১০:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
নেপালের আবহাওয়া বিপর্যয়: ‘স্বাভাবিক’ বৃষ্টির হিসাব কেন ভয়ংকর বিভ্রান্তি তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা, এআই সতর্কতা ও নিষেধাজ্ঞা—আলোচনায় সাত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পুরোনো দিনের রেশ মুছে আবারও ফ্যাশনের কেন্দ্রে রেশমি স্কার্ফ গ্রীষ্মজুড়ে নজর কেড়েছে রঙিন গ্রাফিক টি-শার্ট, বদলে গেছে ফ্যাশনের ধারা টোকিওর বসন্ত ২০২৭: ইয়োশিওকুবোর পোশাকে নতুন জাপানি নান্দনিকতার ছোঁয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত সফর নিয়ে কী ঘটেছিল, প্রকাশ করলে অবাক হবেন: তামিম আওয়ামী লীগকে সংসদ নির্বাচন থেকে ‘মাইনাস’ করার অভিযোগ আইপিইউতে ‘স্বাস্থ্যকর’ ভাবা জাইলিটলেই হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি? গবেষণায় মিলল উদ্বেগজনক তথ্য ভোটেকোশি আকস্মিক বন্যায় মৃত ৯০৩, নিখোঁজ ৪,২৪৭; উদ্ধার ১০,৫৪১ অসুস্থ হওয়ার সামর্থ্যও নেই: চিকিৎসার খরচে আফগান পরিবারের নিঃস্ব হওয়ার গল্প

নেপালের আবহাওয়া বিপর্যয়: ‘স্বাভাবিক’ বৃষ্টির হিসাব কেন ভয়ংকর বিভ্রান্তি তৈরি করছে

নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধস আবারও দেখিয়ে দিল, আবহাওয়াকে কেবল একটি জাতীয় গড় হিসাব দিয়ে বোঝার চেষ্টা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। হিমালয়ের ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং সীমান্তপারের নদী—সবকিছু মিলিয়ে নেপালের দুর্যোগ পূর্বাভাসের বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল।

রাশুয়া এলাকায় নেপাল-চীন সীমান্তে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার প্রাথমিক বিশ্লেষণে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের পর ভূমিধস, নদীর গতিপথ আটকে যাওয়া কিংবা হিমবাহের কোনো অংশ ধসে পড়ার মতো সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে। অর্থাৎ, শুধু আকাশে কতটা মেঘ আছে বা মৌসুমি বৃষ্টিপাতের গড় কত—তা দিয়ে এমন দুর্যোগের পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।

হিমালয়ের বাস্তবতা গড় সংখ্যায় ধরা পড়ে না

নেপাল পৃথিবীর সবচেয়ে নবীন ও ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল পর্বতমালার অংশ। এখানে একটি বৃষ্টিপাতের ঘটনা কেবল কৃষি বা জলসম্পদের বিষয় নয়; একই সঙ্গে তা ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা, সড়ক বিচ্ছিন্নতা কিংবা জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংসের কারণ হতে পারে। এর সঙ্গে যখন জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি যুক্ত হয়, তখন প্রচলিত পূর্বাভাস ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ বছরের শুরুতে নেপালকে দুর্বল ও বিলম্বিত মৌসুমির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল। প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনোর বিকাশের কারণে উপমহাদেশে বৃষ্টিপাত কমতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগও স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি এবং বেশি তাপমাত্রার পূর্বাভাস দিয়েছিল। বর্ষা দেরিতে আসায় প্রথম দিকে সেই পূর্বাভাস যথার্থ বলেই মনে হয়েছিল।

কিন্তু পরে চিত্র বদলে যায়।

What caused Nepal flood? Scientist says it was enormous landslide, glacier  fall - ABC News

