১১:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হুথিদের বিদ্যুৎগতির এগিয়ে চলা ইরান যুদ্ধে কী প্রভাব ফেলবে? ছাদ থেকে সৌর বিদ্যুৎ বাড়ানোর লক্ষ্য সফল হবে কীভাবে? ইনানীতে বিপন্ন মেঘলা চিতাসহ আরও যেসব প্রাণীর দেখা মিললো কানাঘুষোয় শোনা যায়, বিএনপি এসে গেছে ডাকসু আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি, প্রতিবাদ ছাত্রদলের জলবায়ু ন্যায়ের সংকটে নেপাল: এলডিসি উত্তরণ ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার নতুন পথ জলবায়ু অর্থায়নের বড় অঙ্কে গ্রামীণ নারীর হিসাব কোথায়? নেপালের আবহাওয়া বিপর্যয়: ‘স্বাভাবিক’ বৃষ্টির হিসাব কেন ভয়ংকর বিভ্রান্তি তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা, এআই সতর্কতা ও নিষেধাজ্ঞা—আলোচনায় সাত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পুরোনো দিনের রেশ মুছে আবারও ফ্যাশনের কেন্দ্রে রেশমি স্কার্ফ

কানাঘুষোয় শোনা যায়, বিএনপি এসে গেছে

  • স্বদেশ রায়
  • ০৯:৩৫:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 5

ভদ্রলোকের বয়স সত্তরোর্ধ্ব, স্ত্রীর বয়সও কাছাকাছি। রাতে উত্তরার এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে ফিরছিলেন। হঠাৎ গাড়িতে তীব্র ঝাঁকুনিতে দুজনেই কোমরে ব্যথা পেলেন। তবে তার থেকে ভয় পেলেন বেশি। ভদ্রলোক একটু তারস্বরে ড্রাইভারকে বললেন, কী হলো?

ড্রাইভার উত্তর দেয়, স্যার, রাস্তা ভাঙা।

তা তুমি আস্তে চালাবে না।

ড্রাইভার শান্ত স্বরে বলে, স্যার, মনে ছিল না, বিএনপি এসেছে।

ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, বিএনপি এসেছে মানে? বিএনপি তো ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরেই এসেছে। তুমি এই ছয় মাস পরে এখন এসে কী বলছ, বিএনপি এসেছে।

ড্রাইভার আবারও শান্ত স্বরে উত্তর দেয়, স্যার, দীর্ঘদিন ধরে অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট ভাঙা চোরা ছিল না। তাই বিএনপি আমলের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। এখন থেকে রাস্তাঘাট দেখে শুনে চলব।

এরপর নাকি ওই ভদ্রলোকের ড্রাইভার অনেক বেশি সচেতন হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে ভদ্রলোককে দুইবার খিলগাঁও, একবার মালিবাগ ও বাড্ডার নয়াবাজার যেতে হয়েছে। সেখানে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ড্রাইভার গাড়ি রাস্তার পাশে থামিয়ে, সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখে এসেছে। তারপরে বলেছে, স্যার, সামনে আর গাড়ি নেওয়া যাবে না। এখানে গাড়ি রাখি। আমি আপনাকে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। সাবধানে হাঁটবেন। রাস্তায় পানি জমে আছে, আবার বড় গর্ত—পড়ে যেতে পারেন।

নির্ভীক সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সম্পাদিত “আমার দেশ” পত্রিকার প্রথম পাতার নিউজ, রিকশাওয়ালাদের এখন দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হচ্ছে। খবরটা দেখে সেদিনই এক রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করি, তোমার এখন দিনে সর্বোচ্চ কত আয় হয়? বলল, স্যার, যেদিন বেশি হয় সেদিন ৫০০ টাকাও হয়। তাকে বলি, তাহলে তো ভালোই আয় হচ্ছে। রিকশাওয়ালা বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয়, কী বলেন স্যার, এখান থেকে দুই বছর আগেও দিনে ১৫০০ থেকে ১৭০০ টাকা আয় করেছি। এর পরে আর তার সঙ্গে কথা বাড়ায়নি। কারণ, দুই বছর আগে দেশে “ফ্যাসিস্ট” ছিল।

