সবকিছুর সিস্টেম ডেভেলপ করা সত্যিই উন্নয়নের অংশ। উন্নয়ন বলিতে পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল বা সুষম খাদ্য—এমনি কতিপয় বিষয়ের মধ্যে কখনই সীমাবদ্ধ থাকিতে পারে না।
যেমন, সেদিন একজন ব্যবসায়ীর কাছে তাঁহার চাঁদা প্রদানের কাহিনী শুনিয়া আদৌ বিস্মিত হই নাই। বরং যে কেহ শুনিলে বুঝিবেন, সিস্টেম গড়িয়া তোলা কতটা সুবিধাজনক। যেমন ওই ব্যবসায়ীর চাঁদা ধার্য হইয়াছে—তাঁহার মার্কেটের তিনটি ফ্লোরের ভাড়া ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ওই এলাকার তিন সিস্টার অর্গানাইজেশন লইয়া যাইবে ভাড়াটিয়াদের নিকট হইতে। ইহাতে কাহারও কাজের কোনো রূপ বিঘ্ন ঘটিবে না। জানিতে পারিলাম, মূল অর্গানাইজেশনের ওই এলাকার যিনি প্রধান, তিনি ছোটখাটো বিষয়ে হাত দিয়া হাতে কালি মাখান না। সে কারণে মূল অর্গানাইজেশন তাঁহাকে কোনো রূপ ডিস্টার্ব করিতেছে না।

বুঝিলাম, বাঙালি যে দীর্ঘদিন মার্কস পড়িয়াছে এবং বামপন্থীরা যে কোনো আন্দোলন দেখিলে সেখানে ‘মা তোর বদনখানি মলিন হইলে আমি আর ঘরে থাকিতে পারি না’ বলিয়া নাচিয়া-কুঁদিয়া রাস্তায় নামিয়া আসে—তাহা সত্যই দেশ-জাতির জন্য উপাদেয় বিষয়। তাহা না হইলে চাঁদাবাজিতে এই যে এলিট এবং প্রলেতেরিয়েত বা নিম্নবর্গীয় বিভেদ আসিয়াছে—ইহা কষিয়া মার্কস না পড়িলে কীভাবে সম্ভব হইত?
তবে ঝামেলার সৃষ্টি করিয়া দেয় বিদ্যুৎ। এই বস্তুটি পৃথিবীতে শ্রেণিবিভাগ খুব বেশি মানিতে পারে না। বর্তমানে গ্রামের অন্ত্যজ শ্রেণি বিদ্যুৎহীনতায় বেশি ভুগিতেছে। যদিও তাহাদিগকে আশ্বাস দেওয়া হইয়াছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের দেওয়া বিদ্যুতের চাইতে দুই বছর পরে তাহাদিগকে আরও ভালো বিদ্যুৎ দেওয়া হইবে। কত ক্যারেটের বিদ্যুৎ, ২৪ না আরও বেশি—তাহা এখনও প্রকাশ করা হয় নাই। ইহা গোপন থাকুক। কিছু তো গোপন রাখিতে হয়। কিছু সময় তো নীরব থাকিতে হয়। না হইলে কী শুধু শুধু গান লেখক রবীন্দ্রনাথ লিখিয়া গিয়াছেন, ‘সখী, তুই নীরবে থাকিস’।

বিদ্যুৎহীনতায় অনেকেই হাঁসফাঁস করেন। কিন্তু ইহার ভালো গুণও আছে। বিদ্যুৎহীনতা নীরবতা আনিয়া দেয়। আর নীরবতা হিরণ্ময়। পৃথিবীতে মানুষের একটা বড় দোষ, সবাই শুধু ভোগ করিতে চাহে, উপভোগ করিতে চাহে না। বিদ্যুৎহীনতায় যে নীরবতা নামিয়া আসে—আহা, একবার মনে-প্রাণে তাহা উপভোগ করিয়া দেখুন না।
বৈশ্যরা শুধু ভোগ করিতে জানে। তাই তাহারা দিনরাত চিৎকার করিতে থাকে—বিদ্যুৎ না থাকিলে আমার বয়লার বন্ধ হইয়া যায়—বারবার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করিতে থাকে আর তাহারা চিৎকার করিতে থাকে—তাহাদের নাকি যন্ত্রপাতি নষ্ট হইয়া যায়। কিন্তু উপভোগ করিয়া দেখুন না, চকিত চাহনি, কটাক্ষ হানিয়া চলিয়া গেল—ক্ষণিক চাহিল, আবার ফিরিয়া গেল। আহা! এ কী ছলনাময়ী! এ কী চঞ্চল চলা তোমার, হে বিদ্যুৎ রানী!
না, ইহা বা এই নির্লোভ উপভোগ বৈশ্যের কাজ নহে। উপভোগে একটা ত্যাগ থাকে। পেটে ভাত থাকিলে শুধুই ভোগের চাহিদা বাড়ে। আর পেটে খাবার কম পড়িলে হৃদয়খানি যে কতটা আনমনা ইরানি বালিকার মতো হইয়া ওঠে—তাহা যাহাদের জীবনে ঘটে নাই, তাহারা বুঝিতে পারিবে না। তাহাদের স্মৃতিতে খুঁজিলেও মিলিবে না।
২০০৫ সালের বিদ্যুৎ আকাশের বিদ্যুৎ-বহ্নিশিখার মতই মুহূর্তে রেখা হানিয়া চলিয়া যাইত—তাহার পরে সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকারসহ একখানি কালো চাদরের মাঝে নিপুণ হাতের কাজের মিটি মিটি তারা খচিত আকাশ দেখিবার নিত্য সুযোগ পাইতাম। অফিস হইতে বাসায় ফিরিয়া দেখিতাম, একটি চার্জার লাইটে ছেলেটি ঘামিতে ঘামিতে ক্লাসের পড়া পড়িতেছে। তখন মনে হইত, হয়তো এই বিদ্যুৎ না পাইয়াই রবীন্দ্রনাথ কাতর কণ্ঠে বলিয়াছিলেন, “দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর”।

