ডোনাল্ড ট্রাম্পের কানাডাবিরোধী বাণিজ্যনীতি শুধু একটি কঠোর শুল্কনীতির উদাহরণ নয়; এর মধ্যে এমন একাধিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসংগতি রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকেই দুর্বল করতে পারে। কানাডার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করে ট্রাম্প যে লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছেন, তার সঙ্গে ব্যবহৃত কৌশলের সামঞ্জস্য খুব সামান্য। বরং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে অর্থনীতি, কূটনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি তৈরি করছে।
ব্যর্থ নীতির ওপর আরও চাপ
ট্রাম্পের শুল্কনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি এখনো তার ঘোষিত অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। আমেরিকান পরিবারগুলোকে গড়ে বছরে প্রায় ১,১০০ ডলার অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে। অথচ বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যায়নি।
উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি অবশ্যই হয়েছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি মূলত এমন শিল্পে কেন্দ্রীভূত, যেগুলো ট্রাম্পের শুল্কনীতির সবচেয়ে কম প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ শুল্ক আরোপকে যে শিল্প পুনরুজ্জীবনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, বাস্তবতা তার পক্ষে খুব শক্ত প্রমাণ দিচ্ছে না।
চীনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কানাডাকে দূরে ঠেলে দেওয়া

চীনকে মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক জোট গড়তে চাইলে কানাডার সঙ্গে সংঘাত সেই প্রচেষ্টাকে সহজ করার বদলে কঠিন করে তুলছে। কানাডাকে চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির সঙ্গে এমন এক বিরোধে জড়িয়েছে, যেখানে বাণিজ্য থেকে শুরু করে কানাডার নিজস্ব রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পছন্দনীয় নাও হতে পারে। কিন্তু ওয়াশিংটনের চাপের মুখে কানাডার এমন প্রতিক্রিয়া যে সৃষ্টি হতে পারে, সেটি মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়। কোনো দেশের সহযোগিতা চাইতে গিয়ে তাকে ক্রমাগত অপমানিত বা চাপে রাখলে কাঙ্ক্ষিত অংশীদারিত্ব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বরং কমে যায়।
ভোটের মাঠেও বাড়ছে ঝুঁকি
ট্রাম্পের জন্য অর্থনীতি ইতিমধ্যে একটি রাজনৈতিক দুর্বলতা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মূল্যবৃদ্ধি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা একজন প্রেসিডেন্টের জন্য এমন নীতি সমস্যাজনক, যা আমদানিপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।
কানাডার ওপর নতুন শুল্ক ঘোষণা সেই বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। এর ফলে ভোটারদের কাছে শুধু মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিই নয়, ট্রাম্পের নীতিতে অনড় থাকার প্রবণতাও আরও স্পষ্ট হচ্ছে। এমনকি লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের মতো উদ্যোগও এই ধারণা জোরদার করে যে প্রশাসন সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগের তুলনায় অন্য বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
মিশিগানের মতো রাজ্যে বিষয়টি রিপাবলিকানদের জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক। কানাডার সঙ্গে ওই রাজ্যের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর এবং চলতি বছর সেখানে গভর্নর, সিনেটর ও একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রতিনিধি পরিষদ আসনে নির্বাচন রয়েছে। কানাডার গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার হুমকি বাস্তবায়িত হলে মিশিগানের গাড়ি শিল্প সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অথচ মার্কিন গাড়ি শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়াই ট্রাম্পের শুল্কনীতির অন্যতম ঘোষিত উদ্দেশ্য।
বিরোধের ভিত্তিও ক্রমেই দুর্বল
কানাডার কিছু সুরক্ষাবাদী নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি থাকার যথেষ্ট কারণ আছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও কানাডীয় ব্যবসার ওপর কিছু বাণিজ্যিক বাধা আরোপ করে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেকটাই মুক্ত।
ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর আগে দুই দেশের সীমান্তবর্তী বাণিজ্যের ৯৯.৮৫ শতাংশই শুল্কমুক্ত ছিল বলে কাতো ইনস্টিটিউটের স্কট লিনসিকোমের হিসাব। এই বাস্তবতার সঙ্গে কানাডার বিরুদ্ধে ব্যাপক ‘নির্যাতন’ বা ‘অন্যায় আচরণের’ অভিযোগ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই বড় প্রশ্ন।
কানাডার দুগ্ধনীতি নিয়ে মার্কিন কৃষকদের ক্ষোভের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু এখানেও চিত্রটি একমুখী নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর ২০১৯ সালের তুলনায় কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের দুগ্ধপণ্যের রপ্তানি ৪২ শতাংশ বেড়েছে। ফলে কানাডার বিরুদ্ধে অভিযোগকে জোরালো করতে প্রশাসনকে এমন কিছু বিষয়ও তালিকাভুক্ত করতে হচ্ছে, যেগুলো প্রকৃত বাণিজ্যিক ‘অপব্যবহারের’ উদাহরণ নয়।
কানাডাকে ভুলভাবে হিসাব করছে ওয়াশিংটন
ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত কানাডার অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে রাজনৈতিক দুর্বলতা হিসেবেও দেখছে। কিন্তু এই হিসাব বিপজ্জনক হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে কানাডাবিরোধী শুল্কনীতি অজনপ্রিয় হলেও কানাডায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের রাজনীতি জনপ্রিয়। মার্ক কার্নির নির্বাচনী সাফল্যের পেছনেও ট্রাম্পের চাপের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কানাডার অর্থনীতি ছোট—এটি সত্য। কিন্তু সেই অসমতা কানাডীয় জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করার বদলে আরও উসকে দিতে পারে। ‘বড় দেশ ছোট দেশকে নির্দেশ দেবে’—এমন ধারণার বিরুদ্ধে কানাডীয় প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই তীব্র হতে পারে। বিপরীতে আমেরিকান ভোটারদের বড় অংশই ট্রাম্পকে কানাডার সঙ্গে দীর্ঘ বাণিজ্যযুদ্ধে যাওয়ার ম্যান্ডেট দেয়নি।
আলোচনার কৌশলও আস্থাহীনতা তৈরি করছে
আলোচনার টেবিলে ট্রাম্পের পদ্ধতিও প্রশ্ন তৈরি করছে। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে কানাডার সঙ্গে আলোচনার শেষ পর্যায়ে নতুন দাবি তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে এমন খবরও এসেছে যে কোনো সমঝোতা হলেও ভবিষ্যতে নতুন শুল্ক আরোপের অধিকার যুক্তরাষ্ট্র ধরে রাখতে চায়।
এ ধরনের শর্তে কানাডা কেন কোনো চুক্তিতে সম্মত হবে, তার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। একটি বাণিজ্যচুক্তির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত পূর্বানুমেয়তা ও পারস্পরিক আস্থা। চুক্তির পরও এক পক্ষ ইচ্ছেমতো নতুন শুল্ক আরোপ করতে পারলে সেটি প্রকৃত অর্থে স্থিতিশীল সমঝোতা হয়ে ওঠে না।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, ব্যর্থতার মধ্যেও আত্মতুষ্টি
ট্রাম্প প্রশাসনের কানাডা নীতির সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক সম্ভবত এই যে, নীতির নেতিবাচক ফলাফলকেও সাফল্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। হোয়াইট হাউস এমন একটি ছবি প্রকাশ করেছিল, যেখানে একটি ঈগল একটি হাঁসকে চেপে ধরেছে বলে মনে হয়। পরে দেখা যায়, ছবিটি আসলে এমন একটি লড়াইয়ের দৃশ্য, যেখানে হাঁসটিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছিল।
ঘটনাটি নিছক একটি প্রচারগত ভুলের চেয়ে বেশি কিছু নির্দেশ করে। কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশল নিয়েছে, তাতে শক্তি প্রদর্শনের ওপর এত বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে যে সেই শক্তি বাস্তবে কোথায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে এগিয়ে নিচ্ছে, সেটিই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।
বাণিজ্যনীতিতে কঠোরতা নিজে কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু কঠোরতার সঙ্গে লক্ষ্য, কৌশল ও ফলাফলের সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। কানাডার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন সেই সামঞ্জস্য হারাচ্ছে। অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে, মিত্রতার জায়গায় অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে এবং একই সঙ্গে মার্কিন রাজনীতিতেও এর মূল্য দিতে হতে পারে। ফলে কানাডার সঙ্গে এই বাণিজ্যযুদ্ধ শুধু ব্যয়বহুল নয়; এটি এমন এক নীতির উদাহরণ হয়ে উঠছে, যেখানে এক ভুল সংশোধনের বদলে আরেকটি ভুল তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
রামেশ পন্নুরু 


