কিন্তু আমি চুপ থাকব এবং ফ্যাসিস্ট নিয়ে কোনো কথা বলব না বলে ভীমপণ করে থাকলেও—বেচারা রিকশাওয়ালা আমাকে ছাড়ল না। সে আমার গোবেচারার মতো চেহারা দেখে বেশ বিজ্ঞের মতো বলে, স্যার, আপনি আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন, “ফ্যাসিস্ট” কী?

তাকে পাল্টা প্রশ্ন করি, তুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রিকশা চালাও না? বলল, স্যার, আগে চালাতাম, এখন কম যাই।

কেন কম যাও?

স্যার, ওই “ফ্যাসিস্ট” তাড়ানোর পরে ওখানে কিছু ছেলে-মেয়ে আছে, ওরা রিকশায় চড়ে ভাড়া দেয় না। ইচ্ছেমতো নেমে যায়।

বললাম, সকলে তো তা করে না?

বলে, না স্যার।

তাহলে ওই যারা ভাড়া না দিয়ে নেমে যায়, ওদের কাছে শোনো “ফ্যাসিস্ট” কী। ওরাই ঠিকমতো বলতে পারবে। আমি তো তোমার মতো সাধারণ মানুষ। পড়ালেখার মধ্যেও থাকি না। আমার অবস্থাও তোমার মতো, কত কঠিন শব্দের অর্থ জানি না।

তার সঙ্গে কথা বলতে আজিমপুর পৌঁছে গিয়েছিলাম। সামনে রাস্তা ঘুরে যেতে হবে। তাই হেঁটে নিউ মার্কেটে বেঁচে থাকা দু-একটা বইয়ের দোকানের দিকে এগোতে থাকি। এই অনেক পুরোনো অভ্যাস আর কি? বয়স হলেও তারুণ্যের নস্টালজিয়ায় ঘেরা নিউ মার্কেটে আমার মতো অনেকেই এখনও যায়।

তখন দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে। নিউ মার্কেটের উল্টো দিকে ঝুপড়ি খাবারের দোকানগুলো, যাকে আমাদের তরুণ বয়সে আমরা ইটালিয়ান রেস্টুরেন্ট বলতাম—সেখান থেকে রিকশাওয়ালা বা ফুটপাতের দোকানিরা খেয়ে বের হচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়ল, মাত্র কয়েকদিন আগে সারাক্ষণ রিপোর্টার ও বাংলা ট্রিবিউনের রিপোর্টার একই ধরনের নিউজ করেছে। এসব রেস্টুরেন্টে এখন আর মুরগির মাংস, গরুর মাংস রান্না হয় না। এমনকি রুই মাছ বা পোনা মাছের কারিও রান্না হয় না। সবজিই বেশি রান্না হয়।

সবজি বেশি খাওয়ার বিষয়টি আগে দিল্লি গেলে শুনতাম। বাংলাদেশে “সবজি”, “সবজি” বেশি শুনেছি ইউনূসের আমলে। এখন দেখছি, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে “সবজি”, “সবজি” একটি রব উঠেছে। সেখানে যারা স্বাধীনচেতা ভদ্রলোক আছেন, তারা বলছেন, আমি সবজি খাব কি না খাব, এটা সরকার বলার কে? আমি আয় করব, আমার ইচ্ছেমতো খাব। আমার ভালো লাগলে গরু খাব, তাতে সরকারের কী? সরকারের সঙ্গে জনগণের কী একটা ঝামেলা না সেখানে? অথচ দেখুন আমাদের সরকার কত সফল। জনগণের সঙ্গে সরকারের কোনো ঝামেলা হচ্ছে না। নীরবে দেশের সাধারণ মানুষ সবজি খাচ্ছে। গরু খাচ্ছে না, মুরগি খাচ্ছে না, এমনকি মাছও খাচ্ছে না।

