১২:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জি-২০ বৈঠকে রাশিয়ার প্রত্যাবর্তনে ইউরোপের তীব্র আপত্তি বিলাসবহুল শরীরচর্চার বাজারে বড় বাজি ধরছে দিপতিক রে ডালিওর দেউলিয়া হওয়ার পথে যাত্রা, বাবার কাছ থেকে ৪ হাজার ডলার ঋণ এবং কোটিপতি হওয়ার দুই শিক্ষা দুই মাস পর আবার বিটকয়েন কিনল সেলরের স্ট্র্যাটেজি, ৩৭ কোটি ডলারের বিনিয়োগ সুন্দরবনে ফেরার প্রস্তুতি, জেলে পল্লিতে স্বস্তির সঙ্গে ডাকাতের চাঁদাবাজির আতঙ্ক ৮ ঘণ্টা ঘুমিয়েও কেন দ্রুত বুড়িয়ে যেতে পারেন, জানুন ঘুমের সঠিক সময়ের গুরুত্ব ৬১ বছর পর রহস্যের জট খুলল, জঙ্গলে পাওয়া দেহটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নিখোঁজ নৌসেনার পর্তুগালের ‘হ্যাম্পটনস’ কমপোর্তা: সমুদ্র, বন আর বিলাসিতার এক গোপন স্বর্গ শরতের আগমনী বার্তা সেলেনা গোমেজ ও বেনি ব্লাঙ্কোর ভেনিস ভ্রমণে ইউএস ওপেন শুরুর আগেই নিউইয়র্কে তারকাদের ঝলমলে পার্টির আসর

লাতিন আমেরিকায় চীন-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মহারণ, ঋণ থেকে প্রযুক্তি—কে দখলে নিচ্ছে দক্ষিণের উঠান?

লাতিন আমেরিকাকে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু গত দুই দশকে সেই চিত্র দ্রুত বদলেছে। বাণিজ্য, অবকাঠামো, ঋণ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে চীন অঞ্চলটিতে নিজের উপস্থিতি ক্রমেই শক্তিশালী করেছে। এখন সেই প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রও বাণিজ্যিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধের মতো নানা হাতিয়ার ব্যবহার করছে।

আগস্টের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, লাতিন আমেরিকা আর কেবল ওয়াশিংটনের প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল অঞ্চল নয়। বরং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতিযোগিতাটি এখন শুধু সামরিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। মুদ্রা, ঋণ, অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ, দুর্যোগ মোকাবিলা এমনকি বাণিজ্যপথও হয়ে উঠছে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ।

ব্রাজিলের ঋণে ইউয়ানের প্রবেশ

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ ব্রাজিল। দেশটি চীনে নিয়মিতভাবে ইউয়ান মুদ্রায় ঋণপত্র বিক্রির পরিকল্পনা করছে। এর আগে এমন উদ্যোগ ছিল বিচ্ছিন্ন ধরনের, কিন্তু এখন ব্রাসিলিয়া এটিকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থায় পরিণত করতে চাইছে।

এর অর্থ শুধু চীনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া নয়। এর মাধ্যমে ব্রাজিলের বৈদেশিক ঋণের কাঠামোয় চীনা মুদ্রার স্থায়ী উপস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কারণ লাতিন আমেরিকায় চীনের সঙ্গে বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছে। চীনের মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক লেনদেনে আরও বেশি ব্যবহারযোগ্য করে তোলার বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার সঙ্গে ব্রাজিলের এই সিদ্ধান্তের মিল রয়েছে।

ব্রাজিল যদি নিয়মিতভাবে ইউয়ানে ঋণ সংগ্রহ শুরু করে, তাহলে অন্য লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর জন্যও এটি একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

Latin America's Tug-Of-War: The Pulls of the U.S.-China Rivalry

আর্জেন্টিনার জন্য চীনা মুদ্রা এখন আর বিকল্প নয়, ভরসার অংশ

আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও চীনা মুদ্রার গুরুত্ব বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থাকা সত্ত্বেও বুয়েনস আয়ার্স চীনের সঙ্গে ১৯ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা আরও পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন করেছে।

এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। কারণ আর্জেন্টিনার বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা দেশটিকে বৈদেশিক লেনদেনে কিছুটা বাড়তি নিরাপত্তা দেয় এবং মার্কিন ডলারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি করে।

ফলে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক বন্ধুত্বের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

ডলার থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা

লাতিন আমেরিকায় ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ার পেছনে শুধু চীনের প্রচেষ্টাই কাজ করছে না। কয়েকটি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সমস্যাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

