বাংলাদেশের নিটওয়্যার শিল্পের জন্য সংকটটি শুরু হয়েছিল কারখানার গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ। এখন সেই সংকটের সঙ্গে নতুন একটি বৈশ্বিক ঝুঁকি যুক্ত হয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা।
ফলে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর সমস্যা আর শুধু ‘বিদ্যুৎ নেই’ বা ‘গ্যাসের চাপ কম’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানি সংকট এখন উৎপাদন ব্যয়, পণ্য সরবরাহের সময়, বিদেশি ক্রেতার আস্থা, ব্যাংকঋণ এবং রপ্তানি আয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সাম্প্রতিক জরিপে এই চাপের একটি স্পষ্ট ছবি পাওয়া গেছে। সংগঠনটির সদস্য রপ্তানিমুখী কারখানার প্রায় ২০ শতাংশের তথ্যের ভিত্তিতে করা জরিপে দেখা গেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ নিটওয়্যার কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে অথবা কমেছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, ৮৭ শতাংশ রপ্তানিকারক নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে পারেননি। প্রায় ৬০ শতাংশকে বিদেশি ক্রেতাদের ছাড় দিতে হয়েছে। তিন-চতুর্থাংশের বেশি কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে এবং ৭ শতাংশ পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধের কথা জানিয়েছে।
এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
কারণ রপ্তানি পোশাক শিল্পে একটি কারখানার ক্ষতি শুধু ওই কারখানার আয় কমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি চালান দেরি হলে ক্রেতার সরবরাহ পরিকল্পনা ব্যাহত হয়। বারবার দেরি হলে ক্রেতা বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে পারেন। অর্ডার কমলে কারখানার নগদ প্রবাহ কমে যায়। এরপর আসে ঋণের কিস্তি, শ্রমিকের মজুরি ও কাঁচামালের অর্থ পরিশোধের চাপ।
অর্থাৎ গ্যাসের চাপ কমার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের হিসাবেও পৌঁছাতে পারে।
সংকট শুরু হয় কারখানার ভেতরে, কিন্তু ক্ষতি ছড়ায় বাইরে
জুলাইয়ের ২০ তারিখ থেকে গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ার পর শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হতে থাকে। পরে বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যাও যুক্ত হয়। বিকেএমইএর জরিপ অনুযায়ী, সংকটের সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় গ্যাসের চাপ ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত কম ছিল।
জরিপে ৯২ শতাংশ কারখানা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা জানিয়েছে। প্রায় একই সংখ্যক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে তাদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। ৮৯ শতাংশ কারখানা বিদেশি ক্রেতার আস্থা হারানোর ঝুঁকি বেড়েছে বলে মনে করেছে। ছয়জনের মধ্যে প্রায় তিনজন রপ্তানিকারক বলেছেন, এই সংকট ঋণখেলাপির ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের চিত্রটি এই অর্থনীতির বাস্তব সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় কিছু কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, আবার কোথাও যন্ত্রে করা কাজ হাতে করতে হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হিসাব রয়েছে।
কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিলেও ভবন, শ্রমিক, ঋণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় পুরোপুরি কমে না। ফলে উৎপাদনের প্রতিটি পোশাকের ওপর ব্যয়ের চাপ বাড়ে।
একই সময়ে বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে নির্ধারিত মূল্য পরিবর্তন করা সহজ নয়। ফলে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের একটি বড় অংশ কারখানাকেই বহন করতে হয়।
সবচেয়ে বড় সম্পদ: ক্রেতার আস্থা
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা শুধু সস্তা শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। সময়মতো বড় পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করতে পারাও এই শিল্পের একটি বড় শক্তি।
