সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দুনিয়ায় ইনফ্লুয়েন্সার বিপণনের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় বিপুলসংখ্যক অনুসারী থাকাই ছিল কোনো নির্মাতাকে বেছে নেওয়ার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। এখন সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। ব্র্যান্ডগুলো ক্রমেই ছোট, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীভিত্তিক এবং স্বতন্ত্র নির্মাতাদের দিকে ঝুঁকছে। আকর্ষণীয়, কিছুটা অগোছালো এবং বিশেষায়িত বিষয়ভিত্তিক বিষয়বস্তু এখন বড় অনুসারীসংখ্যার চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে উঠছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে একটি প্রচারণার জন্য সঠিক নির্মাতা নির্বাচন করা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। এ কারণে ছোট ও অতি ক্ষুদ্র পর্যায়ের নির্মাতাদের খুঁজে বের করতে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানও তৈরি হয়েছে।
হঠাৎ জনপ্রিয়তার নতুন বাস্তবতা
অনলাইনে কোন বিষয়টি কখন ভাইরাল হবে, তা অনেক সময় বিপণন গবেষণা দিয়েও অনুমান করা যায় না। এর উদাহরণ অনলাইন কৌতুকশিল্পী কোর্টনি ও’ডনেলের তৈরি কাল্পনিক চরিত্র ‘চ্যান্টি বেলুগা’। ২৮ জুলাই একটি অভিনয়সংক্রান্ত ছোট ভিডিওতে চরিত্রটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর একই ধরনের একাধিক ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এক মাসও পার হওয়ার আগে ও’ডনেল টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ভেরাইজনের সঙ্গে অংশীদারত্বের সুযোগ পান।
এই দ্রুতগতির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বাস্তবতা ব্র্যান্ডগুলোর সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। অনুসারীসংখ্যা যখন আর সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়, তখন কোন ধরনের বিষয়বস্তু নিয়মিতভাবে কাজ করে? ব্যবহারকারীদের সামনে যে ধরনের বিষয়বস্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে চলে আসে, ব্র্যান্ড কীভাবে তার সঙ্গে যুক্ত হবে? আর শুধু ভাইরাল হওয়ার পেছনে ছোটা কি আদৌ লাভজনক?
হঠাৎ জনপ্রিয়তা যে পূর্বাভাস দেওয়া যায় না, সেটিই বাস্তবতা। অনেক সময় ভাইরাল বিষয়বস্তু যুক্তির বাইরে গিয়েও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার খুঁজছে এমন ব্র্যান্ডগুলোর জন্য এখনও আশার জায়গা রয়েছে।

এখন কোন কৌশল বেশি কার্যকর
ছোট পরিসরের ইনফ্লুয়েন্সারদের সংখ্যা বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিলাসবহুল পণ্যের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অদ্ভুত ও স্বতন্ত্র অনলাইন চরিত্রের মানুষের দিকে ঝুঁকেছে। কেউ জুতাকে নিয়ে অভিনব কৌশল দেখান, কেউ শব্দনির্ভর অভিজ্ঞতা তৈরি করেন, আবার কেউ বিখ্যাত হাতব্যাগের আদলে কেক তৈরি করেন। পাশাপাশি জ্ঞানভিত্তিক ও চিন্তাশীল নির্মাতাদের গুরুত্বও বাড়ছে।
জনপ্রিয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ছোট পরিসরের এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে। এর একটি কারণ হলো, ভোক্তারা খ্যাতির বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যেই আরও বেশি স্বাভাবিকতা দেখতে চাইছেন।
