১০:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হলিউডের মোহ, লস অ্যাঞ্জেলেসের রোদ আর কুতুরের জাদুতে ডিওর ক্রুজ ২০২৭ মসলাদার গরুর মাংসের টাকো বাটি যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোন ব্যবহারের পথ খুলল চীন, বদলাল প্রতিরক্ষা আইন বাংলাদেশের লাওয়াছড়ায় বনে ছেড়ে দেওয়া ৯ ধীরলোরির ৭টিই মারা গেল ঘরে দুই শিশুর নিথর দেহ, পাশে বাবার মরদেহ—যশোরে হৃদয়বিদারক ঘটনা নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে দেশজুড়ে সব এফআইআর বাতিল সুপ্রিম কোর্টের বৃদ্ধার চোখে বিজয়ের দামি চশমা, মানবিকতায় মুগ্ধ তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর ভক্ত নেপালের ভয়াবহ বন্যায় জলবায়ু সংকটের দায় এড়াচ্ছে পশ্চিমা গণমাধ্যম? হারাল্ডের মৃত্যুর পর নরওয়েতে রাজতন্ত্রের সমর্থন বেড়ে ৭২ শতাংশ, নতুন রাজার শপথ গোপন তহবিলের নামে জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ নেই

বাংলাদেশের লাওয়াছড়ায় বনে ছেড়ে দেওয়া ৯ ধীরলোরির ৭টিই মারা গেল

উদ্ধার করা বন্যপ্রাণীকে নিরাপদ বনে ছেড়ে দেওয়া মানেই তার জীবন রক্ষা হবে—এমন ধারণা সব সময় ঠিক নয়। উপযুক্ত আবাসস্থল, খাবার, নিরাপদ চলাচলের জায়গা এবং একই প্রজাতির অন্য প্রাণীর উপস্থিতি বিবেচনা না করে বনে ছেড়ে দিলে সেই বনই প্রাণীটির জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ধীরলোরি নামে পরিচিত বিরল নিশাচর প্রাণীকে অবমুক্ত করার পর এমনই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। বনে ছেড়ে দেওয়া নয়টি ধীরলোরির মধ্যে সাতটিই মারা গেছে। মাত্র দুটি ছয় মাসের বেশি সময় বেঁচে ছিল।

চারটির শরীরে পাওয়া গেছে আক্রমণের চিহ্ন

মারা যাওয়া সাতটি ধীরলোরির মধ্যে চারটির দেহ পরীক্ষা করার মতো অবস্থায় ছিল। তাদের মাথা, মুখ ও আঙুলে অন্য ধীরলোরির আক্রমণের চিহ্ন পাওয়া যায়।

তবে বাকি তিনটির দেহ পচে যাওয়ায় মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তাই গবেষকেরা সাতটি প্রাণীর মৃত্যুর জন্য একই প্রজাতির অন্য প্রাণীর আক্রমণকে একমাত্র কারণ হিসেবে দাবি করেননি।

গবেষণাটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের গবেষক হাসান আল-রাজির নেতৃত্বে এতে বাংলাদেশ ও বিদেশের আরও ১০ জন গবেষক অংশ নেন। বাংলাদেশের বন বিভাগের পাশাপাশি জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এই গবেষণায় যুক্ত ছিল।

আট মাস ধরে চলেছে নজরদারি

গবেষণায় থাকা ধীরলোরিগুলো বন বিভাগ উদ্ধার করেছিল। কিছু প্রাণী পাচারকারী, বন্যপ্রাণী ব্যবসায়ী ও পোষা প্রাণীর মালিকদের কাছ থেকেও উদ্ধার করা হয়। আবার কয়েকটি প্রাণী মানুষের বসতির আশপাশের বাগান থেকেও উদ্ধার করা হয়েছিল।

বনে ছাড়ার আগে প্রতিটি প্রাণীর ওজন, আঘাত ও অসুস্থতার লক্ষণ পরীক্ষা করা হয়। দুর্বল প্রাণীগুলোকে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হয়। তাদের রাতের চলাফেরা, খাবার গ্রহণ ও আচরণও ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নয়টি ধীরলোরিকে লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে পাঁচটিকে জানকিছড়া এলাকার কাছে এবং চারটিকে অন্য কয়েকটি স্থানে অবমুক্ত করা হয়েছিল।