এই জায়গাতেই বর্তমান সংকট দীর্ঘ হলে ক্ষতির মাত্রা বাড়তে পারে।

একটি কারখানা একবার একটি চালান দেরিতে পাঠালে ক্রেতা ছাড় দিতে পারেন। কিন্তু একই ঘটনা যদি বারবার ঘটে, তখন বিষয়টি কারখানার উৎপাদনক্ষমতার ওপর আস্থার প্রশ্নে পরিণত হয়।
বিকেএমইএর জরিপে ৮৯ শতাংশ কারখানা মালিক বিদেশি ক্রেতার আস্থা হারানোর ঝুঁকি বৃদ্ধির কথা বলেছেন।
এটি নিটওয়্যার শিল্পের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের নিটওয়্যার রপ্তানি ছিল প্রায় ২০ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। নিটওয়্যার খাতের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমেছে বলেও শিল্প খাতের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
অর্থাৎ জ্বালানি সংকট এমন সময়ে এসেছে, যখন খাতটি আগেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও রপ্তানি চাপের মুখে।
এবার ঝুঁকি বাংলাদেশের সীমানার বাইরেও
বাংলাদেশের জ্বালানি সমস্যার একটি অংশ দেশের অভ্যন্তরীণ। কিন্তু আরেকটি অংশ আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক গ্যাসনির্ভর। একই সঙ্গে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে এসেছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, এই পথ দিয়ে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে হারিয়ে যেতে পারে।

এখানেই বাংলাদেশের ঝুঁকি অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি।
বাংলাদেশ শুধু গ্যাস আমদানি করে না; সেই গ্যাসের একটি বড় অংশ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ফলে আন্তর্জাতিক গ্যাসের সরবরাহ কমলে প্রথম ধাক্কা পড়তে পারে আমদানি ব্যয়ে। এরপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। শিল্পে গ্যাস কমলে উৎপাদন কমবে; বিদ্যুৎ কমলে সেই উৎপাদন আরও ব্যাহত হবে।
হরমুজ বন্ধ হলে সমস্যা শুধু গ্যাসের দাম নয়
হরমুজ প্রণালিকে সাধারণত তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এলএনজি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এর গুরুত্ব আরও বড়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বলছে, হরমুজ দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে এশিয়া ও ইউরোপের আমদানিকারক দেশগুলো একই সঙ্গে বিকল্প সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতায় নামবে। ফলে সরবরাহের ঘাটতির পাশাপাশি খোলাবাজারের দামও দ্রুত বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এই চাপের নমুনা দেখেছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ থেমে যাওয়ার পর বাংলাদেশকে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর অর্থ হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সংকটের একটি নতুন চক্র তৈরি হতে পারে।
কম সরবরাহ → বেশি দাম → বেশি আমদানি ব্যয় → বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় → শিল্পে বেশি খরচ → কম প্রতিযোগিতা।
বিকল্প এলএনজি পাওয়া গেলেও সমস্যা শেষ হবে না
বাংলাদেশ এখন কাতারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও চীনসহ অন্যান্য উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু সরবরাহের উৎস বদলানো মানেই ঝুঁকি শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে কাতারের মতো বড় সরবরাহকারী দেশের গ্যাস না থাকলে অন্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও একই কার্গোর জন্য অনেক দেশ প্রতিযোগিতা করবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ার পর উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকার নতুন উৎস থেকে উৎপাদন বাড়লেও তা ঘাটতি পুরোপুরি সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। মার্চ থেকে জুন ২০২৬ সময়ে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এলএনজি সরবরাহ আগের বছরের তুলনায় ৩৫ বিলিয়ন ঘনমিটার কমেছিল।
তাই বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন শুধু ‘গ্যাস কোথা থেকে আসবে’ নয়।
প্রশ্ন হলো—কত দামে আসবে?