আবার মনে একটু ভয়ও হলো, পাছে এ দেশে আবার বিজেপি না জিতে যায়। যেভাবে সবজি খাবারের প্লেট দখল করছে। যদিও বহুদিন গোল কালো বেগুন খেতে পারছি না, কেজি ১৮০ টাকা শুনে চলে আসি প্রতিদিন সকালে রাস্তায় হাঁটার শেষে। যাহোক, বেগুন তো, না হয়, না-ই খেলাম। তারপরে সম্বিত ফিরে পেতেই মনে হলো, না, তা হবে না। বাংলাদেশে কখনও বিজেপি আসতে পারবে না। বরং বিজেপি সরকারই তো হাতে-পায়ে ধরে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার কাজ করেছে। কিন্তু তারপরেও আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাদের খুব একটা পাত্তা-টাত্তা দিচ্ছেন না। যতই তারা হাত জোড় করে বেড়াক না কেন? সেদিক থেকে ঠিক আছে।

আসলে দেশ চালাতে গেলে বুকের পাটা থাকা দরকার।

এই যে দেখুন, এত বড় একটা ব্রিকস সম্মেলন হয়ে গেল। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট এলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এলেন, আসিয়ান নেতা থেকে শুরু করে ইরানের নেতা এলেন। মিশরের নেতা, ব্রাজিলের নেতা, সাউথ আফ্রিকার নেতা, এমনকি আরব আমিরাতের ও ইথিওপিয়ার নেতাও এলেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ তো আসতেই চেয়েছিলেন, কিন্তু তার চিরকালের জানি দুশমন ভারত বাধা দেওয়াতে তিনি যেতে পারেননি বলে মিডিয়াতে ফাঁস করে দিয়েছেন।

Clay Oven | Almost 8 million people died due to pollution caused by clay  oven both in Urban as well as Rural areas - Anandabazar

আসলে যত বড় সম্মেলন হোক না, আমরা সেখানে যাইনি। ভারত এক ভুলভাল দাওয়াতপত্র দেবে—আর আমরা সেখানে চলে যাব, আমাদের অত জ্বালা নেই। মিডিয়ার লোকজনের জ্বালা থাকতে পারে। ওই সব বড় বড় দেশের নেতাদের জ্বালা থাকতে পারে।

বড় বড় নেতাদের জ্বালা আছেই, কারণ তাদের বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য সয়াবিন তেল রাখতে হবে। এজন্য ব্রাজিলের সঙ্গে, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে তাদের কথা বলতে হবে। আমাদের বাজারে এ মুহূর্তে সয়াবিন উধাও। তাতে আমাদের কীসের জ্বালা!

তাছাড়া ওই সম্মেলনে দেখা গেল, আলাদা গুরুত্ব পেল ইথিওপিয়া। কারণ অতি সহজ। রেড সি বন্ধ করে রেখেছে হুতিরা। আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের ফলে হরমুজ বন্ধ। তাই তেল-গ্যাসের সরবরাহ সব দেশেরই দরকার আছে। রেড সি তো আর মক্কা চুক্তির মাধ্যমে ওপেন করা সম্ভব হবে না। এখানে ইথিওপিয়াকেই লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে হবে। তাদের মাধ্যমেই করাতে হবে। তা না হলে তেল, গ্যাসের দাম বাড়তেই থাকবে, বিদ্যুৎ কমতেই থাকবে, সার আক্রা হতেই থাকবে।

অথচ এতে বড় দেশগুলোর মাথাব্যথা থাকতে পারে। আমাদের কোনো কিছু যায় আসে না। বরং রুমিন ফারহানা তো সংসদে বলেছেনই, “বিএনপি ক্ষমতায় থাকবে, আর তেল, গ্যাস, পানি, সার ক্রাইসিস থাকবে না—এটা তো হতে পারে না।” রুমিন ফারহানা অবশ্য “দৌড় সালাউদ্দিনের” কথা বলেননি। আচ্ছা, ওটা থাক।

