নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও কাদাধসের মধ্যে মাত্র ১৪ মিনিটের আগাম সতর্কবার্তা এক বিদ্যালয়ের ৯০০-এর বেশি শিক্ষার্থী ও ১৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীর জীবন বাঁচিয়েছে। অথচ সেই বিদ্যালয়টি এখন আর নেই—প্রবল পানির স্রোতে পুরো ভবনটি ভেসে গিয়ে জায়গাটি পরিণত হয়েছে নদীর তলদেশে।
‘বন্যা আসছে, বন্যা আসছে’
গত বুধবার নেপালের বিদুর শহরের ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস চলছিল। হঠাৎ বিদ্যালয়ের হিসাবরক্ষক ছুটে এসে প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদিকে চিৎকার করে জানান, সামনে ভয়াবহ বন্যার ঢল আসছে।
খবরটি তিনি পেয়েছিলেন রাসুয়া এলাকায় থাকা এক স্বজনের কাছ থেকে। রাসুয়া অঞ্চলেই প্রথম ভয়াবহ পানির স্রোত আঘাত হানে। হাতে সময় ছিল মাত্র ১৪ মিনিট।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে প্রধান শিক্ষক সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস বন্ধ করে ঘণ্টা বাজানোর নির্দেশ দেন। শিক্ষকদেরও দ্রুত সতর্ক করা হয়।
৯০০ শিক্ষার্থীকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া
বন্যার সময় বিদ্যালয়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯০০-এর বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করে।
যেসব শিক্ষার্থীকে নিয়ে বাসগুলো তখন বিদ্যালয়ের দিকে আসছিল, সেগুলোকে নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে বিদ্যালয়ের ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীদেরও দ্রুত বের করে উঁচু স্থানের দিকে পাঠানো হয়।
ভয়াবহ আতঙ্কের মধ্যে অন্তত একজন শিক্ষার্থী অজ্ঞান হয়ে যায়। অভিভাবকেরা মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটে এসে সন্তানদের নিয়ে যান। অনেক শিক্ষার্থী বাসে করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যায়, আবার কেউ কেউ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে উঁচু এলাকায় আশ্রয় নেয়।
প্রধান শিক্ষক জানান, শেষ বাসটি কাছের একটি সেতু পার হওয়ার আনুমানিক ১৪ মিনিটের মধ্যেই ভয়ংকর পানির দেয়াল শহরের দিকে ধেয়ে আসে।
‘আমাদের বাসটি নতুন সেতু পার হওয়ার সময় পুরোনো সেতুটি ভেঙে পড়ে,’ বলেন তিনি।
বিদ্যালয়টি এখন নদীর তলদেশে
ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছিল। ওই ভূমিকম্পে নেপালে প্রায় ৯ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।
বিদ্যালয়টি ত্রিশূলী নদী ও একটি জলবিদ্যুৎ খালের মাঝখানে তুলনামূলক সরু জায়গায় অবস্থিত ছিল। ভয়াবহ বন্যার পানির সঙ্গে কাদা ও পাথরের স্রোত নেমে এসে পুরো এলাকাটিকে তছনছ করে দেয়।

এখন বিদ্যালয়টির কোনো অস্তিত্ব নেই। যে জায়গায় একসময় শিক্ষার্থীদের কোলাহল শোনা যেত, সেটিই এখন নদীর তলদেশের অংশ।
প্রধান শিক্ষক দাওয়াদি নিজেও একসময় এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পরে শিক্ষকতা করতে করতে তিনি বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হন। এখন তাঁর একমাত্র চাওয়া, যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ কোনো স্থানে বিদ্যালয়টি পুনর্নির্মাণ করা।
‘তিনি আমার মেয়েকে নতুন জীবন দিয়েছেন’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রশংসা করছেন অনেক অভিভাবক। তাঁদের কাছে তিনি যেন ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে একজন রক্ষাকর্তা।
৫০ বছর বয়সী মান মায়া তামাং প্রথমে ভেবেছিলেন তাঁর মেয়ে সুষ্মিতা হয়তো আর বেঁচে নেই। পরে মেয়েকে নিরাপদে ফিরে পেয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, প্রধান শিক্ষক যেন ঈশ্বরের মতো ভূমিকা রেখেছেন।
তাঁর ভাষায়, তিনি তাঁর মেয়েসহ বহু শিশুকে নতুন জীবন দিয়েছেন।
সবার জন্য সতর্কবার্তা পৌঁছায়নি
তবে এই ভয়াবহ দুর্যোগে সবাই এতটা ভাগ্যবান ছিলেন না। বিদুর এলাকায় অনেকের কাছেই সতর্কবার্তা পৌঁছানোর আগেই বন্যার ঢল আঘাত হানে।
প্রধান শিক্ষক জানান, বিদ্যালয়ের অন্তত একজন কর্মী এবং বিদ্যালয়ের হিসাবরক্ষকের মা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
বিদ্যালয়কে সতর্ক করার পর হিসাবরক্ষক নিজের বাবা-মাকে উদ্ধারের জন্য বাড়ির দিকে ছুটে যান। তিনি তাঁর বাবাকে কোনোভাবে উঁচু জায়গায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু মাকে উদ্ধারের জন্য আবার বাড়িতে ফিরে গিয়ে দেখেন, ততক্ষণে পানির স্রোতে পুরো বাড়িটিই ভেসে গেছে।
১৪ মিনিটই হয়ে উঠল জীবনের ব্যবধান
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও কাদাধসে ইতোমধ্যে ৯০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে একটি ফোনকল, একটি সতর্কবার্তা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত শত শত পরিবারের জীবন বদলে দিয়েছে।
মাত্র ১৪ মিনিট—স্বাভাবিক সময়ে যা খুবই সামান্য। কিন্তু সেদিন নেপালের ওই বিদ্যালয়ে এই ১৪ মিনিটই হয়ে উঠেছিল জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