যেসব দেশের ডলারের ঘাটতি রয়েছে, তাদের কাছে চীনা মুদ্রা একটি বিকল্প লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো দেশ চীনের সঙ্গে বিপুল বাণিজ্য করে। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রা বা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর অর্থনৈতিক যুক্তিও রয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে লাতিন আমেরিকা দ্রুত ডলার ত্যাগ করছে। বাস্তবে ডলার এখনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু ইউয়ানের প্রবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—একক মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে।

কলম্বিয়ায় চীনা মেট্রো প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ

চীনের প্রভাব বৃদ্ধির পথে সবকিছু অবশ্য মসৃণ নয়। কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতার মেট্রো নির্মাণ প্রকল্পে চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় এক উপঠিকাদারের পাওনা অর্থ ছাড় করার বিনিময়ে নগদ অর্থ দাবি করা হয়েছিল। এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি তদন্তের আওতায় আসে।

এই অভিযোগের গুরুত্ব শুধু দুর্নীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো লাতিন আমেরিকার বড় অবকাঠামো প্রকল্পে যত বেশি প্রবেশ করছে, ততই তাদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থানীয় আইন মেনে চলার প্রশ্ন সামনে আসছে।

অর্থাৎ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব যত বাড়ছে, সেই প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকি ও বিতর্কও তত দৃশ্যমান হচ্ছে।

As Colombia continues its rescue and relief efforts after a powerful  earthquake, the 80 tonnes of aid sent from Beijing have arrived in Bogota,  where they will be delivered to communities affected

ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার দরজায় চীন

অন্যদিকে একই কলম্বিয়ায় চীনকে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূমিকায়।

আগস্টে শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর বেইজিং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কলম্বিয়া যে ধরনের সহায়তা চাইবে, তার ভিত্তিতে সহযোগিতা করার প্রস্তুতি রয়েছে।

এখানে কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শুধু বাণিজ্য বা বিনিয়োগই গুরুত্বপূর্ণ নয়; দুর্যোগের সময় পাশে দাঁড়ানোও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছার বার্তা দিতে পারে।

বিশেষ করে কলম্বিয়ার নতুন সরকার যখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকছে, তখন চীনের এই সহায়তার প্রস্তাবকে বেইজিংয়ের সম্পর্ক ধরে রাখার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

কিউবাকে ঘিরে সরাসরি সংঘাতে ওয়াশিংটন-বেইজিং

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে কিউবার ক্ষেত্রে।

বেইজিংয়ে দায়িত্ব পালনরত কিউবার একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক প্রতিনিধির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তিনি চীন থেকে কিউবার সামরিক বাহিনীর জন্য সামরিক-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সংগ্রহে সহায়তা করেছেন।

এ ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, চীন ও লাতিন আমেরিকার সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্র এখন শুধু বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে দেখছে না। সামরিক সহযোগিতা বা সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা-সম্পর্কও ওয়াশিংটনের নজরদারির আওতায় এসেছে।

কিউবা ঐতিহাসিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে রয়েছে। সেখানে চীনের উপস্থিতি বাড়লে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ স্বাভাবিকভাবেই আরও বাড়বে।

নয়টি দেশের বিরুদ্ধে শুল্ক এড়ানোর অভিযোগ

বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও সংঘাত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিবেদনে নয়টি লাতিন আমেরিকান দেশের বিরুদ্ধে চীনা পণ্যকে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

The US has played its hand in Latin America. Will China's firms there cash  out? | South China Morning Post

ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, চীনা রপ্তানিকারকেরা তৃতীয় দেশের পথ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক এড়িয়ে যাচ্ছে। যদি এই অভিযোগের ভিত্তিতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের প্রত্যক্ষ চাপে পড়তে পারে।

এখানে অঞ্চলটির জন্য বড় একটি সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অনেক লাতিন আমেরিকান দেশ চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে চায়, আবার যুক্তরাষ্ট্রও তাদের গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও বিনিয়োগকারী। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ভেনেজুয়েলায় প্রযুক্তির লড়াই

ভেনেজুয়েলা আবার প্রতিযোগিতাটিকে নিয়ে গেছে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে।

যুক্তরাষ্ট্র দেশটির টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সুযোগ তৈরি করতে চাইছে, কিন্তু একই সঙ্গে চীনা কোম্পানিগুলোকে সেই সুযোগের বাইরে রাখার ব্যবস্থা করছে।

ভেনেজুয়েলার টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোয় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সময় কে প্রযুক্তি সরবরাহ করবে, সেটি শুধু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়—এটি কৌশলগত সিদ্ধান্তও।

টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ভবিষ্যতের অর্থনীতি, তথ্যপ্রবাহ ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই ভেনেজুয়েলায় চীনা প্রযুক্তির জায়গা সংকুচিত করে পশ্চিমা প্রযুক্তির প্রবেশ ঘটানো যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে।

লাতিন আমেরিকা কি দুই শক্তির নতুন যুদ্ধক্ষেত্র?

