যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা ইস্যুতে নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কখনো চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা, কখনো মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চীন-সম্পর্কিত গবেষণা নিয়ে তদন্ত, আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় দুই দেশের সহযোগিতার আহ্বান—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের পরিসর আরও জটিল হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে সাতটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
চীন-সম্পর্ক নিয়ে ৩০ মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরীক্ষা
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৩০টি মার্কিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বিদেশি গবেষণা-সম্পর্ক পর্যালোচনা বা নিরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশি গবেষণা অংশীদারিত্বের ধরন ও সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হবে। তবে উচ্চশিক্ষা খাতের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, প্রতিরক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য অনিয়মের ইঙ্গিত দেওয়া হলেও প্রকাশ্যে তার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ দেখানো হয়নি।
এই পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চীনের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ও গবেষণা সহযোগিতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরান-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞায় চীনের কড়া প্রতিক্রিয়া
ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে চীনের মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ওপর নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে বেইজিং। চীন জানিয়েছে, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইরান ইস্যুকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এখন শুধু ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কেও পড়ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিল গেটসের সতর্কবার্তা
দ্রুত বিকশিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যৎ সমাজে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিল গেটস।
তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামাজিক প্রভাব সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
তাই প্রতিযোগিতার পাশাপাশি দুই পরাশক্তির মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
মার্কিন তথ্যকেন্দ্র নিয়ে চীনকে দায়ী করার বিরোধিতা
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভের পেছনে চীনের প্রভাব রয়েছে—এমন দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠরা।
তবে ভার্জিনিয়ার একটি শহরের বাসিন্দারা এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের অভিযোগের মূল বিষয় চীন নয়; বরং তাদের বাড়ির কাছাকাছি বিশাল তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ, শব্দ, পরিবেশগত প্রভাব এবং জ্বালানি ব্যবহারের মতো স্থানীয় সমস্যা।
ফলে অভ্যন্তরীণ মার্কিন বিরোধে চীনকে দায়ী করার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।![]()
শূকর পালন নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক লড়াইয়েও চীনের নাম
যুক্তরাষ্ট্রে শূকর পালনের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ককে কেন্দ্র করে একটি আইনের বিরুদ্ধে প্রচারণায় চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়েছে।
‘সেভ আওয়ার বেকন’ নামে পরিচিত উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রচারণায় আইনটিকে চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য সুবিধাজনক বলে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এর নেপথ্যে মূল বিরোধ শূকর কীভাবে ও কোন পরিবেশে পালন করা হবে—তা নিয়ে।
এ ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চীনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আরেকটি উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নাসা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সিনেটকে লক্ষ্য করা চীনা হ্যাকিং প্ল্যাটফর্ম জব্দ
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, তারা চীনা রাষ্ট্র-সমর্থিত দুটি অনলাইন হ্যাকিং প্ল্যাটফর্ম জব্দ করেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্ল্যাটফর্মগুলো মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করেছিল। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল নাসা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং মার্কিন সিনেটের নেটওয়ার্কও।
এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে চীনের সঙ্গে চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়াতে পারে।
‘গোল্ডেন ডোম’ কি চীনা ও রুশ হুমকি ঠেকাতে পারবে?
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চাভিলাষী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ‘গোল্ডেন ডোম’ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও সংশয় রয়েছে।
পরিকল্পনাটির লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ছুটে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা, সেগুলোর গতিপথ নির্ধারণ করা এবং মাঝপথে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সেগুলো ধ্বংস করা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে চীন ও রাশিয়ার সম্ভাব্য সব ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত করতে নাও পারে। বরং এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়াকে আরও উন্নত অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বদলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সমীকরণ
গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, স্থানীয় রাজনীতি এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
একদিকে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাড়ছে, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসছে। ফলে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় রাজনীতির বিষয় থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের ওপরও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