বরং মানুষ নতুন দৃশ্য দেখছে, ঢাকা শহরের মানুষ ফ্ল্যাটের সুসজ্জিত কিচেন ছেড়ে রাস্তায় এসে আদি ও অকৃত্রিম পদ্ধতিতে লাকড়ি দিয়ে রান্না করছে। ঝিনাইদহে, রংপুরে সার না পেয়ে কৃষক গুদাম লুট করছে। পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওইসব কৃষকদের গ্রেপ্তার করছে। ভয়ে কৃষক চাষ ফেলে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। আর ঢাকা কেন, সব শহরের রাস্তা সন্ধ্যা হলেই অন্ধকার, গ্রামে গ্রামে ফিরে আসছে হ্যারিকেন, কুপিবাতি। কেরোসিনেরও যা দাম, তা রাতের খাবারও সন্ধ্যা হতেই সবজি দিয়ে খেয়ে নেবে। তাতে শরীরও ভালো থাকবে। শুনেছি বেশি সবজি খেলে নাকি বাথরুমও ভালো হয়। অথচ এ ব্যাপারে ইউনূস সেন্টার থেকে একটা গবেষণা হলে সব থেকে ভালো হতো।

তবে ব্রিকস বয়কট করে আমাদের ভালোই হয়েছে। কারণ, এই ব্রাজিল, চায়না, ইথিওপিয়া—এইসব সমীকরণে আগেভাগে যাওয়া উচিত নয়। যে কোনো কিছু বুঝে শুনে করাই উচিত। যেমন একটা গল্প আছে, ১৯৪৬ সালে কলকাতায় দাঙ্গা শুরু হলে পুলিশ এসে নাকি “উড়ে” (তখন উড়িষ্যার লোককে বেঙ্গলে উড়ে বলত) পাড়ায় গিয়ে তাদের রাস্তা থেকে ঘরের ভেতর যেতে বলে—এমনকি এও বলে, রাস্তায় থাকলে তারা মারাও যেতে পারে। “উড়ে”রা কিন্তু সেদিন রাস্তা থেকে ঘরে যায়নি। তাদের সাফ কথা ছিল, “মরি তো মরব, তবে বুঝে শুনে মরব।”

এই বুঝে শুনে চলার পথটিই ভালো। ১৯৯১ সালে সাবমেরিন ক্যাবল সুবিধা বাংলাদেশকে বিনামূল্যে দিতে চেয়েছিল। বিএনপি সরকার বিষয়টি বুঝতে পাঁচ বছর সময় নিয়েছিল। সাবমেরিন ক্যাবল সুবিধা নেয়নি। শেখ হাসিনা এসে বোঝার সময় না নিয়েই দেশের পয়সা দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবল সুবিধা নিলেন। যার ফলেই তো সবার হাতে হাতে ফেসবুক। আর কপাল পুড়ল শেখ হাসিনার। মুখে টমেটোর সস মেখে, ফেসবুক, ইউটিউবের অ্যালগরিদমে ভর করে ইউনূস মেটিকুলাস বিপ্লব করে ফেলল। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলেন।

যাহোক, এখন আর শেখ হাসিনার মতো ঘটনা ঘটবে না। যেহেতু বিএনপি এসে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ফেসবুকও কমে গেছে—মানুষও সুখে আছে।

Free Photos | Girl playing acoustic guitar on a park bench

এই যেমন এজাজ নামে আমার এক পাঠক আমাকে একটি গান পাঠিয়েছে—

ঘুটঘুটে অন্ধকারে একরাশ গরমে বসে আছি
কানাঘুষোয় শোনা যায়, বিএনপি এসে গেছে
বিএনপি এসে গেছে,
বাকস্বাধীনতার দুই সম্পাদকের মৃতদেহ চাপা পড়ে কাগজে
বিএনপি এসে গেছে।

এই বিএনপি দেখেছিলাম ২০০১ থেকে ২০০৬-এ
প্রথম দেখেছিলাম আমি “পূর্ণিমা”র খবরে
তারপরে বিদ্যুৎহীন, গ্যাসহীন, সারছাড়া, পানি ছাড়া পথে—

সেই বিএনপি এখন ভীষণ দামি
ইন্ডিয়ার কাছে, পাকিস্তানের কাছে—
মক্কা চুক্তি ফেলে দিল পাছে
বিএনপি এসে গেছে—
বিদ্যুৎহীন রাতে তপ্ত বয়লারের মতো গরমের মাঝে শুয়ে আছি
পুতুলের মায় শোন….

