সরকার, স্বাস্থ্যসেবা অংশীদার ও বিভিন্ন সম্প্রদায়কে একত্র করে রোগীর নিরাপত্তার প্রতি মনোযোগ বাড়ানোই এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। সীমিত প্রমাণ-উপাত্ত থেকে জানা যায়, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অনিরাপদ ও নিম্নমানের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষতিকর প্রভাব আরও ভয়াবহ। এসব কারণে বিশ্বে আনুমানিক ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং অর্থনৈতিক কল্যাণে প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়।
এ বছর বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবসের মূল প্রচারাভিযানে অসংক্রামক রোগ বা এনসিডি চিকিৎসায় নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘জীবনভর নিরাপদ চিকিৎসা’।
অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে বারবার এবং অনেক সময় জটিলভাবে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। ফলে চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে রোগীর নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ক্যানসারের মতো কিছু রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবা নেওয়া প্রতি তিনজন রোগীর একজন পর্যন্ত বিরূপ চিকিৎসাজনিত ঘটনার শিকার হতে পারেন।
বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৭৪ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে প্রতি বছর অসংক্রামক রোগে প্রায় ৯৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এর প্রায় অর্ধেক মৃত্যু ঘটে ৭০ বছরের আগেই, অর্থাৎ অকালমৃত্যু হিসেবে।
তাই অসংক্রামক রোগের নিরাপদ চিকিৎসা শুধু রোগ নির্ণয় ও ওষুধ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। রোগ প্রতিরোধ, রোগ শনাক্তকরণ, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও নিজস্ব যত্ন, পুনর্বাসন এবং জীবনাবসানের সময় প্রয়োজনীয় সেবাসহ পুরো চিকিৎসা-ধারার প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
চিকিৎসায় দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া, ওষুধ ব্যবহারে ভুল, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের অনিরাপদ ব্যবহার—সবই রোগীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। রোগী এক চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে অন্য কেন্দ্রে গেলে, চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হলে বা হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার সময় সঠিকভাবে তথ্য আদান-প্রদান না হলেও ঝুঁকি বাড়ে।
একজন রোগীর একাধিক অসংক্রামক রোগ থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তাকে একসঙ্গে একাধিক চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণ করতে এবং বিভিন্ন ধরনের ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। ফলে চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপে ভুল ও সমন্বয়হীনতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন কাঠামোও রয়েছে। ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদের রোগীর নিরাপত্তা বিষয়ে বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রস্তাবের পর ২০২১–২০৩০ মেয়াদের বৈশ্বিক রোগী নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এতে রোগীর নিরাপত্তা এবং অসংক্রামক রোগবিষয়ক কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় ও একীভূত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অসংক্রামক রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক রাজনৈতিক ঘোষণায় উন্নত স্বাস্থ্যফল অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে নিরাপদ চিকিৎসাসেবার কথা বলা হয়েছে।
২০২৬–২০৩৫ মেয়াদের জরুরি, সংকটাপন্ন ও অস্ত্রোপচারভিত্তিক সমন্বিত চিকিৎসাসেবার বৈশ্বিক কৌশলেও অসংক্রামক রোগের তীব্র জটিলতায় দ্রুত, নিরাপদ ও উচ্চমানের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে নিয়মিত নিরীক্ষা ও রোগীভিত্তিক তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসকদের দলগতভাবে নিরাপদ চিকিৎসার সংস্কৃতি গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
অনিরাপদ চিকিৎসার অর্থনৈতিক মূল্য
রোগীর নিরাপত্তায় ব্যর্থতার আর্থিক মূল্যও কম নয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত দেশগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ব্যয়ের ও কার্যক্রমের প্রায় ১৫ শতাংশ এমন রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় হয়, যারা স্বাস্থ্যসেবার নিরাপত্তাজনিত ব্যর্থতার কারণে ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এর বড় একটি অংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
স্বাস্থ্য খাতে যখন বাজেটের ওপর চাপ বাড়ছে, তখন প্রতিরোধযোগ্য চিকিৎসাজনিত ক্ষতি কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্যই গ্রহণযোগ্য ব্যয় হতে পারে না।
তাই অসংক্রামক রোগবিষয়ক নীতি, কৌশল ও কর্মসূচিতে রোগীর নিরাপত্তাকে শুরু থেকেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরে আলাদাভাবে যুক্ত করার বিষয় হিসেবে এটিকে দেখা যাবে না।
এ জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রিক এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে রোগীরা ধারাবাহিক ও সমন্বিত চিকিৎসা পাবেন। একই সঙ্গে নিরাপদ ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা যেন মানুষের নাগালের বাইরে চলে না যায়, সে জন্য আর্থিক বাধাও দূর করতে হবে।
নিরাপদ অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে টেকসই অর্থায়ন, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং প্রশিক্ষিত, দক্ষ ও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকর্মীদের এমন কর্মপরিবেশও দিতে হবে, যেখানে চিকিৎসাজনিত ভুল বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা শাস্তি বা দোষারোপের ভয় ছাড়াই জানানো যায়।
রোগীকেও হতে হবে নিরাপত্তার অংশীদার
অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত মানুষকে নিজের চিকিৎসার নিরাপত্তার অংশীদার করতে হবে। তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান শুধু ব্যক্তিগত চিকিৎসার সিদ্ধান্ত গ্রহণেই নয়, স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনা ও উন্নয়নেও কাজে লাগাতে হবে।
রোগী ও তার পরিচর্যাকারীদের প্রশ্ন করার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দিতে হবে। তাদের নিজের ওষুধ ও চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে, বিপদের সতর্কসংকেত চিনতে হবে এবং চিকিৎসার কোনো বিষয় অস্বাভাবিক মনে হলে তা স্বাস্থ্যকর্মীদের জানাতে হবে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর্মীদেরও নিরাপদ চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, সরঞ্জাম, সম্পদ এবং উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে চিকিৎসার সময় ঘটে যাওয়া ভুল বা অল্পের জন্য এড়িয়ে যাওয়া দুর্ঘটনার বিষয়গুলো গোপন না করে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য হবে কাউকে দোষী করা নয়, বরং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা এবং চিকিৎসার মান উন্নত করা।
বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবসে তাই আবারও মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন—নিরাপদ চিকিৎসা প্রত্যেক মানুষের অধিকার। চিকিৎসার যে পর্যায়েই মানুষ থাকুক এবং যতদিন চিকিৎসার প্রয়োজন হোক, প্রতিটি ধাপেই তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য থেকেও রোগীর নিরাপত্তাকে আলাদা করা যায় না।
জীবনভর নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত হোক।
লেখক: ডা. নিশেল বুদ্ধা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ১০টি সদস্যরাষ্ট্র হলো বাংলাদেশ, ভুটান, গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া, ভারত, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও তিমুর-লেস্তে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















