ফিলিপাইনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সারা দুতের্তের বিরুদ্ধে অভিশংসন বিচারপ্রক্রিয়ায় গোপন তহবিল ব্যবহারের প্রশ্নটি এখন কেবল অর্থ কোথায় খরচ হয়েছে, সেই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং সরকারি অর্থের নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব হস্তান্তর এবং ব্যয়ের পরবর্তী যাচাই—রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এই মৌলিক স্তম্ভগুলো আদৌ মানা হয়েছিল কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
হাউসের অভিশংসন মামলার প্রসিকিউশন প্যানেলের মুখপাত্র ডেপুটি স্পিকার পাওলো ওর্তেগা ভি-এর বক্তব্যে বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাঁর দাবি, ভাইস প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে শত শত মিলিয়ন পেসোর গোপন তহবিল এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে, যেন নির্ধারিত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার হাতে অর্থ পৌঁছানোর পর সেটি আর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির মধ্যে থাকেনি। তৎকালীন বিশেষ বিতরণ কর্মকর্তা জিনা আকোস্তার সাক্ষ্য অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্টের নির্দেশে তিনি নগদ অর্থের ব্যাগ নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল রেমুন্ড দান্তে লাচিকাকে তুলে দিয়েছিলেন।
এখানেই প্রশাসনিক দায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। সরকারি অর্থ কার হাতে দেওয়া হলো, তা শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়। যিনি অর্থের দায়িত্বে থাকবেন, তাঁর কাজ শুধু অর্থ গ্রহণ ও বিতরণ করা নয়; অর্থের গতিপথ, ব্যবহার এবং পরবর্তী হিসাবও তাঁর জানা ও নথিবদ্ধ থাকার কথা। একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে অর্থ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে দেওয়া হলে সেই ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
গোপন মানেই জবাবদিহির বাইরে নয়

গোপন তহবিলের ক্ষেত্রে একটি ভুল ধারণা রাজনৈতিক বিতর্ককে প্রায়ই বিভ্রান্ত করে—গোপনীয়তা যেন হিসাবের দায় থেকে অব্যাহতি দেয়। বাস্তবে গোপন তহবিলের ব্যয়ের উদ্দেশ্য বা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের কিছু তথ্য প্রকাশযোগ্য না হলেও অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বিলীন হয়ে যায় না।
২০১৫ সালের যৌথ পরিপত্রে গোপন ও গোয়েন্দা তহবিল গ্রহণ, ছাড়, ব্যবহার, প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে। অর্থাৎ নিরাপত্তাজনিত গোপনীয়তা এবং আর্থিক জবাবদিহি—দুটি আলাদা বিষয়। একটি রক্ষা করতে গিয়ে অন্যটি বাদ দেওয়া যায় না।
এই পার্থক্যটি অভিশংসন বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে অর্থটি কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, অর্থ ব্যবহারের পুরো প্রক্রিয়ায় কে দায়িত্বে ছিলেন, কে অনুমোদন দিয়েছেন, কে গ্রহণ করেছেন এবং ব্যয়ের যথাযথ প্রমাণ ও যাচাই কোথায় ছিল।
যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অর্থ হস্তান্তরের পর আর তার গতিপথ যাচাই না করেন, তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। সরকারি অর্থকে ব্যক্তিগত আস্থার ভিত্তিতে পরিচালনা করার সুযোগ তৈরি হলে নিরীক্ষা ব্যবস্থা কেন প্রয়োজন—সেই মৌলিক প্রশ্নও সামনে আসে।
দায়িত্ব শুধু অর্থ হাতে নেওয়ার নয়
আকোস্তার অবস্থানও তাই এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যদি আনুষ্ঠানিকভাবে গোপন তহবিলের বিশেষ বিতরণ কর্মকর্তা হয়ে থাকেন, তাহলে অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কাকে দেওয়া হয়েছে, কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং কীভাবে তার হিসাব সম্পন্ন হয়েছে—এসব বিষয়ে তাঁর জবাব দেওয়ার সক্ষমতা থাকা প্রত্যাশিত।
অন্যদিকে, প্রসিকিউশন যে বিষয়টি সামনে আনছে তা হলো, লাচিকা ভাইস প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সেই আনুষ্ঠানিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন না, যাঁর কাছে তহবিলের হেফাজত ন্যস্ত থাকার কথা। ফলে তাঁর হাতে বিপুল নগদ অর্থ তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং এরপর সেই অর্থের ব্যবহার যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা বিচারিক অনুসন্ধানের যৌক্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখানে ব্যক্তিগত অপরাধের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে অবশ্যই প্রমাণ ও বিচারিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। তবে প্রশাসনিক কাঠামোর দৃষ্টিতে একটি বিষয় স্পষ্ট: সরকারি অর্থের ক্ষেত্রে ‘নির্দেশ ছিল’—এটি সবসময় যথেষ্ট ব্যাখ্যা নয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিজস্ব যাচাই ও নথিভুক্তির দায়িত্বও থাকে।
পোয়ার সাক্ষ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

