জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডির জনপ্রিয়তা বাড়ার পেছনে শুধু অভিবাসনবিরোধী মনোভাব নয়, অতীতের হারিয়ে যাওয়া গৌরব ও পরিচয়ের প্রতি এক ধরনের নস্টালজিয়াও কাজ করছে বলে বিশ্লেষকদের মত। অর্থনৈতিক ও শিল্পখাতের অবনতি, সামাজিক অনিরাপত্তা এবং দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারার অনুভূতি দলটির সমর্থন বাড়াচ্ছে।
সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনেও এএফডির অগ্রগতি এই প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্ন রাজ্যে দলটি প্রথম হয়েছে এবং বার্লিনে পেয়েছে তৃতীয় স্থান। অন্যদিকে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎসের খ্রিস্টীয় গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন সেখানে দুর্বল ফল করেছে। মেরৎস নিজেই ফলাফলকে ‘বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
হারানো অতীতের প্রতি আকর্ষণ
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন ডানপন্থী ও জনতুষ্টিবাদী দলের রাজনীতিতে একটি সাধারণ উপাদান হলো এমন এক অতীতের প্রতি আকর্ষণ, যেখানে সমাজকে তুলনামূলকভাবে সহজ, পরিবারকে আরও সুসংগঠিত এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে অপেক্ষাকৃত বেশি খ্রিস্টান ও কম বৈচিত্র্যময় হিসেবে কল্পনা করা হয়। অর্থনীতিবিদ মোহামেদ এ এল-ইরিয়ান বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে বিভাজন ও বৈষম্য বেড়েছে এবং মানুষ আগের মতো কোনো ঐক্যবদ্ধ বয়ান খুঁজে পাচ্ছে না।
ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি, নেদারল্যান্ডসের পার্টি ফর ফ্রিডম, সুইডেন ডেমোক্র্যাটস এবং যুক্তরাজ্যের রিফর্ম পার্টির মতো দলগুলোর রাজনীতিতেও জাতীয় পরিচয়, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব দলের বক্তব্যে বিশ্বায়ন, ইসলাম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কারণে জাতীয় সংস্কৃতি ও পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরা হয়।
পূর্ব জার্মানির আলাদা ক্ষত
পূর্ব জার্মানিতে এই নস্টালজিয়ার মাত্রা আরও প্রবল। ১৯৮৯ সালের পর দুই জার্মানির একীভূত হওয়ার সময় পশ্চিম জার্মানির মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। বিপুলসংখ্যক মানুষ পশ্চিমে চলে যায়, যাদের মধ্যে তরুণ নারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ছিল। ফলে পূর্বাঞ্চলের একটি অংশের মধ্যে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় হারানোর অনুভূতি তৈরি হয়।
সমাজবিজ্ঞানী স্টেফেন মাউয়ের মতে, এএফডির নেতারা পূর্ব জার্মানদের এমন একটি অনুভূতি দিচ্ছেন যে তারা ‘আরও খাঁটি জার্মান’ এবং ভবিষ্যতের প্রতিনিধিত্ব করেন। ইতিহাসবিদদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট শাসন নিজেকে নাৎসিবিরোধী প্রতিরোধের উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিম জার্মানির মতো ঐতিহাসিক অপরাধবোধের সংস্কৃতি সেখানে একইভাবে বিকশিত হয়নি।
ইতিহাসের স্মৃতি নিয়ে নতুন সংঘাত
এএফডি জার্মানির শিক্ষা, জাদুঘর ও গণমাধ্যমে নাৎসি অতীতের অপরাধবোধের ওপর জোর কমিয়ে জার্মানির সাফল্য ও জাতীয় গৌরবকে সামনে আনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটির এক নেতা বলেছেন, ইতিহাসে ‘বিসমার্ক বেশি, হিটলার কম’ হওয়া উচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়াশা মুঙ্কের ভাষায়, জার্মানি এখন নিজের ইতিহাস নিয়ে এক ধরনের ‘মনস্তাত্ত্বিক নাটক’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইভান ক্রাসতেভের মতে, এই নস্টালজিয়া নাৎসি শাসন বা কমিউনিজমের জন্য নয়; বরং এমন একটি পৃথিবীর জন্য, যেটিকে মানুষ একসময় বুঝতে পারত বলে মনে করে। তাঁর ভাষায়, নিজের জীবনের গৌরব ও মর্যাদা অবমূল্যায়িত হয়েছে বলে যারা মনে করেন, তারা ‘গৌরব, মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের’ কথা বলা রাজনৈতিক দলের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হতে পারেন।
ইউরোপজুড়ে একই প্রবণতা
এই প্রবণতা শুধু জার্মানিতে সীমাবদ্ধ নয়। আগামী বছর ফ্রান্স, ইতালি, পোল্যান্ড ও স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোতেও শক্তিশালী ডানপন্থী দলগুলোর উপস্থিতি থাকবে। অর্থনীতিবিদ ও নোবেলজয়ী দারন আচেমোলুর মতে, গণতন্ত্রের প্রতি অতিরিক্ত আত্মতুষ্টি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে অবজ্ঞা করা রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করেছে। সেই শূন্যতা পূরণের সুযোগ পাচ্ছে ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী দলগুলো।
সামগ্রিকভাবে, জার্মানির অভিজ্ঞতা ইউরোপের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। নিরাপত্তাহীনতা, বিশ্বায়নের প্রতি সন্দেহ এবং জাতীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনীতি—এই তিনটি প্রবণতা একসঙ্গে কাজ করে ডানপন্থী রাজনীতির জন্য নতুন সমর্থন তৈরি করছে।
জার্মানিতে এএফডির উত্থান, জাতীয় পরিচয়ের রাজনীতি, রাজনৈতিক নস্টালজিয়া ও পূর্ব-পশ্চিম বিভাজন নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। আগামী দিনের নির্বাচনগুলোতে এই প্রবণতা কতটা প্রভাব ফেলবে, তা ইউরোপীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
জার্মানিতে ডানপন্থার উত্থান ও হারানো জাতীয় গৌরবের নস্টালজিয়া ইউরোপের রাজনীতিতে নতুন প্রভাব ফেলছে।
জার্মানিতে ডানপন্থার উত্থান
জার্মানির এএফডির উত্থানের পেছনে জাতীয় পরিচয়, অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা ও হারানো অতীতের প্রতি নস্টালজিয়ার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