ঘর্মাক্ত ছেলেটির গৌরবর্ণ গরমে রক্তবর্ণ হইয়া উঠিয়াছে—আর ওই ঘামে আধোভেজা রক্তবর্ণ শরীর লইয়া অঙ্ক কষিতেছে দেখিয়া কেবলই মনে হইত—আহা! যদি অরণ্য ফিরিয়া আসিত! তাহা হইলে বৃক্ষতলে মৃদু বাতাসে চন্দ্রালোকে ঋষিবালকদের সহিত বসিয়া মুনি বা ঋষির মুখনিঃসৃত জ্ঞান সে অর্জন করিতে পারিত। মনে হইত, অরণ্য হইতে যিনি মানুষকে এই সভ্যতার নামে বিদ্যুৎহীন ইটের প্রকোষ্ঠে লইয়া আসিয়াছেন, তাঁহাকে যদি…। না থাক, বীরত্ব এখানে সাজিবে না।
তাই নীরবে বাহির হইয়া প্রতিদিন আবুজর গিফারি কলেজের মাঠে গিয়া মধ্যরাত অবধি আকাশের তারাদের খেলা ও অন্ধকার দেখিতাম। সেখানে আমি একা নহি, অনেকেই থাকিতেন। অনেকে গোল হইয়া বসিয়া গল্পগুজব করিতেন। আমি একাকী করুণ কেরানির মতো কলেজের মাঠের এক পাশে জাতীয় পতাকা টাঙানোর স্ট্যান্ডটির বেদীতে শুইয়া-বসিয়া অর্ধেক রাত্রি পার করিতাম। আর মনে মনে ভাবিতাম সেই ইংরেজ সাহেবের কথা। বেচারা ২০ বছর বয়সে ডেপুটির চাকুরি লইয়া কালাপানি পাড়ি দিয়া সুদূর ভারতবর্ষের বঙ্গমুলুকের একেবারে কিশোরগঞ্জে আসিয়া পড়িয়াছিলেন। সেখান হইতে তাঁহার বন্ধুকে চিঠি লিখিয়াছিলেন, এই দেশের মানুষ রাত্রে ঘুমায় না—গরমে সারা রাত হাঁসফাঁস করিতে করিতে ক্লান্ত হইয়া সকালে ক্লান্ত শরীর লইয়া মাটিতে ঘুমাইয়া পড়ে।
ছোটবেলায় তাঁহার আত্মজীবনীটি পড়িয়াছিলাম। যৌবনে নিজের জীবনে তাহা পাইয়া ২০০৪, ২০০৫, ২০০৬, ২০০৭, ২০০৮ অবধি নিজেকে ওই ইংরেজ ডেপুটি যে বাঙালি দেখিয়াছিলেন—তাহাদের একজন মনে করিতাম।
আলো হোক আর অন্ধকার হোক—মানুষের জীবনে ঘটনা ঘটিতেই থাকে। ২০০৫-এর দিকে একদিন শরতের রাতে হঠাৎ বর্ষা নামিল। যাহাদের শরীরের রক্ত অনেক গরম, তাহারা বর্ষার পানি গায়ে মাখিতে মাখিতে নিজ নিজ ডেরার পথে চলিয়া গেল। আমরা যাহারা ছাগগোত্রীয়, সামান্য বর্ষার পানিতেই সর্দি-কাশি বাধাইয়া ফেলি—তাহারা দৌড়াইয়া টিনের ছাউনির কলেজ ক্লাসঘরের বারান্দায় উঠিলাম। দৌড়টা উপযুক্ত না হওয়াতে বারান্দায় উঠিতে গিয়া পড়িয়া যাইতেছিলাম। এমন সময় একজন হাত ধরিয়া টানিয়া তুলিল শুধু নয়—বলিল, স্যার, কিছু না মনে করিলে আমার গামছা দিয়া মাথাটি মুছিয়া ফেলিতে পারেন।

