শরৎ আসতেই যুক্তরাষ্ট্রের নানা প্রান্তে প্রকৃতি যেন নতুন করে সাজতে শুরু করে। গাছের পাতায় লাল, হলুদ, কমলা ও সোনালি রঙের ছটা ছড়িয়ে পড়ে পাহাড়, উপত্যকা আর হ্রদের চারপাশে। শরতের এই রূপ দেখতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক জাতীয় উদ্যানগুলোতে ছুটে যান। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থানগুলোর ভিড় এড়িয়ে একটু নিরিবিলি পরিবেশে শরতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে রয়েছে বেশ কিছু অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত উদ্যান।
দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্য ঘুরে দেখা ভ্রমণস্রষ্টা আলেকজান্দ্রা ব্লডজেট শরতের প্রকৃতি উপভোগের জন্য এমন পাঁচটি জাতীয় উদ্যানের কথা বলেছেন। বহু বছর ধরে স্বামীর সঙ্গে আরভিতে করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরেছেন তিনি। তাঁর মতে, শরতে জাতীয় উদ্যানগুলোর বার্ষিক রূপান্তরই প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্যগুলোর একটি।
নর্থ ক্যাসকেডস জাতীয় উদ্যান, ওয়াশিংটন
সিয়াটল থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার মনোরম পথ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় নর্থ ক্যাসকেডস জাতীয় উদ্যানে। বিশাল এই উদ্যানের আয়তন প্রায় পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার একর। চারদিকে হিমবাহের স্বচ্ছ হ্রদ, পাহাড়ি উপত্যকা আর সোনালি রঙে ঝলমল করা লার্চ গাছ শরতে এখানকার সৌন্দর্যকে অন্য মাত্রা দেয়।
আলেকজান্দ্রার মতে, উদ্যানটির সবচেয়ে সুন্দর অনেক জায়গা দুর্গম বনাঞ্চলের গভীরে হওয়ায় সাধারণ পর্যটকদের মধ্যে এটি যথেষ্ট পরিচিত নয়। তবে গভীরে না গিয়েও বেশ কিছু মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়।

ম্যাপল পাস ও ব্লু লেকের আশপাশে সোনালি লার্চ গাছের সারি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। ডায়াবলো লেকের দর্শনস্থল থেকেও নীল জলরাশি ও দূরের খাঁজকাটা পাহাড়ের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়।
এখানে শরতের রঙ সাধারণত সেপ্টেম্বরের শেষদিকে ফুটে উঠতে শুরু করে এবং অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে অনেক এলাকায় তা চূড়ায় পৌঁছায়। অ্যাসপেন, পাহাড়ি অ্যাশ, লার্চ, কটনউড ও ভাইন ম্যাপলের মতো নানা গাছ তখন রঙ বদলায়।
ক্রেটার লেক জাতীয় উদ্যান, ওরেগন
গভীর নীল পানির বিশাল হ্রদকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা আগ্নেয় পাহাড় ক্রেটার লেক জাতীয় উদ্যানকে বছরের যেকোনো সময়ই আকর্ষণীয় করে তোলে। তবে শরতে এর চারপাশের রঙিন গাছপালা দৃশ্যটিকে আরও মনোরম করে তোলে।
উদ্যানটির প্রধান আকর্ষণ প্রায় ২১ বর্গমাইল বিস্তৃত স্বচ্ছ নীল হ্রদ। আলেকজান্দ্রা এখানে অন্তত দুই দিন কাটানোর পরামর্শ দিয়েছেন। হ্রদের চারপাশের দীর্ঘ মনোরম সড়ক ঘুরতেই একটি দিন কেটে যেতে পারে। এরপর রিম ভিলেজ ও পিনাকলসের মতো জায়গাগুলো ঘুরে দেখার জন্য আরেকটি দিন রাখা যায়।
তবে ভ্রমণের আগে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া জরুরি। চলতি বছর নির্মাণকাজের কারণে ক্লিটউড কোভ পথ এবং ইস্ট রিম ড্রাইভের কিছু অংশ বন্ধ রয়েছে।
ওরেগনে সেপ্টেম্বরের প্রথম কয়েক সপ্তাহ থেকেই গাছের পাতা সোনালি হতে শুরু করে। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে শরতের রঙ সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। উদ্যানের অধিকাংশ গাছ চিরসবুজ হলেও অ্যাসপেন, কটনউড, উইলো, অ্যাল্ডার ও ডগউডের পাতায় তখন দেখা যায় নানা রঙের ছটা।
ক্যাপিটল রিফ জাতীয় উদ্যান, ইউটাহ
লালচে পাথরের বিশাল গিরিখাতের সামনে হলুদ পাতার গাছ—ক্যাপিটল রিফ জাতীয় উদ্যানের শরতের দৃশ্য এমনই বৈপরীত্যে ভরা।
