দশকের পর দশক ধরে বিপুলসংখ্যক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু উচ্চশিক্ষার সেই বিশাল ব্যবস্থার সামনে এখন নতুন বাস্তবতা—কলেজে ভর্তি হওয়ার বয়সী শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত কমছে। এর সঙ্গে বাড়ছে শিক্ষা পরিচালনার ব্যয়, আর্থিক চাপ এবং শিক্ষার্থীদের বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার প্রবণতা। সব মিলিয়ে আগামী বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বহু কলেজকে টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ে নামতে হতে পারে।
উচ্চবিদ্যালয়ের স্নাতক কমছে
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড ৩৯ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চবিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেছে। তবে এই সংখ্যা ছিল একটি শীর্ষবিন্দু। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে প্রতি বছর উচ্চবিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে প্রায় ৩৪ লাখে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ মাত্র দেড় দশকের মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ পতনের আশঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার অর্থ হলো কলেজগুলোর মধ্যে ভর্তি নিয়ে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীরাও আগের তুলনায় বেশি কলেজে আবেদন করছে। চলতি ভর্তি মৌসুমে গড়ে একজন শিক্ষার্থী প্রায় ৬ দশমিক ৫৬টি কলেজে আবেদন করেছে, যেখানে আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৬ দশমিক ৩৭।
ফলে শুধু শিক্ষার্থী পাওয়াই নয়, কোন শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত ভর্তি হবে—সেটিও কলেজগুলোর জন্য ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
খরচ বাড়ছে, আয় কমছে
শিক্ষার্থী কমে গেলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে যেসব কলেজের আয়ের বড় অংশ আসে শিক্ষার্থীদের দেওয়া ফি থেকে। একটি আসন খালি থাকা মানে সরাসরি আয় কমে যাওয়া। পর্যাপ্ত আসন খালি থাকলে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এর পাশাপাশি কলেজ পরিচালনার খরচও বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্যবিমা ও অন্যান্য ব্যয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ফলে একই সময়ে আয় কমছে এবং ব্যয় বাড়ছে।
শিক্ষার্থী আকর্ষণ করতে কলেজগুলোকে আবার আর্থিক সহায়তা ও ছাড় দিতে হচ্ছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি অলাভজনক কলেজে প্রথমবার ভর্তি হওয়া স্নাতক পর্যায়ের ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনই প্রতিষ্ঠানভিত্তিক অনুদান পেয়েছে। এসব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে নির্ধারিত শিক্ষাব্যয়ের ওপর গড় ছাড়ের হার পৌঁছেছে প্রায় ৫৭ শতাংশে।
অর্থাৎ শিক্ষার্থী ধরে রাখতে কলেজকে ছাড় দিতে হচ্ছে, কিন্তু সেই ছাড়ের কারণে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পাওয়া প্রকৃত আয়ও কমে যাচ্ছে।
চার বছরের ডিগ্রির বিকল্প বাড়ছে
শুধু জনসংখ্যাগত পরিবর্তনই কলেজ সংকটের কারণ নয়। চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সামনে এখন কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষার পথও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
২০২০ সালের বসন্ত থেকে ২০২৫ সালের বসন্তের মধ্যে পেশাভিত্তিক কর্মসূচিতে জোর দেওয়া সরকারি দুই বছরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীসংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে চার বছরের ডিগ্রির ব্যয়ও অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বহু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাব্যয়, আবাসন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বছরে মোট ব্যয় এখন প্রায় ১ লাখ ডলার বা তারও বেশি।
ফলে উচ্চবিদ্যালয় শেষ করার পর সরাসরি কলেজে যাওয়ার প্রবণতাও কমেছে। গত এক দশকে তা প্রায় ৭০ শতাংশ থেকে নেমে ৬২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বন্ধ হচ্ছে কলেজ, বাড়ছে একীভূত হওয়ার আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ২০০৮ সালের পর থেকে ৩০০টিরও বেশি ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। আগামী ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে আরও প্রায় ৮০টি কলেজ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে একটি পূর্বাভাসে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে সব প্রতিষ্ঠান সরাসরি বন্ধ হয়ে যাবে এমন নয়। অনেক কলেজ নিজেদের টিকিয়ে রাখতে অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পথ খুঁজছে।
বেসরকারি অলাভজনক কলেজের প্রধানদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে প্রায় ৩১ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান একীভূত হওয়া বা অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অধিগ্রহণ নিয়ে গুরুতর আলোচনা করেছে। এসব আলোচনার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আর্থিক স্থিতিশীলতা।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় বাড়ছে চাপ
বিদেশি শিক্ষার্থীরাও অনেক মার্কিন কলেজের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কারণ তাঁদের বড় অংশই পূর্ণ শিক্ষাব্যয় পরিশোধ করেন।
কিন্তু বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি বাড়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন চাপের মুখে পড়েছে। গত বছরের মে থেকে আগস্টের গুরুত্বপূর্ণ ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত ভিসা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ শতাংশ কম দেওয়া হয়েছিল।
ফলে যেসব কলেজ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভরশীল, তাদের আর্থিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হ্যাম্পশায়ার কলেজের পরিণতি সতর্কবার্তা
এই সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি হলো ম্যাসাচুসেটসের অ্যামহার্স্টে অবস্থিত হ্যাম্পশায়ার কলেজ। প্রতিষ্ঠানটি শরৎকালীন সেমিস্টারের পর নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করার পথে রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি একটি সুপরিচিত পাঁচ-কলেজ জোটের অংশ ছিল। এই জোটে অ্যামহার্স্ট কলেজ, মাউন্ট হলিওক কলেজ, স্মিথ কলেজ এবং ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয় অ্যামহার্স্টও রয়েছে।
হ্যাম্পশায়ার কলেজের পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, দীর্ঘদিনের সুনাম থাকা প্রতিষ্ঠানও আর্থিক চাপ থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
বড় তহবিল থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়
সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানেরও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। জাতীয়ভাবে পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের তহবিল রয়েছে। তবুও চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারেনি। এর ফলে বাজেটে প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীসংখ্যা ভিসা নীতির কঠোরতার কারণে অর্ধেকে নেমে এসেছে। একই সময়ে নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি গত বছর প্রায় ৪৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার ঋণ নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় তহবিল থাকলেই কোনো কলেজ নিরাপদ হয়ে যায় না। কারণ সেই সম্পদের বড় অংশ ভবন বা নির্দিষ্ট ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত তহবিলে আটকে থাকতে পারে। দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয়ে সেগুলো সহজে ব্যবহার করা যায় না।
সামনে ছোট হয়ে টিকে থাকার লড়াই
উচ্চশিক্ষা খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে কলেজ বন্ধ হওয়ার সংখ্যা বাড়বে, তবে তা একসঙ্গে বিশাল ধসের আকার নাও নিতে পারে। গ্রামীণ উত্তর-পূর্ব ও মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব এলাকায় উচ্চবিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে এবং বড় শহরের মতো শিক্ষার্থী আকর্ষণের সুযোগও সীমিত।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন সামনে আসছে। যে সময়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে জায়গা দেওয়ার জন্য হাজার হাজার কলেজ গড়ে উঠেছিল, এখন সেই আসন পূরণ করাই অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফলে আগামী দিনে অনেক কলেজকে হয় একীভূত হতে হবে, নয়তো কার্যক্রম সংকুচিত করতে হবে। আর কিছু প্রতিষ্ঠানকে হয়তো শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কলেজগুলোর জন্য ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই আর শুধু কত শিক্ষার্থী ভর্তি হবে—বরং কমতে থাকা শিক্ষার্থী নিয়ে কীভাবে প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















