০১:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মায়ের পেনশন পেতে ঘুষের দাবি, প্রতিবাদে কিশোরের ‘ঘুষ’ ওয়েবসাইট—৯ দিনে অভিযোগ প্রায় ১০ হাজার সিন্ধু পানি চুক্তির সালিশি রায় প্রত্যাখ্যান ভারতের, আদালতকে বলল ‘অবৈধভাবে গঠিত’ যুক্তরাষ্ট্রে কলেজ সংকট: কমতে থাকা শিক্ষার্থী ও বাড়তি খরচে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে শত শত প্রতিষ্ঠান শি–পুতিন বৈঠক: কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার চীন ও রাশিয়ার শি-ট্রাম্প বৈঠকের আগে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্তে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চাপ চীনের চমক ‘ডিয়ার ইউ’, এবার কি জয় করবে যুক্তরাষ্ট্রের বক্স অফিস? চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে এবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভারতকে শরতের রঙে মুগ্ধ করবে যুক্তরাষ্ট্রের ৫ অপেক্ষাকৃত অচেনা জাতীয় উদ্যান স্বপ্নের নরওয়ে ছেড়ে চার বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছেন মার্কিন দম্পতি প্রথম কোম্পানি বিক্রির পর পাওয়া চার বছরেই তৈরি করলেন নিজের স্বপ্নের পণ্য

স্বপ্নের নরওয়ে ছেড়ে চার বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছেন মার্কিন দম্পতি

স্বপ্নের মতো এক জীবন গড়ার আশায় যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা ছেড়ে চার বছর আগে নরওয়ের দুর্গম লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জে পাড়ি জমিয়েছিলেন র‍্যাচেল পোল ও চার্লস পোস্ট। চারদিকে পাহাড়, সমুদ্র, বুনো ফুলের মাঠ, নির্জন সৈকত আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য—দূর উত্তরের সেই জীবন শুরুতে তাদের কাছে ছিল ঠিক যেন স্বপ্নপূরণের গল্প।

কিন্তু চার বছর পর সেই স্বপ্নেরও যেন নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছেন তারা। নরওয়ের সেই সুন্দর, নির্জন বাড়ি এখন বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে। আগামী অক্টোবরেই তারা ফিরতে চান যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানায়—পরিবার, বন্ধু আর পরিচিত জীবনের কাছে।

৩৮ বছর বয়সী চার্লস পোস্ট বিপণন কৌশলবিদ ও প্রকৃতি সংরক্ষণকর্মী। তার স্ত্রী ৩৪ বছর বয়সী র‍্যাচেল পোল একজন শিল্পী। নরওয়েতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের মনে ছিল একটি কথা—স্বপ্ন যদি সহজেই পূরণ হয়ে যায়, তাহলে সেটিকে আর স্বপ্ন বলা যায় না।

চার বছর পর তারা বুঝেছেন, স্বপ্ন পূরণ করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই স্বপ্ন আদৌ এখনও নিজের স্বপ্ন কি না, সেটিও একসময় ভেবে দেখা দরকার।

মন্টানার জীবনেও ছিল অপূর্ণতার অনুভূতি

প্রায় ছয় বছর আগে মন্টানার বোজম্যান শহরে তাদের জীবন বেশ গোছানোই ছিল। নিজেদের বাড়ি, পরিচিত মানুষজন, স্থায়ী কাজ এবং একটি নির্ভরযোগ্য দৈনন্দিন জীবন—সবই ছিল।

We Moved to a Remote Island Across the World; Now Returning to the US -  Business Insider

তবু কোথাও একটা অস্থিরতা কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, তারা হয়তো খুব তাড়াতাড়িই একটি জায়গায় থিতু হয়ে গেছেন। পরিচিত জীবনের সীমানার বাইরে কী আছে, তা দেখার একটা প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল দুজনের মধ্যেই।

২০১৯ সালে একসঙ্গে নরওয়ের লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জ ঘুরে যাওয়ার পর সেই আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়। দূরবর্তী, প্রায় রূপকথার মতো প্রাকৃতিক পরিবেশ তাদের গভীরভাবে টেনে নেয়।

দুজনেরই নরওয়ের সঙ্গে পারিবারিকভাবে কিছু দূরবর্তী সম্পর্ক ছিল। তার ওপর সেখানে যাওয়ার বাস্তব সুযোগও তৈরি হয়েছিল। অভিবাসন আইনজীবীর সহায়তায় তারা নরওয়ের দক্ষ কর্মী হিসেবে বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করেন।

তাদের প্রমাণ করতে হয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্রে তারা সফলভাবে যে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তা নরওয়েতেও চালানো সম্ভব।