এই কারণেই অভিশংসন মামলায় আইনজীবী মাইকেল ওয়েসলি পোয়ার সাক্ষ্যকে প্রসিকিউশন গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। দুতের্তের শিক্ষা সচিব থাকাকালে পোয়া উপসচিব, চিফ অব স্টাফ ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গোপন তহবিল নিয়ে যে প্রশ্নগুলো আগে থেকেই উঠেছে, সেগুলোর কিছু উত্তর তাঁর কাছে থাকতে পারে বলে প্রসিকিউশনের ধারণা।
২০২৪ সালের হাউস তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গোপন তহবিলের ব্যয় নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তির প্রসঙ্গও উঠে এসেছিল। প্রায় ১৫ মিলিয়ন পেসোর ব্যয়কে সমর্থন করতে সামরিক প্রত্যয়নপত্র ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন ছিল। সাবেক উপসচিব নোলাসকো মেমপিন তখন জানিয়েছিলেন, পোয়ার অনুরোধে তিনি এসব প্রত্যয়ন সংগ্রহ করেছিলেন।
এখন পোয়াকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করার অর্থ হলো, পূর্বের সেই প্রশ্নগুলোকে অভিশংসন আদালতের কাঠামোয় আরও গভীরভাবে পরীক্ষা করা। তিনি একই সঙ্গে বিবাদীপক্ষের আইনজীবী হওয়ায় আইনজীবী-মক্কেল গোপনীয়তার প্রশ্নও উঠতে পারে। তবে প্রসিকিউশন আগেই ইঙ্গিত দিয়েছে, তিনি কী বলতে পারেন বা কোন তথ্য প্রকাশে আপত্তি জানাতে পারেন—দুই সম্ভাবনার জন্যই তারা প্রস্তুত।
অভিশংসনের বড় প্রশ্নটি ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে ব্যবস্থার দিকে

সারা দুতের্তের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়ার প্রথম অভিযোগে মোট ৬১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন পেসোর গোপন তহবিলের অপব্যবহার, আত্মসাৎ এবং অনিয়মিত হিসাব নিষ্পত্তির অভিযোগ পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকের ৫০০ মিলিয়ন পেসো এবং ২০২৩ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন পেসো রয়েছে।
এই বিপুল অর্থের হিসাব নিয়ে বিচারিক অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত একটি বৃহত্তর নীতিগত প্রশ্নে গিয়ে ঠেকে: রাষ্ট্রের গোপনীয় প্রয়োজন মেটাতে অর্থ বরাদ্দ করা যেতে পারে, কিন্তু সেই অর্থের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা কি গোপন রাখা যায়?
উত্তর হওয়া উচিত—না।
গোপন তহবিলের ব্যবহার নিয়ে সব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা সবসময় সম্ভব নয়। কিন্তু দায়িত্বের শৃঙ্খল, অনুমোদনের কাঠামো, অর্থের হেফাজত এবং নিরীক্ষার নিয়ম অদৃশ্য হয়ে গেলে গোপনীয়তা আর রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের সুরক্ষা থাকে না; তা জবাবদিহির দুর্বলতায় পরিণত হয়।
অভিশংসন বিচার তাই শুধু সারা দুতের্তের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রক্রিয়া নয়। এটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠার পরীক্ষাও—কোনো অর্থকে ‘গোপন’ বলা গেলেই তার ওপর থেকে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির দায় সরিয়ে নেওয়া যায় কি না। এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতে ফিলিপাইনের সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকতে পারে।
ক্রিস্টিনা মারালিত 


