অনলাইন সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম পারফেক্টলি ইমপারফেক্ট বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরে। সেখানে চ্যান্টি বেলুগার পাশাপাশি বিকল্প ধারার সংগীতশিল্পী ট্রু ব্লু, অভিনেত্রী এল ফ্যানিং এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের ফ্যাশন সম্পাদক ক্যারোলিন ফো-ও জায়গা পেয়েছেন। অর্থাৎ এখন এই ক্ষেত্রটি অনেক বেশি সমতাভিত্তিক। শুধু তথ্যভিত্তিক তালিকা দেখে কোনো নির্মাতাকে বেছে নিলেই নিশ্চিত সাফল্য পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এর পেছনে বড় কারণ ভোক্তাদের মনোভাবের পরিবর্তন। নতুন প্রজন্মের দর্শকরা যেমন কম বয়সী, তেমনি তারা আগের চেয়ে বেশি সচেতন ও বাছাইপ্রবণ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রজন্ম-জেডের ৭৫ শতাংশ মনে করেন, অ্যালগরিদম নির্দিষ্ট ধরনের নির্মাতাকে অগ্রাধিকার দেয়। ৭০ শতাংশ মনে করেন, অনেক ইনফ্লুয়েন্সারের বক্তব্য, নান্দনিকতা ও যোগাযোগের ধরন প্রায় একই রকম। আর ৬৮ শতাংশ মনে করেন, আগের তুলনায় ইনফ্লুয়েন্সাররা বেশি একঘেয়ে হয়ে উঠেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার অনেক বেশি হলেও সেখানে আস্থার জায়গাটি ততটা শক্তিশালী নয়। ভোক্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ব্র্যান্ডের সন্ধান পেলেও এটিকে সবচেয়ে বিশ্বস্ত উৎসগুলোর একটি মনে করেন না। বিশেষ করে বন্ধু ও পরিবারের পরামর্শের তুলনায় এর বিশ্বাসযোগ্যতা কম।
তাই অনুসারীসংখ্যা ও মানুষের অংশগ্রহণের হার এখনও গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি নয়। বরং ব্র্যান্ডগুলোকে দেখতে হবে মানুষ কেন কোনো নির্মাতার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে এবং কোন কারণে তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
ব্র্যান্ডের সামনে আসল কাজ
প্রচারাভিযান, নির্মাতা ও সম্প্রদায়—এই তিনটির মধ্যে সঠিক সমন্বয় করতে পারা ব্র্যান্ডগুলোই ভবিষ্যতে বেশি সফল হবে। সব ব্র্যান্ডের জন্য একই পদ্ধতি প্রয়োগ না করে তাদের নিজেদের পরিচয় এবং নির্দিষ্ট প্রচারণার লক্ষ্য বুঝে নির্মাতা নির্বাচন করতে হবে।
একটি ব্যাপক ভোক্তাভিত্তিক ব্র্যান্ডের জন্য যে কৌশল কার্যকর, সীমিত পরিসরের বিশেষ সংস্কৃতি বা রুচিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ব্র্যান্ডের জন্য তা কার্যকর নাও হতে পারে। কোনো ব্র্যান্ডের লক্ষ্য হতে পারে গভীর আস্থা তৈরি করা, রুচির গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা কিংবা নতুন পণ্যের বিষয়ে ব্যাপক পরিচিতি তৈরি করা।
এই কারণে প্রতিটি প্রচারণায় নির্মাতাদের সমন্বয়ও আলাদা হওয়া দরকার। ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান গুচির সাম্প্রতিক কৌশল এর একটি ভালো উদাহরণ। তাদের নতুন সংগ্রহের প্রচারণায় তারা বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিত্বকে যুক্ত করেছে। কেউ বিশেষ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছেন, কেউ সমসাময়িক জনপ্রিয়তার প্রতীক, কেউ রুচির পরিচায়ক, আবার কেউ পুরোনো দিনের জনপ্রিয়তা ও স্মৃতির আবেদন তৈরি করেছেন।
অর্থাৎ সঠিক দর্শকের কাছে সঠিক বার্তা পৌঁছাতে নির্মাতা নির্বাচনে প্রতিটি প্রচারণাকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
জনপ্রিয়তার সঙ্গে ঝুঁকিও আছে
ইনফ্লুয়েন্সার বিপণন পুরোপুরি মানবিক বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এতে যেমন সুবিধা রয়েছে, তেমনি ঝুঁকিও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ কাউকে অনুসরণ করার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে আকর্ষণীয় ও মনোগ্রাহী বিষয়বস্তু এবং নিজের আগ্রহের সঙ্গে মিল।
অন্যদিকে কাউকে অনুসরণ করা বন্ধ করার বড় কারণ হলো অবিশ্বস্ত পরামর্শ বা তথ্য এবং আপত্তিকর মন্তব্য কিংবা আচরণ।

এ কারণে কোনো নির্মাতার সঙ্গে কাজ করার আগে ব্র্যান্ডকে তার অতীত আচরণ ও ভাবমূর্তি সম্পর্কে যথাযথ যাচাই করতে হবে। বিনোদন ও বিতর্কের মধ্যে ভারসাম্যও বুঝতে হবে। খুব দ্রুত ভাইরাল হওয়া কোনো নির্মাতা হয়তো স্বল্পমেয়াদে ব্র্যান্ডকে আলোচনায় নিয়ে আসতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার কারণে ব্র্যান্ডের ক্ষতিও হতে পারে।