চার্লস বিপণন ব্যবসা চালাবেন, আর র‍্যাচেল শুরু করবেন চারুকলার নিজস্ব ব্যবসা—এই পরিকল্পনা নিয়েই এগিয়ে যান তারা।

অনুমতি পাওয়ার পর ২০২২ সালে অবশেষে তারা নরওয়েতে পৌঁছান। পুরো প্রক্রিয়ায় লেগেছিল প্রায় আড়াই বছর।

সমুদ্রের ওপর ছোট্ট কুটিরে শুরু হয়েছিল নতুন জীবন

লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছে প্রথম বছর তারা সমুদ্রের ওপর খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট কুটির ভাড়া নেন।

দৃশ্যটি ছিল অসাধারণ। কিন্তু সেখানে দুজন মানুষ ও দুটি ব্যবসা একসঙ্গে চালানো খুব একটা সহজ ছিল না। জায়গা ছিল অত্যন্ত কম।

তখনই তারা বুঝতে পারেন, নরওয়ে যদি সত্যিই তাদের স্থায়ী ঠিকানা হতে হয়, তাহলে নিজেদের একটি বাড়ি প্রয়োজন।

সমস্যা ছিল বাড়ি পাওয়া। পুরো লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জে মানুষের সংখ্যা ২৫ হাজারেরও কম। অনেক বাড়িই প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পরিবারের হাতে থাকে। ফলে বাজারে নতুন বাড়ি আসত খুব কম।

দীর্ঘদিন খোঁজার পর ২০২৩ সালে তারা দেখতে পান নিজেদের স্বপ্নের বাড়ি।

তিন শয়নকক্ষ ও দুটি স্নানঘরসহ প্রায় ১ হাজার ৮০০ বর্গফুটের একটি খামারবাড়ি। র‍্যাচেলের জন্য ছিল আলাদা ছবি আঁকার ঘর, চার্লসের জন্য কাজের জায়গা। বড় বড় জানালা, খোলা রান্নাঘর এবং আরামদায়ক বারান্দাও ছিল।

We Moved to a Remote Island Across the World; Now Returning to the US -  Business Insider

তবে বাড়িটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর জমি।

প্রায় ২ দশমিক ৯ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটি ছিল একটি শান্ত রাস্তার একেবারে শেষ প্রান্তে। চারদিকে বাগান, বুনো ফুলের মাঠ, নানা ধরনের প্রাণী এবং দূরে নির্জন সৈকত।

চার্লসের মনে হয়েছিল, এটাই সেই জায়গা—যেখানে তারা সত্যিই নিজেদের জীবন গড়ে তুলতে পারবেন।

নিলামের অপেক্ষা না করে সরাসরি বাড়ি কিনে ফেলেন

নরওয়েতে সাধারণত বাড়ি নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হয়। বাড়িটির অবস্থান ও আয়তন দেখে চার্লস বুঝতে পেরেছিলেন, এটি স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি বিদেশিদেরও আকৃষ্ট করবে। ফলে শেষ পর্যন্ত দাম তাদের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।

তাই বাড়িটির বিজ্ঞাপন দেখার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে তিনি গাড়ি নিয়ে সরাসরি সেখানে চলে যান।

বাড়ির মালিকদের তিনি বাগানের সামনে দেখতে পান। এরপর তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং জানতে চান, তারা চাইলে এখনই বাড়িটি বিক্রি করবেন কি না।

চার্লস তাদের বোঝান, তিনি ও র‍্যাচেল বাড়িটির যত্ন নেবেন এবং আগের মালিকদের মতোই জায়গাটিকে ভালোবাসবেন।

দীর্ঘ আলোচনা ও দর-কষাকষির পর তারা প্রচলিত নিলামের পথ এড়িয়ে সরাসরি বাড়িটি কিনে নেন। বিনিময় হারের হিসাবে বাড়িটির দাম পড়েছিল প্রায় ৬ লাখ ৬৯ হাজার মার্কিন ডলার, যা প্রাথমিক চাওয়া দামের চেয়ে প্রায় ২ লাখ ডলার বেশি।

আরও মজার বিষয় হলো, বাড়ি কেনার সময় র‍্যাচেল সেখানে ছিলেনই না। তিনি তখন কানাডার আলবার্টায় ভাইয়ের বিয়েতে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ, যে বাড়িতে তারা পরবর্তী কয়েক বছর কাটাবেন, সেটি কেনার আগে র‍্যাচেল নিজ চোখে বাড়িটিও দেখেননি।

