চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন যখন নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, ঠিক তখনই বৈশ্বিক বাণিজ্যে চীনের বিশাল উদ্বৃত্তকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে ওয়াশিংটন। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকের কয়েক সপ্তাহ আগে জি২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের অ্যাশভিলে সোমবার অনুষ্ঠিত জি২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকের উদ্বোধনী বক্তব্যে বেসেন্ট বৈশ্বিক অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্যহীনতার সমালোচনা করেন। তিনি সরাসরি চীনের নাম না নিলেও তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল এমন দেশগুলোর বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত, যা অন্য দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।
চীনের নাম না নিয়েও বার্তা স্পষ্ট
বেসেন্ট বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা ভারসাম্যহীনতা সমৃদ্ধির জন্য হুমকি তৈরি করছে। তাঁর ভাষায়, উদ্বৃত্ত ও ঘাটতি—উভয় ধরনের দেশই অতিরিক্ত ভারসাম্যহীনতা কমানোর মাধ্যমে লাভবান হতে পারে।
কূটনৈতিকভাবে বক্তব্যটি ছিল যথেষ্ট সতর্ক। তিনি চীনের নাম উল্লেখ করেননি। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্তধারী অর্থনীতিগুলোর একটি চীন হওয়ায় তাঁর বক্তব্যের লক্ষ্য নিয়ে খুব বেশি সংশয়ের সুযোগ নেই।
চীনের বিপুল রপ্তানি, তুলনামূলকভাবে কম আমদানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অভিযোগ। ফলে জি২০-এর মতো বহুপক্ষীয় মঞ্চে বিষয়টি তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্র শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনাতেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও চীনের বাণিজ্যনীতির ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

জি২০কে চাপ তৈরির মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার
২০২৬ সালে জি২০-এর সভাপতিত্ব করছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের প্রধান উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর এই জোটের বৈঠকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা করার সুযোগকে তাই ওয়াশিংটন কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সমস্যাটি শুধু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চীনের বিপুল উৎপাদনক্ষমতা ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি বিশ্বের অন্যান্য বাজারেও চাপ সৃষ্টি করছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।
বিশেষ করে শিল্পপণ্য, প্রযুক্তিপণ্য ও অন্যান্য পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে চীনের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে। এসব উদ্বেগকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের বৃহত্তর আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম কৌশল বলে মনে হচ্ছে।
শি-ট্রাম্প বৈঠকের আগে কেন গুরুত্বপূর্ণ
জি২০ বৈঠকে বেসেন্টের বক্তব্যের সময়টিই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটনে গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসার প্রত্যাশা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে আগে থেকেই আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্র আসন্ন বৈঠকের অর্থনৈতিক এজেন্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ধারণ করতে চাইছে।
শি-ট্রাম্প বৈঠকে বাণিজ্য ঘাটতি, শুল্ক, বাজারে প্রবেশাধিকার, শিল্প উৎপাদন এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য—সবকিছুই আলোচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে চীনের বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে যুক্তরাষ্ট্র যদি কাঠামোগত অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে আলোচনার পরিধি শুধু শুল্ক আরোপ বা পণ্য আমদানির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
ওয়াশিংটনের মূল অভিযোগ কোথায়
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের মূল জায়গা হলো, চীন দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করছে, কিন্তু একই মাত্রায় বিদেশি পণ্য ও সেবা আমদানি করছে না। এর ফলে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাড়ছে এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো, এমন ভারসাম্যহীনতা শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সমস্যা নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের পক্ষ থেকে অবশ্য এ ধরনের অভিযোগের ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে। দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং বৈশ্বিক চাহিদাকে বাণিজ্য উদ্বৃত্তের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়। ফলে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমানোর জন্য চীনের ওপর চাপ বাড়ানো হলে বেইজিং কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
সামনে কঠিন দর-কষাকষির সম্ভাবনা

জি২০ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র যে বার্তা দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট—চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু শুল্ক বা নির্দিষ্ট পণ্যের বাণিজ্য নয়, সামগ্রিক বাণিজ্য ভারসাম্যও এখন ওয়াশিংটনের আলোচনার কেন্দ্রে।
এর ফলে শি-ট্রাম্প বৈঠকের আগে দুই দেশের দর-কষাকষির ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র চাইবে চীন তার বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমানোর দিকে এগিয়ে আসুক। অন্যদিকে চীন তার রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর এমন কোনো চাপ সহজে মেনে নেবে কি না, সেটিই হবে আলোচনার বড় পরীক্ষা।
সব মিলিয়ে জি২০ বৈঠকে বেসেন্টের বক্তব্যকে কেবল একটি সাধারণ অর্থনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ কম। শি-ট্রাম্প বৈঠকের আগে এটি ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে একটি আগাম বার্তা—চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এখন আর শুধু দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন হিসেবেও সামনে আনা হচ্ছে।
চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান ভবিষ্যৎ আলোচনায় কতটা চাপ তৈরি করবে, আর বেইজিং তার জবাবে কী ধরনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান নেয়—সেদিকেই এখন আন্তর্জাতিক বাজার ও নীতিনির্ধারকদের নজর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