ছোট স্বাধীন ব্র্যান্ডগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা বিতর্কিত বিষয়ও কাজ করতে পারে, যদি সেটি ব্র্যান্ডের নিজস্ব চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তবে শুধু বিতর্ক তৈরি করার জন্য বিতর্ক সৃষ্টি করা আর সাহসী বা উসকানিমূলক হওয়া এক বিষয় নয়।
বড় ব্র্যান্ডের সমস্যা আরও জটিল
বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দ্রুত বদলে যাওয়া ভাইরাল প্রবণতা কাজে লাগানো কঠিন। দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে কোনো বিষয় প্রকাশের সময় দেখা যেতে পারে, মানুষের আগ্রহ ইতিমধ্যে অন্যদিকে চলে গেছে।
তাই সফল অংশীদারত্বের জন্য একদিকে ব্র্যান্ডের সঙ্গে নির্মাতার সামঞ্জস্য থাকতে হবে, অন্যদিকে নির্মাতাকে যথেষ্ট স্বাধীনতাও দিতে হবে। যাতে পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
তবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থাও বিতর্কের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারে না। কিছু প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ড, নির্মাতা ও যোগাযোগ দলের সমন্বয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর বিশেষ দল তৈরি করছে। প্রয়োজন হলে সেখানে আইনজীবীদেরও যুক্ত করা হচ্ছে।
কোনো ভাইরাল মুহূর্ত সত্যিই ব্র্যান্ডের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, বিষয়টি বাস্তবে ক্ষতি করতে পারে কি না এবং এমন পরিস্থিতিতে ব্র্যান্ড প্রকাশ্যে তার পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত কি না—এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেওয়া জরুরি।
ক্ষুদ্র না বড়—কোন ইনফ্লুয়েন্সার বেশি কার্যকর
বিপুলসংখ্যক অনুসারী থাকা নির্মাতাদের ওপর নির্ভরতা কমছে। কারণ তাদের সঙ্গে কাজ করলে ব্র্যান্ডের সুনাম নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে।
গত পাঁচ বছরে ছোট পরিসরের ইনফ্লুয়েন্সার ও অতি বড় ইনফ্লুয়েন্সারের অনুপাত ৩:১ থেকে বেড়ে ১০:১ হয়েছে। ছোট নির্মাতারা বড় নির্মাতাদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি মানুষের অংশগ্রহণ তৈরি করছেন।
এখন ব্র্যান্ডের মূল লক্ষ্যও বদলেছে। অনুসারীসংখ্যা ও মানুষের কাছে পৌঁছানোর পরিমাণকে অনেকটা পটভূমির তথ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিনিয়োগের বিনিময়ে কতটা ফল পাওয়া যাচ্ছে, কত নতুন ক্রেতা আসছে এবং কতজন কেনাকাটায় রূপান্তরিত হচ্ছে—এসবই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ব্র্যান্ড নিয়ে অনলাইনে কতটা আলোচনা হচ্ছে কিংবা কোনো নির্মাতার সঙ্গে অংশীদারত্বের পর সাধারণ মানুষ নিজেরা কী ধরনের বিষয়বস্তু তৈরি করছে, সেসবও গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইনফ্লুয়েন্সারের বদলে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
ছোট পরিসরের নির্মাতাদের মধ্যেও বিকল্প ধারার এমনকি প্রচলিত ইনফ্লুয়েন্সার ধারণার বিরোধী ব্যক্তিদের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। মানুষ এখন সরাসরি বিজ্ঞাপনের চেয়ে অর্থপূর্ণ অভিজ্ঞতাকে বেশি মূল্য দিতে চাইছে।
ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে সফল অংশীদারত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখের সঙ্গে নয়, বরং সম্পাদক, স্টাইলিস্ট, শিল্পী, সৃজনশীল পরিচালক এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে হচ্ছে।
ফ্যাশন জগতের মডেল মিয়া রেগানের তৈরি লুসেন ওয়ার্ল্ড এর একটি উদাহরণ। এটি বাস্তব জীবনের অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক একটি সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য অংশগ্রহণকারীদের নতুন দক্ষতা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া।
