একটি কোম্পানি বিক্রি করে পাওয়া আর্থিক স্বস্তি অনেকের কাছে হয়তো অবসর নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু ক্যারিলিন চ্যানের কাছে সেটি ছিল নতুন কিছু করার সাহস। প্রথম কোম্পানির সাফল্যের পর প্রায় চার বছর সময় নিয়ে তিনি তৈরি করেছেন এমন একটি সূর্যরোধী প্রসাধনী, যা ব্যবহারকারীর কাছে শুধু প্রয়োজনীয় নয়, আনন্দদায়কও হয়ে উঠবে—এটাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
আর এই নতুন উদ্যোগের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, তাঁর সহপ্রতিষ্ঠাতা এমিলি হার্ড বিশ্বের অন্য প্রান্তে থাকেন। এখন পর্যন্ত দুজনের সামনাসামনি একসঙ্গে কাটানো সময় ১৪ দিনেরও কম। তবু দূরত্ব তাঁদের ব্যবসা গড়ে তোলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
সূর্যরশ্মি থেকে সুরক্ষার আগ্রহ থেকেই ব্যবসার ভাবনা
২০১৮ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কয়েনমার্কেটক্যাপে যোগ দেন ক্যারিলিন চ্যান। তখন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী দল ছিল খুবই ছোট। সবাই দূর থেকে কাজ করলেও এমিলি হার্ডের সঙ্গে তাঁর দ্রুতই ভালো বন্ধুত্ব তৈরি হয়। সে সময় এমিলিই ছিলেন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান এবং নির্বাহী দলে থাকা একমাত্র অন্য নারী।
নিউইয়র্কে এক বিরল সরাসরি বৈঠকের সময় দুজন বসেছিলেন ব্রায়ান্ট পার্কে। কথার একপর্যায়ে আলোচনা চলে যায় সূর্যরশ্মি থেকে ত্বক রক্ষার বিষয়ে।
কৈশোর থেকেই সূর্যরশ্মি থেকে ত্বক সুরক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন ক্যারিলিন। তাঁর কাছে রোদ থেকে ত্বককে রক্ষা করা ছিল সুস্থ থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস। পরিবার ও বন্ধুদের সূর্যরশ্মির ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন করা, এমনকি তাঁদের গায়ে সূর্যরোধী প্রসাধনী মেখে দেওয়াকেও তিনি ভালোবাসার একটি প্রকাশ হিসেবে দেখতেন।
তবে ব্রায়ান্ট পার্কের সেই আলাপের সময় তিনি বুঝতে পারেননি, তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত আগ্রহের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসার ধারণা।

প্রথম কোম্পানি বিক্রিই দিল নতুন ঝুঁকি নেওয়ার সাহস
এরপরও কয়েক বছর দুজন নিজেদের আগের প্রতিষ্ঠান নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। প্রায় দুই বছর পর কোম্পানিটি বিক্রির সুযোগ আসে। গোপনীয়তা চুক্তির কারণে বিক্রির অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করতে পারেননি ক্যারিলিন। তবে সেই বিক্রি তাঁদের দুজনকেই এমন একটি আর্থিক নিরাপত্তা দিয়েছিল, যার ফলে নতুন ব্যবসা শুরু করার ঝুঁকি নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।
এরই মধ্যে সূর্যরোধী প্রসাধনীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান নিয়ে আরও গভীরভাবে জানতে শুরু করেন ক্যারিলিন। ধীরে ধীরে তাঁর মনে তৈরি হয় একটি নির্দিষ্ট ধারণা—এমন একটি সম্পূর্ণ খনিজভিত্তিক সূর্যরোধী প্রসাধনী তৈরি করা, যা ত্বকে সাদা আস্তরণ তৈরি করবে না, সহজে মিশে যাবে এবং ব্যবহারের অনুভূতিও হবে আরামদায়ক ও বিলাসবহুল।
নতুন উদ্যোগের জন্য এমিলিকেই উপযুক্ত সঙ্গী মনে হয়েছিল তাঁর।
অদ্ভুত হলেও সত্যি, আজ পর্যন্ত দুজনের সামনাসামনি একসঙ্গে কাজ করার সময় ১৪ দিনেরও কম। তবু তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা এতটাই শক্তিশালী যে ভৌগোলিক দূরত্ব তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা কাজের গতি থামাতে পারেনি।
চার বছর ধরে শুধু একটি ভালো পণ্য তৈরির চেষ্টা
কয়েনমার্কেটক্যাপের সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার ওপর কঠোর মনোযোগ। এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে মানুষ বারবার ফিরে আসতে চাইত।
সূর্যরোধী প্রসাধনীর ক্ষেত্রেও ক্যারিলিন একই দর্শন অনুসরণ করতে চেয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি পণ্য তৈরি করা, যা ব্যবহার করতে মানুষকে আলাদা করে মনে করিয়ে দিতে হবে না। বরং সেটি দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হবে।