প্রতিটি প্রাণীর গলায় বেতার সংকেত শনাক্তকারী কলার পরিয়ে গবেষকেরা আট মাসে মোট ১৩৮ রাত তাদের অবস্থান ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন।

মাত্র ১০ দিনের মধ্যে তিনটির মৃত্যু

নয়টি ধীরলোরির মধ্যে তিনটি বনে ছাড়ার মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই মারা যায়। আরও চারটি এক মাসের বেশি সময় বেঁচে থাকার পর মারা যায়।

‘আনু’ নামের একটি পুরুষ ধীরলোরি ১৭৯ দিন পর সংঘর্ষে মারা যায়। ‘ডারউইন’ ও ‘নিশাত’ নামের মাত্র দুটি ধীরলোরি ছয় মাসের বেশি সময় বেঁচে ছিল।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জানকিছড়া এলাকার কাছে ছাড়া পাঁচটি প্রাণীর একটিও বেঁচে থাকেনি। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ওই এলাকায় মোট ১৯টি ধীরলোরি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

গবেষকদের ধারণা, একই এলাকায় বারবার ধীরলোরি ছেড়ে দেওয়ার কারণে সেখানে প্রাণীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এতে নিজেদের মধ্যে এলাকা দখল, খাবার এবং নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

শান্ত দেখতে হলেও নিজের এলাকা নিয়ে খুবই সতর্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান বলেন, ধীরলোরিকে দেখতে শান্ত মনে হলেও তারা নিজেদের এলাকা নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। নতুন কোনো ধীরলোরি এমন এলাকায় ঢুকে পড়লে, যেখানে আগে থেকেই অন্য একটি প্রাণী বসবাস করছে, সেখানে সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মারা যাওয়া প্রাণীগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক ও আক্রমণাত্মক আচরণ করছিল। গবেষকদের মতে, এ ধরনের আচরণ দীর্ঘস্থায়ী চাপ এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারার ইঙ্গিত হতে পারে।

গবেষক হাসান আল-রাজি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণী উদ্ধার এখন শুধু প্রাণীটিকে বনে ছেড়ে দেওয়ার দৃশ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ প্রাণীটি এরপর সেখানে বেঁচে থাকতে পারছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিষয়।

সবুজ বন হলেই তা উপযুক্ত আবাসস্থল নয়

কোনো বন ঘন ও সবুজ হলেই সেখানে একটি প্রাণী ছেড়ে দেওয়া নিরাপদ—এমন ধারণা ঠিক নয়। বনে অবমুক্ত করার আগে ওই এলাকায় একই প্রজাতির কতগুলো প্রাণী আছে, তাদের দখলে থাকা এলাকা কতটা, নতুন প্রাণীর জন্য ফাঁকা এলাকা রয়েছে কি না এবং পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ চলাচলের সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।

গবেষণায় যুক্ত বন বিভাগের উপপ্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মদ জাহিদুল কবির বলেন, ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী অবমুক্ত করার ক্ষেত্রে এই গবেষণার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

গবেষকেরা সম্ভাব্য অবমুক্তকরণ এলাকায় আগে প্রাণীর সংখ্যা ও তাদের এলাকা ব্যবহারের ধরন সম্পর্কে জরিপ করার সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তা শনাক্ত করা, প্রজাতিভিত্তিক পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

বনে ছাড়ার আগে প্রয়োজন আচরণ পর্যবেক্ষণ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হাবিবুন নাহার মনে করেন, বনে ছাড়ার আগে ধীরলোরিগুলোকে আধা-প্রাকৃতিক পরিবেশে রেখে তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা উচিত।

এতে সময় ও অর্থ বেশি লাগলেও প্রাণীটি নতুন পরিবেশে টিকে থাকতে পারবে কি না, অন্য প্রাণীর সঙ্গে তার আচরণ কেমন হবে এবং সে নিজের জন্য নিরাপদ এলাকা খুঁজে নিতে পারবে কি না—এসব বোঝা সম্ভব।