গলার স্বর শুধু পরিচিত নয়। অনেক পরিচিত। প্রায় দশ বছর ধরিয়া তাঁহার দোকান হইতে মাংস কিনি। আবুজর গিফারি কলেজের সামনের রাস্তার অপর পাশে তাঁহার ছোট্ট কসাইখানা। সপ্তাহে তিন দিন দুইটি করিয়া পশু আনিত। সবগুলিই দেশি। দেশি গরু এবং তাহার সঙ্গে একেবারে বেঙ্গল গোট। তাঁহার বেঙ্গল গোটের কথা মনে পড়িতেই বিদ্যুৎহীন, বর্ষামথিত ওই রাতে কলেজের বারান্দায় দাঁড়াইয়া মনে হইল—আহা! বিধাতা বাঙালিকে একটি আস্ত জাতি বানাইয়া দিয়াছিলেন। তাহা না হইলে কোন প্রাচীন কাল হইতে বাঙালির একটি ভূমি আছে, যাহার নাম বঙ্গ; বাঙালির একটি সাগর আছে, যাহার নাম বঙ্গোপসাগর; বাঙালির একটি বাঘ আছে—যাহার নাম দ্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার—এমনকি লজ্জার নহে—(যেহেতু নিজে নহে) বাঙালির একটি ছাগল আছে, যাহার নাম বেঙ্গল গোট। আর সেই বাঙালি বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রাতে অন্ধকার আকাশের তারা গুনিতেছে। আহারে, কেন শুধুই বেঙ্গল গোটের ছবিখানি সামনে ভাসিতে লাগিল।
যাহোক, তাঁহার হাত ধরিয়া বারান্দায় উঠিয়া, ভদ্রতার খাতিরে তাঁহাকে বলিলাম, তোমাকে অনেক দিন যাবৎ দেখি না কেন? দূরে কোথাও গিয়াছিলে? তোমার দোকানও বন্ধ কেন? দেখিলাম, অন্ধকারের ভেতর সে একটু কাঁপিয়া উঠিল।

তাহার পরে বর্ষা থামিয়া গেল। আবুজর গিফারি কলেজের মাঠে খানিকটা জল ও কাদা রাখিয়া গেল। আমার মনের ভেতর তখন রবীন্দ্রনাথের সেই ঝড়-জলের “একরাত্রির” নায়কের কথা মনে আসিতেছে। বেচারা গ্যারিবল্ডি বা সানইয়াত সেন হইবার সাধে যৌবন শেষ করিয়া শেষ অবধি ওই ঝড়-জলের রাতে নিতান্ত স্কুলমাস্টার হিসেবে অন্ধকারে পুকুরের পাড়ে আসিয়া বসিয়াছিল। আমারও কবি হইবার ঘোড়া রোগে না পাইলে বিজ্ঞানের যে ট্রেনে পিতৃদেব তুলিয়া দিয়াছিলেন, তাহাতে আর যাই হোক, আবুজর গিফারি কলেজের অন্ধকার বারান্দায় ওই স্কুলমাস্টারের মতো থাকিতে হইত না—পশ্চিমে তখনও দুয়ার ছিল খোলা। ট্রাম্প বাবাজি তখনও খেলা দেখানো থেকে অনেক দূরে ছিলেন।
ততক্ষণে সকলে চলিয়া গিয়াছে—কেবল অপর প্রান্তের সুরবালার মতো মাংসওয়ালা নীরবে নামিয়া না যাইয়া পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে।
নীরবতা ভাঙিয়া সে বলিল, স্যার, যাইবেন না? বলিলাম, যাইব—তবে তোমাকে দেখি না কেন? সে ফাঁকা বারান্দায়, অন্ধকারে দাঁড়াইয়াও এদিকে-ওদিকে কয়েকবার তাকাইয়া ফিসফিস করিয়া বলিল—স্যার, পুঁজি শেষ হইয়া গিয়াছে।

বলিলাম, কীভাবে শেষ করিলে?
আবারও ভয়ার্তভাবে চারপাশে তাকাইয়া কহিল—স্যার, সরকারি দলের লোকেরা মাংস বাকিতে লইয়া যায় আর কেহ বাকি টাকা ফেরত দেয় না। এমনি করিয়া তাহাদের মাংসের জোগান দিতে দিতে আমার পুঁজি শেষ হইয়া গিয়াছে।
সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতির আরেকটি সূত্র শিখিলাম—ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মাংস জোগান দিতে দিতে নিজের মাংসের দোকান শেষ হইয়া যায়। হয়তো এমনও দিন আসিবে, ভবিষ্যতে নিজের হাড়-মাংসও শেষ হইয়া যাইবে। যেহেতু বিদ্যুৎ সেই অতীতের মতো আবারও চঞ্চলা হইয়াছে, সে নিশিদিন রহে না পাশে। বারবার চলিয়া যায়।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 


















