০৮:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জলবায়ু অর্থায়নের বড় অঙ্কে গ্রামীণ নারীর হিসাব কোথায়? নেপালের আবহাওয়া বিপর্যয়: ‘স্বাভাবিক’ বৃষ্টির হিসাব কেন ভয়ংকর বিভ্রান্তি তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা, এআই সতর্কতা ও নিষেধাজ্ঞা—আলোচনায় সাত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পুরোনো দিনের রেশ মুছে আবারও ফ্যাশনের কেন্দ্রে রেশমি স্কার্ফ গ্রীষ্মজুড়ে নজর কেড়েছে রঙিন গ্রাফিক টি-শার্ট, বদলে গেছে ফ্যাশনের ধারা টোকিওর বসন্ত ২০২৭: ইয়োশিওকুবোর পোশাকে নতুন জাপানি নান্দনিকতার ছোঁয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত সফর নিয়ে কী ঘটেছিল, প্রকাশ করলে অবাক হবেন: তামিম আওয়ামী লীগকে সংসদ নির্বাচন থেকে ‘মাইনাস’ করার অভিযোগ আইপিইউতে ‘স্বাস্থ্যকর’ ভাবা জাইলিটলেই হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি? গবেষণায় মিলল উদ্বেগজনক তথ্য ভোটেকোশি আকস্মিক বন্যায় মৃত ৯০৩, নিখোঁজ ৪,২৪৭; উদ্ধার ১০,৫৪১

জলবায়ু অর্থায়নের বড় অঙ্কে গ্রামীণ নারীর হিসাব কোথায়?

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দক্ষিণ আফ্রিকা বছরে বিপুল অর্থ সংগ্রহ ও বিনিয়োগ করছে। কিন্তু জলবায়ু অর্থায়নের এই বড় অঙ্কের হিসাবের ভেতর এমন এক বাস্তবতা প্রায়ই অনুপস্থিত—গ্রামীণ নারীরা নিজেরাই প্রতিদিন যে জলবায়ু অভিযোজনের কাজ করে চলেছেন, তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য।

পানি শুকিয়ে গেলে কারা বিকল্প উৎস খোঁজেন? ফসল নষ্ট হলে কারা পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা বদলান? বন্যা বা খরায় জীবিকা বিপন্ন হলে কারা নতুন আয়ের পথ খুঁজে নেন? অনেক গ্রামীণ এলাকায় এসব প্রশ্নের উত্তর প্রায়ই নারী। আনুষ্ঠানিক জলবায়ু সহায়তা পৌঁছানোর আগেই তাঁরা সংকট সামাল দেওয়ার কাজ শুরু করেন।

তবু জলবায়ু অর্থায়নের প্রচলিত কাঠামো তাঁদের সেই ভূমিকা অনুযায়ী অর্থ বা স্বীকৃতি দেয় না।

সমস্যা শুধু অর্থের ঘাটতি নয়

জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা সাধারণত কত টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে, কোন খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে কিংবা কত বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে—এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন আছে: অর্থ যাচ্ছে কোথায়? কারা তা পাচ্ছে? কারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? আর যাদের জীবন জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন, তাঁদের স্থিতিস্থাপকতা কতটা বাড়ছে?

বড় অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদন কিংবা বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার মতো প্রকল্পে বিনিয়োগের শক্তিশালী অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে। এসব বিনিয়োগ জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয়। কিন্তু জলবায়ু সংকটকে কেবল জ্বালানি রূপান্তর বা কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখলে এর মানবিক দিকটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

একটি দেশের জলবায়ু নীতি তখনই কার্যকর, যখন তা একই সঙ্গে ভবিষ্যতের নিঃসরণ কমায় এবং বর্তমানের ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা দেয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি পানি, খাদ্য, কৃষি ও স্থানীয় জীবিকা রক্ষার সক্ষমতাও জরুরি।

আর এসব ক্ষেত্রেই গ্রামীণ নারীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

মুনাফার হিসাবের বাইরে যারা

জলবায়ু অর্থায়নের বর্তমান কাঠামোতে ‘ব্যাংকযোগ্যতা’ বা ঋণ ও বিনিয়োগ পাওয়ার উপযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। যে প্রকল্পে নির্দিষ্ট আর্থিক আয় আছে, জামানত দেওয়া যায়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা প্রমাণ করা যায় এবং বড় পরিসরে বিনিয়োগ করা সম্ভব—সেই প্রকল্প সহজে অর্থ পায়।