ফুলচৌকি, পানৌতি ও ধুলিখেলের আশপাশে রোশি নদীর উজানে ভারী বৃষ্টিপাত বারবার আকস্মিক ঢল তৈরি করে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের বন্যায় কাঠমান্ডু ও পূর্ব নেপালের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ বিপর্যস্ত হওয়ার পর নদীর ওপর তৈরি অস্থায়ী সড়ক ব্যবস্থা বারবার ভেসে গেছে। স্থায়ী পুনর্নির্মাণ চললেও নদীর নাগালের বাইরে সড়ক তুলতে এখন সেটিকে নদীর তলদেশ থেকে প্রায় আট মিটার উঁচু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একইভাবে ভোতে কোশির বন্যার পানি ত্রিশূলী হয়ে মুগলিন ও নারায়ণগড়ের দিকে নেমে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগে প্রভাব ফেলে। সরকারকে পৃথ্বী মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ করতে হয় এবং নিচের দিকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের কয়েকটি সেতুও বন্যার পানিতে ভেসে যায়।

জুলাইয়ের এক সপ্তাহেই নেপালের নয়টি মহাসড়ক একই সময়ে বন্যা ও ভূমিধসে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোথাও সেতু নির্মাণ থেমেছে, কোথাও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আবার কোথাও পুরো জেলা যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি নেপাল পুলিশ জানিয়েছিল, এপ্রিল থেকে বর্ষাজনিত দুর্যোগে অন্তত ১৯ জেলায় ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাহলে পূর্বাভাস কি ভুল ছিল?

প্রশ্নটি এত সরল নয়।

‘স্বাভাবিক’ বৃষ্টিপাতের ফাঁদ

নেপালে দীর্ঘমেয়াদি বর্ষার গড়ের ৯০ থেকে ১১০ শতাংশ বৃষ্টিপাতকে সাধারণত স্বাভাবিক ধরা হয়। জাতীয় পর্যায়ে চলতি মৌসুমের মোট বৃষ্টিপাতও সেই সীমার কাছাকাছি থাকলে পরিসংখ্যানের ভাষায় পুরো মৌসুমকে ‘স্বাভাবিক’ বলা যায়।

কিন্তু নেপালের মতো বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতির দেশে এই জাতীয় গড় বাস্তব বিপদের অনেকটাই আড়াল করতে পারে।

তরাই, শিবালিক, মহাভারত পর্বতমালা এবং উচ্চ হিমালয়ের আবহাওয়া এক নয়। একটি এলাকায় কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি আর অন্য এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা—দুটিই একই জাতীয় গড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে।

ধরা যাক, একই জেলার দুই কৃষকের মৌসুমি বৃষ্টিপাতের মোট পরিমাণ সমান। একজন জুন ও জুলাইয়ে নিয়মিত বৃষ্টি পেয়েছেন। মাটিতে আর্দ্রতা ছিল, ধানের চাষ সময়মতো হয়েছে। অন্যজন প্রায় পুরো জুন মাস বৃষ্টি পাননি, পরে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে মাত্র ৭২ ঘণ্টায় ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টি পেয়েছেন। কাগজে দুজনের মৌসুমি বৃষ্টির পরিমাণ একই। কিন্তু বাস্তবে একজনের ফসল ভালো হয়েছে, অন্যজনের ফসল নষ্ট হয়েছে এবং জমিতে যাওয়ার রাস্তা পর্যন্ত ভেসে গেছে।

নেপালের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই ব্যবধানেরই বাস্তব উদাহরণ।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট দিনে বৃষ্টি হবে কি না, তা পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা এখন অনেক বেশি। স্যাটেলাইট, আধুনিক মডেল এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সমস্যা হলো, নেপালের বাস্তব প্রয়োজন আরও সূক্ষ্ম।

কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানেই বদলে যায় আবহাওয়া

Nepal News | Nepal's First Online News Portal

বিশ্বের অধিকাংশ আবহাওয়া মডেল বায়ুমণ্ডলকে প্রায় ১০ থেকে ২৫ কিলোমিটার আকারের গ্রিডে বিশ্লেষণ করে। কিন্তু নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে কয়েকশ মিটার থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে।