ইউটাহর বিখ্যাত পাঁচ জাতীয় উদ্যানের একটি হওয়ায় পর্যটকদের কাছে এটি পরিচিত। কিন্তু আলেকজান্দ্রার মতে, অনেকেই এখানে এসে কেবল প্রধান কয়েকটি দর্শনীয় স্থান দেখে ফিরে যান। ফলে উদ্যানটির আরও গভীর সৌন্দর্য আবিষ্কারের সুযোগ অনেকেরই হয় না।
শরতের রঙ উপভোগ করতে কাছের বাইওয়ে ১২ সড়ক ধরে ভ্রমণ করা যেতে পারে। হাঁটতে ভালোবাসলে হিকম্যান ব্রিজ কিংবা ক্যাপিটল গর্জ ওয়াশের পথে যাওয়া যায়। পরিবার নিয়ে গেলে উদ্যানের ফলের বাগানে ফল সংগ্রহের অভিজ্ঞতাও ভ্রমণকে বিশেষ করে তুলতে পারে।
উঁচু এলাকায় অক্টোবরের শুরুতেই শরতের রঙ সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়। এরপর ধীরে ধীরে নিচু এলাকার গাছগুলো রঙ বদলাতে শুরু করে এবং অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের শুরুর দিকে নিচু এলাকাতেও শরতের আবহ তৈরি হয়।
অ্যাসপেন, কটনউড ও বক্স এল্ডারের পাশাপাশি ফলের বাগানগুলোও এ সময় রঙিন হয়ে ওঠে।
থিওডোর রুজভেল্ট জাতীয় উদ্যান, নর্থ ডাকোটা
যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলীয় নর্থ ডাকোটায় অবস্থিত থিওডোর রুজভেল্ট জাতীয় উদ্যানে পৌঁছাতে কিছুটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু শরতে সেই পরিশ্রম সার্থক হতে পারে।
এখানকার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ানো বুনো ঘোড়া। অনেক পর্যটকই জানেন না যে উদ্যানটিতে এমন ঘোড়ার পাল দেখা যায়। পাশাপাশি বাইসন, এল্ক, বিভিন্ন প্রজাতির হরিণসহ নানা বন্যপ্রাণীর দেখা মিলতে পারে।
শরতের রঙ উপভোগের অন্যতম ভালো উপায় হলো উত্তর অংশের প্রায় ২৮ মাইল দীর্ঘ মনোরম সড়ক ধরে গাড়ি চালানো। দক্ষিণ অংশে চাইলে বোইকোর্ট দর্শনস্থলের পথে হাঁটাও যায়।
এখানে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে পাতার রঙ বদলাতে শুরু করে এবং মাসের শেষদিকে শরতের রূপ সবচেয়ে সুন্দর হয়ে ওঠে। উদ্যানের প্রধান গাছ কটনউড, যার পাতা শরতে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সোনালি আবহ তৈরি করে।

ব্যাডল্যান্ডস জাতীয় উদ্যান, সাউথ ডাকোটা
ব্যাডল্যান্ডস জাতীয় উদ্যানকে প্রচলিত অর্থে শরতের পাতাঝরা দেখার জায়গা বলা যায় না। কারণ উদ্যানটির বড় অংশজুড়ে রয়েছে তৃণভূমি, ঘন বন নয়। কিন্তু লাল ও বাদামি রঙের বিশাল পাথুরে গঠন, খাড়া পাহাড় আর বিস্তৃত প্রান্তর এই ঘাটতি সহজেই পূরণ করে।
আলেকজান্দ্রার মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সুন্দর অথচ তুলনামূলকভাবে অবমূল্যায়িত জাতীয় উদ্যান। এখানে দুই দিন কাটালে বন্যপ্রাণী দেখা এবং রাতের আকাশের তারা উপভোগ—দুটিই ভালোভাবে করা সম্ভব।
গ্রীষ্মের শেষদিকে, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শুরুতেই এখানকার ঘাস সবুজ থেকে ধীরে ধীরে সোনালি রঙ ধারণ করতে শুরু করে। অক্টোবর পর্যন্ত এই রঙের সৌন্দর্য বজায় থাকে। হাঁটুসমান প্রেইরি ঘাসের পাশাপাশি উদ্যানটিতে চার শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদও রয়েছে।
শরতের ভ্রমণে একটু ভিন্ন অভিজ্ঞতা
যুক্তরাষ্ট্রে শরতের রঙ দেখার মৌসুম সাধারণত উত্তরের অঙ্গরাজ্যগুলোতে সেপ্টেম্বরের শেষদিকে শুরু হয়। এরপর অক্টোবরজুড়ে ধীরে ধীরে দক্ষিণের দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক এলাকায় নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
তবে শরতের সৌন্দর্য মানেই শুধু ঘন জঙ্গলে লাল-হলুদ পাতা নয়। নর্থ ক্যাসকেডসের সোনালি লার্চ, ক্রেটার লেকের নীল পানির পাশে রঙিন গাছ, ক্যাপিটল রিফের লাল পাথরের সঙ্গে হলুদ পাতা, থিওডোর রুজভেল্টের বিস্তীর্ণ তৃণভূমি কিংবা ব্যাডল্যান্ডসের সোনালি ঘাস—প্রতিটি জায়গাই শরৎকে দেখায় আলাদা রূপে।
তাই জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির আরও শান্ত ও ভিন্নধর্মী শরৎ দেখতে চাইলে এই পাঁচ জাতীয় উদ্যান হতে পারে দারুণ গন্তব্য।



