কিন্তু গ্রামীণ নারীদের অনেক কর্মকাণ্ড এই মানদণ্ডে পড়ে না।

ক্ষুদ্র কৃষি, অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা, পানি সংগ্রহ, পারিবারিক খাদ্যব্যবস্থা কিংবা স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলোর আর্থিক মুনাফা বড় বিনিয়োগকারীর কাছে সবসময় আকর্ষণীয় নয়। ক্ষুদ্র কৃষকদের জামানত বা ঋণের ইতিহাস না থাকার সমস্যাটিও জলবায়ু অর্থায়ন-সংক্রান্ত ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে নারী ও পুরুষভিত্তিক পৃথক তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।Why gender equality must be part of global climate finance reform  initiatives | Brookings

এখানেই বাজারনির্ভর অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়।

বেসরকারি বিনিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই এমন খাত খুঁজবে যেখানে মুনাফা নিশ্চিত করার সম্ভাবনা বেশি। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি কিংবা বড় অবকাঠামো তাই বিনিয়োগকারীর কাছে আকর্ষণীয়। কিন্তু একটি গ্রামের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা, নারী কৃষকদের জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে সহায়তা দেওয়া কিংবা স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সামাজিক মূল্য অনেক সময় আর্থিক মুনাফায় সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।

তার মানে এই নয় যে এসব বিনিয়োগের মূল্য কম। বরং এর অর্থ হলো, প্রচলিত বাজারমূল্য দিয়ে সব জলবায়ু বিনিয়োগের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।

অভিযোজনের ঘাটতি আসলে বৈষম্যের ঘাটতি

জলবায়ু অর্থায়নের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি তাই অভিযোজন। কার্বন নিঃসরণ কমানো জরুরি, কিন্তু একই সঙ্গে এমন মানুষদের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি, যারা ইতিমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা করছেন।

এই জায়গায় নারীরা শুধু সহায়তা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা মানুষ নন; তাঁরা বাস্তবে জলবায়ু অভিযোজনের সক্রিয় কর্মী। তাঁরা স্থানীয় জ্ঞান ব্যবহার করেন, পরিবারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা করেন এবং সংকটের সময় বিকল্প জীবিকার পথ খুঁজে নেন। কিন্তু এই অবদানকে অর্থনৈতিক মূল্য বা জলবায়ু বিনিয়োগের পরিমাপে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

ফলে জলবায়ু অর্থায়নের একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়। যারা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত প্রতিদিন মোকাবিলা করছেন, তাঁরাই অনেক সময় সেই অর্থের নাগালের বাইরে থাকেন, যা তাঁদের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে।

এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্নও।

কত টাকা নয়, কার জন্য টাকা

জলবায়ু অর্থায়নের সাফল্য তাই শুধু মোট অর্থের পরিমাণ দিয়ে বিচার করলে চলবে না। অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কতটা বেসরকারি খাত থেকে এসেছে কিংবা কত বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সঙ্গে জানতে হবে, এই অর্থের সুফল কারা পাচ্ছে এবং কারা বাদ পড়ছে।

সরকারি জলবায়ু বাজেট ও প্রকল্পে নারী, তরুণ, ক্ষুদ্র কৃষক এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠন ও স্থানীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগের জন্য আলাদা অর্থায়ন কাঠামোও প্রয়োজন। একই সঙ্গে আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করা, কারিগরি সহায়তা দেওয়া এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না। সেই অর্থ পাওয়ার পথটিও সহজ করতে হবে। ছোট সংগঠন ও স্থানীয় উদ্যোগগুলোর জন্য জটিল আবেদনপদ্ধতি, কঠিন আর্থিক শর্ত এবং অতিরিক্ত কাগজপত্র অনেক সময় অর্থ পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তথ্যের ঘাটতি দূর করা। জলবায়ু অর্থায়নের হিসাব যদি নারী ও পুরুষভিত্তিক তথ্য আলাদা করে না দেখায়, তাহলে কে কতটা উপকৃত হচ্ছে তা বোঝা কঠিন। ফলে নীতিনির্ধারণেও বৈষম্য অদৃশ্য থেকে যায়।

