুইস্টার-উচাটন বুকের সবকিছু তছনছ করে এগুতে চাইছে। এলোমেলো হয়ে পড়ছে সব। উত্তেজনা ও আনন্দ রাতে ঘুমাতে পর্যন্ত দিচ্ছে না। সেভেন-আপের বোতলের মতো ভেতরের ছিপিটা কেবল আলগা হতে চাইছে। শুভকে মনে হচ্ছে এক যাদুকর; এক ঝটকায় যে আমার ভেতরকার সমস্ত একঘেয়েমি আর বৈচিত্রহীনতার মরচেগুলো পরিষ্কার করার সুযোগ করে দিয়েছে। আমি ওর কাছে কৃতজ্ঞ। গত রাতেও তুমুল আড্ডা হয়েছে শুভর সঙ্গে। আর এখন দুপুর বারোটায় শুনতে হচ্ছে, শুভ নেই।
বললেই হল? ফাজলামো? মোবাইলটা বেজে উঠল। শুভর নম্বর। তীব্র উত্তেজনায় ফোনটি কানে দিয়ে বলে উঠলাম, শুভ? কী শুরু হয়েছে? নিজের মৃত্যু নিয়েও রসিকতা শুরু করে দিয়েছিস? আমরা অকূল দরিয়ার মাঝখানে উথাল-পাতাল ঢেউয়ে ভেসে বেড়াবো না? আমরা দামাল বৃষ্টিতে ভিজব না?’
ওপাশে হো হো করে হেসে উঠল শুভ। বলল,’ তুই বিশ্বাস করলি? বৃষ্টি না দেখে চলে যাবো? কথা এটা?’
বলতে বলতে চুপ হয়ে যায় শুভ।
আমি অস্থির হয়ে বলি’ চুপ মেরে গেলি যে? আমার যে সময় আর কাটছে না। অথৈ জলরাশির ভেতর শুধু বৃষ্টি আর হাওয়ার শব্দ শুনছি। শুধুই শব্দ।’
আবেগে বুজে আসে আমার কণ্ঠ। তবু আমার মুখ ভরা হাসি আর বুক ভরা ভরসা শুভর প্রতি। ‘গান শোন। শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা তিমির যামিনী রে/ কুঞ্জপথে কৈসে যাওব অবলা কামিনী রে.. রবীন্দ্র নাথ ছাড়া কে এমন বুঝেছে বৃষ্টিকে? বল বল? আজ আকাশের প্রাণের কথা ঝরোঝরো বাজে…’ বলতে বলতে গাইতে গাইতে সে হেসে উঠল। হাসি ওর থামছেই না। দেখদেখি আমিও হাসছি। আমারও হাসি থামছে না। বৃষ্টির অনুভব আমাকেও গ্রাস করে নিচ্ছে। এসময় শুক্তি এসে আমাকে থামায়। বলে ওঠে, তোমার হাতে ওটা কি? ড্রেসিং টেবিল থেকে চিরুনি নিয়ে কানে ধরে বসে আছো কেন?
আবার হাসছো? তুমিও কি তোমার ওই ছন্নছাড়া বন্ধুটার মতো পাগলে পরিণত হলে?’ আমি সম্বিৎ ফিরে পাই। ফিসফিস করে নিজেকে বলি, রাতের লঞ্চে কি আর চড়া হবে না আমার?
শুভ কি বৃষ্টি হয়ে আসবে না আর কখনও?
মণীশ রায় 


