বাংলাদেশে এ ধরনের ব্যবস্থা এখনো খুবই সীমিত। বন বিভাগের কর্মকর্তারাও প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদের ঘাটতির কথা জানিয়েছেন।

বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, একটি প্রাণীকে উদ্ধার করে বনে ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্তটি হয়তো সাফল্যের ছবি হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু প্রকৃত সংরক্ষণ সাফল্য নির্ধারিত হবে তার পরের গল্পে—প্রাণীটি বেঁচে থাকল কি না এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারল কি না।

জনপ্রিয় সংবাদ

হলিউডের মোহ, লস অ্যাঞ্জেলেসের রোদ আর কুতুরের জাদুতে ডিওর ক্রুজ ২০২৭

বাংলাদেশের লাওয়াছড়ায় বনে ছেড়ে দেওয়া ৯ ধীরলোরির ৭টিই মারা গেল

১০:৩০:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উদ্ধার করা বন্যপ্রাণীকে নিরাপদ বনে ছেড়ে দেওয়া মানেই তার জীবন রক্ষা হবে—এমন ধারণা সব সময় ঠিক নয়। উপযুক্ত আবাসস্থল, খাবার, নিরাপদ চলাচলের জায়গা এবং একই প্রজাতির অন্য প্রাণীর উপস্থিতি বিবেচনা না করে বনে ছেড়ে দিলে সেই বনই প্রাণীটির জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ধীরলোরি নামে পরিচিত বিরল নিশাচর প্রাণীকে অবমুক্ত করার পর এমনই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। বনে ছেড়ে দেওয়া নয়টি ধীরলোরির মধ্যে সাতটিই মারা গেছে। মাত্র দুটি ছয় মাসের বেশি সময় বেঁচে ছিল।

চারটির শরীরে পাওয়া গেছে আক্রমণের চিহ্ন

মারা যাওয়া সাতটি ধীরলোরির মধ্যে চারটির দেহ পরীক্ষা করার মতো অবস্থায় ছিল। তাদের মাথা, মুখ ও আঙুলে অন্য ধীরলোরির আক্রমণের চিহ্ন পাওয়া যায়।

তবে বাকি তিনটির দেহ পচে যাওয়ায় মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তাই গবেষকেরা সাতটি প্রাণীর মৃত্যুর জন্য একই প্রজাতির অন্য প্রাণীর আক্রমণকে একমাত্র কারণ হিসেবে দাবি করেননি।

গবেষণাটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের গবেষক হাসান আল-রাজির নেতৃত্বে এতে বাংলাদেশ ও বিদেশের আরও ১০ জন গবেষক অংশ নেন। বাংলাদেশের বন বিভাগের পাশাপাশি জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এই গবেষণায় যুক্ত ছিল।

আট মাস ধরে চলেছে নজরদারি

গবেষণায় থাকা ধীরলোরিগুলো বন বিভাগ উদ্ধার করেছিল। কিছু প্রাণী পাচারকারী, বন্যপ্রাণী ব্যবসায়ী ও পোষা প্রাণীর মালিকদের কাছ থেকেও উদ্ধার করা হয়। আবার কয়েকটি প্রাণী মানুষের বসতির আশপাশের বাগান থেকেও উদ্ধার করা হয়েছিল।

বনে ছাড়ার আগে প্রতিটি প্রাণীর ওজন, আঘাত ও অসুস্থতার লক্ষণ পরীক্ষা করা হয়। দুর্বল প্রাণীগুলোকে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হয়। তাদের রাতের চলাফেরা, খাবার গ্রহণ ও আচরণও ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নয়টি ধীরলোরিকে লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে পাঁচটিকে জানকিছড়া এলাকার কাছে এবং চারটিকে অন্য কয়েকটি স্থানে অবমুক্ত করা হয়েছিল।

প্রতিটি প্রাণীর গলায় বেতার সংকেত শনাক্তকারী কলার পরিয়ে গবেষকেরা আট মাসে মোট ১৩৮ রাত তাদের অবস্থান ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন।