একটি পাহাড়ের যে ঢাল সরাসরি বৃষ্টিবাহী বাতাসের মুখোমুখি, তার বিপরীত পাশের উপত্যকায় হয়তো একই সময়ে অনেক কম বৃষ্টি হচ্ছে। একই ঝড়ের প্রভাবে দুটি স্থানের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কয়েক গুণ আলাদা হতে পারে।

এ কারণে শুধু মৌসুমি পূর্বাভাস দিয়ে কোনো স্থানীয় পৌরসভাকে বলা যায় না, শুষ্ক মৌসুমে তার ঝরনাগুলো সচল রাখার মতো পর্যাপ্ত পানি উজানে জমা হবে কি না। সেই উত্তর পেতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

এখানেই নেপালের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি বড় দুর্বলতা সামনে আসে।

তথ্য ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণ

দশকের পর দশক ধরে নেপালে পানি সরবরাহ, সেচ, জলবিদ্যুৎ এবং সড়ক প্রকল্প তৈরি হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্প এলাকার নিজস্ব আবহাওয়া ও জলপ্রবাহের পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি।

কাছের বিমানবন্দর, জেলা সদর বা কোনো দূরের আবহাওয়া স্টেশনের তথ্য ধরে প্রকল্পের নকশা করা হয়েছে—যদিও সেই স্টেশনটি প্রকল্প এলাকা থেকে ৩০, ৫০ কিংবা ৮০ কিলোমিটার দূরে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূপ্রকৃতিতে অবস্থিত হতে পারে।

ফলে কোনো প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল না দিলে কিংবা একটি চরম আবহাওয়া ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমরা দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করি। অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কিন্তু সব ব্যর্থতার ব্যাখ্যা সেখানে নেই। অনেক সময় মৌলিক সমস্যাটি আরও সহজ—যে পরিবেশে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, সেটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যই সংগ্রহ করা হয়নি।

Improving solar plant efficiency with automatic weather stations

স্থানীয় তথ্যই হতে পারে বড় সমাধান

এই পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া স্টেশন বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাসের গতিবেগ নিয়মিত মাপতে পারে এমন সৌরবিদ্যুৎচালিত যন্ত্র এখন আর কেবল জাতীয় পর্যায়ের সংস্থার জন্য ব্যয়বহুল প্রযুক্তি নয়।

পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন পৌরসভা, স্কুল কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন স্টেশন স্থাপন করা গেলে স্থানীয় জলাধার ও নদী অববাহিকা সম্পর্কে তথ্যের পরিমাণ দ্রুত বাড়বে। কয়েকটি কৌশলগত স্থানে সংগৃহীত তথ্যই একটি পৌরসভার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রয়েছে নেপালের গ্রামগুলোতেই—কৃষকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা।

কোন পাহাড়ের ঢালে আগে বর্ষার বৃষ্টি নামে, কোন ঝরনা ভারী বৃষ্টির কয়েক সপ্তাহ পর পানি বাড়ায়, কিংবা কোন ধরনের মেঘ দেখে শিলাবৃষ্টির আশঙ্কা করা যায়—অনেক কৃষক এসব পরিবর্তন প্রজন্মের পর প্রজন্ম পর্যবেক্ষণ করে আসছেন।

এই অভিজ্ঞতা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের বিকল্প নয়। তবে এটি স্থানীয় জলবায়ু সম্পর্কে এমন এক ধরনের সূক্ষ্ম জ্ঞান, যা জাতীয় পর্যায়ের আবহাওয়া মডেলের পক্ষে সহজে ধারণ করা সম্ভব নয়।

তাই স্কুল, স্থানীয় প্রশাসন এবং কৃষকদের মধ্যে এই জ্ঞান নথিবদ্ধ করার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