ধীরে ধীরে অপরিচিত জায়গাই হয়ে উঠেছিল ঘর

বাড়িতে ওঠার পর তাদের জীবন বদলে যেতে শুরু করে।

দূরদেশ থেকে পাঠানো ছোট্ট একটি বাক্সে রাখা শৈশবের বই, পাখি দেখার বই, র‍্যাচেলের আঁকা ছবি ও শিল্পকর্ম—সব একে একে বাড়িতে জায়গা পায়।

র‍্যাচেল নিজের ছবি আঁকার ঘর সাজিয়ে নেন। চার্লস তৈরি করেন নিজের কাজের জায়গা।

পাশের বাড়ির তরুণ প্রতিবেশীদের সঙ্গেও ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব তৈরি হয়। সকালে বারান্দায় বসে কফি খাওয়া, একসঙ্গে সময় কাটানো—এভাবেই গড়ে ওঠে নতুন এক সামাজিক জীবন। এমনকি তাদের কুকুরগুলোর মধ্যেও বন্ধুত্ব হয়ে যায়।

বাড়িটিতে নানা পরিবর্তনও আনেন তারা। ভেতরের দেয়ালে নতুন রং করেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী তাপ পাম্প বসান এবং পেছনের উঠানে একটি আলাদা বাষ্পস্নান ঘর তৈরি করেন।

চার্লসের ভাষায়, নরওয়েকে সত্যিকারের বাড়ি বলে মনে হতে তাদের প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল।

কিন্তু সুন্দর জীবনের আড়ালে জমতে থাকে নানা চাপ

প্রকৃতির সৌন্দর্য যতই মুগ্ধকর হোক, দুর্গম এলাকায় বসবাসের বাস্তবতা ছিল অনেক কঠিন।

We Moved to a Remote Island Across the World; Now Returning to the US -  Business Insider

একদিন চার্লস গাড়ির পেছনের আসনে রাখা দুটি বাজারের ব্যাগ দেখিয়ে জানান, সেগুলোর দাম পড়েছে প্রায় ৩০০ মার্কিন ডলার। একই ধরনের, এমনকি আরও ভালো মানের পণ্য মন্টানায় অনেক কম দামে পাওয়া যেত বলে তার মনে হয়েছে।

জ্বালানির দামও ছিল বেশি। এক গ্যালনের জন্য তাকে প্রায় সাড়ে ৮ ডলার পর্যন্ত দিতে হতো।

এর পাশাপাশি বিদেশে বসবাস ও করসংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলার জন্য তাদের প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার ডলার ব্যয় হতো।

তবে অর্থনৈতিক চাপই শেষ পর্যন্ত তাদের নরওয়ে ছাড়ার সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হয়নি।

ভাষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাও হয়ে উঠেছিল বড় পরীক্ষা

নরওয়ের ওই অঞ্চলে অনেকেই ইংরেজি বলতে পারলেও স্থানীয় জীবনের প্রধান ভাষা নরওয়েজীয়। ফলে প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজেও বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি হতো।

চিঠি পড়া, খাবারের গায়ে লেখা বোঝা, পশুচিকিৎসকের কাছে যাওয়া কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে—সবকিছুর জন্যই তাদের বাড়তি মনোযোগ দিতে হতো।

চার্লসের মতে, জীবনের সাধারণ কাজগুলো করার সময়ও তাদের মস্তিষ্কের একটা অংশ শুধু ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য সামলাত।

র‍্যাচেলের অস্ত্রোপচারের সময় এই সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নতুন স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ভিন্ন ভাষা এবং পাশে পরিবারের সদস্য বা পুরোনো বন্ধু না থাকায় পুরো পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

দুর্গম এলাকায় বসবাসের কারণে চিকিৎসক, ওষুধের দোকান কিংবা কেনাকাটার জন্যও অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালাতে হতো।

একবার চার্লসকে তাদের একটি কুকুরের ওষুধ আনতে প্রায় দুই ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে যাওয়া-আসা করতে হয়েছিল।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল দূরত্ব

নরওয়ের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল আরেকটি বিষয়—পরিবার ও পুরোনো বন্ধুদের কাছ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা।

সময় অঞ্চলের ব্যবধান ছিল প্রায় আট ঘণ্টা। ফলে দেশে থাকা মানুষদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করাও ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে ওঠে।

চার্লসের কাছে বিষয়টি ছিল ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এক বিচ্ছিন্নতা। প্রতি বছর সেই দূরত্ব যেন আরও বেশি অনুভূত হতে থাকে।

They Traded America for a Remote Archipelago. Now They're Moving Back. - WSJ

মন্টানায় কোনো সমস্যা হলে তাদের সাহায্য করার মতো অসংখ্য পরিচিত মানুষ ছিল। কিন্তু নরওয়ের দুর্গম এলাকায় রাত একটায় গাড়ির চাকা পাংচার হলে কাকে ফোন করবেন, কোথায় যাবেন—এমন সাধারণ সমস্যাও বড় হয়ে উঠত।

