জাপানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে চীন। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত শিয়াংশান ফোরামে চীনা বিশেষজ্ঞ ও আলোচকরা জাপানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরে টোকিওর সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধির সমালোচনা করেছেন।
তিন দিনের এই প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্মেলন বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে শেষ হয়। সম্মেলনে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্য এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি।
এরই মধ্যে জাপান তার মধ্যমেয়াদি প্রতিরক্ষা বাজেট দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ থেকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার কথা বিবেচনা করছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য মিত্র দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাপানও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপ ও এশিয়ায় তার মিত্র দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে জাপানের সামরিক ব্যয় বাড়ানোর সম্ভাবনাকে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
শিয়াংশান ফোরামের আলোচনায় রেনমিন ইউনিভার্সিটি অব চায়নার চোংইয়াং ইনস্টিটিউট ফর ফাইন্যান্সিয়াল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ঝৌ রং বলেন, জাপানের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কাজ করছে না।
সম্মেলনের বাইরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জাপানের প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি জাপানের অভ্যন্তরীণ রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর চাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ঝৌ রংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, জাপানের কিছু রক্ষণশীল গোষ্ঠী চীনকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এবং দেশটির প্রতি তাদের অবস্থানও কঠোর। ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ জাপানের সামরিক ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে বলে তিনি মনে করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের সামরিক অবস্থান
জাপানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে চীনের উদ্বেগের পেছনে রয়েছে দুই দেশের দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের সামরিক আগ্রাসনের স্মৃতি চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এখনো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধের পর জাপান সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে যুদ্ধকে রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে পরিত্যাগ করে এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় হিসেবে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে সীমাবদ্ধতা গ্রহণ করে। যদিও সময়ের সঙ্গে জাপান আত্মরক্ষার জন্য শক্তিশালী সামরিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, দেশটির প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও জাপানের মধ্যকার নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। পূর্ব চীন সাগর, তাইওয়ান প্রণালি এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি ও জোট রাজনীতি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
এশিয়ায় বাড়ছে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চাপ
ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ও অংশীদারদের আরও বেশি প্রতিরক্ষা ব্যয়ের আহ্বান জানাচ্ছে।
জাপানের জন্য এই পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিবেশ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
অন্যদিকে চীনের দৃষ্টিতে জাপানের দ্রুত সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যকে বদলে দিতে পারে।
ফলে জাপান যদি জিডিপির ৩ থেকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ায়, তা শুধু টোকিওর অভ্যন্তরীণ বাজেট সিদ্ধান্ত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পূর্ব এশিয়ার সামরিক ভারসাম্য, চীন-জাপান সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের ওপরও পড়তে পারে।
শিয়াংশান ফোরামে চীনা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য তাই এ অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা নিয়ে বেইজিংয়ের উদ্বেগেরই প্রতিফলন। জাপানের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি দেওয়া হলেও চীন এটিকে সম্ভাব্য সামরিক পুনরুত্থানের অংশ হিসেবে দেখছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে জাপানের প্রতিরক্ষা নীতি ও সামরিক বাজেট পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