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।

হুথিদের বিদ্যুৎগতির এগিয়ে চলা ইরান যুদ্ধে কী প্রভাব ফেলবে?

কানাঘুষোয় শোনা যায়, বিএনপি এসে গেছে

০৯:৩৫:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভদ্রলোকের বয়স সত্তরোর্ধ্ব, স্ত্রীর বয়সও কাছাকাছি। রাতে উত্তরার এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে ফিরছিলেন। হঠাৎ গাড়িতে তীব্র ঝাঁকুনিতে দুজনেই কোমরে ব্যথা পেলেন। তবে তার থেকে ভয় পেলেন বেশি। ভদ্রলোক একটু তারস্বরে ড্রাইভারকে বললেন, কী হলো?

ড্রাইভার উত্তর দেয়, স্যার, রাস্তা ভাঙা।

তা তুমি আস্তে চালাবে না।

ড্রাইভার শান্ত স্বরে বলে, স্যার, মনে ছিল না, বিএনপি এসেছে।

ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, বিএনপি এসেছে মানে? বিএনপি তো ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরেই এসেছে। তুমি এই ছয় মাস পরে এখন এসে কী বলছ, বিএনপি এসেছে।

ড্রাইভার আবারও শান্ত স্বরে উত্তর দেয়, স্যার, দীর্ঘদিন ধরে অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট ভাঙা চোরা ছিল না। তাই বিএনপি আমলের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। এখন থেকে রাস্তাঘাট দেখে শুনে চলব।

এরপর নাকি ওই ভদ্রলোকের ড্রাইভার অনেক বেশি সচেতন হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে ভদ্রলোককে দুইবার খিলগাঁও, একবার মালিবাগ ও বাড্ডার নয়াবাজার যেতে হয়েছে। সেখানে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ড্রাইভার গাড়ি রাস্তার পাশে থামিয়ে, সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখে এসেছে। তারপরে বলেছে, স্যার, সামনে আর গাড়ি নেওয়া যাবে না। এখানে গাড়ি রাখি। আমি আপনাকে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। সাবধানে হাঁটবেন। রাস্তায় পানি জমে আছে, আবার বড় গর্ত—পড়ে যেতে পারেন।

নির্ভীক সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সম্পাদিত “আমার দেশ” পত্রিকার প্রথম পাতার নিউজ, রিকশাওয়ালাদের এখন দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হচ্ছে। খবরটা দেখে সেদিনই এক রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করি, তোমার এখন দিনে সর্বোচ্চ কত আয় হয়? বলল, স্যার, যেদিন বেশি হয় সেদিন ৫০০ টাকাও হয়। তাকে বলি, তাহলে তো ভালোই আয় হচ্ছে। রিকশাওয়ালা বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয়, কী বলেন স্যার, এখান থেকে দুই বছর আগেও দিনে ১৫০০ থেকে ১৭০০ টাকা আয় করেছি। এর পরে আর তার সঙ্গে কথা বাড়ায়নি। কারণ, দুই বছর আগে দেশে “ফ্যাসিস্ট” ছিল।

কিন্তু আমি চুপ থাকব এবং ফ্যাসিস্ট নিয়ে কোনো কথা বলব না বলে ভীমপণ করে থাকলেও—বেচারা রিকশাওয়ালা আমাকে ছাড়ল না। সে আমার গোবেচারার মতো চেহারা দেখে বেশ বিজ্ঞের মতো বলে, স্যার, আপনি আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন, “ফ্যাসিস্ট” কী?

