বিশ্বের অন্যতম সফল বিনিয়োগকারী ও ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটসের প্রতিষ্ঠাতা রে ডালিওর সাফল্যের গল্পের পেছনে রয়েছে এক ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে একটি বড় বিনিয়োগ ভুলের কারণে তিনি এতটাই অর্থকষ্টে পড়েছিলেন যে সংসারের খরচ চালাতে বাবার কাছ থেকে ৪ হাজার ডলার ধার করতে হয়েছিল।
নিউইয়র্কের একটি দুই কক্ষের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ১৯৭৫ সালে নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন ডালিও। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে তাঁর আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
একটি ভুল যেভাবে বদলে দিল জীবন
১৯৮০ থেকে ১৯৮১ সালের দিকে ডালিও ধারণা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশকে যে পরিমাণ ঋণ দিয়েছে, তা আর ফেরত পাওয়ার মতো অবস্থায় নেই। তাঁর আশঙ্কা ছিল, বড় ধরনের ঋণসংকট আসছে।
১৯৮২ সালে মেক্সিকো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ডালিও মনে করেছিলেন তাঁর পূর্বাভাস সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা।
অর্থনৈতিক ধসের বদলে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াল। একই সময়ে আর্থিক নীতি শিথিল করা হলো। ডালিওর বিনিয়োগ অবস্থান ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েন এবং পারিবারিক ব্যয় মেটাতে বাবার কাছ থেকে ৪ হাজার ডলার ধার নেন।

ডালিওর ভাষায়, এই ঘটনা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর চিন্তাভাবনা ও বিনিয়োগের পদ্ধতি আমূল বদলে দেয়।
প্রথম শিক্ষা—নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ করা
ডালিও উপলব্ধি করেন, কেউই সব সময় সঠিক হতে পারে না। এমনকি বিশ্বের অন্যতম সফল বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটও নন।
এই উপলব্ধি তাঁকে নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে নিজের ধারণাকে প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি হয়।
এরপর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ বছর ধরে তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড লিখে রাখার অভ্যাস গড়ে তোলেন। পরে তিনি বুঝতে পারেন, এসব সিদ্ধান্তের নিয়মকে প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করা সম্ভব।
এই পদ্ধতিই ধীরে ধীরে তাঁর বিখ্যাত নীতিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো তৈরি করে। তিনি বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার নীতি লিখেছেন, যা পরবর্তীতে ব্রিজওয়াটারের সংস্কৃতি ও পরিচালন পদ্ধতির অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় শিক্ষা—বিনিয়োগে বৈচিত্র্যের শক্তি
আর্থিক বিপর্যয় থেকে ডালিওর দ্বিতীয় বড় শিক্ষা ছিল বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনা।
তিনি উপলব্ধি করেন, এমন বিভিন্ন সম্পদে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেওয়া যায় যেগুলোর ওঠানামা একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। এতে সম্ভাব্য মুনাফা খুব বেশি কমিয়ে না দিয়েও ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
ডালিওর মতে, সঠিকভাবে বৈচিত্র্য আনা গেলে বিনিয়োগের ঝুঁকি প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে।
এই ধারণাই পরবর্তীতে ব্রিজওয়াটারের বিনিয়োগ দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে। তাঁর বহুল আলোচিত ধারণাগুলোর একটি হলো এমন ১৫টি ভালো ও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কহীন মুনাফার উৎস তৈরি করা, যেগুলোর প্রত্যাশিত মুনাফা কাছাকাছি। এতে ঝুঁকি কমে এবং ঝুঁকির তুলনায় সম্ভাব্য মুনাফা অনেক বেড়ে যায়।
ব্যক্তিগত বিপর্যয় থেকে সাম্রাজ্যের ভিত্তি
ডালিওর কাছে ১৯৮০-এর দশকের সেই ভয়াবহ সময়টি শুধু একটি ব্যর্থ বিনিয়োগের ঘটনা ছিল না। বরং সেটিই তাঁর বিনিয়োগ দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায়।

নিজের ভুল তাঁকে শিখিয়েছে আত্মবিশ্বাস ও অহংকারের মধ্যে পার্থক্য করতে। একই সঙ্গে শিখিয়েছে, একটি অনুমান সঠিক মনে হলেও তার ওপর সবকিছু বাজি রাখা কতটা বিপজ্জনক।
এই অভিজ্ঞতার পর তিনি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে চেয়েছেন যেখানে সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত মতামতের পরিবর্তে নির্দিষ্ট নীতি, তথ্য এবং অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে যাচাই করা যায়।
এবার দেশগুলোর অর্থনীতি নিয়ে সতর্কবার্তা
নিজের আর্থিক বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতার আলোতেই ডালিও এখন দেশগুলোর ঋণ ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে সতর্ক করে আসছেন।
তাঁর নতুন বই হাউ কান্ট্রিজ গো ব্রোক: দ্য বিগ সাইকেল-এ তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে অতিরিক্ত ঋণ ধীরে ধীরে একটি দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
ডালিও ঋণ ও অর্থনীতির সম্পর্ককে মানুষের রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, ঋণ ও সুদ পরিশোধের জন্য যদি একটি অর্থনীতি পর্যাপ্ত আয় তৈরি করতে না পারে, তাহলে ঋণের বোঝা অর্থনীতির অন্যান্য ব্যয়কে সংকুচিত করতে থাকে।
তিনি মনে করেন, ইতিহাসে বড় অর্থনৈতিক চক্র বারবার একই ধরনের কারণে ফিরে এসেছে। তাই অতীতের এসব ধরণ বুঝতে পারলে ভবিষ্যতের বড় পরিবর্তন সম্পর্কে আগেভাগে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
পতনই হয়ে উঠেছিল সাফল্যের ভিত্তি
রে ডালিওর গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ব্যর্থতা সব সময় শেষ নয়। কখনো কখনো সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ই ভবিষ্যতের সাফল্যের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে।
৪ হাজার ডলার ধার করার মতো আর্থিক দুর্দশায় পড়া সেই মানুষটিই পরে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর সেই যাত্রায় বড় ভূমিকা রেখেছে দুটি শিক্ষা—নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করার বিনয় এবং ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগের বৈচিত্র্য।




















