১৯০১ সালের ১ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করা দানাং বন্দর ১২৫ বছরে এসে ভিয়েতনামের মধ্যাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্মার্ট সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একসময় যেখানে বালুময় তীরে শ্রমিকরা হাতে হাতে পণ্য ওঠানামা করতেন, সেই বন্দর এখন স্বয়ংক্রিয় কনটেইনার গেট, ডিজিটাল সেবা ও তথ্যনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। দানাং শহরের একটি উপকূলীয় বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংযোগস্থলে পরিণত হওয়ার ইতিহাসের সঙ্গেও বন্দরের এই পরিবর্তন গভীরভাবে যুক্ত।
বর্তমানে দানাং বন্দরে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিটার জেটি রয়েছে। এখানে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ডেডওয়েট টন (DWT) সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ, ৪ হাজার TEU ধারণক্ষমতার কনটেইনার জাহাজ এবং ১ লাখ ৭০ হাজার গ্রস রেজিস্টার্ড টন (GRT) পর্যন্ত ক্রুজ জাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে।
আঞ্চলিক বাণিজ্যে কৌশলগত অবস্থান
দানাং বন্দরের গুরুত্ব শুধু সমুদ্রসীমায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি ১ হাজার ৪৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট ইকোনমিক করিডরের (EWEC) গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। এই পরিবহনপথ মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস ও ভিয়েতনামকে সংযুক্ত করে দানাংয়ের মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে।
![]()
গত এক দশকে বন্দরটি অবকাঠামো, সরঞ্জাম ও লজিস্টিক সেবায় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। তিয়েন সা বন্দরের দ্বিতীয় পর্যায়ের সম্প্রসারণের ফলে পণ্য ও কনটেইনার সামলানোর সক্ষমতা আরও বেড়েছে। নতুন স্টোরেজ ইয়ার্ড, ERTG ক্রেন, CFS গুদাম, উন্নত তিয়েন সা ২ নম্বর জেটি, মোবাইল ও কোয়ে ক্রেন, বিশেষায়িত ট্রাক্টর এবং পৃথক লজিস্টিক সেবা কেন্দ্র যুক্ত হয়েছে।
বন্দর থেকে লজিস্টিক নেটওয়ার্কে
ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে হোয়া ভাং এলাকায় ২০ হেক্টরের একটি লজিস্টিক কেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি প্রথমে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো হিসেবে কাজ করবে এবং ধীরে ধীরে মধ্য ভিয়েতনাম ও সেন্ট্রাল হাইল্যান্ডসের আঞ্চলিক লজিস্টিক ও পণ্য সমন্বয়কেন্দ্রে রূপ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রযুক্তিতে বড় পরিবর্তন
২০২০ সাল থেকে দানাং বন্দরের ডিজিটাল রূপান্তর আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ePort ব্যবস্থা ও স্মার্ট কনটেইনার গেট AutoGate পণ্য গ্রহণ ও সরবরাহের প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে প্রায় ১০০ শতাংশ কনটেইনার সেবা অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে। এতে কাগজপত্র কমেছে, প্রক্রিয়াকরণের সময় কমেছে এবং গ্রাহক ও বন্দরের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হয়েছে।
![]()
স্বয়ংক্রিয় গেট ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্যামেরার মাধ্যমে কনটেইনার নম্বর শনাক্তকরণ ও কনটেইনারের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ePort, Smart Container Gate, AutoGate এবং eCPS স্বয়ংক্রিয় যানবাহন অবস্থান নির্ধারণ ব্যবস্থা জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে পুরস্কার ও স্বীকৃতিও পেয়েছে।
বাণিজ্যিক সাফল্যের নতুন মাইলফলক
প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা গেছে বন্দরের ব্যবসায়িক ফলাফলেও। ২০২৫ সালে পণ্য পরিবহন ১০.২৯ শতাংশ এবং কনটেইনার পরিবহন ১১.১৩ শতাংশ বেড়েছে। ২০২১ সালে বন্দরের আয় ছিল ১ ট্রিলিয়ন ভিয়েতনামি ডং এবং মুনাফা ২৯৬ বিলিয়ন ডং। ২০২৪ সালে আয় বেড়ে ১.৫ ট্রিলিয়ন এবং মুনাফা ৩৭৫ বিলিয়ন ডং হয়েছে। ২০২৬ সালে আয় ২ ট্রিলিয়ন ডং ছাড়িয়ে এবং মুনাফা ৫০০ বিলিয়ন ডং অতিক্রম করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Maersk Line, TS Line, ZIM, COSCO, Samudera, SITC, Evergreen, Wan Hai ও YCKY-এর মতো আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি বন্দরে সেবা যুক্ত করেছে। পাশাপাশি সবুজ বন্দর উন্নয়ন, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পরিচালন দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১২৫ বছর পর দানাং বন্দর এখন এমন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে জাহাজ, জেটি ও ক্রেনের পাশাপাশি প্রযুক্তি, লজিস্টিক সংযোগ এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনাই ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি। ১৯০১ সালের বালুর তীর থেকে ২০২৬ সালের স্মার্ট বন্দরের ডিজিটাল ব্যবস্থায় পৌঁছানো তাই দানাং বন্দরের ধারাবাহিক পরিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















