“যে ছেলের ভরসা নেই সে অন্ধকার বিছানায় মাকে না দেখতে পেলেই কাঁদে, আর যার ভরসা আছে সে হাত বাড়ালেই মাকে তখন বুকের মধ্যে পায়। তখন ভয়ের অন্ধকারটা আরও নিবিড় মিষ্টি হয়ে ওঠে। মা তখন জিজ্ঞেস করে আলো চাই? ছেলে বলে তুমি থাকলে আমার আলো যেমন অন্ধকারও তেমনি।”
অচলায়তন ভাঙতে চাওয়া পঞ্চককে যখন দাদাঠাকুরকে বলেছিল, “পাব বলে বুক বাড়িয়ে দিলুম তাই পেলুম। কোথাও যেতে হয়নি।”
সেটা কেমন? পঞ্চক তা জানতে চাইলে, ওই ভরসা থাকা আর না থাকার ছেলের উদাহরণটিই দাদাঠাকুর দেন। জানিয়ে দেন, অচলায়তন ভাঙতে হবে এই আদর্শে অটুট থাকাই বড়। আদর্শ অটুট হলে আলো আর অন্ধকারে কোনো পার্থক্য থাকে না। তখন অচলায়তন ভাঙার জন্য অন্ধকার সময় কোনো বাধাও নয়।
আদর্শটা মায়ের বুকের মতোই এক নির্ভরতার স্থান। এর থেকে বড় কোনো স্থান পৃথিবীতে নেই। আদর্শের সারা শরীর জুড়ে থাকে একটা ভালোবাসা। তাই এখানে নির্ভারতা বড় বেশি। যেমন বাউলের গান গাইলেই দিন চলে যায়; এক বেলা তার না খেলেও কোনো ক্ষতি নয়, এমনকি সেও তো দাদাঠাকুরের মতো, দিনের আলোতেও যেমন গান গায়, নিকষ-কালো রাত নামলেও সে একই গান গায়। তার কাছে রাত ও দিন সবই সমান।

সব আদর্শের সঙ্গে বাউলের মতো একটা ভালোবাসা থাকে। সেখানে কোনো কূটিলতা থাকে না। তাই আদর্শ সব সময়ই মাটিতে থাকে, মায়ের বুকে থাকে। উচ্চাসনে যায় না এ পৃথিবীতে।
উচ্চাসনটি হাজার বছর এক জায়গায় বসে আছে। হাজার বছর বললেও বাস্তবে রবীন্দ্রনাথের অচলায়তনের উপাচার্যের ভাষায়, “সময় ঠিক করে বলা কঠিন। এখানে মনের পক্ষে প্রাচীন হয়ে উঠতে বয়সের দরকার হয় না। আমার তো মনে হয় আমি জন্মের বহু পূর্ব হতেই এখানে স্থির হয়ে বসে আছি।”
বাস্তবে উচ্চাসনটি হয়তো চিরকালই স্থির হয়ে বসে থাকে। চলমান থাকে মাটি—যেখানে বৃষ্টি পড়ে, যেখানে তীব্র রোদের আলো আসে আবার অন্ধকারও নামে।
তাই তো চৈত্রের খরাক্লিষ্ট রুক্ষ মাটিকে দেখে রবীন্দ্রনাথের মনে এসেছিল এটাই মাটির পুরুষাকার আর বৃষ্টি এলেই সে আবার জন্মদাত্রী, প্রেমময়ী প্রকৃতি বা নারী হয়ে উঠবে।
এই ভাবনাই জন্ম দেয় তাঁর চিত্রাঙ্গদা চরিত্র। যে চরিত্রে পুরুষ ও নারীকে একসঙ্গে পাওয়া যায়। মানুষের প্রেম মূলত বৃষ্টির মতো, মাটিতে পড়লেই মাটি নারীর মতো জন্মদাত্রী প্রকৃতি হয়ে ওঠে—নতুন কিছু জন্ম দেয়।
বৃষ্টি ও মাটির সঙ্গে যে সম্পর্ক—দুই এক হলেই যেমন নতুন সৃষ্টি হয়—আদর্শ তেমনই। মানুষ জীবনের সব সময় আদর্শ ধারণ করে না। বরং দেখা যায় যখনই অন্ধকার নামে তখনই প্রয়োজন পড়ে আলো হাতে চলার—“আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী”—যেমনটি। এমনকি যদি ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলা—আপন বুকের বজ্রানলে একলা জ্বলা—
তখন কত সংখ্যা হলো—এ বড় নয়। ওই অন্ধকারের মধ্যে একটি মশাল, একটি বুকের বজ্রানল—অনেক বড়।
আদর্শ তো মায়ের বুকের ভরসা। সন্তান যখন মায়ের বুকে, তাকে রুখবে কে? তখন তো আলো ও অন্ধকার দুই-ই সমান হয়ে যায়। যদি তখন অন্ধকার থাকে তাহলে তো কথাই নেই—অন্ধকারে ছুটলে সে ঠিকই পৌঁছে যায় নতুন ভোরের আলোয়।
তারপরে তার কাজ শেষ। তাকে বড় জোর তখন একটু নতুন নামে ডাকা হতে পারে—সে “ভোরের পাখি” গান গেয়ে জানিয়ে গেল ভোর এসেছে।
পৃথিবীতে উচ্চাসন যেমন অজানা কাল থেকে স্থির হয়ে বসে আছে তেমনি অন্ধকারে ভোর আনতে ভোরের পাখিরা বার বার ছুটেছে—বার বার তারা অচলায়তন ভেঙে ফেলেছে।

আর গেয়েছে—
ভুলে গিয়ে জীবন মরণ
লব তোমায় করে বরণ,
করিব জয় শরমত্রাসে
দাঁড়াব আজ তোমার পাশে
বাঁধন বাধা যাবে জ্বলে,
সুখদুঃখ দেব দলে,
ঝড়ের রাতে তোমার সাথে
বাহির হব অভয় ভরে।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 



















