আফগানিস্তানে অসুস্থতা শুধু শারীরিক কষ্টের নাম নয়, অনেক পরিবারের জন্য এটি হয়ে ওঠে ভয়াবহ আর্থিক সংকট। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পেরে মানুষকে কখনো চিকিৎসা পিছিয়ে দিতে হয়, কখনো কম খরচের বিকল্প খুঁজতে হয়। কেউ ছুটছেন কবিরাজের কাছে, কেউ ভেষজ ওষুধে ভরসা করছেন, আবার কেউ যাচ্ছেন অলৌকিক নিরাময়ের আশায় পবিত্র মাজারে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন অস্ত্রোপচারই হয়ে ওঠে একমাত্র পথ—কিন্তু সেই পথের মূল্যও অনেকের সামর্থ্যের বাইরে।
দীর্ঘদিনের ব্যথা, সামনে বিপুল খরচ
কাবুলের ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে কোমরের ব্যথায় ভুগছিলেন। প্রথম দিকে ব্যথা সহনীয় ছিল। ব্যায়াম ও ব্যথানাশক ওষুধে তিনি কাজ চালিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু একসময় ব্যথা বাঁ পা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এমন দিনও এসেছে, যখন দীর্ঘক্ষণ চেয়ারেও বসে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্ত্রী, তিন সন্তান, বাবা, বাবার স্ত্রী, দুই ভাই ও এক ভাবিসহ বড় পরিবারের ব্যয় তাঁর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি নিজ গ্রামের আত্মীয়দের কাছেও প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে হয়।
দীর্ঘ সময় বসে কাজ করতে হয় বলে কোমরের ব্যথা তাঁর জীবিকা নিয়েও হুমকি তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর জোরাজুরিতে চিকিৎসকের কাছে যান তিনি। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে কোমরের নিচের অংশে মেরুদণ্ডের একটি ডিস্ক সরে গিয়ে স্নায়ুর ওপর চাপ তৈরি করেছে।
চিকিৎসক প্রথমে বিশ্রাম ও শারীরিক চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কিন্তু তাতে ব্যথা কমেনি। দ্বিতীয় একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একই পরীক্ষার ফল দেখে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন।
অস্ত্রোপচারের খরচ বলা হয় প্রায় দেড় লাখ আফগানি। এর সঙ্গে হাসপাতালের খরচ, ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যয়ও যোগ হওয়ার কথা। এত টাকা তাঁর হাতে ছিল না।
অস্ত্রোপচার এড়াতে একের পর এক কবিরাজ
অস্ত্রোপচারের ভয়ও তাঁকে পিছিয়ে দেয়। পরিচিতদের কাছ থেকে তিনি এমন অনেক গল্প শুনেছিলেন, যেখানে কোমরের অস্ত্রোপচারের পরও রোগীরা ভালো হননি। ফলে বিপুল টাকা খরচ কিংবা ঋণ করার আগে তিনি অন্য সব পথ চেষ্টা করতে চাইলেন।
আফগানিস্তানে প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসকদের বলা হয় হাকিম। তাঁর পরিচিতরাও একের পর এক বিভিন্ন হাকিমের সন্ধান দিতে থাকেন।
প্রথম হাকিম দাবি করেন, তাঁর কোমরের ব্যথার কারণ শরীরের একটি শিরায় জমে থাকা ঘন রক্ত। সেটি বের করে দিতে হবে। ক্ষুর দিয়ে শরীরে কেটে রক্ত বের করা হয়। কিন্তু ব্যথা কমেনি।
এরপর আরেক হাকিমের কাছে যান তিনি। সেই ব্যক্তি ভেষজ উপাদান দিয়ে তৈরি তরল ওষুধ দেন। তাতেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
এরপর হাকিমদের সংগঠনের পরামর্শে তিনি আরও অভিজ্ঞ একজন প্রবীণ চিকিৎসকের কাছে যান। ওই ব্যক্তি তাঁর পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখে বলেন, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন নেই। তিনি ভেষজ গুঁড়া, নানা ধরনের মিশ্রণ এবং বিশেষ পদ্ধতিতে চিকিৎসা শুরু করেন।
