দুই মাসের বিরতির পর আবারও বিপুল পরিমাণ বিটকয়েন কিনেছে মাইকেল সেলরের নেতৃত্বাধীন স্ট্র্যাটেজি। সোমবার প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, প্রায় ৩৭ কোটি ডলার খরচ করে তারা নতুন করে বিটকয়েন কিনেছে। প্রতিটি বিটকয়েনের গড় ক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ৮০ হাজার ৩০০ ডলার।
এই ঘোষণার পর স্ট্র্যাটেজির শেয়ারের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে যায়। লেনদেনে শেয়ারের দাম প্রায় ১৩০ ডলারে পৌঁছায়।
নতুন করে বিটকয়েন কেনার অর্থ এল যেভাবে
নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, নতুন শেয়ার বিক্রি করে সংগ্রহ করা অর্থের একটি অংশ দিয়ে বিটকয়েন কেনা হয়েছে। বাকি অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ পরিশোধ, নির্দিষ্ট শ্রেণির শেয়ার পুনঃক্রয় এবং প্রতিষ্ঠানের নগদ মজুত বাড়াতে।
প্রতিষ্ঠানটি নগদ তহবিলে আরও ৩ কোটি ডলার যোগ করেছে। এর ফলে বিটকয়েনের দাম আবার দুর্বল হয়ে পড়লেও নিয়মিত আর্থিক দায় মেটানোর সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে স্ট্র্যাটেজি।
বিটকয়েনের দামে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রভাব
স্ট্র্যাটেজির এই নতুন কেনাকাটা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিটকয়েন সাম্প্রতিক দরপতনের পর কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সোমবার বিটকয়েনের দাম ছিল প্রায় ৭৮ হাজার ৮০০ ডলার।

আগের প্রায় ১০ মাসের বড় একটি সময়জুড়ে দুর্বল বাজারের মধ্যে থাকার পর ২১ আগস্ট একদিনেই বিটকয়েনের দাম ২৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। এতে আবারও ৭৯ হাজার ডলারের কাছাকাছি উঠে আসে বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত এই ক্রিপ্টো সম্পদ।
দাম বাড়ায় স্ট্র্যাটেজির বিপুল বিটকয়েন মজুতের মূল্যও পুনরায় তাদের মোট ক্রয়মূল্যের ওপরে উঠে এসেছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ের বড় অঙ্কের কাগুজে লোকসানের চাপ কিছুটা কমেছে।
আক্রমণাত্মক কেনাকাটার মডেলে চাপ
বিশ্বের সবচেয়ে বড় করপোরেট বিটকয়েনধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি স্ট্র্যাটেজি মোট বিটকয়েন সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ নিজেদের কাছে রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরে নতুন শেয়ার বিক্রি এবং ঋণ নিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে বিটকয়েন কেনার কৌশল অনুসরণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কিন্তু বিটকয়েনের দাম কমতে শুরু করলে এই মডেল বড় ধরনের চাপে পড়ে। একদিকে প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা বিটকয়েনের মূল্য কমে যায়, অন্যদিকে নতুন অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে ওঠে যে, বিটকয়েন কখনো বিক্রি না করার পুরোনো অবস্থান থেকেও সরে আসতে হয় স্ট্র্যাটেজিকে।
চার দফায় বিটকয়েন বিক্রি
জুনের শেষ দিকে বিটকয়েনের দাম যখন প্রায় ৫৮ হাজার ৫০০ ডলারে নেমে আসে, তখন নিজেদের আর্থিক দায় মেটাতে কিছু বিটকয়েন বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর গ্রীষ্মকালজুড়ে আরও তিন দফায় বিটকয়েন বিক্রি করা হয়।
সব মিলিয়ে এসব বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
এ ঘটনা স্ট্র্যাটেজির আগের ‘বিটকয়েন বিক্রি না করার’ নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা
এবারের কেনাকাটায় স্ট্র্যাটেজি বিটকয়েন কেনার প্রধান অর্থের উৎস হিসেবে আগের মতো ঋণ নেওয়ার পথ অনুসরণ করেনি। বরং নতুন শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির আগ্রাসী বিটকয়েন কেনার কৌশল নিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের চাপও বাড়ছে। গত এক বছরে স্ট্র্যাটেজির শেয়ারের দাম ৬০ শতাংশের বেশি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিটকয়েন কেনার জন্য নতুন অর্থের উৎস তৈরির চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এসব উদ্যোগের কিছু সমালোচনার মুখে পড়েছে, আবার কিছু প্রত্যাশিত ফলও দিতে পারেনি।
লভ্যাংশভিত্তিক শেয়ারের নতুন কৌশল
২০২৫ সালের জুলাইয়ে স্ট্র্যাটেজি বিশেষ ধরনের লভ্যাংশভিত্তিক শেয়ার চালু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল নিয়মিত আয় চান এমন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা এবং বিটকয়েন কেনার জন্য প্রতিষ্ঠানের হাতে নতুন অর্থের উৎস তৈরি করা।
এই শেয়ারের বিনিয়োগকারীরা নিয়মিত লভ্যাংশ পান। অন্যদিকে সাধারণ শেয়ারধারীদের প্রধান লাভ আসে স্ট্র্যাটেজির শেয়ারের দাম বাড়লে।
২০২৬ সালের জুনে বিটকয়েনের দরপতনের কারণে আগের অর্থনৈতিক কাঠামো চাপে পড়ার পর প্রতিষ্ঠানটি আরও একটি আর্থিক সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করে। এর মাধ্যমে লভ্যাংশ ও সুদের অর্থ পরিশোধের জন্য নগদ অর্থ আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা হয়। প্রয়োজনে শেয়ার পুনঃক্রয় অথবা বিটকয়েন বিক্রির সুযোগও রাখা হয়।
তবে নিয়মিত লভ্যাংশ পরিশোধের জন্য স্ট্র্যাটেজিকে এখনও নতুন শেয়ার বিক্রি অথবা বিটকয়েন বিক্রির ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
সামনে নগদ মজুতই বড় বিষয়
সাম্প্রতিক সময়ে স্ট্র্যাটেজির প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে নগদ অর্থের মজুত বাড়ানো। বিটকয়েনের দাম দীর্ঘ সময় দুর্বল থাকলেও যাতে লভ্যাংশ ও অন্যান্য নিয়মিত আর্থিক দায় পরিশোধ করা যায়, সেই প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
অর্থাৎ, দুই মাস পর আবার বিটকয়েন কেনার সিদ্ধান্ত স্ট্র্যাটেজির পুরোনো আক্রমণাত্মক কৌশলে ফেরার ইঙ্গিত দিলেও এবার নগদ অর্থের নিরাপত্তা এবং আর্থিক দায় মেটানোর সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















