অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ায় হাঙরের হামলায় ৬৩ বছর বয়সী গ্রেগ ও’নিল নিহত হওয়ার পর একটি গ্রেট হোয়াইট হাঙরকে ধরতে পারলে মেরে ফেলার বিরল নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার পার্থের উত্তরের জনপ্রিয় সরেন্টো বিচে সাঁতার কাটার সময় ওই হামলার ঘটনা ঘটে। এখনো গ্রেগের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
হামলার পর সরেন্টোসহ পার্থের আশপাশের উপকূলের সব সৈকত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাঙরটির সন্ধানে অভিযান চলবে এবং অন্তত রোববার পর্যন্ত এসব সৈকত বন্ধ থাকতে পারে।
এ সপ্তাহে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ায় এটি দ্বিতীয় হাঙর হামলার ঘটনা। চলতি বছর রাজ্যটিতে এখন পর্যন্ত এটি তৃতীয় প্রাণঘাতী হাঙর হামলা।
গ্রেগ ও’নিলের পরিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই মর্মান্তিক ঘটনায় তারা গভীরভাবে শোকাহত ও বিধ্বস্ত। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেগ সমুদ্রকে ভালোবাসতেন। তিনি ছিলেন একজন আগ্রহী সাঁতারু, খেলাধুলাপ্রেমী, কর্মনিষ্ঠ এবং উদার ও রসবোধসম্পন্ন মানুষ।
শনিবার গ্রেগের পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা তার স্মরণে ফুল রেখে শ্রদ্ধা জানান।
হামলার প্রত্যক্ষদর্শী জ্যাকুই রাপাইক অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনকে জানান, ওই সময় দুজন পুরুষ সাঁতার কাটছিলেন। তবে তাদের মধ্যে মাত্র একজন তীরে ফিরতে সক্ষম হন। পানিতে তিনি রক্তের একটি বড় দাগ দেখতে পেয়েছিলেন বলেও জানান।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ওয়াটুডেকে বলেন, তিনি ওই ব্যক্তিকে হাঙরের আক্রমণের শিকার হতে দেখেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হাঙরটি লোকটিকে পানিতে ছুড়ে ছুড়ে আক্রমণ করছিল। একই সময় প্রায় ২ দশমিক ৫ মিটার লম্বা একটি হাঙর দেখার কথাও জানান কয়েকজন।
ঘটনার পর সরেন্টো বিচসহ জুন্ডালাপ এলাকার সব সৈকত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। শনিবার সেখানে পুলিশি নৌযান ও হেলিকপ্টার দিয়ে উপকূল এলাকায় নজরদারি চালানো হয়।
গ্রেট হোয়াইট হাঙরকে মেরে ফেলার নির্দেশ
ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার মৎস্যমন্ত্রী জ্যাকি জারভিস জানিয়েছেন, শনিবার সকালে জল পুলিশ একটি হাঙর দেখতে পায় এবং সেটিকে হামলায় জড়িত হাঙর হিসেবে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা হয়। এরপরই তিনি বিশেষ পরিস্থিতিতে সেটিকে ধরতে পারলে মেরে ফেলার অনুমতি দেন।
মন্ত্রী বলেন, হামলার ভয়াবহতা এবং মানুষের জন্য হাঙরটির সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় তিনি এই ‘অসাধারণ পদক্ষেপ’ নিয়েছেন। তবে এটি ব্যাপকভাবে হাঙর নিধনের কোনো কর্মসূচি নয় বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ায় গ্রেট হোয়াইট হাঙর সংরক্ষিত প্রজাতি হওয়ায় এ ধরনের ‘ধরো ও মেরে ফেলো’ নির্দেশ অত্যন্ত বিরল এবং বিতর্কিত। জারভিস জানান, প্রায় ১০ বছর পর ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ায় এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হলো।
সমুদ্রসৈকতে মানুষের নিরাপত্তা বাড়াতে ড্রোন ব্যবহার এবং হাঙর শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের জন্য ট্যাগিং কার্যক্রমও বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
হাঙর নিধন নিয়ে পুরোনো বিতর্ক
ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ায় হাঙর ধরা ও হত্যার দীর্ঘ ও বিতর্কিত ইতিহাস রয়েছে। ২০১৪ সালে ধারাবাহিক হাঙর হামলার পর রাজ্য সরকার হাঙর নিধনের উদ্যোগ নিলে মাসের পর মাস ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল।
নতুন করে সরেন্টো বিচের এই হামলা সেই বিতর্ক আবার সামনে নিয়ে এসেছে—সমুদ্রসৈকতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এবং সংরক্ষিত হাঙর প্রজাতি রক্ষার সঙ্গে সেই নিরাপত্তার ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে সোমবার ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার জেরাল্ডটনের উপকূলে সার্ফিং করার সময় ৫৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তি হাঙরের কামড়ের শিকার হন। তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও তার পায়ের একটি অংশ হারিয়েছেন।
চলতি বছর অস্ট্রেলিয়ায় এখন পর্যন্ত হাঙরের হামলায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। জানুয়ারিতে সিডনি হারবারে হাঙরের কামড়ে ১২ বছর বয়সী এক কিশোর মারা যায়। মে ও জুন মাসে আলাদা তিনটি ঘটনায় তিনজন ডুবুরি হাঙরের হামলায় নিহত হন—তাদের মধ্যে দুজন ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার এবং একজন কুইন্সল্যান্ডের।
গ্রেগ ও’নিলের মৃত্যুর পর এখন সরেন্টো বিচের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উপকূলে নজরদারি, ড্রোন ও হাঙর শনাক্তকরণ বাড়ানোর পাশাপাশি হামলায় জড়িত বলে শনাক্ত হাঙরটি ধরা সম্ভব হলে তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে এই পদক্ষেপ অস্ট্রেলিয়ায় হাঙর সংরক্ষণ ও মানুষের নিরাপত্তা—দুইয়ের মধ্যে পুরোনো বিতর্ককেও আবার সামনে এনেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