বর্তমান পরিস্থিতিতে লাতিন আমেরিকাকে সরাসরি চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো একটি শিবিরে চলে যাচ্ছে—এমনটা বলা কঠিন।

বরং দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখছে। ব্রাজিল চীনের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে, আর্জেন্টিনা চীনের মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা ধরে রাখছে, কলম্বিয়া চীনা অবকাঠামো ও দুর্যোগ সহায়তা গ্রহণ করছে; আবার একই সময়ে এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে।

এটাই সম্ভবত লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল—কোনো এক পক্ষের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে দুই শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা।

চীনের শক্তি অর্থনীতিতে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বাজার ও নিষেধাজ্ঞায়

চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অর্থনৈতিক সম্পর্ক। অবকাঠামো নির্মাণ, ঋণ, বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বেইজিং দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি তৈরি করেছে। চীনের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার বাণিজ্য বৃদ্ধির ফলে এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে বিশাল বাজার, আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাব, নিষেধাজ্ঞা এবং প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের মতো শক্তিশালী হাতিয়ার।

ফলে প্রতিযোগিতাটি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে একটি দেশ চীনের কাছ থেকে ঋণ নিলে সেটি শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকে না, একটি প্রযুক্তি চীনা কোম্পানি সরবরাহ করলে সেটিও শুধু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত থাকে না।

প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে ভূরাজনীতি।

সামনে আরও কঠিন ভারসাম্যের পরীক্ষা

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই দুই শক্তির প্রতিযোগিতাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা, কিন্তু কোনো পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে না পড়া।

চীনের অর্থায়ন দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে। চীনা বাজার কৃষি ও খনিজ রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও অঞ্চলটির অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বিনিয়োগের উৎস।

তাই ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা কিংবা অন্য দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল সম্ভবত হবে বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখা।

আগামী দিনে লাতিন আমেরিকায় চীন-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হলে তার প্রভাব শুধু কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঋণের মুদ্রা থেকে শুরু করে মোবাইল নেটওয়ার্ক, বন্দর, রেলপথ, জ্বালানি, বাণিজ্যপথ এবং দুর্যোগ সহায়তা—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতই এই প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

অর্থাৎ লাতিন আমেরিকা এখন আর কেবল কার প্রভাববলয়ে থাকবে, সেই প্রশ্নের মুখে নেই। বরং অঞ্চলটির দেশগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতাকে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে, সেটিই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

চীন যেখানে অর্থ ও অবকাঠামোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করছে, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে বাজার, নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে। এই দ্বন্দ্ব যত গভীর হবে, লাতিন আমেরিকার প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ভূরাজনৈতিক মূল্যও তত বাড়বে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

জি-২০ বৈঠকে রাশিয়ার প্রত্যাবর্তনে ইউরোপের তীব্র আপত্তি

লাতিন আমেরিকায় চীন-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মহারণ, ঋণ থেকে প্রযুক্তি—কে দখলে নিচ্ছে দক্ষিণের উঠান?

১১:৫২:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লাতিন আমেরিকাকে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু গত দুই দশকে সেই চিত্র দ্রুত বদলেছে। বাণিজ্য, অবকাঠামো, ঋণ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে চীন অঞ্চলটিতে নিজের উপস্থিতি ক্রমেই শক্তিশালী করেছে। এখন সেই প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রও বাণিজ্যিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধের মতো নানা হাতিয়ার ব্যবহার করছে।

আগস্টের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, লাতিন আমেরিকা আর কেবল ওয়াশিংটনের প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল অঞ্চল নয়। বরং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতিযোগিতাটি এখন শুধু সামরিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। মুদ্রা, ঋণ, অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ, দুর্যোগ মোকাবিলা এমনকি বাণিজ্যপথও হয়ে উঠছে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ।

ব্রাজিলের ঋণে ইউয়ানের প্রবেশ

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ ব্রাজিল। দেশটি চীনে নিয়মিতভাবে ইউয়ান মুদ্রায় ঋণপত্র বিক্রির পরিকল্পনা করছে। এর আগে এমন উদ্যোগ ছিল বিচ্ছিন্ন ধরনের, কিন্তু এখন ব্রাসিলিয়া এটিকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থায় পরিণত করতে চাইছে।