তার উপলব্ধি ছিল, জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতে নরওয়ের পরিস্থিতি শুধু দূরত্ব ও ভাষার কারণে আরও কিছুটা কঠিন মনে হতো।

এক স্বজনের মৃত্যু বদলে দেয় তাদের ভাবনা

গত বছরের অক্টোবরে পরিবারের একজন সদস্যের আকস্মিক মৃত্যু তাদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে।

সেই সময় দেশে ফিরতে হলে চার-পাঁচটি বিমানে যাত্রা করতে হতো। পুরো যাত্রায় ২৫ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগত এবং খরচ হতো ৩ হাজার ডলারের বেশি।

শেষ পর্যন্ত তারা নরওয়েতেই থেকে যান। পরিবারের কাছ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসেই তাদের শোক সামলাতে হয়।

ঘটনাটি তাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে—কী হারাচ্ছেন তারা?

পরিবারের সঙ্গে ছুটির দিন কাটানো হচ্ছে না। বন্ধুদের বিয়ে মিস করছেন। জন্মদিন, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে সরাসরি উপস্থিত থাকার বদলে পর্দার ওপাশ থেকে অংশ নিতে হচ্ছে।

চার্লসের কাছে সবচেয়ে কষ্টের ছিল, দূর থেকে ফোনে বাবা-মায়ের চুল সাদা হয়ে যেতে দেখা।

শেষ পর্যন্ত তারা বুঝলেন, স্বপ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মানুষ

চলতি বছরের শীতকালে চার বছরের বিদেশজীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে দুজন বুঝতে পারেন, নরওয়ে তাদের অনেক কিছু দিয়েছে।

তারা নতুন সংস্কৃতি শিখেছেন, নতুন ভাষা আয়ত্ত করেছেন, ব্যবসা গড়ে তুলেছেন, নতুন বন্ধু পেয়েছেন এবং প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্যের মধ্যে বসবাস করেছেন।

কিন্তু এর বিনিময়ে পরিবার ও পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেটি দিন দিন তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অনেক আলোচনার পর তারা সিদ্ধান্ত নেন, এই বিনিময় আর তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

তারা ফিরে যেতে চান মন্টানায়—যেখানে পরিবার আছে, পুরোনো বন্ধুরা আছে এবং এমন মানুষ আছে, যাদের প্রয়োজনে সহজেই ফোন করা যায়।

প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে স্বপ্নের বাড়ি

আগামী অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এই দম্পতি। একই সঙ্গে তারা তাদের নরওয়ের বাড়িটির জন্য নতুন মালিক খুঁজছেন।

Meet Rachel Pohl, Charles Post and Mr. Knute! Together with Hannah the cat,  they followed their dream and moved all the way from Montana, USA, to  Lofoten, Norway. Their passion is reminding

যে বাড়িটি তারা প্রায় ৬ লাখ ৬৯ হাজার ডলারে কিনেছিলেন, সেটিই এখন প্রায় ১২ লাখ ডলারে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে—অর্থাৎ তাদের প্রাথমিক ক্রয়মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ।

ইতোমধ্যে বাড়িটি নিয়ে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চার্লস। তবে শুধু বেশি দামে বিক্রি করাই তাদের উদ্দেশ্য নয়।

তারা এমন একজন ক্রেতা চান, যিনি বাড়িটির জমি, প্রকৃতি এবং পুরো এলাকার প্রতি একই ধরনের ভালোবাসা দেখাবেন।

কারণ তাদের কাছে এটি শুধু একটি বাড়ি নয়। চার বছর ধরে এটি ছিল তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

একটি স্বপ্ন শেষ, আরেকটি স্বপ্নের শুরু

নরওয়ে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও র‍্যাচেল ও চার্লস তাদের বিদেশজীবনকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন না।

বরং তাদের অভিজ্ঞতা তাদের শিখিয়েছে, জীবনের কোনো স্বপ্ন চিরস্থায়ী হতে হবে এমন নয়।

একসময় যে দূরবর্তী দ্বীপ ছিল তাদের কাছে পরম আকাঙ্ক্ষার জায়গা, চার বছর পর সেই একই জায়গা তাদের বুঝিয়েছে—কখনও কখনও নিজের স্বপ্নকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হয়।

চার্লসের কাছে মন্টানার স্বপ্ন এখন খুব সাধারণ কিছু মুহূর্তে লুকিয়ে আছে—জুনের এক বজ্রঝড়ের সময় ভাইয়ের সঙ্গে থাকা, র‍্যাচেলের ছবিতে বারবার ফিরে আসা পশ্চিমাঞ্চলের বুনো ফুল, কিংবা এমন বন্ধুদের পাশে থাকা যারা কথা না বললেও মনের কথা বুঝতে পারেন।

