প্রশান্ত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু প্রবণতা এল নিনো গত চার দশকে প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি শক্তিশালী হয়েছে। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের প্রাচীন প্রবালের প্রায় এক হাজার বছরের সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এমনই ইঙ্গিত পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, শিল্পযুগের পর দ্রুত বেড়ে চলা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে এল নিনোর এই শক্তিবৃদ্ধির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
হাজার বছরের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী এল নিনো
গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৪০ বছরে যে শক্তিশালী এল নিনো দেখা গেছে, তার তুলনা গত এক হাজার বছরের প্রাকৃতিক পরিবর্তনশীলতার মধ্যে খুব কমই পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, বর্তমান সময়ের এল নিনোর তীব্রতা স্বাভাবিক ওঠানামার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ থেকে জীবিত প্রবালসহ প্রাচীন প্রবালের ১৩টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। প্রবাল প্রতিবছর প্রায় ১ থেকে ২ সেন্টিমিটার করে বাড়ে। তাদের কঙ্কালে জমা হওয়া ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের স্তরে সমুদ্রের তাপমাত্রার ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
বিজ্ঞানীরা প্রবালের রাসায়নিক গঠনে স্ট্রনশিয়াম ও ক্যালসিয়ামের অনুপাত পরীক্ষা করেন। এই অনুপাত প্রবাল বেড়ে ওঠার সময়কার সমুদ্রের তাপমাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। পাশাপাশি অক্সিজেনের বিভিন্ন সমস্থানিকের অনুপাতও বিশ্লেষণ করা হয়।

গত চার দশকেই বড় পরিবর্তন
গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর আগে থেকে গ্যালাপাগোস অঞ্চলে শক্তিশালী এল নিনোর ঘটনা স্পষ্টভাবে বেড়েছে। এর আগের কয়েক শতাব্দীতে এল নিনোর তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কম এবং অনেক বেশি ধারাবাহিক ছিল।
গবেষকেরা এরপর জলবায়ুর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলো দিয়ে এমন পরিবর্তন ঘটতে পারে কি না, তা পরীক্ষা করেন। গত এক হাজার বছরের জলবায়ু পরিস্থিতি পুনর্গঠন করতে বিভিন্ন জলবায়ু মডেল ব্যবহার করা হয়। এতে ঐতিহাসিক তথ্য, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং সূর্যের পরিবর্তনশীলতার তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
মডেল বিশ্লেষণে গত এক হাজার বছরে এল নিনোর তীব্রতায় বর্তমান সময়ের মতো বড় পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে গবেষকদের ধারণা, প্রাকৃতিক কারণ দিয়ে সাম্প্রতিক শক্তিবৃদ্ধির ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন।
বিশ্বজুড়ে বাড়তে পারে চরম আবহাওয়া
এল নিনো সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর দেখা দেয়। এ সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে। সাধারণ অবস্থায় বাণিজ্যিক বায়ুপ্রবাহ উষ্ণ পানি দক্ষিণ আমেরিকা থেকে অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হলে উষ্ণ পানি পূর্বদিকে সরে দক্ষিণ আমেরিকার কাছাকাছি চলে আসে এবং এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না। বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে। কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দিতে পারে, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা তৈরি হতে পারে।
ভারতসহ বিভিন্ন দেশে কম বৃষ্টিপাত ও খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে বিশ্বের কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে দাবানল, খাদ্যসংকট এবং অবকাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
জলবায়ু উষ্ণায়নের সঙ্গে যোগসূত্র
গবেষণাটি সরাসরি প্রমাণ করেনি যে মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনই এল নিনোর শক্তি বাড়িয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এল নিনোর সাম্প্রতিক তীব্রতা এবং শিল্পযুগের পর দ্রুত বেড়ে যাওয়া বৈশ্বিক তাপমাত্রার মধ্যে সময়গত মিল রয়েছে।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী কিম কবের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রবাল নিয়ে করা অন্যান্য গবেষণার ফলের সঙ্গেও এই নতুন গবেষণার তথ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জলবায়ুর চরম পরিস্থিতি তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস এল নিনোর আচরণে পরিবর্তন এসেছে বলে ধারণা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক জুলিয়া কোলের মতে, এল নিনো যত শক্তিশালী হবে, এর সঙ্গে সম্পর্কিত চরম আবহাওয়ার প্রভাবও তত বাড়বে। এর মধ্যে খরা, বন্যা, দাবানল ও খাদ্যসংকটের পাশাপাশি বন্যায় ঘরবাড়ি, মহাসড়ক ও রেলপথের ক্ষতি এবং কিছু সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধিও থাকতে পারে।
জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার তাগিদ
গবেষকদের মতে, এল নিনোর শক্তিবৃদ্ধি যদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফল হয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে জলবায়ুজনিত চরম পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে। এতে পরিবেশ, অবকাঠামো এবং মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়াকে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই নতুন সংকেত এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন চলতি বছর অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কা নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের খরা, বন্যা, দাবানল ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















