নেপালের ভয়াবহ ভোতে কোসি বন্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্টভাবে তুলে না ধরার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বন্যার পেছনে দায়ী মানবসৃষ্ট কাঠামো, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং দায়বদ্ধতার প্রশ্নও যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে সমালোচনা করেছেন দুই ডিজাইনার ভব্যা জৈন ও ফাতিমা হামদানি।
ঘটনার দুই দিন পর তাঁরা পশ্চিমা প্রধানধারার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের শিরোনাম নিয়ে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট প্রকাশ করেন। আলেক্সান্দ্রা বেলের ‘কাউন্টারন্যারেটিভস’ ধারার আদলে লাল কলমের দাগ টেনে তাঁরা শিরোনামগুলোর দ্ব্যর্থক ভাষা তুলে ধরেন। তাঁদের দাবি, এসব প্রতিবেদনে বন্যার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়ে যথেষ্ট দৃঢ়ভাবে কথা বলা হয়নি।
পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এতে ৩২ হাজারের বেশি পছন্দের প্রতিক্রিয়া পড়ে। তাঁদের যৌথ লেখায় বলা হয়, সংবাদমাধ্যম বেঁচে যাওয়া মানুষের আতঙ্ক ও বিস্ময়ের কথা তুলে ধরলেও বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের জলবায়ু সংকট নিয়ে দেওয়া সতর্কতার বিষয়টি একই গুরুত্বে তুলে ধরছে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসূত্র নিয়ে দ্বিধা
ভোতে কোসি বন্যাকে বৃহত্তর জলবায়ু সংকটের অংশ হিসেবে দেখার বিষয়টি নিয়ে গত এক সপ্তাহে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমবাহের পশ্চাদপসরণ ও চিরতুষার স্তর বা পারমাফ্রস্টের ক্ষয় জলবায়ু পরিবর্তনের নথিভুক্ত প্রভাব।
২৬ আগস্ট লাংটাং লিরুংয়ের একটি বরফস্তর ধসে পড়ে। বিজ্ঞানীদের মতে, এর প্রধান কারণ ছিল নিচের শিলাস্তরের ভেঙে যাওয়া। হিমালয় বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, শিলার ফাটলে থাকা পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ায় বরফের সেই বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়। তিব্বত মালভূমিতে এ গ্রীষ্মে রেকর্ড তাপমাত্রার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনকে বন্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে পশ্চিমা গণমাধ্যমের একাংশের সতর্কতা বা দ্বিধার সমালোচনা করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে ‘নেপালের বন্যার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী কি না’—এমন প্রশ্ন তোলার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্যোগের বাইরে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
প্রতিবেদনটির মূল বক্তব্য হলো, বন্যাকে জলবায়ু সংকটের সঙ্গে যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন নিজে কোনো স্বতন্ত্র কারণ নয়; এর পেছনে রয়েছে মানুষের তৈরি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো।
নেপালে প্রাণহানি বেশি হওয়ার পেছনে নদীর স্বাভাবিক প্লাবনভূমিতে অনিয়ন্ত্রিত বসতিকে কেউ কেউ দায়ী করলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী মানবসৃষ্ট ব্যবস্থাগুলোই অনেক মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসে ঠেলে দেয়।
পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় নেপালের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অত্যন্ত কম হলেও দেশটি জলবায়ু সংকটের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের সামনে রয়েছে। এ বাস্তবতা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এলেও প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—শুধু দায় অন্যত্র সরিয়ে দিলেই কি জবাবদিহির বিষয়টি শেষ হয়ে যায়?
আন্তর্জাতিক মনোযোগ দ্রুত কমছে
ভোতে কোসি বন্যায় নেপালে মৃতের সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং আরও প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ‘নেপাল’ নিয়ে গুগলে অনুসন্ধান বন্যার পরদিন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর এরই মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের মতো এবারও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশ্ববাসীর মনোযোগ ধীরে ধীরে অন্য দুর্যোগের দিকে সরে যেতে পারে। তবে লেখাটির প্রশ্ন, পরবর্তী দুর্যোগে কি গণমাধ্যম জলবায়ু পরিবর্তনের অবদান স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে এবং একই সঙ্গে কারা দায়ী ও ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব কার—সেই প্রশ্নও সামনে আনবে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















