শরীর সুস্থ রাখতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন সাধারণত সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু শুধু ঘুমের সময় পূরণ করলেই যে শরীর সুস্থ থাকবে বা তারুণ্য ধরে রাখা যাবে, বিষয়টি এমন নয়। কখন ঘুমাচ্ছেন এবং ঘুমের মান কেমন—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মানুষ রাত ১০টায় ঘুমিয়ে সকাল ৬টায় উঠলেন। আরেকজন রাত ২টায় ঘুমিয়ে সকাল ১০টায় উঠলেন। দুজনেরই ঘুম হলো আট ঘণ্টা। তারপরও শরীরের ওপর এই দুই ধরনের ঘুমের প্রভাব এক নাও হতে পারে।
সমস্যাটা কোথায়
আমাদের শরীরে দিন-রাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নানা শারীরবৃত্তীয় কাজ চলতে থাকে। শরীরের এই নিজস্ব সময়চক্রকে বলা হয় জৈবিক ঘড়ি। ঘুমও এই জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
রাত শরীরের স্বাভাবিক বিশ্রামের সময়। সন্ধ্যার পর অন্ধকার বাড়তে থাকলে শরীর ধীরে ধীরে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে। এ সময় ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোন মেলাটোনিনের নিঃসরণ বাড়ে।
অন্যদিকে ভোরের দিকে আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলাটোনিনের মাত্রা কমতে থাকে এবং কর্টিসলের নিঃসরণ বাড়ে। কর্টিসল শরীরকে জাগ্রত ও কর্মক্ষম রাখতে ভূমিকা রাখে।

ফলে রাতের বদলে দিনের বেলায় দীর্ঘ সময় ঘুমালে মোট ঘুমের সময় আট ঘণ্টা হলেও ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হতে পারে।
দিনের ঘুম কেন একই রকম নয়
দিনের আলো, চারপাশের শব্দ এবং মানুষের চলাচল দিনের ঘুমে বাধা দিতে পারে। ফলে গভীর ঘুমের পর্যায় ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে রাত ১০টার দিকে ঘুমাতে গেলে শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দের সঙ্গে ঘুমের সময়টি বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। এতে ঘুমের গুণগত মানও ভালো হওয়ার সুযোগ থাকে।
ঘুমের মান এত গুরুত্বপূর্ণ কেন
ভালো ঘুমের সময় শরীর হালকা ও গভীর ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যায়। এই ঘুমের চক্র শরীরের আলো-অন্ধকারের সংস্পর্শ এবং বিভিন্ন হরমোনের নিঃসরণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
গভীর ঘুমের সময় শরীরে বৃদ্ধিবর্ধক হরমোনের নিঃসরণ বেশি হয়। শিশু ও কিশোরদের শারীরিক বৃদ্ধির জন্য এই হরমোন গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও শরীরের প্রতিদিনের ক্ষয়ক্ষতি মেরামত ও পুনরুদ্ধারে এর ভূমিকা রয়েছে।
তাই আট ঘণ্টা ঘুমানোর পরও যদি ঘুমের মান ভালো না হয়, তাহলে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর পুরোপুরি সতেজ নাও লাগতে পারে।
হরমোনের ভারসাম্যেও প্রভাব পড়ে
ঘুমের সময় ঠিক না থাকলে শরীরে ইনসুলিন, কর্টিসল, বৃদ্ধিবর্ধক হরমোনসহ বিভিন্ন হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণেও পড়তে পারে।
একই সঙ্গে ক্ষুধা বাড়ানোর হরমোন ঘ্রেলিন এবং পেট ভরা থাকার অনুভূতি তৈরি করা হরমোন লেপটিনের ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে। ফলে ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
অকালে বার্ধক্যের ঝুঁকি
শরীরের প্রতিদিনের মেরামত ও পুনরুদ্ধারের কাজগুলো যদি ঠিকমতো সম্পন্ন না হয় এবং এই পরিস্থিতি দিনের পর দিন চলতে থাকে, তাহলে অকালে বয়সের ছাপ পড়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে।
ঘুম থেকে ওঠার পরও ক্লান্তি থাকতে পারে। মেজাজ সহজেই খারাপ হতে পারে এবং মানসিক চাপ সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
দীর্ঘদিন ঘুমের অনিয়ম চলতে থাকলে ওজন বাড়ার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও স্ট্রোকের মতো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে পারে।
শুধু শরীরের ভেতরেই নয়, ত্বকেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ত্বকের স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা কমে গিয়ে তুলনামূলক কম বয়সেই বলিরেখা দেখা দিতে পারে।

শুধু আট ঘণ্টা ঘুম নয়, সঠিক সময়েও ঘুম
সুস্থ থাকা এবং শরীরের তারুণ্য ধরে রাখার জন্য প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঘুমের সময়টিও শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া দরকার।
প্রতিদিন চেষ্টা করুন একই সময়ে ঘুমাতে যেতে এবং একই সময়ে ঘুম থেকে উঠতে। সকালে কিছু সময় প্রাকৃতিক আলোয় থাকাও উপকারী।
প্রয়োজনে দিনের বেলায় অল্প সময়ের জন্য ঘুমানো যেতে পারে। তবে দিনের ঘুম যেন রাতের মূল ঘুমের বিকল্প না হয়ে যায়। নিয়মিত ঘুমের প্রধান সময়টি রাতেই রাখা ভালো।
ঘুমানোর সময় শোবার ঘর যতটা সম্ভব অন্ধকার ও শান্ত রাখুন। প্রয়োজন হলে চোখ ঢাকার আবরণ ব্যবহার করতে পারেন।
যারা রাতের পালায় কাজ করেন, তাদের জন্য দিনের ঘুমের পরিবেশকে রাতের মতো অন্ধকার ও শান্ত রাখার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ। আর বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে রাত জাগার অভ্যাস এড়িয়ে চলাই ভালো।
কিশোর-কিশোরীদের প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বেশি ঘুম প্রয়োজন। শিশুদের প্রয়োজন আরও বেশি। তাই শিশু ও কিশোরদের পর্যাপ্ত রাতের ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