নরওয়ে ছিল তাদের একটি স্বপ্ন। এখন তারা সেই স্বপ্নের অধ্যায় শেষ করে আরেকটি স্বপ্নের দিকে ফিরছেন—নিজেদের মানুষের কাছে, নিজেদের দেশে, নিজেদের পুরোনো জীবনের কাছে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

মায়ের পেনশন পেতে ঘুষের দাবি, প্রতিবাদে কিশোরের ‘ঘুষ’ ওয়েবসাইট—৯ দিনে অভিযোগ প্রায় ১০ হাজার

স্বপ্নের নরওয়ে ছেড়ে চার বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছেন মার্কিন দম্পতি

০১:০৪:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্বপ্নের মতো এক জীবন গড়ার আশায় যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা ছেড়ে চার বছর আগে নরওয়ের দুর্গম লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জে পাড়ি জমিয়েছিলেন র‍্যাচেল পোল ও চার্লস পোস্ট। চারদিকে পাহাড়, সমুদ্র, বুনো ফুলের মাঠ, নির্জন সৈকত আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য—দূর উত্তরের সেই জীবন শুরুতে তাদের কাছে ছিল ঠিক যেন স্বপ্নপূরণের গল্প।

কিন্তু চার বছর পর সেই স্বপ্নেরও যেন নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছেন তারা। নরওয়ের সেই সুন্দর, নির্জন বাড়ি এখন বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে। আগামী অক্টোবরেই তারা ফিরতে চান যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানায়—পরিবার, বন্ধু আর পরিচিত জীবনের কাছে।

৩৮ বছর বয়সী চার্লস পোস্ট বিপণন কৌশলবিদ ও প্রকৃতি সংরক্ষণকর্মী। তার স্ত্রী ৩৪ বছর বয়সী র‍্যাচেল পোল একজন শিল্পী। নরওয়েতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের মনে ছিল একটি কথা—স্বপ্ন যদি সহজেই পূরণ হয়ে যায়, তাহলে সেটিকে আর স্বপ্ন বলা যায় না।

চার বছর পর তারা বুঝেছেন, স্বপ্ন পূরণ করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই স্বপ্ন আদৌ এখনও নিজের স্বপ্ন কি না, সেটিও একসময় ভেবে দেখা দরকার।

মন্টানার জীবনেও ছিল অপূর্ণতার অনুভূতি

প্রায় ছয় বছর আগে মন্টানার বোজম্যান শহরে তাদের জীবন বেশ গোছানোই ছিল। নিজেদের বাড়ি, পরিচিত মানুষজন, স্থায়ী কাজ এবং একটি নির্ভরযোগ্য দৈনন্দিন জীবন—সবই ছিল।

We Moved to a Remote Island Across the World; Now Returning to the US -  Business Insider

তবু কোথাও একটা অস্থিরতা কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, তারা হয়তো খুব তাড়াতাড়িই একটি জায়গায় থিতু হয়ে গেছেন। পরিচিত জীবনের সীমানার বাইরে কী আছে, তা দেখার একটা প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল দুজনের মধ্যেই।

২০১৯ সালে একসঙ্গে নরওয়ের লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জ ঘুরে যাওয়ার পর সেই আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়। দূরবর্তী, প্রায় রূপকথার মতো প্রাকৃতিক পরিবেশ তাদের গভীরভাবে টেনে নেয়।

দুজনেরই নরওয়ের সঙ্গে পারিবারিকভাবে কিছু দূরবর্তী সম্পর্ক ছিল। তার ওপর সেখানে যাওয়ার বাস্তব সুযোগও তৈরি হয়েছিল। অভিবাসন আইনজীবীর সহায়তায় তারা নরওয়ের দক্ষ কর্মী হিসেবে বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করেন।

তাদের প্রমাণ করতে হয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্রে তারা সফলভাবে যে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তা নরওয়েতেও চালানো সম্ভব।

চার্লস বিপণন ব্যবসা চালাবেন, আর র‍্যাচেল শুরু করবেন চারুকলার নিজস্ব ব্যবসা—এই পরিকল্পনা নিয়েই এগিয়ে যান তারা।

অনুমতি পাওয়ার পর ২০২২ সালে অবশেষে তারা নরওয়েতে পৌঁছান। পুরো প্রক্রিয়ায় লেগেছিল প্রায় আড়াই বছর।