এর অর্থ শুধু চীনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া নয়। এর মাধ্যমে ব্রাজিলের বৈদেশিক ঋণের কাঠামোয় চীনা মুদ্রার স্থায়ী উপস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কারণ লাতিন আমেরিকায় চীনের সঙ্গে বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছে। চীনের মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক লেনদেনে আরও বেশি ব্যবহারযোগ্য করে তোলার বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার সঙ্গে ব্রাজিলের এই সিদ্ধান্তের মিল রয়েছে।

ব্রাজিল যদি নিয়মিতভাবে ইউয়ানে ঋণ সংগ্রহ শুরু করে, তাহলে অন্য লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর জন্যও এটি একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

Latin America's Tug-Of-War: The Pulls of the U.S.-China Rivalry

আর্জেন্টিনার জন্য চীনা মুদ্রা এখন আর বিকল্প নয়, ভরসার অংশ

আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও চীনা মুদ্রার গুরুত্ব বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থাকা সত্ত্বেও বুয়েনস আয়ার্স চীনের সঙ্গে ১৯ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা আরও পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন করেছে।

এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। কারণ আর্জেন্টিনার বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা দেশটিকে বৈদেশিক লেনদেনে কিছুটা বাড়তি নিরাপত্তা দেয় এবং মার্কিন ডলারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি করে।

ফলে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক বন্ধুত্বের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

ডলার থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা

লাতিন আমেরিকায় ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ার পেছনে শুধু চীনের প্রচেষ্টাই কাজ করছে না। কয়েকটি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সমস্যাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

যেসব দেশের ডলারের ঘাটতি রয়েছে, তাদের কাছে চীনা মুদ্রা একটি বিকল্প লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো দেশ চীনের সঙ্গে বিপুল বাণিজ্য করে। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রা বা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর অর্থনৈতিক যুক্তিও রয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে লাতিন আমেরিকা দ্রুত ডলার ত্যাগ করছে। বাস্তবে ডলার এখনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু ইউয়ানের প্রবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—একক মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে।

কলম্বিয়ায় চীনা মেট্রো প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ

চীনের প্রভাব বৃদ্ধির পথে সবকিছু অবশ্য মসৃণ নয়। কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতার মেট্রো নির্মাণ প্রকল্পে চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় এক উপঠিকাদারের পাওনা অর্থ ছাড় করার বিনিময়ে নগদ অর্থ দাবি করা হয়েছিল। এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি তদন্তের আওতায় আসে।

এই অভিযোগের গুরুত্ব শুধু দুর্নীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো লাতিন আমেরিকার বড় অবকাঠামো প্রকল্পে যত বেশি প্রবেশ করছে, ততই তাদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থানীয় আইন মেনে চলার প্রশ্ন সামনে আসছে।

অর্থাৎ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব যত বাড়ছে, সেই প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকি ও বিতর্কও তত দৃশ্যমান হচ্ছে।

As Colombia continues its rescue and relief efforts after a powerful  earthquake, the 80 tonnes of aid sent from Beijing have arrived in Bogota,  where they will be delivered to communities affected

ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার দরজায় চীন

অন্যদিকে একই কলম্বিয়ায় চীনকে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূমিকায়।

আগস্টে শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর বেইজিং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কলম্বিয়া যে ধরনের সহায়তা চাইবে, তার ভিত্তিতে সহযোগিতা করার প্রস্তুতি রয়েছে।

এখানে কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শুধু বাণিজ্য বা বিনিয়োগই গুরুত্বপূর্ণ নয়; দুর্যোগের সময় পাশে দাঁড়ানোও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছার বার্তা দিতে পারে।

বিশেষ করে কলম্বিয়ার নতুন সরকার যখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকছে, তখন চীনের এই সহায়তার প্রস্তাবকে বেইজিংয়ের সম্পর্ক ধরে রাখার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

কিউবাকে ঘিরে সরাসরি সংঘাতে ওয়াশিংটন-বেইজিং

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে কিউবার ক্ষেত্রে।

বেইজিংয়ে দায়িত্ব পালনরত কিউবার একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক প্রতিনিধির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তিনি চীন থেকে কিউবার সামরিক বাহিনীর জন্য সামরিক-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সংগ্রহে সহায়তা করেছেন।

এ ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, চীন ও লাতিন আমেরিকার সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্র এখন শুধু বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে দেখছে না। সামরিক সহযোগিতা বা সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা-সম্পর্কও ওয়াশিংটনের নজরদারির আওতায় এসেছে।

কিউবা ঐতিহাসিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে রয়েছে। সেখানে চীনের উপস্থিতি বাড়লে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ স্বাভাবিকভাবেই আরও বাড়বে।