তাকে পাল্টা প্রশ্ন করি, তুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রিকশা চালাও না? বলল, স্যার, আগে চালাতাম, এখন কম যাই।

কেন কম যাও?

স্যার, ওই “ফ্যাসিস্ট” তাড়ানোর পরে ওখানে কিছু ছেলে-মেয়ে আছে, ওরা রিকশায় চড়ে ভাড়া দেয় না। ইচ্ছেমতো নেমে যায়।

বললাম, সকলে তো তা করে না?

বলে, না স্যার।

তাহলে ওই যারা ভাড়া না দিয়ে নেমে যায়, ওদের কাছে শোনো “ফ্যাসিস্ট” কী। ওরাই ঠিকমতো বলতে পারবে। আমি তো তোমার মতো সাধারণ মানুষ। পড়ালেখার মধ্যেও থাকি না। আমার অবস্থাও তোমার মতো, কত কঠিন শব্দের অর্থ জানি না।

তার সঙ্গে কথা বলতে আজিমপুর পৌঁছে গিয়েছিলাম। সামনে রাস্তা ঘুরে যেতে হবে। তাই হেঁটে নিউ মার্কেটে বেঁচে থাকা দু-একটা বইয়ের দোকানের দিকে এগোতে থাকি। এই অনেক পুরোনো অভ্যাস আর কি? বয়স হলেও তারুণ্যের নস্টালজিয়ায় ঘেরা নিউ মার্কেটে আমার মতো অনেকেই এখনও যায়।

তখন দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে। নিউ মার্কেটের উল্টো দিকে ঝুপড়ি খাবারের দোকানগুলো, যাকে আমাদের তরুণ বয়সে আমরা ইটালিয়ান রেস্টুরেন্ট বলতাম—সেখান থেকে রিকশাওয়ালা বা ফুটপাতের দোকানিরা খেয়ে বের হচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়ল, মাত্র কয়েকদিন আগে সারাক্ষণ রিপোর্টার ও বাংলা ট্রিবিউনের রিপোর্টার একই ধরনের নিউজ করেছে। এসব রেস্টুরেন্টে এখন আর মুরগির মাংস, গরুর মাংস রান্না হয় না। এমনকি রুই মাছ বা পোনা মাছের কারিও রান্না হয় না। সবজিই বেশি রান্না হয়।

সবজি বেশি খাওয়ার বিষয়টি আগে দিল্লি গেলে শুনতাম। বাংলাদেশে “সবজি”, “সবজি” বেশি শুনেছি ইউনূসের আমলে। এখন দেখছি, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে “সবজি”, “সবজি” একটি রব উঠেছে। সেখানে যারা স্বাধীনচেতা ভদ্রলোক আছেন, তারা বলছেন, আমি সবজি খাব কি না খাব, এটা সরকার বলার কে? আমি আয় করব, আমার ইচ্ছেমতো খাব। আমার ভালো লাগলে গরু খাব, তাতে সরকারের কী? সরকারের সঙ্গে জনগণের কী একটা ঝামেলা না সেখানে? অথচ দেখুন আমাদের সরকার কত সফল। জনগণের সঙ্গে সরকারের কোনো ঝামেলা হচ্ছে না। নীরবে দেশের সাধারণ মানুষ সবজি খাচ্ছে। গরু খাচ্ছে না, মুরগি খাচ্ছে না, এমনকি মাছও খাচ্ছে না।

আবার মনে একটু ভয়ও হলো, পাছে এ দেশে আবার বিজেপি না জিতে যায়। যেভাবে সবজি খাবারের প্লেট দখল করছে। যদিও বহুদিন গোল কালো বেগুন খেতে পারছি না, কেজি ১৮০ টাকা শুনে চলে আসি প্রতিদিন সকালে রাস্তায় হাঁটার শেষে। যাহোক, বেগুন তো, না হয়, না-ই খেলাম। তারপরে সম্বিত ফিরে পেতেই মনে হলো, না, তা হবে না। বাংলাদেশে কখনও বিজেপি আসতে পারবে না। বরং বিজেপি সরকারই তো হাতে-পায়ে ধরে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার কাজ করেছে। কিন্তু তারপরেও আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাদের খুব একটা পাত্তা-টাত্তা দিচ্ছেন না। যতই তারা হাত জোড় করে বেড়াক না কেন? সেদিক থেকে ঠিক আছে।