কোপেনহেগেনের নকশাকার নিকলাস স্কোভগার্ডও অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে নির্মাতা বাছাই করেন না। তার কাছে পাঁচ হাজার অনুসারী থাকা স্থানীয় এমন একজন মানুষও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন, যার কাজ তার কাছে আকর্ষণীয়।
তাই তার নির্বাচনে একদিকে ২৩ হাজার অনুসারী থাকা সংগীতশিল্পী ট্রু ব্লু, অন্যদিকে মাত্র ৭ হাজার ৬০০ অনুসারী থাকা ফ্যাশন সম্পাদক এনি সুবাইর—দুজনই জায়গা পেয়েছেন।
শুধু ফ্যাশন নয়, জ্ঞান ও সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ
পরিবর্তনের আরেকটি বড় ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে প্রতিভা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ডে। একসময় যারা মূলত মডেলদের নিয়ে কাজ করত, তারাই এখন ফ্যাশন লেখক, রাঁধুনি ও শিল্পীদেরও নিজেদের তালিকায় রাখছে।
এই ব্যক্তিরা নিজেদের ক্ষেত্রে আলোচনার বিষয় তৈরি করেন, শিল্পখাতের মতামতকে প্রভাবিত করেন এবং মানুষের রুচি গড়ে দেন। তাই ব্র্যান্ডগুলোও এখন শুধু অনুসারীসংখ্যার দিকে তাকাচ্ছে না।
কত মানুষ কোনো নির্মাতার মাধ্যমে ওয়েবসাইটে যাচ্ছে, কতজন তার সংবাদপত্রের গ্রাহক হচ্ছে, একটি সম্প্রদায় কতটা ধরে রাখা যাচ্ছে কিংবা কোনো আলোচনামূলক অনুষ্ঠান কত মানুষ শুনছে—এসবও সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে বিলাসবহুল পণ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু বিক্রি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তি, সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই কোনো নির্মাতাকে বেছে নেওয়ার আগে সহজ কিছু প্রশ্ন করা জরুরি—সম্পাদকরা তাকে কতটা সম্মান করেন? ক্রেতারা তাকে কতটা গুরুত্ব দেন? শিল্পখাতের অন্য পেশাজীবীরা কি তার মতামতকে মূল্য দেন? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সে কি সঠিক মানুষদের এক জায়গায় নিয়ে আসতে পারে?
এই গুণগুলো একটি নির্দিষ্ট অংশগ্রহণের হারের চেয়েও বেশি মূল্যবান হতে পারে।
বড় ও ছোট—দুই ধরনের নির্মাতারই প্রয়োজন
বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের জন্য বড় ও ছোট—দুই ধরনের ইনফ্লুয়েন্সারই প্রয়োজন। বড় নির্মাতারা ব্র্যান্ডকে ব্যাপক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন, আর ছোট নির্মাতারা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের কাছে ব্র্যান্ডকে আরও ব্যক্তিগত ও নির্বাচিত বলে মনে করাতে পারেন।
শুধু কোনো নির্মাতার দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পেলেই হবে না। একজন নির্মাতা নিজের সৃজনশীলতা, জ্ঞান, রুচি ও সাংস্কৃতিক প্রভাব দিয়ে ব্র্যান্ডকে আরও অনেক কিছু দিতে পারেন।
অনুসারীর চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা
ছোট নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্র্যান্ডগুলোর প্রত্যাশাও বাড়ছে। এখন শুধু কোনো পণ্য বা প্রচারণার বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। নির্মাতাকে সেই ধারণায় সত্যিকার অর্থে অবদান রাখতে হবে।
একটি বড় ক্রীড়া পোশাক প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা মনে করেন, বিশ্বাসযোগ্যতা, নিজস্ব শক্তিশালী দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিজের সম্প্রদায়ের কাছে স্বাভাবিক মনে হয় এমন বিষয়বস্তু তৈরির ক্ষমতাই গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে নির্মাতা ও ব্র্যান্ডের সম্পর্কও দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে। নির্মাতারা এখন আর শুধু বিজ্ঞাপন পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম নন; তারা ক্রমেই সৃজনশীল অংশীদারে পরিণত হচ্ছেন।