নয়টি দেশের বিরুদ্ধে শুল্ক এড়ানোর অভিযোগ

বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও সংঘাত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিবেদনে নয়টি লাতিন আমেরিকান দেশের বিরুদ্ধে চীনা পণ্যকে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

The US has played its hand in Latin America. Will China's firms there cash  out? | South China Morning Post

ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, চীনা রপ্তানিকারকেরা তৃতীয় দেশের পথ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক এড়িয়ে যাচ্ছে। যদি এই অভিযোগের ভিত্তিতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের প্রত্যক্ষ চাপে পড়তে পারে।

এখানে অঞ্চলটির জন্য বড় একটি সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অনেক লাতিন আমেরিকান দেশ চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে চায়, আবার যুক্তরাষ্ট্রও তাদের গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও বিনিয়োগকারী। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ভেনেজুয়েলায় প্রযুক্তির লড়াই

ভেনেজুয়েলা আবার প্রতিযোগিতাটিকে নিয়ে গেছে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে।

যুক্তরাষ্ট্র দেশটির টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সুযোগ তৈরি করতে চাইছে, কিন্তু একই সঙ্গে চীনা কোম্পানিগুলোকে সেই সুযোগের বাইরে রাখার ব্যবস্থা করছে।

ভেনেজুয়েলার টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোয় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সময় কে প্রযুক্তি সরবরাহ করবে, সেটি শুধু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়—এটি কৌশলগত সিদ্ধান্তও।

টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ভবিষ্যতের অর্থনীতি, তথ্যপ্রবাহ ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই ভেনেজুয়েলায় চীনা প্রযুক্তির জায়গা সংকুচিত করে পশ্চিমা প্রযুক্তির প্রবেশ ঘটানো যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে।

লাতিন আমেরিকা কি দুই শক্তির নতুন যুদ্ধক্ষেত্র?

বর্তমান পরিস্থিতিতে লাতিন আমেরিকাকে সরাসরি চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো একটি শিবিরে চলে যাচ্ছে—এমনটা বলা কঠিন।

বরং দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখছে। ব্রাজিল চীনের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে, আর্জেন্টিনা চীনের মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা ধরে রাখছে, কলম্বিয়া চীনা অবকাঠামো ও দুর্যোগ সহায়তা গ্রহণ করছে; আবার একই সময়ে এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে।

এটাই সম্ভবত লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল—কোনো এক পক্ষের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে দুই শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা।

চীনের শক্তি অর্থনীতিতে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বাজার ও নিষেধাজ্ঞায়

চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অর্থনৈতিক সম্পর্ক। অবকাঠামো নির্মাণ, ঋণ, বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বেইজিং দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি তৈরি করেছে। চীনের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার বাণিজ্য বৃদ্ধির ফলে এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে বিশাল বাজার, আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাব, নিষেধাজ্ঞা এবং প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের মতো শক্তিশালী হাতিয়ার।

ফলে প্রতিযোগিতাটি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে একটি দেশ চীনের কাছ থেকে ঋণ নিলে সেটি শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকে না, একটি প্রযুক্তি চীনা কোম্পানি সরবরাহ করলে সেটিও শুধু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত থাকে না।

প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে ভূরাজনীতি।

সামনে আরও কঠিন ভারসাম্যের পরীক্ষা

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই দুই শক্তির প্রতিযোগিতাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা, কিন্তু কোনো পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে না পড়া।

চীনের অর্থায়ন দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে। চীনা বাজার কৃষি ও খনিজ রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও অঞ্চলটির অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বিনিয়োগের উৎস।

তাই ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা কিংবা অন্য দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল সম্ভবত হবে বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখা।

আগামী দিনে লাতিন আমেরিকায় চীন-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হলে তার প্রভাব শুধু কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঋণের মুদ্রা থেকে শুরু করে মোবাইল নেটওয়ার্ক, বন্দর, রেলপথ, জ্বালানি, বাণিজ্যপথ এবং দুর্যোগ সহায়তা—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতই এই প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

অর্থাৎ লাতিন আমেরিকা এখন আর কেবল কার প্রভাববলয়ে থাকবে, সেই প্রশ্নের মুখে নেই। বরং অঞ্চলটির দেশগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতাকে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে, সেটিই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

চীন যেখানে অর্থ ও অবকাঠামোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করছে, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে বাজার, নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে। এই দ্বন্দ্ব যত গভীর হবে, লাতিন আমেরিকার প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ভূরাজনৈতিক মূল্যও তত বাড়বে।