আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই চীনের বার্ষিক প্রতিরক্ষা ফোরাম ‘শাংগশান ফোরাম’ শুরু হতে যাচ্ছে। তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর এবং এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে বেইজিং এই ফোরামকে বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতিক ও বিশ্লেষকেরা।
তিন দিনের এই ফোরাম মঙ্গলবার বেইজিংয়ে উদ্বোধন করার কথা চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দং জুনের। তিনি বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে পারেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশে পরোক্ষ সমালোচনাও থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বের কয়েক ডজন দেশ থেকে শত শত সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও গবেষক এতে অংশ নেবেন। সিঙ্গাপুরের শাংগ্রি-লা সংলাপের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত এই ফোরাম সাধারণত চীনের কঠোরভাবে পরিচালিত একটি নিরাপত্তা মঞ্চ হিসেবে দেখা হয়। শাংগ্রি-লা সংলাপ তুলনামূলকভাবে বেশি উন্মুক্ত ও স্বাধীন আলোচনার সুযোগ দেয়।

তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার ক্ষেত্রে বেইজিং কিছুটা সংযত থাকতে পারে। কারণ চলতি মাসের শেষ দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনকে সরাসরি আক্রমণ না করে কূটনৈতিক ভাষায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন কিছু এশীয় কূটনীতিক ও বিশ্লেষক।
এর বিপরীতে জাপান চীনের সমালোচনার তুলনামূলক সহজ লক্ষ্য হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং ও টোকিওর সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক চীনা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জেমস চার মনে করেন, ফোরামে চীন জাপানের যুদ্ধকালীন ইতিহাস এবং টোকিওর কথিত ‘সামরিক পুনর্গঠন’ নিয়ে সমালোচনা করতে পারে।
তাইওয়ান অবশ্য এই ফোরামে অংশ নিচ্ছে না। গত মাসে তাইওয়ান চীনা আগ্রাসনের সম্ভাবনা মোকাবিলায় সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা মহড়া চালিয়েছিল। চীন স্বশাসিত গণতান্ত্রিক দ্বীপটিকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। অন্যদিকে তাইওয়ানের সরকার বেইজিংয়ের এই দাবিকে স্বীকার করে না।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর আরও বেশি প্রতিনিধিত্বের আহ্বান জানিয়েছেন। চলতি মাসের শুরুতে কিরগিজস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনে তিনি বলেন, কয়েকটি দেশ বা একটি জোটের হাতে আন্তর্জাতিক বিষয় পরিচালনার ক্ষমতা থাকা প্রকৃত বহুপাক্ষিকতা নয়।
এই অবস্থানকে সামনে রেখেই চীন এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এশীয় দেশগুলোর নেতৃত্বের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে পারে। বিশেষ করে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলে সেটিকে বেইজিং নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখছে।
তবে চীনের জন্য বড় বাধা হচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর একটি অংশের চীন-সংশয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পূর্ব এশিয়া রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিসিয়া কিমের মতে, দক্ষিণ চীন সাগরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান দৃঢ় ও আগ্রাসী আচরণ অনেক এশীয় দেশকে বেইজিংয়ের ব্যাপারে সতর্ক করে তুলেছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয় থাকলেও এশিয়ার দেশগুলো যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চীনের নেতৃত্ব মেনে নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং অনেক দেশ একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতাও ধরে রাখতে চাইছে।
এবারের ফোরামে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিনিধিদল তুলনামূলকভাবে নিম্নপর্যায়ের হওয়ার কথা। তবে এশিয়ার কয়েকটি দেশ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে। চীনের প্রতিবেশী ও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বিরোধে থাকা ভিয়েতনাম পাঠাচ্ছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফান ভান জিয়াংকে। মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করবেন উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী আদলি জাহারি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা পেন্টাগনের চীন, তাইওয়ান ও মঙ্গোলিয়াবিষয়ক প্রধান পরিচালক সিনথিয়া কারাসের। ফলে ওয়াশিংটনও ফোরামটিকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাচ্ছে না।

এদিকে চীনের সামরিক নেতৃত্বে চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানও এবারের ফোরামের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। প্রেসিডেন্ট শির নেতৃত্বে চীনের সামরিক বাহিনীতে শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক পরিবর্তন ও অপসারণের পর বিদেশি প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিদের জন্য দেশটির সামরিক নেতৃত্বের ভেতরের পরিস্থিতি বোঝার এটিও একটি সুযোগ হতে পারে।
আগামী বছর চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই কংগ্রেসের মাধ্যমে দেশটির কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের নতুন নেতৃত্ব আরও স্পষ্ট হবে। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সর্বোচ্চ কমান্ড কাঠামো হিসেবে এই কমিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে সাত সদস্যের কমিশনে মাত্র দুজনের আসন পূর্ণ রয়েছে এবং তাঁদের একজন হলেন শি জিনপিং, যিনি চীনের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতা। ফলে এবারের শাংগশান ফোরামে বিদেশি প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাব্য চীনা সামরিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও পেতে পারেন।
সব মিলিয়ে, এবারের ফোরাম শুধু চীনের নিরাপত্তা নীতি তুলে ধরার মঞ্চ নয়; এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, চীনের আঞ্চলিক প্রভাব, তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে উত্তেজনা এবং ভবিষ্যৎ চীনা সামরিক নেতৃত্ব—সবকিছুর ওপর নজর রাখার গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 














