শৈশব পেরিয়ে সন্তান যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে, তখন তার সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্কও নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করে। সন্তান বড় হলেও অনেক সময় সে মানসিকভাবে বা আর্থিকভাবে একা থাকার জন্য প্রস্তুত থাকে না। ফলে পড়াশোনা, চাকরি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা অন্য নানা কারণে অনেক তরুণ-তরুণী দীর্ঘদিন বাবা-মায়ের সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাস করে।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন বাবা-মায়ের প্রত্যাশার সঙ্গে সন্তানের চিন্তা ও আচরণের মিল থাকে না। সন্তানকে এখনো নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া, অন্যদিকে সন্তানের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি—দুইয়ের সংঘাত থেকে তৈরি হতে পারে রাগ, অসম্মান, দায়িত্বহীনতা ও পারিবারিক অশান্তি।
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে কখন স্বাধীন হতে দিতে হবে
অনেক বাবা-মা চান সন্তান দ্রুত নিজের পায়ে দাঁড়াক। কিন্তু চাকরির অভাব, অর্থনৈতিক চাপ বা জীবনের অনিশ্চয়তার কারণে সন্তান হয়তো বাড়ি ছাড়তে পারছে না। এ অবস্থায় তাকে শুধু চাপ দেওয়া বা বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি না দিয়ে স্বাধীন হওয়ার জন্য একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরি করা বেশি কার্যকর হতে পারে।
সন্তান যদি বাড়িতে থাকে, তাহলে তাকে পরিবারের একজন প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নিতে উৎসাহিত করা জরুরি। ঘরের কাজে অংশ নেওয়া, নিজের খরচের কিছুটা বহন করা কিংবা চাকরি বা দক্ষতা অর্জনের জন্য নিয়মিত চেষ্টা করা—এসব দায়িত্ব ধীরে ধীরে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিতে পারে।
বাড়িতে থাকার জন্য স্পষ্ট নিয়ম প্রয়োজন
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে ভালোবাসা ও সহযোগিতা করা মানেই তার সব আচরণ মেনে নেওয়া নয়। বরং একই বাড়িতে বসবাস করলে শুরুতেই কিছু পরিষ্কার নিয়ম ঠিক করা প্রয়োজন।
কে কোন কাজ করবে, ঘরের খরচে কে কতটা সহযোগিতা করবে, অতিথি আনা, বাড়িতে ফেরার সময়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং পারস্পরিক সম্মানের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা করা গেলে অনেক ভুল বোঝাবুঝি কমে যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিয়মগুলো যেন শুধু সন্তানের জন্য না হয়। বাবা-মায়েরও সন্তানের ব্যক্তিগত জীবন ও সিদ্ধান্তের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো প্রয়োজন।
সন্তান দায়িত্ব না নিলে কী করবেন
কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তান বাড়িতে থেকে কোনো কাজ করছে না, ঘরের দায়িত্ব নিচ্ছে না এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও খুব একটা চিন্তিত নয়। বাবা-মা তখন তার হয়ে সব কাজ করে দেন এবং আর্থিকভাবেও পুরোপুরি সহযোগিতা করতে থাকেন।
এতে সাময়িকভাবে সমস্যা কম মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে সন্তান আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। তাই সাহায্য করার পাশাপাশি দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগও দিতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, বাবা-মা বলতে পারেন—বাড়িতে থাকা যাবে, তবে নির্দিষ্ট কিছু ঘরের কাজ করতে হবে অথবা নিজের কিছু ব্যক্তিগত খরচ নিজেকেই বহন করতে হবে। এতে সহযোগিতা বন্ধ না করেও দায়িত্বশীলতার অভ্যাস তৈরি করা সম্ভব।
বাবা-মায়ের হতাশা সামলানোও জরুরি
অনেক বাবা-মা মনে করেন, সন্তানের জন্য তারা অনেক ত্যাগ করেছেন; তাই সন্তান তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী জীবনযাপন করবে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জীবন সম্পর্কে বাবা-মায়ের স্বপ্ন সবসময় বাস্তবায়িত নাও হতে পারে।
সন্তান হয়তো কাঙ্ক্ষিত পেশা বেছে নেবে না, প্রত্যাশিত আয় করবে না কিংবা এমন জীবনযাপন করবে যা বাবা-মায়ের পছন্দ নয়। এসব ক্ষেত্রে হতাশা স্বাভাবিক হলেও প্রতিনিয়ত সমালোচনা করলে সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে।
সন্তানের জীবনকে পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার বদলে কোথায় বাবা-মা সাহায্য করবেন এবং কোথায় সন্তানকে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দেবেন—এই সীমারেখা নির্ধারণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভালোবাসার সঙ্গে সীমারেখাও দরকার
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে সহায়তা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখা। সন্তান বাড়িতে থাকলে তাকে শিশু হিসেবে নয়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
একই সঙ্গে তাকেও বুঝতে হবে, বাবা-মায়ের বাড়িতে বসবাসের অর্থ হলো কিছু পারিবারিক দায়িত্ব গ্রহণ করা। স্পষ্ট সীমারেখা, পারস্পরিক সম্মান এবং খোলামেলা আলোচনা থাকলে একই বাড়িতে থেকেও বাবা-মা ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সম্পর্ক অনেক বেশি শান্তিপূর্ণ রাখা সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