প্রয়োজন সমন্বিত স্থানীয় আবহাওয়া ব্যবস্থা

AI is revolutionizing weather forecasting — but it won't solve the weather  - The Weather Network

নেপালের জন্য কার্যকর ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস ব্যবস্থা কেবল একটি নতুন কম্পিউটার মডেল দিয়ে তৈরি হবে না। সেখানে স্থানীয় স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া স্টেশন, স্যাটেলাইট তথ্য, জাতীয় আবহাওয়া বিভাগের আঞ্চলিক পূর্বাভাস এবং স্থানীয় মানুষের পর্যবেক্ষণ—সবকিছুকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।

এর পাশাপাশি চীনের সঙ্গে সীমান্তপারের তথ্য বিনিময়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া জরুরি। নেপালের উজানে কোনো হিমবাহ হ্রদ ভেঙে পড়লে, বড় ভূমিধস হলে বা আকস্মিক বৃষ্টিপাত হলে নিম্নাঞ্চলের মানুষকে দ্রুত জানাতে হবে। ভোতে কোশির মতো নদীর ক্ষেত্রে নদীর উৎসের ঘটনা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বহু দূরের জনপদে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি অবশ্য প্রযুক্তিতে নয়, পরিকল্পনার দর্শনে প্রয়োজন।

নেপালের কৃষক জানতে চান না, পুরো দেশে মৌসুমি বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের ৯০ শতাংশ হবে নাকি ১১০ শতাংশ। তাঁর প্রয়োজন হলো—আগামী কয়েক দিনে তাঁর জমির আশপাশে কতটা বৃষ্টি হতে পারে, বৃষ্টির তীব্রতা কত হতে পারে এবং মাটির বর্তমান অবস্থায় সেই বৃষ্টি বিপজ্জনক হবে কি না।

একটি পৌরসভারও জাতীয় পর্যায়ের গড় পূর্বাভাস যথেষ্ট নয়। তাকে জানতে হবে, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় তার গুরুত্বপূর্ণ নদীপথে পানির প্রবাহ কতটা বাড়তে পারে, কোন বসতিগুলো ঝুঁকিতে এবং কোথায় আগেই মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া দরকার।

প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়। কিন্তু কোথায় বৃষ্টি হচ্ছে, কতটা হচ্ছে এবং সেই বৃষ্টির সম্ভাব্য প্রভাব কী—এসব তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব।

এটি কেবল আবহাওয়াবিদ্যার উন্নয়ন নয়। নেপালের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে এটি কার্যকর শাসনব্যবস্থার অপরিহার্য দায়িত্ব।

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপালের আবহাওয়া বিপর্যয়: ‘স্বাভাবিক’ বৃষ্টির হিসাব কেন ভয়ংকর বিভ্রান্তি তৈরি করছে

নেপালের আবহাওয়া বিপর্যয়: ‘স্বাভাবিক’ বৃষ্টির হিসাব কেন ভয়ংকর বিভ্রান্তি তৈরি করছে

১০:০০:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধস আবারও দেখিয়ে দিল, আবহাওয়াকে কেবল একটি জাতীয় গড় হিসাব দিয়ে বোঝার চেষ্টা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। হিমালয়ের ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং সীমান্তপারের নদী—সবকিছু মিলিয়ে নেপালের দুর্যোগ পূর্বাভাসের বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল।

রাশুয়া এলাকায় নেপাল-চীন সীমান্তে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার প্রাথমিক বিশ্লেষণে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের পর ভূমিধস, নদীর গতিপথ আটকে যাওয়া কিংবা হিমবাহের কোনো অংশ ধসে পড়ার মতো সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে। অর্থাৎ, শুধু আকাশে কতটা মেঘ আছে বা মৌসুমি বৃষ্টিপাতের গড় কত—তা দিয়ে এমন দুর্যোগের পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।