এর পেছনে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় মাত্রায় বা প্রয়োজনীয় সময় পরপর সূর্যরোধী প্রসাধনী আবার ব্যবহার করেন না। তাই পণ্যটি যদি ব্যবহারে আরামদায়ক ও আকর্ষণীয় হয়, তাহলে মানুষ সেটি নিয়মিত ব্যবহারে আরও আগ্রহী হবে—এমনটাই ছিল তাঁর ভাবনা।
প্রথম কোম্পানি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ তাঁকে এই কাজে সময় দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। ফলে দ্রুত বাজারে যাওয়ার চাপ ছাড়াই তিনি প্রায় চার বছর ধরে পণ্যটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পেরেছেন।
সিঙ্গাপুরে বসে তিনি বেশিরভাগ সময় কাজ করতেন। যখন নিজের কাছে কোনো নমুনা পছন্দ হতো, সেটি পাঠিয়ে দিতেন নিউইয়র্কে থাকা এমিলির কাছে। এভাবেই দুই মহাদেশের দূরত্ব পেরিয়ে চলতে থাকে নতুন পণ্য তৈরির কাজ।
রাতজাগা প্রতিষ্ঠাতা আর ভোরে ওঠা সহপ্রতিষ্ঠাতা
অবশেষে গত বছর তাঁদের সূর্যরোধী প্রসাধনী বাজারে আসে। ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া তাঁদের জন্য ছিল অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।
একজন নিয়মিত ক্রেতা এখন পর্যন্ত ২৪ বার পণ্যটি কিনেছেন। এমন অনুগত ক্রেতা তৈরি হওয়াকে ক্যারিলিন তাঁদের উদ্যোগের বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন।
তবে সবচেয়ে বেশি অর্থবহ প্রতিক্রিয়া এসেছে এমন মানুষদের কাছ থেকে, যারা আগে সংবেদনশীল ত্বক, ব্রণ বা অন্য কোনো কারণে সূর্যরোধী প্রসাধনী ব্যবহার করতে পারতেন না। নতুন পণ্য তাঁদের সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার একটি বিকল্প দিয়েছে।
দুই প্রান্তের দুই প্রতিষ্ঠাতা এভাবেই গড়ে তুলেছেন নিজেদের প্রতিষ্ঠান। ক্যারিলিন রাতজাগা মানুষ, আর এমিলি ভোরে উঠে কাজ করতে পছন্দ করেন। ফলে তাঁদের কাজের সময়ের মধ্যে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি মিল পাওয়া যায়।
এ ছাড়া কাজের ধারাবাহিক যোগাযোগ বজায় রাখতে তাঁরা একটি অনলাইন কর্মপরিচালনা ব্যবস্থাও ব্যবহার করেন। দুজন আলাদা সময়ে কাজ করলেও পরস্পরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।
ক্যারিলিনের কাছে তাঁদের এই সম্পর্ক এবং একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা প্রায় অবিশ্বাস্য। পৃথিবীর দুই প্রান্তে থেকেও তাঁরা যে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পেরেছেন, সেটিই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রমাণ—ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের শক্তি সবসময় একই জায়গায় বসে কাজ করার ওপর নির্ভর করে না।
প্রথম সাফল্য থেকে দ্বিতীয় স্বপ্ন
ক্যারিলিন চ্যানের গল্পে তাই শুধু একটি নতুন সূর্যরোধী প্রসাধনীর জন্মের কাহিনি নেই। আছে প্রথম সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয়বার আরও ধৈর্য নিয়ে নিজের পছন্দের পণ্য তৈরির গল্প।
প্রথম কোম্পানি তাঁকে দিয়েছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। আর সেই নিরাপত্তা তাঁকে দিয়েছে সময়। সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে তিনি এমন একটি পণ্য তৈরির চেষ্টা করেছেন, যার প্রতি তাঁর নিজেরই দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ছিল।
চার বছর ধরে ধীরে ধীরে তৈরি করা সেই উদ্যোগ এখন বাজারে। আর এর পেছনে রয়েছে একটি সরল দর্শন—ভালো পণ্য শুধু প্রয়োজন মেটাবে না, মানুষকে সেটি বারবার ব্যবহার করতেও আগ্রহী করে তুলবে।
প্রথম ব্যবসা বিক্রি করে পাওয়া অর্থ তাই ক্যারিলিনের কাছে ছিল শেষ অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; বরং নিজের সবচেয়ে পছন্দের কাজটি নতুন করে শুরু করার সুযোগ।
প্রথম কোম্পানি বিক্রির পর পাওয়া চার বছরের সময় কীভাবে একটি নতুন ব্যবসার ভিত্তি তৈরি করতে পারে, ক্যারিলিন চ্যানের গল্প তারই অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