আসলে দেশ চালাতে গেলে বুকের পাটা থাকা দরকার।

এই যে দেখুন, এত বড় একটা ব্রিকস সম্মেলন হয়ে গেল। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট এলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এলেন, আসিয়ান নেতা থেকে শুরু করে ইরানের নেতা এলেন। মিশরের নেতা, ব্রাজিলের নেতা, সাউথ আফ্রিকার নেতা, এমনকি আরব আমিরাতের ও ইথিওপিয়ার নেতাও এলেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ তো আসতেই চেয়েছিলেন, কিন্তু তার চিরকালের জানি দুশমন ভারত বাধা দেওয়াতে তিনি যেতে পারেননি বলে মিডিয়াতে ফাঁস করে দিয়েছেন।

Clay Oven | Almost 8 million people died due to pollution caused by clay  oven both in Urban as well as Rural areas - Anandabazar

আসলে যত বড় সম্মেলন হোক না, আমরা সেখানে যাইনি। ভারত এক ভুলভাল দাওয়াতপত্র দেবে—আর আমরা সেখানে চলে যাব, আমাদের অত জ্বালা নেই। মিডিয়ার লোকজনের জ্বালা থাকতে পারে। ওই সব বড় বড় দেশের নেতাদের জ্বালা থাকতে পারে।

বড় বড় নেতাদের জ্বালা আছেই, কারণ তাদের বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য সয়াবিন তেল রাখতে হবে। এজন্য ব্রাজিলের সঙ্গে, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে তাদের কথা বলতে হবে। আমাদের বাজারে এ মুহূর্তে সয়াবিন উধাও। তাতে আমাদের কীসের জ্বালা!

তাছাড়া ওই সম্মেলনে দেখা গেল, আলাদা গুরুত্ব পেল ইথিওপিয়া। কারণ অতি সহজ। রেড সি বন্ধ করে রেখেছে হুতিরা। আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের ফলে হরমুজ বন্ধ। তাই তেল-গ্যাসের সরবরাহ সব দেশেরই দরকার আছে। রেড সি তো আর মক্কা চুক্তির মাধ্যমে ওপেন করা সম্ভব হবে না। এখানে ইথিওপিয়াকেই লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে হবে। তাদের মাধ্যমেই করাতে হবে। তা না হলে তেল, গ্যাসের দাম বাড়তেই থাকবে, বিদ্যুৎ কমতেই থাকবে, সার আক্রা হতেই থাকবে।

অথচ এতে বড় দেশগুলোর মাথাব্যথা থাকতে পারে। আমাদের কোনো কিছু যায় আসে না। বরং রুমিন ফারহানা তো সংসদে বলেছেনই, “বিএনপি ক্ষমতায় থাকবে, আর তেল, গ্যাস, পানি, সার ক্রাইসিস থাকবে না—এটা তো হতে পারে না।” রুমিন ফারহানা অবশ্য “দৌড় সালাউদ্দিনের” কথা বলেননি। আচ্ছা, ওটা থাক।

