যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির আঙিনায় পাখির জন্য খাবারের পাত্র ঝুলিয়ে রাখার প্রবণতা ব্যাপক। আনুমানিক ৫ থেকে ৬ কোটি মানুষ নিয়মিত এভাবে পাখিকে খাবার দেন। উদ্দেশ্য সাধারণত ভালো—শীত, খরা কিংবা দুর্যোগের সময়ে বন্য পাখিকে খাবারের জোগান দেওয়া। কিন্তু গবেষণা বলছে, দীর্ঘদিন ধরে মানুষের দেওয়া খাবারের ওপর নির্ভরতা পাখির আচরণ, প্রতিযোগিতা এমনকি বিবর্তনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
পাখির আচরণ ও গঠনে বদল
বাড়ির আঙিনায় নিয়মিত খাবার পাওয়ার সুযোগ পাখিদের জন্য নতুন ধরনের পরিবেশ তৈরি করেছে। শহর ও শহরতলির কিছু পাখির মধ্যে খাবার সংগ্রহের সাহসী আচরণ এবং ঠোঁটের গঠনে পরিবর্তনের মতো বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
মানুষের দেওয়া খাবার সহজে সংগ্রহ করতে পারা এসব বৈশিষ্ট্য পাখিদের জন্য তাৎক্ষণিক সুবিধা তৈরি করলেও বন্য পরিবেশে তাদের স্বাভাবিকভাবে খাবার খোঁজা ও টিকে থাকার সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব পড়তে পারে।
সুবিধা পাচ্ছে শক্তিশালী প্রজাতি
খাবারের পাত্রে সব পাখি সমানভাবে সুযোগ পায় না। কাকজাতীয় পাখি, জে পাখি কিংবা ঘরের ফিঞ্চের মতো অপেক্ষাকৃত সাহসী ও অভিযোজনক্ষম প্রজাতি সহজেই খাবারের জায়গা দখল করে নিতে পারে।
অন্যদিকে লাজুক ও অপেক্ষাকৃত কম আক্রমণাত্মক পাখিরা খাবারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। ফলে কিছু প্রজাতির সংখ্যা বাড়লেও অন্য কিছু প্রজাতি আরও কোণঠাসা হয়ে যেতে পারে। এতে স্থানীয় পাখির বৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
খাবারের পাত্রে বাড়ে রোগের ঝুঁকি
পাখির খাবারের পাত্র এক জায়গায় অনেক পাখিকে জড়ো করে। এর ফলে শিকারি প্রাণীরাও সেখানে সহজে আসতে পারে। বিড়াল, র্যাকুন এবং শিকারি পাখি খাবারের আশপাশে অবস্থান করে দুর্বল পাখিদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে ঘনবসতিপূর্ণ এসব খাবারের জায়গায় পাখিদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। পাখির ইনফ্লুয়েঞ্জা, সালমোনেলা এবং চোখের প্রদাহের মতো রোগ দূষিত খাবার, বিষ্ঠা ও পারস্পরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়াতে পারে।
অতিরিক্ত খাবার পরিবেশের জন্যও সমস্যা
খাবারের পাত্রের নিচে পড়ে থাকা অতিরিক্ত বীজ ও পাখির বিষ্ঠা স্থানীয় পরিবেশে পুষ্টি উপাদানের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে এসব উপাদান নদী বা জলাশয়ে গিয়ে শৈবালের অতিরিক্ত বৃদ্ধি ঘটাতে পারে।
শৈবালের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। ফলে মাছসহ জলজ প্রাণী এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে বিপদের সময়ে খাবারের বড় ভূমিকা আছে
তাই বলে বাড়ির আঙিনায় পাখিকে খাবার দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রচণ্ড শীত, দীর্ঘস্থায়ী খরা কিংবা অন্য কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষের দেওয়া খাবার অনেক পাখির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হতে পারে।
এ ধরনের খাবারের পাত্র আবার পাখি পর্যবেক্ষণের একটি কার্যকর মাধ্যমও হতে পারে। স্থানীয় মানুষ নিয়মিত কোন প্রজাতির পাখি আসছে, তাদের সংখ্যা কীভাবে বদলাচ্ছে—এসব তথ্য নথিবদ্ধ করলে গবেষকেরা পাখির জনসংখ্যার পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
দায়িত্বশীলভাবে খাবার দেওয়াই সমাধান
পাখিকে খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো ভারসাম্য। খাবারের পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে এবং পাখির জন্য উপযুক্ত খাবার দিতে হবে। একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে, মানুষের দেওয়া খাবার যেন পাখির স্বাভাবিক খাদ্যের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়।
অর্থাৎ, পাখির খাবারের পাত্র নিজে ভালো বা খারাপ নয়—এটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে, সঠিক খাবার দিয়ে এবং প্রাকৃতিক খাদ্যের ওপর পাখির নির্ভরতা বজায় রেখে খাবার দেওয়া হলে এর সুফল পাওয়া সম্ভব, আবার সম্ভাব্য ক্ষতিও কমানো যায়।
Sarakhon Report 



