সমুদ্রের ওপর ছোট্ট কুটিরে শুরু হয়েছিল নতুন জীবন

লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছে প্রথম বছর তারা সমুদ্রের ওপর খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট কুটির ভাড়া নেন।

দৃশ্যটি ছিল অসাধারণ। কিন্তু সেখানে দুজন মানুষ ও দুটি ব্যবসা একসঙ্গে চালানো খুব একটা সহজ ছিল না। জায়গা ছিল অত্যন্ত কম।

তখনই তারা বুঝতে পারেন, নরওয়ে যদি সত্যিই তাদের স্থায়ী ঠিকানা হতে হয়, তাহলে নিজেদের একটি বাড়ি প্রয়োজন।

সমস্যা ছিল বাড়ি পাওয়া। পুরো লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জে মানুষের সংখ্যা ২৫ হাজারেরও কম। অনেক বাড়িই প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পরিবারের হাতে থাকে। ফলে বাজারে নতুন বাড়ি আসত খুব কম।

দীর্ঘদিন খোঁজার পর ২০২৩ সালে তারা দেখতে পান নিজেদের স্বপ্নের বাড়ি।

তিন শয়নকক্ষ ও দুটি স্নানঘরসহ প্রায় ১ হাজার ৮০০ বর্গফুটের একটি খামারবাড়ি। র‍্যাচেলের জন্য ছিল আলাদা ছবি আঁকার ঘর, চার্লসের জন্য কাজের জায়গা। বড় বড় জানালা, খোলা রান্নাঘর এবং আরামদায়ক বারান্দাও ছিল।

We Moved to a Remote Island Across the World; Now Returning to the US -  Business Insider

তবে বাড়িটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর জমি।

প্রায় ২ দশমিক ৯ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটি ছিল একটি শান্ত রাস্তার একেবারে শেষ প্রান্তে। চারদিকে বাগান, বুনো ফুলের মাঠ, নানা ধরনের প্রাণী এবং দূরে নির্জন সৈকত।

চার্লসের মনে হয়েছিল, এটাই সেই জায়গা—যেখানে তারা সত্যিই নিজেদের জীবন গড়ে তুলতে পারবেন।

নিলামের অপেক্ষা না করে সরাসরি বাড়ি কিনে ফেলেন

নরওয়েতে সাধারণত বাড়ি নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হয়। বাড়িটির অবস্থান ও আয়তন দেখে চার্লস বুঝতে পেরেছিলেন, এটি স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি বিদেশিদেরও আকৃষ্ট করবে। ফলে শেষ পর্যন্ত দাম তাদের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।

তাই বাড়িটির বিজ্ঞাপন দেখার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে তিনি গাড়ি নিয়ে সরাসরি সেখানে চলে যান।

বাড়ির মালিকদের তিনি বাগানের সামনে দেখতে পান। এরপর তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং জানতে চান, তারা চাইলে এখনই বাড়িটি বিক্রি করবেন কি না।

চার্লস তাদের বোঝান, তিনি ও র‍্যাচেল বাড়িটির যত্ন নেবেন এবং আগের মালিকদের মতোই জায়গাটিকে ভালোবাসবেন।

দীর্ঘ আলোচনা ও দর-কষাকষির পর তারা প্রচলিত নিলামের পথ এড়িয়ে সরাসরি বাড়িটি কিনে নেন। বিনিময় হারের হিসাবে বাড়িটির দাম পড়েছিল প্রায় ৬ লাখ ৬৯ হাজার মার্কিন ডলার, যা প্রাথমিক চাওয়া দামের চেয়ে প্রায় ২ লাখ ডলার বেশি।

আরও মজার বিষয় হলো, বাড়ি কেনার সময় র‍্যাচেল সেখানে ছিলেনই না। তিনি তখন কানাডার আলবার্টায় ভাইয়ের বিয়েতে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ, যে বাড়িতে তারা পরবর্তী কয়েক বছর কাটাবেন, সেটি কেনার আগে র‍্যাচেল নিজ চোখে বাড়িটিও দেখেননি।

ধীরে ধীরে অপরিচিত জায়গাই হয়ে উঠেছিল ঘর

বাড়িতে ওঠার পর তাদের জীবন বদলে যেতে শুরু করে।

দূরদেশ থেকে পাঠানো ছোট্ট একটি বাক্সে রাখা শৈশবের বই, পাখি দেখার বই, র‍্যাচেলের আঁকা ছবি ও শিল্পকর্ম—সব একে একে বাড়িতে জায়গা পায়।