বেশি দাম মানে পোশাকের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন
ধরা যাক, একটি নিটওয়্যার কারখানা অর্ডার পেয়েছে নির্দিষ্ট দামে। অর্ডার পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়ল। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেল। কারখানাকে ডিজেল ব্যবহার করতে হলো। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদনের সময় নষ্ট হলো।
ক্রেতা কিন্তু তার দেওয়া দাম একই রাখতে চাইবেন।
ফলে কারখানার মুনাফা কমবে।
এরপর যদি সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারায় ছাড় দিতে হয়, তাহলে মুনাফা আরও কমবে।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে নতুন অর্ডারের জন্য কারখানাকে হয় বেশি দাম চাইতে হবে, নয়তো কম মুনাফায় কাজ করতে হবে। দুই ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চাপ বাড়ে।
বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তি জ্বালানি ভর্তুকি, বেশি আমদানি ব্যয়, দুর্বল রপ্তানি এবং চলতি হিসাবে চাপ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার সুরক্ষা বলয়ও খুব বড় নয় বলে বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যাংকঋণের ঝুঁকি
পোশাক শিল্পে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও ঋণের সুদ বন্ধ থাকে না।
এ কারণেই বিকেএমইএর জরিপে ঋণখেলাপির ঝুঁকি বৃদ্ধির তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারখানার উৎপাদন কমে গেলে নগদ প্রবাহ কমে। রপ্তানি চালান দেরি হলে অর্থপ্রাপ্তি পিছিয়ে যায়। ক্রেতাকে ছাড় দিলে আয় কমে। একই সময়ে জ্বালানি ব্যয় বাড়ে।
এটি একটি ‘নগদ প্রবাহের চাপ’ তৈরি করে, যা দীর্ঘ হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায়ও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত ইতোমধ্যে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।
সুতরাং নিটওয়্যার শিল্পে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটকে শুধু শিল্প খাতের সমস্যা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়।
ঝুঁকির আরেক স্তর—ইতোমধ্যে কারখানা বন্ধ হচ্ছে
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে সংকটের গভীরতা বোঝাতে আরেকটি তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে ৪০০টির বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এর মধ্যে ২৮২টি বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির এবং ১২০টি বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সদস্য কারখানা। বৈশ্বিক মন্দা, সংঘাত, দেশীয় অস্থিতিশীলতা, জ্বালানি, অর্থায়ন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে এর পেছনের কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অবস্থায় নতুন করে দীর্ঘ জ্বালানি সংকট তৈরি হলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি সময়সীমা
এই সংকটের প্রভাবকে তিনটি সময়সীমায় দেখা যায়।
স্বল্পমেয়াদে সবচেয়ে জরুরি হলো গ্যাস ও বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ। কারণ কারখানার হাতে অর্ডার থাকলেও জ্বালানি না থাকলে সেই অর্ডার উৎপাদন করা সম্ভব নয়।

মধ্যমেয়াদে প্রশ্ন হবে জ্বালানি আমদানির উৎস কতটা বহুমুখী করা যায় এবং বেশি দামের এলএনজি শিল্প কতটা বহন করতে পারবে।
দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নটি আরও মৌলিক—বাংলাদেশের শিল্পায়ন কতটা আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে?
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, হরমুজ সংকটের পর বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বেড়েছে এবং অনেক দেশ গ্যাসের পরিবর্তে কয়লা ব্যবহার বাড়িয়েছে। একই সময়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্প্রসারণ বিভিন্ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে সাহায্য করেছে।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হতে পারে, শিল্পের জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু আমদানি করা গ্যাসের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নিটওয়্যার শিল্পের
বাংলাদেশের নিটওয়্যার শিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
একদিকে দেশের ভেতরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা। তার ওপর বিদেশি ক্রেতার সময়সীমা, মূল্যছাড়ের চাপ, ব্যাংকঋণ এবং বৈশ্বিক পোশাক বাজারের প্রতিযোগিতা।
এই সবগুলো চাপ একসঙ্গে কাজ করলে একটি কারখানার সমস্যা খুব দ্রুত জাতীয় অর্থনীতির সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত কমে গেলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপও কমতে পারে। কিন্তু হরমুজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন হলে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে বেশি দাম, কম সরবরাহ এবং বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।
তখন বাংলাদেশের নিটওয়্যার শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে শুধু কত টাকায় গ্যাস কেনা যাচ্ছে তা নয়।
প্রশ্ন হবে—বাংলাদেশ কি সেই জ্বালানি খরচের মধ্যেও সময়মতো, প্রতিযোগিতামূলক দামে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে বিশ্ববাজারে পোশাক সরবরাহ করতে পারবে?
কারণ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট কারখানার মেশিন থামায়। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হলে সেটি থামিয়ে দিতে পারে অর্ডারের প্রবাহও।
আর রপ্তানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় ক্ষতিই হতে পারে বেশি দীর্ঘস্থায়ী।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 