জলবায়ু অর্থায়নকে তাই শুধু বিনিয়োগের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় সুশাসনের প্রশ্ন। বিশেষ করে যখন বেসরকারি পুঁজি জলবায়ু অর্থায়নে ক্রমশ বড় ভূমিকা নিচ্ছে, তখন সরকারের দায়িত্ব শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণ করা নয়; নিশ্চিত করা যে সেই বিনিয়োগ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের আরও পিছিয়ে দিচ্ছে না।

জলবায়ু অর্থায়ন আসলে কেমন উন্নয়ন চাই, সেই প্রশ্ন

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় প্রকল্পের প্রয়োজন আছে। কিন্তু বড় প্রকল্পের সাফল্য দিয়ে ছোট মানুষের স্থিতিস্থাপকতার ঘাটতি মাপা যায় না। একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোনো গ্রামীণ পরিবার পানির সংকটে কতটা নিরাপদ, কৃষক জলবায়ুজনিত ক্ষতির পর কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন এবং নারীর আয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কতটা বাড়ছে।

জলবায়ু অর্থায়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন অর্থ শুধু দৃশ্যমান প্রকল্প তৈরি করবে না, অদৃশ্য সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও তৈরি করবে।

গ্রামীণ নারীরা জলবায়ু সংকটের প্রান্তিক দর্শক নন। তাঁরা বহু ক্ষেত্রে এর প্রথম সারির মোকাবিলাকারী। এখন প্রয়োজন তাঁদের কাজকে দয়া বা কল্যাণমূলক সহায়তার বিষয় হিসেবে না দেখে জলবায়ু অভিযোজনের অপরিহার্য বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

কারণ যে অর্থনীতি নারীর অদৃশ্য শ্রমের ওপর নির্ভর করে, কিন্তু জলবায়ু অর্থায়নে সেই শ্রমকে মূল্য দেয় না, সেই অর্থায়ন কাঠামো শেষ পর্যন্ত শুধু জলবায়ু বৈষম্যই নয়, বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্যও পুনরুৎপাদন করে।

একটি ন্যায্য জলবায়ু রূপান্তরের প্রশ্ন তাই শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায়—আমরা শুধু ভবিষ্যতের জন্য কত টাকা বিনিয়োগ করছি তা নয়, সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে কাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করছি।

* লিন্ডেলওয়া ননজাদুকা, দক্ষিণ আফ্রিকার স্টেলেনবোশ বিজনেস স্কুল থেকে উন্নয়ন অর্থায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার কমিশনের কৌশল ও সুশাসন বিভাগের প্রধান।

জলবায়ু অর্থায়নের বড় অঙ্কে গ্রামীণ নারীর হিসাব কোথায়?

জলবায়ু অর্থায়নের বড় অঙ্কে গ্রামীণ নারীর হিসাব কোথায়?

০৮:০০:২১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দক্ষিণ আফ্রিকা বছরে বিপুল অর্থ সংগ্রহ ও বিনিয়োগ করছে। কিন্তু জলবায়ু অর্থায়নের এই বড় অঙ্কের হিসাবের ভেতর এমন এক বাস্তবতা প্রায়ই অনুপস্থিত—গ্রামীণ নারীরা নিজেরাই প্রতিদিন যে জলবায়ু অভিযোজনের কাজ করে চলেছেন, তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য।

পানি শুকিয়ে গেলে কারা বিকল্প উৎস খোঁজেন? ফসল নষ্ট হলে কারা পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা বদলান? বন্যা বা খরায় জীবিকা বিপন্ন হলে কারা নতুন আয়ের পথ খুঁজে নেন? অনেক গ্রামীণ এলাকায় এসব প্রশ্নের উত্তর প্রায়ই নারী। আনুষ্ঠানিক জলবায়ু সহায়তা পৌঁছানোর আগেই তাঁরা সংকট সামাল দেওয়ার কাজ শুরু করেন।

তবু জলবায়ু অর্থায়নের প্রচলিত কাঠামো তাঁদের সেই ভূমিকা অনুযায়ী অর্থ বা স্বীকৃতি দেয় না।

সমস্যা শুধু অর্থের ঘাটতি নয়

জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা সাধারণত কত টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে, কোন খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে কিংবা কত বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে—এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন আছে: অর্থ যাচ্ছে কোথায়? কারা তা পাচ্ছে? কারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? আর যাদের জীবন জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন, তাঁদের স্থিতিস্থাপকতা কতটা বাড়ছে?