র‍্যাচেল নিজের ছবি আঁকার ঘর সাজিয়ে নেন। চার্লস তৈরি করেন নিজের কাজের জায়গা।

পাশের বাড়ির তরুণ প্রতিবেশীদের সঙ্গেও ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব তৈরি হয়। সকালে বারান্দায় বসে কফি খাওয়া, একসঙ্গে সময় কাটানো—এভাবেই গড়ে ওঠে নতুন এক সামাজিক জীবন। এমনকি তাদের কুকুরগুলোর মধ্যেও বন্ধুত্ব হয়ে যায়।

বাড়িটিতে নানা পরিবর্তনও আনেন তারা। ভেতরের দেয়ালে নতুন রং করেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী তাপ পাম্প বসান এবং পেছনের উঠানে একটি আলাদা বাষ্পস্নান ঘর তৈরি করেন।

চার্লসের ভাষায়, নরওয়েকে সত্যিকারের বাড়ি বলে মনে হতে তাদের প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল।

কিন্তু সুন্দর জীবনের আড়ালে জমতে থাকে নানা চাপ

প্রকৃতির সৌন্দর্য যতই মুগ্ধকর হোক, দুর্গম এলাকায় বসবাসের বাস্তবতা ছিল অনেক কঠিন।

We Moved to a Remote Island Across the World; Now Returning to the US -  Business Insider

একদিন চার্লস গাড়ির পেছনের আসনে রাখা দুটি বাজারের ব্যাগ দেখিয়ে জানান, সেগুলোর দাম পড়েছে প্রায় ৩০০ মার্কিন ডলার। একই ধরনের, এমনকি আরও ভালো মানের পণ্য মন্টানায় অনেক কম দামে পাওয়া যেত বলে তার মনে হয়েছে।

জ্বালানির দামও ছিল বেশি। এক গ্যালনের জন্য তাকে প্রায় সাড়ে ৮ ডলার পর্যন্ত দিতে হতো।

এর পাশাপাশি বিদেশে বসবাস ও করসংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলার জন্য তাদের প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার ডলার ব্যয় হতো।

তবে অর্থনৈতিক চাপই শেষ পর্যন্ত তাদের নরওয়ে ছাড়ার সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হয়নি।

ভাষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাও হয়ে উঠেছিল বড় পরীক্ষা

নরওয়ের ওই অঞ্চলে অনেকেই ইংরেজি বলতে পারলেও স্থানীয় জীবনের প্রধান ভাষা নরওয়েজীয়। ফলে প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজেও বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি হতো।

চিঠি পড়া, খাবারের গায়ে লেখা বোঝা, পশুচিকিৎসকের কাছে যাওয়া কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে—সবকিছুর জন্যই তাদের বাড়তি মনোযোগ দিতে হতো।

চার্লসের মতে, জীবনের সাধারণ কাজগুলো করার সময়ও তাদের মস্তিষ্কের একটা অংশ শুধু ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য সামলাত।

র‍্যাচেলের অস্ত্রোপচারের সময় এই সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নতুন স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ভিন্ন ভাষা এবং পাশে পরিবারের সদস্য বা পুরোনো বন্ধু না থাকায় পুরো পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

দুর্গম এলাকায় বসবাসের কারণে চিকিৎসক, ওষুধের দোকান কিংবা কেনাকাটার জন্যও অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালাতে হতো।

একবার চার্লসকে তাদের একটি কুকুরের ওষুধ আনতে প্রায় দুই ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে যাওয়া-আসা করতে হয়েছিল।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল দূরত্ব

নরওয়ের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল আরেকটি বিষয়—পরিবার ও পুরোনো বন্ধুদের কাছ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা।

সময় অঞ্চলের ব্যবধান ছিল প্রায় আট ঘণ্টা। ফলে দেশে থাকা মানুষদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করাও ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে ওঠে।

চার্লসের কাছে বিষয়টি ছিল ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এক বিচ্ছিন্নতা। প্রতি বছর সেই দূরত্ব যেন আরও বেশি অনুভূত হতে থাকে।

They Traded America for a Remote Archipelago. Now They're Moving Back. - WSJ

মন্টানায় কোনো সমস্যা হলে তাদের সাহায্য করার মতো অসংখ্য পরিচিত মানুষ ছিল। কিন্তু নরওয়ের দুর্গম এলাকায় রাত একটায় গাড়ির চাকা পাংচার হলে কাকে ফোন করবেন, কোথায় যাবেন—এমন সাধারণ সমস্যাও বড় হয়ে উঠত।

তার উপলব্ধি ছিল, জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতে নরওয়ের পরিস্থিতি শুধু দূরত্ব ও ভাষার কারণে আরও কিছুটা কঠিন মনে হতো।

এক স্বজনের মৃত্যু বদলে দেয় তাদের ভাবনা

গত বছরের অক্টোবরে পরিবারের একজন সদস্যের আকস্মিক মৃত্যু তাদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে।

সেই সময় দেশে ফিরতে হলে চার-পাঁচটি বিমানে যাত্রা করতে হতো। পুরো যাত্রায় ২৫ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগত এবং খরচ হতো ৩ হাজার ডলারের বেশি।

শেষ পর্যন্ত তারা নরওয়েতেই থেকে যান। পরিবারের কাছ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসেই তাদের শোক সামলাতে হয়।

ঘটনাটি তাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে—কী হারাচ্ছেন তারা?