হিমালয়ের বাস্তবতা গড় সংখ্যায় ধরা পড়ে না

নেপাল পৃথিবীর সবচেয়ে নবীন ও ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল পর্বতমালার অংশ। এখানে একটি বৃষ্টিপাতের ঘটনা কেবল কৃষি বা জলসম্পদের বিষয় নয়; একই সঙ্গে তা ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা, সড়ক বিচ্ছিন্নতা কিংবা জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংসের কারণ হতে পারে। এর সঙ্গে যখন জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি যুক্ত হয়, তখন প্রচলিত পূর্বাভাস ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ বছরের শুরুতে নেপালকে দুর্বল ও বিলম্বিত মৌসুমির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল। প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনোর বিকাশের কারণে উপমহাদেশে বৃষ্টিপাত কমতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগও স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি এবং বেশি তাপমাত্রার পূর্বাভাস দিয়েছিল। বর্ষা দেরিতে আসায় প্রথম দিকে সেই পূর্বাভাস যথার্থ বলেই মনে হয়েছিল।

কিন্তু পরে চিত্র বদলে যায়।

What caused Nepal flood? Scientist says it was enormous landslide, glacier  fall - ABC News

ফুলচৌকি, পানৌতি ও ধুলিখেলের আশপাশে রোশি নদীর উজানে ভারী বৃষ্টিপাত বারবার আকস্মিক ঢল তৈরি করে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের বন্যায় কাঠমান্ডু ও পূর্ব নেপালের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ বিপর্যস্ত হওয়ার পর নদীর ওপর তৈরি অস্থায়ী সড়ক ব্যবস্থা বারবার ভেসে গেছে। স্থায়ী পুনর্নির্মাণ চললেও নদীর নাগালের বাইরে সড়ক তুলতে এখন সেটিকে নদীর তলদেশ থেকে প্রায় আট মিটার উঁচু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একইভাবে ভোতে কোশির বন্যার পানি ত্রিশূলী হয়ে মুগলিন ও নারায়ণগড়ের দিকে নেমে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগে প্রভাব ফেলে। সরকারকে পৃথ্বী মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ করতে হয় এবং নিচের দিকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের কয়েকটি সেতুও বন্যার পানিতে ভেসে যায়।

জুলাইয়ের এক সপ্তাহেই নেপালের নয়টি মহাসড়ক একই সময়ে বন্যা ও ভূমিধসে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোথাও সেতু নির্মাণ থেমেছে, কোথাও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আবার কোথাও পুরো জেলা যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি নেপাল পুলিশ জানিয়েছিল, এপ্রিল থেকে বর্ষাজনিত দুর্যোগে অন্তত ১৯ জেলায় ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাহলে পূর্বাভাস কি ভুল ছিল?

প্রশ্নটি এত সরল নয়।

‘স্বাভাবিক’ বৃষ্টিপাতের ফাঁদ

নেপালে দীর্ঘমেয়াদি বর্ষার গড়ের ৯০ থেকে ১১০ শতাংশ বৃষ্টিপাতকে সাধারণত স্বাভাবিক ধরা হয়। জাতীয় পর্যায়ে চলতি মৌসুমের মোট বৃষ্টিপাতও সেই সীমার কাছাকাছি থাকলে পরিসংখ্যানের ভাষায় পুরো মৌসুমকে ‘স্বাভাবিক’ বলা যায়।

কিন্তু নেপালের মতো বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতির দেশে এই জাতীয় গড় বাস্তব বিপদের অনেকটাই আড়াল করতে পারে।

তরাই, শিবালিক, মহাভারত পর্বতমালা এবং উচ্চ হিমালয়ের আবহাওয়া এক নয়। একটি এলাকায় কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি আর অন্য এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা—দুটিই একই জাতীয় গড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে।

