কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে অতিরঞ্জিত আশঙ্কা ছড়ানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের আশঙ্কা তৈরি করছে কিছু ‘খুবই নেতিবাচক শক্তি’। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাঁর মতে, ‘যে এআইয়ে জিতবে, সেই জিতবে।’
রোববার আয়ারল্যান্ডের ডুনবেগে নিজের গলফ কোর্সে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হয়, এআই শিল্পের বিকাশ ধীর করা বা এ খাতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত কি না। জবাবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এআইয়ে চীনের চেয়ে এগিয়ে আছে এবং প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ। তিনি এই অবস্থান ধরে রাখতে চান।
ট্রাম্প বলেন, এআইয়ের ক্ষেত্রে কিছু ‘সুরক্ষা ব্যবস্থা’ বা নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। তবে তাঁর মতে, এআই নিয়ে যেসব ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর অনেকটাই বাস্তবে ঘটবে না।
তিনি বলেন, এআই নিয়ে যেসব বিষয় সামনে আনা হচ্ছে, সেগুলো উত্থাপন করার পেছনে কিছু ‘খুবই নেতিবাচক শক্তি’ রয়েছে এবং এমন কিছু আশঙ্কা তৈরি করা হচ্ছে, যা বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা নেই।

এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যতে মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের দুই গবেষক। তাঁদের আশঙ্কা, প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে একসময় মানবসভ্যতার অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর প্রশাসন সামগ্রিকভাবে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সহায়ক অবস্থান নিয়েছে। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও এআই খাতের নেতারাও ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এআই খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের রাজনৈতিক ব্যয়ও বেড়েছে। এই নির্বাচন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারণ করবে। এআই ও প্রযুক্তি খাতের নেতারা রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন।
স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের সুপার প্যাক ‘আমেরিকা প্যাক’ ইতোমধ্যে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। চলতি শরতে ভোটারদের মাঠপর্যায়ের প্রচেষ্টায়ও এই সংগঠন বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরও সতর্ক করেছে। চলতি বছর অ্যানথ্রপিকের একটি এআই মডেল থেকে সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা জানিয়েছিল পেন্টাগন।

গবেষকদের সতর্কবার্তার পর এআই খাতের কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহীও প্রযুক্তির উন্নয়নের গতি কিছুটা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। শনিবার অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এআই মডেলের উন্নয়ন ধীর করা এবং ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য আরও সময় তৈরি করতে তিন ধাপের একটি কাঠামো প্রস্তাব করেন। বড় কয়েকটি এআই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা দ্রুত তাঁর প্রস্তাবকে সমর্থন জানান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইলন মাস্ক এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান।
রোববার সিবিএসের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে আমোদেই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রযুক্তির বিকাশের জন্য একটি ‘সবচেয়ে কঠিন দ্বিধা’ তৈরি করেছে। কারণ, দুই দেশেরই দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার প্রবল প্রণোদনা রয়েছে।
তাঁর মতে, এআই উন্নয়নের গতির ক্ষেত্রে একটি ‘সীমা’ নির্ধারণ করতে হলে দুই পক্ষই নিয়ম মেনে চলছে কি না, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী হতে হবে। কারণ, প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এর সামরিক সুবিধাও অনেক বড়। এমন আন্তর্জাতিক সমন্বয় কার্যকর করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, এমন ব্যবস্থা আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন।
অ্যানথ্রপিকের পদত্যাগী গবেষক জ্যাকব কক্সনও এআইয়ের বিকাশের গতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। তা না হলে চীনের সঙ্গে একই ধরনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় নেমে উভয় পক্ষই এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ দৌড়ে জড়িয়ে পড়তে পারে, যার পরিণতি বিপজ্জনক হতে পারে।
ফলে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব ধরে রেখে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে চাইছে, অন্যদিকে প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার নিয়ে নিরাপত্তা ও মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের ওপর জোর থাকলেও এআইয়ের গতি, নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক যে আরও গভীর হচ্ছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে তারই ইঙ্গিত মিলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 