বড় অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদন কিংবা বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার মতো প্রকল্পে বিনিয়োগের শক্তিশালী অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে। এসব বিনিয়োগ জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয়। কিন্তু জলবায়ু সংকটকে কেবল জ্বালানি রূপান্তর বা কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখলে এর মানবিক দিকটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

একটি দেশের জলবায়ু নীতি তখনই কার্যকর, যখন তা একই সঙ্গে ভবিষ্যতের নিঃসরণ কমায় এবং বর্তমানের ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা দেয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি পানি, খাদ্য, কৃষি ও স্থানীয় জীবিকা রক্ষার সক্ষমতাও জরুরি।

আর এসব ক্ষেত্রেই গ্রামীণ নারীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

মুনাফার হিসাবের বাইরে যারা

জলবায়ু অর্থায়নের বর্তমান কাঠামোতে ‘ব্যাংকযোগ্যতা’ বা ঋণ ও বিনিয়োগ পাওয়ার উপযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। যে প্রকল্পে নির্দিষ্ট আর্থিক আয় আছে, জামানত দেওয়া যায়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা প্রমাণ করা যায় এবং বড় পরিসরে বিনিয়োগ করা সম্ভব—সেই প্রকল্প সহজে অর্থ পায়।

কিন্তু গ্রামীণ নারীদের অনেক কর্মকাণ্ড এই মানদণ্ডে পড়ে না।

ক্ষুদ্র কৃষি, অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা, পানি সংগ্রহ, পারিবারিক খাদ্যব্যবস্থা কিংবা স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলোর আর্থিক মুনাফা বড় বিনিয়োগকারীর কাছে সবসময় আকর্ষণীয় নয়। ক্ষুদ্র কৃষকদের জামানত বা ঋণের ইতিহাস না থাকার সমস্যাটিও জলবায়ু অর্থায়ন-সংক্রান্ত ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে নারী ও পুরুষভিত্তিক পৃথক তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।Why gender equality must be part of global climate finance reform  initiatives | Brookings

এখানেই বাজারনির্ভর অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়।

বেসরকারি বিনিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই এমন খাত খুঁজবে যেখানে মুনাফা নিশ্চিত করার সম্ভাবনা বেশি। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি কিংবা বড় অবকাঠামো তাই বিনিয়োগকারীর কাছে আকর্ষণীয়। কিন্তু একটি গ্রামের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা, নারী কৃষকদের জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে সহায়তা দেওয়া কিংবা স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সামাজিক মূল্য অনেক সময় আর্থিক মুনাফায় সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।

তার মানে এই নয় যে এসব বিনিয়োগের মূল্য কম। বরং এর অর্থ হলো, প্রচলিত বাজারমূল্য দিয়ে সব জলবায়ু বিনিয়োগের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।

অভিযোজনের ঘাটতি আসলে বৈষম্যের ঘাটতি

জলবায়ু অর্থায়নের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি তাই অভিযোজন। কার্বন নিঃসরণ কমানো জরুরি, কিন্তু একই সঙ্গে এমন মানুষদের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি, যারা ইতিমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা করছেন।

এই জায়গায় নারীরা শুধু সহায়তা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা মানুষ নন; তাঁরা বাস্তবে জলবায়ু অভিযোজনের সক্রিয় কর্মী। তাঁরা স্থানীয় জ্ঞান ব্যবহার করেন, পরিবারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা করেন এবং সংকটের সময় বিকল্প জীবিকার পথ খুঁজে নেন। কিন্তু এই অবদানকে অর্থনৈতিক মূল্য বা জলবায়ু বিনিয়োগের পরিমাপে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

ফলে জলবায়ু অর্থায়নের একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়। যারা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত প্রতিদিন মোকাবিলা করছেন, তাঁরাই অনেক সময় সেই অর্থের নাগালের বাইরে থাকেন, যা তাঁদের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে।

এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্নও।

কত টাকা নয়, কার জন্য টাকা

জলবায়ু অর্থায়নের সাফল্য তাই শুধু মোট অর্থের পরিমাণ দিয়ে বিচার করলে চলবে না। অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কতটা বেসরকারি খাত থেকে এসেছে কিংবা কত বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সঙ্গে জানতে হবে, এই অর্থের সুফল কারা পাচ্ছে এবং কারা বাদ পড়ছে।

সরকারি জলবায়ু বাজেট ও প্রকল্পে নারী, তরুণ, ক্ষুদ্র কৃষক এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠন ও স্থানীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগের জন্য আলাদা অর্থায়ন কাঠামোও প্রয়োজন। একই সঙ্গে আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করা, কারিগরি সহায়তা দেওয়া এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না। সেই অর্থ পাওয়ার পথটিও সহজ করতে হবে। ছোট সংগঠন ও স্থানীয় উদ্যোগগুলোর জন্য জটিল আবেদনপদ্ধতি, কঠিন আর্থিক শর্ত এবং অতিরিক্ত কাগজপত্র অনেক সময় অর্থ পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তথ্যের ঘাটতি দূর করা। জলবায়ু অর্থায়নের হিসাব যদি নারী ও পুরুষভিত্তিক তথ্য আলাদা করে না দেখায়, তাহলে কে কতটা উপকৃত হচ্ছে তা বোঝা কঠিন। ফলে নীতিনির্ধারণেও বৈষম্য অদৃশ্য থেকে যায়।

জলবায়ু অর্থায়নকে তাই শুধু বিনিয়োগের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় সুশাসনের প্রশ্ন। বিশেষ করে যখন বেসরকারি পুঁজি জলবায়ু অর্থায়নে ক্রমশ বড় ভূমিকা নিচ্ছে, তখন সরকারের দায়িত্ব শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণ করা নয়; নিশ্চিত করা যে সেই বিনিয়োগ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের আরও পিছিয়ে দিচ্ছে না।

জলবায়ু অর্থায়ন আসলে কেমন উন্নয়ন চাই, সেই প্রশ্ন

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় প্রকল্পের প্রয়োজন আছে। কিন্তু বড় প্রকল্পের সাফল্য দিয়ে ছোট মানুষের স্থিতিস্থাপকতার ঘাটতি মাপা যায় না। একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোনো গ্রামীণ পরিবার পানির সংকটে কতটা নিরাপদ, কৃষক জলবায়ুজনিত ক্ষতির পর কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন এবং নারীর আয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কতটা বাড়ছে।

জলবায়ু অর্থায়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন অর্থ শুধু দৃশ্যমান প্রকল্প তৈরি করবে না, অদৃশ্য সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও তৈরি করবে।

গ্রামীণ নারীরা জলবায়ু সংকটের প্রান্তিক দর্শক নন। তাঁরা বহু ক্ষেত্রে এর প্রথম সারির মোকাবিলাকারী। এখন প্রয়োজন তাঁদের কাজকে দয়া বা কল্যাণমূলক সহায়তার বিষয় হিসেবে না দেখে জলবায়ু অভিযোজনের অপরিহার্য বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

কারণ যে অর্থনীতি নারীর অদৃশ্য শ্রমের ওপর নির্ভর করে, কিন্তু জলবায়ু অর্থায়নে সেই শ্রমকে মূল্য দেয় না, সেই অর্থায়ন কাঠামো শেষ পর্যন্ত শুধু জলবায়ু বৈষম্যই নয়, বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্যও পুনরুৎপাদন করে।

একটি ন্যায্য জলবায়ু রূপান্তরের প্রশ্ন তাই শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায়—আমরা শুধু ভবিষ্যতের জন্য কত টাকা বিনিয়োগ করছি তা নয়, সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে কাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করছি।

* লিন্ডেলওয়া ননজাদুকা, দক্ষিণ আফ্রিকার স্টেলেনবোশ বিজনেস স্কুল থেকে উন্নয়ন অর্থায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার কমিশনের কৌশল ও সুশাসন বিভাগের প্রধান।