পরিবারের সঙ্গে ছুটির দিন কাটানো হচ্ছে না। বন্ধুদের বিয়ে মিস করছেন। জন্মদিন, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে সরাসরি উপস্থিত থাকার বদলে পর্দার ওপাশ থেকে অংশ নিতে হচ্ছে।

চার্লসের কাছে সবচেয়ে কষ্টের ছিল, দূর থেকে ফোনে বাবা-মায়ের চুল সাদা হয়ে যেতে দেখা।

শেষ পর্যন্ত তারা বুঝলেন, স্বপ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মানুষ

চলতি বছরের শীতকালে চার বছরের বিদেশজীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে দুজন বুঝতে পারেন, নরওয়ে তাদের অনেক কিছু দিয়েছে।

তারা নতুন সংস্কৃতি শিখেছেন, নতুন ভাষা আয়ত্ত করেছেন, ব্যবসা গড়ে তুলেছেন, নতুন বন্ধু পেয়েছেন এবং প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্যের মধ্যে বসবাস করেছেন।

কিন্তু এর বিনিময়ে পরিবার ও পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেটি দিন দিন তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অনেক আলোচনার পর তারা সিদ্ধান্ত নেন, এই বিনিময় আর তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

তারা ফিরে যেতে চান মন্টানায়—যেখানে পরিবার আছে, পুরোনো বন্ধুরা আছে এবং এমন মানুষ আছে, যাদের প্রয়োজনে সহজেই ফোন করা যায়।

প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে স্বপ্নের বাড়ি

আগামী অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এই দম্পতি। একই সঙ্গে তারা তাদের নরওয়ের বাড়িটির জন্য নতুন মালিক খুঁজছেন।

Meet Rachel Pohl, Charles Post and Mr. Knute! Together with Hannah the cat,  they followed their dream and moved all the way from Montana, USA, to  Lofoten, Norway. Their passion is reminding

যে বাড়িটি তারা প্রায় ৬ লাখ ৬৯ হাজার ডলারে কিনেছিলেন, সেটিই এখন প্রায় ১২ লাখ ডলারে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে—অর্থাৎ তাদের প্রাথমিক ক্রয়মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ।

ইতোমধ্যে বাড়িটি নিয়ে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চার্লস। তবে শুধু বেশি দামে বিক্রি করাই তাদের উদ্দেশ্য নয়।

তারা এমন একজন ক্রেতা চান, যিনি বাড়িটির জমি, প্রকৃতি এবং পুরো এলাকার প্রতি একই ধরনের ভালোবাসা দেখাবেন।

কারণ তাদের কাছে এটি শুধু একটি বাড়ি নয়। চার বছর ধরে এটি ছিল তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

একটি স্বপ্ন শেষ, আরেকটি স্বপ্নের শুরু

নরওয়ে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও র‍্যাচেল ও চার্লস তাদের বিদেশজীবনকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন না।

বরং তাদের অভিজ্ঞতা তাদের শিখিয়েছে, জীবনের কোনো স্বপ্ন চিরস্থায়ী হতে হবে এমন নয়।

একসময় যে দূরবর্তী দ্বীপ ছিল তাদের কাছে পরম আকাঙ্ক্ষার জায়গা, চার বছর পর সেই একই জায়গা তাদের বুঝিয়েছে—কখনও কখনও নিজের স্বপ্নকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হয়।

চার্লসের কাছে মন্টানার স্বপ্ন এখন খুব সাধারণ কিছু মুহূর্তে লুকিয়ে আছে—জুনের এক বজ্রঝড়ের সময় ভাইয়ের সঙ্গে থাকা, র‍্যাচেলের ছবিতে বারবার ফিরে আসা পশ্চিমাঞ্চলের বুনো ফুল, কিংবা এমন বন্ধুদের পাশে থাকা যারা কথা না বললেও মনের কথা বুঝতে পারেন।

নরওয়ে ছিল তাদের একটি স্বপ্ন। এখন তারা সেই স্বপ্নের অধ্যায় শেষ করে আরেকটি স্বপ্নের দিকে ফিরছেন—নিজেদের মানুষের কাছে, নিজেদের দেশে, নিজেদের পুরোনো জীবনের কাছে।