ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় রাশিয়ার জি-২০-তে ফিরে আসাকে ঘিরে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার অ্যাশভিলে জি-২০-এর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠকে রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভ অংশ নেওয়ার পর ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে আপত্তি জানান।
জার্মানির অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবাইল স্পষ্ট করে বলেছেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো সুযোগ নেই। তাঁর বক্তব্যে ইউরোপের বর্তমান অবস্থানের কঠোরতাই ফুটে উঠেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রশ্নে জার্মানির আপত্তি
বৈঠকে রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভের পাশাপাশি রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। বৈঠকের ফাঁকে সিলুয়ানভ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গে আলোচনাও করেন। রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুই দেশের আর্থিক সহযোগিতা এবং জি-২০ কাঠামোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ নিয়ে তাঁদের আলোচনা হয়েছে।
তবে রাশিয়ার এই অংশগ্রহণ ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের কাছে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। জার্মানির অর্থমন্ত্রী ক্লিংবাইল জানান, ইউরোপ রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও একটি নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা চায়।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সমন্বিত অবস্থানই সবচেয়ে ভালো হতো। কিন্তু ওয়াশিংটন রাশিয়ার বিষয়ে অবস্থান কিছুটা শিথিল করতে পারে কি না, তা নিয়ে কখনো কখনো অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রুশ অর্থমন্ত্রীকে স্বাভাবিক অতিথির মতো গ্রহণ করার বিষয়টি তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছে।
‘পারিবারিক ছবি’ থেকেও বাদ রুশ অর্থমন্ত্রী
রাশিয়ার অংশগ্রহণ নিয়ে ইউরোপীয় অসন্তোষ শুধু বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বৈঠকে অংশ নেওয়া ইউরোপীয় অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা রুশ অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রচলিত যৌথ ‘পারিবারিক ছবি’তেও থাকতে চাননি।
শেষ পর্যন্ত রুশ অর্থমন্ত্রীকে বাদ দিয়েই জি-২০-এর অংশগ্রহণকারীদের ছবি তোলার সিদ্ধান্ত হয়। ঘটনাটি বৈঠকে রাশিয়ার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে ইউরোপের অস্বস্তির একটি দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে ওঠে।
ক্লিংবাইল জানান, রাশিয়ার অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জন হিলি এবং ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দের সঙ্গে আগের সন্ধ্যায় আলোচনা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে মত ছিল, রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার একটি পথ থাকা প্রয়োজন, কারণ এর মাধ্যমে মস্কোকে সরাসরি এবং স্পষ্ট বার্তা দেওয়া সম্ভব।

তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, দীর্ঘ বিরতির পর রুশ অর্থমন্ত্রীর জি-২০ বৈঠকে ফিরে আসা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর সে কারণেই ইউরোপকে এর বিরুদ্ধে আরও দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিতে হবে।
চার বৈঠক পর জি-২০-তে রাশিয়ার প্রত্যাবর্তন
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার জি-২০ অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে সীমিত ছিল। ক্লিংবাইলের বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়ার অংশগ্রহণ ছাড়াই চারটি জি-২০ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই বিরতির পর রুশ অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে এবারের বৈঠকের অতিথিদের তালিকা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যারা চলতি বছর জি-২০-এর আয়োজক। কিন্তু গত বছরের আয়োজক দক্ষিণ আফ্রিকাকে এবারের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। একইভাবে স্পেনও বৈঠকে অনুপস্থিত ছিল। স্পেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যিক বিরোধ এবং বাণিজ্য বন্ধের হুমকিও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে।
রাশিয়ার প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একটি অর্থনৈতিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার ঘটনা নয়; এর মধ্য দিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং মস্কোর সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অবস্থানের পার্থক্যও নতুন করে সামনে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