ধরা যাক, একই জেলার দুই কৃষকের মৌসুমি বৃষ্টিপাতের মোট পরিমাণ সমান। একজন জুন ও জুলাইয়ে নিয়মিত বৃষ্টি পেয়েছেন। মাটিতে আর্দ্রতা ছিল, ধানের চাষ সময়মতো হয়েছে। অন্যজন প্রায় পুরো জুন মাস বৃষ্টি পাননি, পরে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে মাত্র ৭২ ঘণ্টায় ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টি পেয়েছেন। কাগজে দুজনের মৌসুমি বৃষ্টির পরিমাণ একই। কিন্তু বাস্তবে একজনের ফসল ভালো হয়েছে, অন্যজনের ফসল নষ্ট হয়েছে এবং জমিতে যাওয়ার রাস্তা পর্যন্ত ভেসে গেছে।

নেপালের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই ব্যবধানেরই বাস্তব উদাহরণ।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট দিনে বৃষ্টি হবে কি না, তা পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা এখন অনেক বেশি। স্যাটেলাইট, আধুনিক মডেল এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সমস্যা হলো, নেপালের বাস্তব প্রয়োজন আরও সূক্ষ্ম।

কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানেই বদলে যায় আবহাওয়া

Nepal News | Nepal's First Online News Portal

বিশ্বের অধিকাংশ আবহাওয়া মডেল বায়ুমণ্ডলকে প্রায় ১০ থেকে ২৫ কিলোমিটার আকারের গ্রিডে বিশ্লেষণ করে। কিন্তু নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে কয়েকশ মিটার থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে।

একটি পাহাড়ের যে ঢাল সরাসরি বৃষ্টিবাহী বাতাসের মুখোমুখি, তার বিপরীত পাশের উপত্যকায় হয়তো একই সময়ে অনেক কম বৃষ্টি হচ্ছে। একই ঝড়ের প্রভাবে দুটি স্থানের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কয়েক গুণ আলাদা হতে পারে।

এ কারণে শুধু মৌসুমি পূর্বাভাস দিয়ে কোনো স্থানীয় পৌরসভাকে বলা যায় না, শুষ্ক মৌসুমে তার ঝরনাগুলো সচল রাখার মতো পর্যাপ্ত পানি উজানে জমা হবে কি না। সেই উত্তর পেতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

এখানেই নেপালের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি বড় দুর্বলতা সামনে আসে।

তথ্য ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণ

দশকের পর দশক ধরে নেপালে পানি সরবরাহ, সেচ, জলবিদ্যুৎ এবং সড়ক প্রকল্প তৈরি হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্প এলাকার নিজস্ব আবহাওয়া ও জলপ্রবাহের পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি।

কাছের বিমানবন্দর, জেলা সদর বা কোনো দূরের আবহাওয়া স্টেশনের তথ্য ধরে প্রকল্পের নকশা করা হয়েছে—যদিও সেই স্টেশনটি প্রকল্প এলাকা থেকে ৩০, ৫০ কিংবা ৮০ কিলোমিটার দূরে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূপ্রকৃতিতে অবস্থিত হতে পারে।

ফলে কোনো প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল না দিলে কিংবা একটি চরম আবহাওয়া ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমরা দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করি। অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কিন্তু সব ব্যর্থতার ব্যাখ্যা সেখানে নেই। অনেক সময় মৌলিক সমস্যাটি আরও সহজ—যে পরিবেশে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, সেটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যই সংগ্রহ করা হয়নি।

Improving solar plant efficiency with automatic weather stations

স্থানীয় তথ্যই হতে পারে বড় সমাধান

এই পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া স্টেশন বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাসের গতিবেগ নিয়মিত মাপতে পারে এমন সৌরবিদ্যুৎচালিত যন্ত্র এখন আর কেবল জাতীয় পর্যায়ের সংস্থার জন্য ব্যয়বহুল প্রযুক্তি নয়।

পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন পৌরসভা, স্কুল কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন স্টেশন স্থাপন করা গেলে স্থানীয় জলাধার ও নদী অববাহিকা সম্পর্কে তথ্যের পরিমাণ দ্রুত বাড়বে। কয়েকটি কৌশলগত স্থানে সংগৃহীত তথ্যই একটি পৌরসভার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রয়েছে নেপালের গ্রামগুলোতেই—কৃষকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা।

কোন পাহাড়ের ঢালে আগে বর্ষার বৃষ্টি নামে, কোন ঝরনা ভারী বৃষ্টির কয়েক সপ্তাহ পর পানি বাড়ায়, কিংবা কোন ধরনের মেঘ দেখে শিলাবৃষ্টির আশঙ্কা করা যায়—অনেক কৃষক এসব পরিবর্তন প্রজন্মের পর প্রজন্ম পর্যবেক্ষণ করে আসছেন।

এই অভিজ্ঞতা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের বিকল্প নয়। তবে এটি স্থানীয় জলবায়ু সম্পর্কে এমন এক ধরনের সূক্ষ্ম জ্ঞান, যা জাতীয় পর্যায়ের আবহাওয়া মডেলের পক্ষে সহজে ধারণ করা সম্ভব নয়।

তাই স্কুল, স্থানীয় প্রশাসন এবং কৃষকদের মধ্যে এই জ্ঞান নথিবদ্ধ করার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

প্রয়োজন সমন্বিত স্থানীয় আবহাওয়া ব্যবস্থা

AI is revolutionizing weather forecasting — but it won't solve the weather  - The Weather Network

নেপালের জন্য কার্যকর ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস ব্যবস্থা কেবল একটি নতুন কম্পিউটার মডেল দিয়ে তৈরি হবে না। সেখানে স্থানীয় স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া স্টেশন, স্যাটেলাইট তথ্য, জাতীয় আবহাওয়া বিভাগের আঞ্চলিক পূর্বাভাস এবং স্থানীয় মানুষের পর্যবেক্ষণ—সবকিছুকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।

এর পাশাপাশি চীনের সঙ্গে সীমান্তপারের তথ্য বিনিময়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া জরুরি। নেপালের উজানে কোনো হিমবাহ হ্রদ ভেঙে পড়লে, বড় ভূমিধস হলে বা আকস্মিক বৃষ্টিপাত হলে নিম্নাঞ্চলের মানুষকে দ্রুত জানাতে হবে। ভোতে কোশির মতো নদীর ক্ষেত্রে নদীর উৎসের ঘটনা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বহু দূরের জনপদে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি অবশ্য প্রযুক্তিতে নয়, পরিকল্পনার দর্শনে প্রয়োজন।

নেপালের কৃষক জানতে চান না, পুরো দেশে মৌসুমি বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের ৯০ শতাংশ হবে নাকি ১১০ শতাংশ। তাঁর প্রয়োজন হলো—আগামী কয়েক দিনে তাঁর জমির আশপাশে কতটা বৃষ্টি হতে পারে, বৃষ্টির তীব্রতা কত হতে পারে এবং মাটির বর্তমান অবস্থায় সেই বৃষ্টি বিপজ্জনক হবে কি না।

একটি পৌরসভারও জাতীয় পর্যায়ের গড় পূর্বাভাস যথেষ্ট নয়। তাকে জানতে হবে, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় তার গুরুত্বপূর্ণ নদীপথে পানির প্রবাহ কতটা বাড়তে পারে, কোন বসতিগুলো ঝুঁকিতে এবং কোথায় আগেই মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া দরকার।

প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়। কিন্তু কোথায় বৃষ্টি হচ্ছে, কতটা হচ্ছে এবং সেই বৃষ্টির সম্ভাব্য প্রভাব কী—এসব তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব।

এটি কেবল আবহাওয়াবিদ্যার উন্নয়ন নয়। নেপালের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে এটি কার্যকর শাসনব্যবস্থার অপরিহার্য দায়িত্ব।