একটি গুঁড়া পানিতে মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে খেতে হতো। অন্য একটি গুঁড়া তিনটি স্থানীয় মুরগির ডিমের কুসুমের সঙ্গে মিশিয়ে কোমরে প্রলেপ হিসেবে লাগাতে বলা হয়। প্রতিদিন প্রায় দশ দিন ধরে সেটি ব্যবহার করেন তিনি।
কিন্তু ব্যথা কমেনি। আরও এক মাস নানা ওষুধ, ব্যায়াম ও খাদ্যনিয়ম মেনে চলেও তেমন উপকার পাননি। এর মধ্যে তাঁর প্রায় আট হাজার আফগানি খরচ হয়ে যায়।
গজনিতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ফিরে আসা
এরপর এক বন্ধু তাঁকে গজনির আরেক হাকিমের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। প্রচণ্ড ব্যথা নিয়েই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছান তিনি।
সেই হাকিম কাঁচা ভেড়ার চর্বি কোমরে মাখিয়ে সারারাত বেঁধে রাখতে বলেন। পরদিন একটি বিশেষ চিকিৎসা করার কথা জানান। কিন্তু কী করবেন, তা স্পষ্ট করে বলেননি।
আগে দুবার শরীর কাটানো, ভেষজ ওষুধ খাওয়া কিংবা ডিমের কুসুমের প্রলেপ ব্যবহার করলেও এবার তাঁর মনে হয়, বিষয়টি বিপজ্জনক হতে পারে। তাই আর ফিরে যাননি তিনি।
এভাবে ছোট ছোট খরচ জমতে জমতে তাঁর ব্যয় দাঁড়ায় ৩০ হাজার আফগানির বেশি। অস্ত্রোপচারের দেড় লাখ আফগানির তুলনায় তা কম হলেও ফলাফল ছিল শূন্য—ব্যথা তখনও রয়ে গেছে।
শেষ ভরসা হয়ে উঠল একটি মাজার
এরপর এক আত্মীয় তাঁর গ্রামের কাছে একটি মাজারের কথা জানান। স্থানীয়ভাবে সেটি কোমরের ব্যথা সারানোর জন্য পরিচিত। আফগানিস্তানের অনেক এলাকায় নির্দিষ্ট রোগ নিরাময়ের জন্য বিভিন্ন মাজারে যাওয়ার প্রচলন রয়েছে।
কোথাও ত্বকের রোগ সারানোর জন্য মানুষ পানিতে গোসল করে, কোথাও দাঁতের ব্যথা কমানোর আশায় বিশেষ আচার পালন করা হয়। সন্তান ধারণে সমস্যায় থাকা নারীরাও কিছু মাজারে যান।
এই সংস্কৃতির সঙ্গে অনেক পরিবার শৈশব থেকেই পরিচিত। শিশুর অসুস্থতা বা অশুভ শক্তির ভয় থেকে পরিবারের সদস্যরা মাজারে গিয়ে ধর্মীয় ব্যক্তির কাছ থেকে তাবিজও নেন।
কোমরের ব্যথার জন্য পরিচিত সেই মাজারে গিয়ে ওই ব্যক্তি একটি তাবিজ নেন। সেটি তাঁর বাঁ হাতে বেঁধে দেওয়া হয়। তাঁকে গরুর মাংস না খাওয়া এবং ধীরে হাঁটার পরামর্শও দেওয়া হয়।
কিন্তু কাবুলে ফেরার পথে তাঁর ব্যথা এতটাই বেড়ে যায় যে গাড়ি বারবার থামাতে হয়। শেষ পর্যন্ত পরিচিত একটি মাঠে নেমে তিনি ঠান্ডা পানির স্রোতে পা ডুবিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকেন।
কিছুক্ষণ পর আশ্চর্যজনকভাবে ব্যথা কমতে শুরু করে। বাড়ি পৌঁছানোর সময় তিনি অনেকটাই স্বস্তি অনুভব করেন।
ছয় মাসের স্বস্তি, তারপর আবার ফিরে এল ব্যথা
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি ব্যথামুক্ত ছিলেন। চিকিৎসককে গিয়ে বিষয়টি জানান। চিকিৎসক আবার পরীক্ষা করিয়ে বলেন, সমস্যার মূল কারণ—সরে যাওয়া ডিস্ক—এখনও রয়েছে। ব্যথা সাময়িকভাবে কমলেও রোগটি সেরে যায়নি।
অস্ত্রোপচার করার পরামর্শও তিনি বহাল রাখেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে রোগী চিকিৎসকের কথা শুনতে চাননি। দীর্ঘ কয়েক মাস পর ব্যথামুক্ত একটি দিন যেন তাঁকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিল।
এরপর প্রায় ছয় মাস তিনি ব্যথামুক্ত ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয় যে অস্ত্রোপচার ছাড়াই হয়তো তিনি সুস্থ হয়ে গেছেন।
কিন্তু এপ্রিলের একদিন বাগানে কাজ করার সময় নিচু হয়ে কিছু তুলতে গিয়ে আবার তীব্র ব্যথা শুরু হয়। সোজা হয়ে দাঁড়ানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
চিকিৎসকের কাছে গেলে তাঁকে সতর্ক করে বলা হয়, আর দেরি করলে অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে মেরুদণ্ডে ধাতব দণ্ড বসানোর প্রয়োজনও হতে পারে।