ভবিষ্যতের কৌশল হবে আরও নির্দিষ্ট—কোন নির্মাতার সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে, কেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্র্যান্ডকে তিনি এমন কী দিতে পারেন যা অন্য কেউ দিতে পারবেন না।
দীর্ঘ বিষয়বস্তুর প্রত্যাবর্তন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষুদ্র ও দ্রুতগতির বিষয়বস্তুর পাশাপাশি চিন্তাশীল দীর্ঘ বিষয়বস্তুর চাহিদাও বাড়ছে। বিশেষ করে সাবস্ট্যাকের মতো দীর্ঘ লেখাভিত্তিক প্ল্যাটফর্মকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কিছু প্রতিষ্ঠান সেখানে নিজেদের প্রকাশনাও শুরু করেছে এবং অন্য নির্মাতাদের সঙ্গে অংশীদারত্ব করছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও তথ্যভিত্তিক নির্মাতাদের সঙ্গেও কাজ বাড়ছে।
কারণ বিপুল দর্শক থাকা মানেই মানুষের রুচি ও সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা থাকা নয়। ব্র্যান্ডগুলো এখন এমন নির্মাতা খুঁজছে, যাদের দর্শক তাদের বিচারবোধকে সত্যিই বিশ্বাস করে। এমন নির্মাতা, যিনি একজন ভোক্তাকে কোনো ব্র্যান্ড নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারেন কিংবা এমন কোনো বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতে পারেন, যার সন্ধান সে আগে কখনও করেনি।
অনলাইন থেকে বাস্তব জীবনে

নতুন নির্মাতা খুঁজতে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব জীবনেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। রাস্তা থেকে প্রতিভা খোঁজা, বিভিন্ন অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করা কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোতে নতুন মুখের সন্ধান করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শুধু তথ্যনির্ভর পদ্ধতির ওপর নির্ভর করলে অনেক সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে। নতুন প্রজন্মের মানুষ বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা চায় এবং সবসময় এমন অনুভূতি পেতে চায় না যে তাদের কাছে কিছু বিক্রি করার চেষ্টা চলছে।
এই কারণেই নতুন প্রজন্মের অনেক জনপ্রিয় মুখ একই সঙ্গে বাস্তব জীবনের আলোচিত অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত থাকেন এবং অনলাইনেও সক্রিয় থাকেন।
সবচেয়ে শক্তিশালী নির্মাতাদের শুধু আকর্ষণীয় অনলাইন পরিচিতি থাকে না; তাদের বাস্তব জীবনও সমৃদ্ধ, বুদ্ধিদীপ্ত এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে যখন সবাই প্রযুক্তি নিয়ে কথা বলছে, তখন বাস্তব জীবনই ভবিষ্যতে বিলাসিতার নতুন প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
ভবিষ্যতের বিজয়ী হবে আগাম প্রতিভা চিনতে পারা ব্র্যান্ড
বুটিক প্রতিভা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষজ্ঞদের মতে, সংস্কৃতির কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা জরুরি। কে এখন জনপ্রিয়, তা অনেকেই বলতে পারেন। কিন্তু জনপ্রিয় হওয়ার আগেই সম্ভাবনাময় কাউকে চিনে ফেলতে পারাই বড় সাফল্য।
তাই ভবিষ্যতের ব্র্যান্ডগুলোর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে না—কোন নির্মাতার সবচেয়ে বেশি অনুসারী আছে? বরং প্রশ্ন হবে—কে সত্যিকার অর্থে মানুষের রুচি ও আলোচনাকে প্রভাবিত করছেন, কার ওপর মানুষ আস্থা রাখে এবং কে ব্র্যান্ডের গল্পকে নতুন মাত্রা দিতে পারেন?
ইনফ্লুয়েন্সার বিপণনের নতুন যুগে সংখ্যার চেয়ে সম্পর্ক, ভাইরালতার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তার চেয়ে সাংস্কৃতিক প্রভাবই ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