মাত্র ১০ দিনের মধ্যে তিনটির মৃত্যু

নয়টি ধীরলোরির মধ্যে তিনটি বনে ছাড়ার মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই মারা যায়। আরও চারটি এক মাসের বেশি সময় বেঁচে থাকার পর মারা যায়।

‘আনু’ নামের একটি পুরুষ ধীরলোরি ১৭৯ দিন পর সংঘর্ষে মারা যায়। ‘ডারউইন’ ও ‘নিশাত’ নামের মাত্র দুটি ধীরলোরি ছয় মাসের বেশি সময় বেঁচে ছিল।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জানকিছড়া এলাকার কাছে ছাড়া পাঁচটি প্রাণীর একটিও বেঁচে থাকেনি। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ওই এলাকায় মোট ১৯টি ধীরলোরি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

গবেষকদের ধারণা, একই এলাকায় বারবার ধীরলোরি ছেড়ে দেওয়ার কারণে সেখানে প্রাণীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এতে নিজেদের মধ্যে এলাকা দখল, খাবার এবং নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

শান্ত দেখতে হলেও নিজের এলাকা নিয়ে খুবই সতর্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান বলেন, ধীরলোরিকে দেখতে শান্ত মনে হলেও তারা নিজেদের এলাকা নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। নতুন কোনো ধীরলোরি এমন এলাকায় ঢুকে পড়লে, যেখানে আগে থেকেই অন্য একটি প্রাণী বসবাস করছে, সেখানে সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মারা যাওয়া প্রাণীগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক ও আক্রমণাত্মক আচরণ করছিল। গবেষকদের মতে, এ ধরনের আচরণ দীর্ঘস্থায়ী চাপ এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারার ইঙ্গিত হতে পারে।

গবেষক হাসান আল-রাজি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণী উদ্ধার এখন শুধু প্রাণীটিকে বনে ছেড়ে দেওয়ার দৃশ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ প্রাণীটি এরপর সেখানে বেঁচে থাকতে পারছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিষয়।

সবুজ বন হলেই তা উপযুক্ত আবাসস্থল নয়

কোনো বন ঘন ও সবুজ হলেই সেখানে একটি প্রাণী ছেড়ে দেওয়া নিরাপদ—এমন ধারণা ঠিক নয়। বনে অবমুক্ত করার আগে ওই এলাকায় একই প্রজাতির কতগুলো প্রাণী আছে, তাদের দখলে থাকা এলাকা কতটা, নতুন প্রাণীর জন্য ফাঁকা এলাকা রয়েছে কি না এবং পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ চলাচলের সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।

গবেষণায় যুক্ত বন বিভাগের উপপ্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মদ জাহিদুল কবির বলেন, ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী অবমুক্ত করার ক্ষেত্রে এই গবেষণার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

গবেষকেরা সম্ভাব্য অবমুক্তকরণ এলাকায় আগে প্রাণীর সংখ্যা ও তাদের এলাকা ব্যবহারের ধরন সম্পর্কে জরিপ করার সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তা শনাক্ত করা, প্রজাতিভিত্তিক পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

বনে ছাড়ার আগে প্রয়োজন আচরণ পর্যবেক্ষণ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হাবিবুন নাহার মনে করেন, বনে ছাড়ার আগে ধীরলোরিগুলোকে আধা-প্রাকৃতিক পরিবেশে রেখে তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা উচিত।

এতে সময় ও অর্থ বেশি লাগলেও প্রাণীটি নতুন পরিবেশে টিকে থাকতে পারবে কি না, অন্য প্রাণীর সঙ্গে তার আচরণ কেমন হবে এবং সে নিজের জন্য নিরাপদ এলাকা খুঁজে নিতে পারবে কি না—এসব বোঝা সম্ভব।

বাংলাদেশে এ ধরনের ব্যবস্থা এখনো খুবই সীমিত। বন বিভাগের কর্মকর্তারাও প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদের ঘাটতির কথা জানিয়েছেন।

বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, একটি প্রাণীকে উদ্ধার করে বনে ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্তটি হয়তো সাফল্যের ছবি হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু প্রকৃত সংরক্ষণ সাফল্য নির্ধারিত হবে তার পরের গল্পে—প্রাণীটি বেঁচে থাকল কি না এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারল কি না।