তখন তিনি বুঝতে পারেন, আর বিকল্প খোঁজার সুযোগ নেই। অস্ত্রোপচার করাতেই হবে।
অস্ত্রোপচারের টাকা জোগাড়েও অনিশ্চয়তা
অস্ত্রোপচারে রাজি হওয়া এক বিষয়, কিন্তু টাকা জোগাড় করা ছিল আরও বড় সমস্যা।
নিজের উপার্জনের অধিকাংশই পরিবারের পেছনে ব্যয় হয়। গ্রামের আত্মীয়দেরও তিনি সহায়তা করেন। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক মানুষ তাঁর কাছ থেকেও ধার চান।
তাঁর কাছে কয়েকজনের টাকা পাওনা ছিল। কিন্তু নিজের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলেও তিনি তাদের টাকা ফেরত দিতে চাপ দিতে চাননি। কারণ তিনি জানতেন, তারাও আর্থিক সমস্যার মধ্যে আছে।
শেষ পর্যন্ত আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এক আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ঠিক তখনই ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। তাঁর এক বন্ধু, যাঁকে তিনি আগে টাকা ধার দিয়েছিলেন, হঠাৎ সেই টাকা ফেরত দেন। বন্ধুটি জানতেনও না যে তাঁর অস্ত্রোপচারের জন্য অর্থ প্রয়োজন।
বন্ধুটি তাঁকে দুই লাখ আফগানি ফেরত দেন। এই অর্থ দিয়েই অস্ত্রোপচার, হাসপাতালের থাকা, ওষুধ, পরবর্তী পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের অন্যান্য খরচ মেটানো সম্ভব হয়।
দুই সপ্তাহ পর তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অস্ত্রোপচার করান।
চিকিৎসা শেষ হলেও খরচের বোঝা শেষ হয়নি
অস্ত্রোপচারের ১৪ দিন পর চিকিৎসক তাঁর সেলাই খুলে দেন। সুস্থ হওয়ার জন্য শারীরিক চিকিৎসার পরামর্শও দেওয়া হয়। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর হাতে আর পর্যাপ্ত টাকা ছিল না।
বিদেশে থাকা এক বন্ধু তাঁকে কোমরের অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যায়ামের নির্দেশনা পাঠান। এখন তিনি বাড়িতেই প্রতিদিন সেগুলো করেন।
অস্ত্রোপচারের পরও কিছুটা ব্যথা রয়েছে। তবে আগের তুলনায় অনেক কম। প্রতিদিন নিজেকে কিছুটা শক্তিশালী মনে হচ্ছে।
তবু পেছনে ফিরে তাকালে তাঁর মনে হয়, অস্ত্রোপচার এড়াতে গিয়ে তিনি কত কিছুই না করেছেন। শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের খরচ তাঁর প্রায় সব সঞ্চয় শেষ করে দিয়েছে।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকে যায়—যদি ঠিক সেই সময়ে বন্ধুটি তাঁর ধার করা টাকা ফেরত না দিতেন, তাহলে কী হতো?
আফগানিস্তানের এই গল্পটি শুধু একজন মানুষের কোমরের ব্যথার গল্প নয়। এটি এমন এক স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তবতা তুলে ধরে, যেখানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই হুমকির মুখে পড়ে। যখন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন মানুষ বাধ্য হয় অপেক্ষা করতে, বিকল্প খুঁজতে কিংবা প্রচলিত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করতে। আর সেই অপেক্ষা কখনো কখনো রোগকে আরও জটিল করে তোলে।
অসুস্থ হওয়া মানুষের হাতে থাকে না, কিন্তু চিকিৎসার সামর্থ্য না থাকা একটি পরিবারের জন্য অসুস্থতাকে আরও নির্মম করে তুলতে পারে।
আফগানিস্তানে চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়, মানুষের সীমিত আয় এবং নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা খরচ বহনের চাপ কীভাবে সাধারণ মানুষকে বিকল্প চিকিৎসার দিকে ঠেলে দেয়, এই ঘটনাটি তারই গভীর উদাহরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