বরং মানুষ নতুন দৃশ্য দেখছে, ঢাকা শহরের মানুষ ফ্ল্যাটের সুসজ্জিত কিচেন ছেড়ে রাস্তায় এসে আদি ও অকৃত্রিম পদ্ধতিতে লাকড়ি দিয়ে রান্না করছে। ঝিনাইদহে, রংপুরে সার না পেয়ে কৃষক গুদাম লুট করছে। পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওইসব কৃষকদের গ্রেপ্তার করছে। ভয়ে কৃষক চাষ ফেলে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। আর ঢাকা কেন, সব শহরের রাস্তা সন্ধ্যা হলেই অন্ধকার, গ্রামে গ্রামে ফিরে আসছে হ্যারিকেন, কুপিবাতি। কেরোসিনেরও যা দাম, তা রাতের খাবারও সন্ধ্যা হতেই সবজি দিয়ে খেয়ে নেবে। তাতে শরীরও ভালো থাকবে। শুনেছি বেশি সবজি খেলে নাকি বাথরুমও ভালো হয়। অথচ এ ব্যাপারে ইউনূস সেন্টার থেকে একটা গবেষণা হলে সব থেকে ভালো হতো।

তবে ব্রিকস বয়কট করে আমাদের ভালোই হয়েছে। কারণ, এই ব্রাজিল, চায়না, ইথিওপিয়া—এইসব সমীকরণে আগেভাগে যাওয়া উচিত নয়। যে কোনো কিছু বুঝে শুনে করাই উচিত। যেমন একটা গল্প আছে, ১৯৪৬ সালে কলকাতায় দাঙ্গা শুরু হলে পুলিশ এসে নাকি “উড়ে” (তখন উড়িষ্যার লোককে বেঙ্গলে উড়ে বলত) পাড়ায় গিয়ে তাদের রাস্তা থেকে ঘরের ভেতর যেতে বলে—এমনকি এও বলে, রাস্তায় থাকলে তারা মারাও যেতে পারে। “উড়ে”রা কিন্তু সেদিন রাস্তা থেকে ঘরে যায়নি। তাদের সাফ কথা ছিল, “মরি তো মরব, তবে বুঝে শুনে মরব।”

এই বুঝে শুনে চলার পথটিই ভালো। ১৯৯১ সালে সাবমেরিন ক্যাবল সুবিধা বাংলাদেশকে বিনামূল্যে দিতে চেয়েছিল। বিএনপি সরকার বিষয়টি বুঝতে পাঁচ বছর সময় নিয়েছিল। সাবমেরিন ক্যাবল সুবিধা নেয়নি। শেখ হাসিনা এসে বোঝার সময় না নিয়েই দেশের পয়সা দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবল সুবিধা নিলেন। যার ফলেই তো সবার হাতে হাতে ফেসবুক। আর কপাল পুড়ল শেখ হাসিনার। মুখে টমেটোর সস মেখে, ফেসবুক, ইউটিউবের অ্যালগরিদমে ভর করে ইউনূস মেটিকুলাস বিপ্লব করে ফেলল। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলেন।

যাহোক, এখন আর শেখ হাসিনার মতো ঘটনা ঘটবে না। যেহেতু বিএনপি এসে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ফেসবুকও কমে গেছে—মানুষও সুখে আছে।

Free Photos | Girl playing acoustic guitar on a park bench

এই যেমন এজাজ নামে আমার এক পাঠক আমাকে একটি গান পাঠিয়েছে—

ঘুটঘুটে অন্ধকারে একরাশ গরমে বসে আছি
কানাঘুষোয় শোনা যায়, বিএনপি এসে গেছে
বিএনপি এসে গেছে,
বাকস্বাধীনতার দুই সম্পাদকের মৃতদেহ চাপা পড়ে কাগজে
বিএনপি এসে গেছে।

এই বিএনপি দেখেছিলাম ২০০১ থেকে ২০০৬-এ
প্রথম দেখেছিলাম আমি “পূর্ণিমা”র খবরে
তারপরে বিদ্যুৎহীন, গ্যাসহীন, সারছাড়া, পানি ছাড়া পথে—

সেই বিএনপি এখন ভীষণ দামি
ইন্ডিয়ার কাছে, পাকিস্তানের কাছে—
মক্কা চুক্তি ফেলে দিল পাছে
বিএনপি এসে গেছে—
বিদ্যুৎহীন রাতে তপ্ত বয়লারের মতো গরমের মাঝে শুয়ে আছি
পুতুলের মায় শোন….

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।