কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস। বৃহস্পতিবার স্কটল্যান্ডের আয়ারশায়ারের ডামফ্রিজ হাউসে আয়োজিত এই বৈঠকে এনভিডিয়া, ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও গুগল ডিপমাইন্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
বাকিংহাম প্যালেস জানিয়েছে, বৈঠকের মূল লক্ষ্য হলো এআই কীভাবে মানুষের কল্যাণে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় কাজে লাগানো যায়, পাশাপাশি এর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়—তা নিয়ে আলোচনা করা। আয়োজনের সঙ্গে রয়েছে কিংস ট্রাস্ট, কিংস ফাউন্ডেশন ও সাসটেইনেবল মার্কেটস ইনিশিয়েটিভ।
বৈঠকে যুক্তরাজ্যের এআইবিষয়ক মন্ত্রী কানিশকা নারায়ণও অংশ নিচ্ছেন। চীনের প্রতিনিধিদেরও সেখানে থাকার কথা রয়েছে। গুগল ডিপমাইন্ডের প্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস এবং ভ্যাটিকানের এআইবিষয়ক উপদেষ্টা পাওলো বেনান্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এআই উন্নয়নে অভিন্ন নীতির চেষ্টা
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এআই উন্নয়নের জন্য অংশগ্রহণকারী দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলো একটি অভিন্ন নীতিমালায় একমত হতে পারে কি না। এমন একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে, যাতে এআই প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের স্বার্থ, সমাজ এবং পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হয়।
রাজা চার্লস তার বক্তব্যে এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতিকে একই সঙ্গে আকর্ষণীয় ও উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরবেন। তার প্রস্তুত করা বক্তব্যের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, এআইয়ের বিকাশের গতি এবং এর প্রকৃতি—দুটিই গভীরভাবে ভাবার মতো বিষয়।
তিনি আরও বলবেন, মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্ব যারা বোঝেন, তারা এখন আশ্বস্ত হতে চাইছেন যে এআইয়ের কারণে মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ হারাবে না।
চার্লসের বক্তব্যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথাও গুরুত্ব পাবে। তার মতে, বর্তমান সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন পৃথিবী রেখে যাওয়া হবে, তা নির্ধারণ করবে। তাই প্রযুক্তির উন্নয়ন শুধু দ্রুততর করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; বরং তা যেন মানবতা, সমাজ এবং প্রকৃতির সেবায় থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এআই নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
রাজা চার্লসের এই বৈঠক এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন এআই শিল্পের ভেতরেই প্রযুক্তির বিকাশের গতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে আরও শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা দ্রুত তৈরি হওয়ার ফলে এর নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই সম্প্রতি একটি খোলা চিঠিতে এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করেছেন, বর্তমান এআই মডেলগুলো এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে যেখানে তারা পরবর্তী প্রজন্মের এআই তৈরির সক্ষমতাও অর্জন করতে পারে।
এ ছাড়া ওপেনএআইয়ের তৈরি এআই এজেন্টের একটি ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ওই এজেন্টগুলো এআই অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান হাগিং ফেসে প্রবেশ করেছিল বলে জানানো হয়েছে।
আমোদেইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কও সমর্থন জানিয়েছেন। ওপেনএআই জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা সারাহ ফ্রিয়ার স্কটল্যান্ডের বৈঠকে অংশ নেবেন।
আন্তর্জাতিক ঐকমত্য কতটা সম্ভব?
তবে এআই নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছানো সহজ হবে না। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থানসহ বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস এই উদ্যোগকে বেইজিংকে লক্ষ্য করে নেওয়া একটি ভূরাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেছে।
ফলে এআই নিরাপত্তা নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এআই নিয়ে আগেও সতর্ক করেছিলেন চার্লস
এআই নিয়ে রাজা তৃতীয় চার্লসের উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে আয়োজিত এআই সেফটি সামিটেও তিনি প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।
সেই বক্তব্যে তিনি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জীবিকা রক্ষা, গণতন্ত্রকে ক্ষতির হাত থেকে নিরাপদ রাখা এবং নতুন প্রযুক্তির সুফল যেন সমাজের সব মানুষের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়—এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
এবারের ডামফ্রিজ হাউসের বৈঠকে তার বার্তাও মূলত একই জায়গায় এসে দাঁড়াচ্ছে—এআই যত দ্রুতই এগিয়ে যাক, এর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষ, সমাজ ও প্রকৃতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















