১৯৭১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তান দেশটিকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনকারী প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি। এরপর দুই দেশের যোগাযোগ ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। আমিরাতের রাষ্ট্র ও অর্থনীতি গড়ে ওঠার বিভিন্ন পর্যায়ে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, শিক্ষক, পেশাজীবী ও দক্ষ কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
বর্তমানে প্রায় ২২ লাখ পাকিস্তানি আমিরাতে বসবাস করেন। তারা দেশটির অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি বছরে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান পাকিস্তানে। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত পাকিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। ফলে এই সম্পর্ক কেবল রাষ্ট্রীয় কূটনীতির বিষয় নয়; দুই দেশের লাখ লাখ মানুষের জীবিকা ও পারিবারিক অর্থনীতিও এর সঙ্গে যুক্ত।
অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বড় ক্ষেত্র হতে পারে বিনিয়োগ। সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় বিনিয়োগভিত্তিক অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান-সংযুক্ত আরব আমিরাত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বাণিজ্যের পরিমাণ ১ হাজার ৬০০ কোটি থেকে ২ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
পাকিস্তানের বিশাল ভোক্তা বাজার, তরুণ কর্মশক্তি, প্রযুক্তিনির্ভর তরুণ উদ্যোক্তা এবং প্রায় ২৬ হাজার নিবন্ধিত তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রতিষ্ঠান আমিরাতের বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক, আর্থিক প্রযুক্তি ও অনলাইন বাণিজ্যে আমিরাতি বিনিয়োগ পাকিস্তানের অর্থনীতিতে নতুন সংযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। পাকিস্তানের কৃষিজমি, উৎপাদন সক্ষমতা ও শ্রমশক্তি আমিরাতের খাদ্য চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে আমিরাতের অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও উন্নত পরিবহনব্যবস্থা পাকিস্তানের কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, শীতল সরবরাহব্যবস্থা, বাজারজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের ঘাটতি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
খনিজসম্পদেও রয়েছে বড় সম্ভাবনা। পাকিস্তানের বিপুল খনিজভাণ্ডার এবং আমিরাতের বিনিয়োগ সক্ষমতার সমন্বয়ে নতুন প্রকল্প গড়ে উঠতে পারে। চাগাই এলাকায় তামা ও সোনার অনুসন্ধানে পাকিস্তানের মেরি এনার্জিজ ও আমিরাতের ইন্টারন্যাশনাল রিসোর্স হোল্ডিংয়ের সহযোগিতা এর একটি উদাহরণ। অ্যান্টিমনি, অ্যালুমিনিয়াম আকরিক ও বিরল মৃত্তিকা উপাদান নিয়েও আগ্রহ রয়েছে। পাঞ্জাবে আকরিক পরিশোধন শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস
দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা সদস্যরা আমিরাতের পাইলট ও সামরিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং সামরিক প্রতিষ্ঠান গঠনে ভূমিকা রাখেন। আমিরাতের বিমানবাহিনীর প্রথম পাঁচজন প্রধানই ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা।
বর্তমানে যৌথ বিশেষ বাহিনীর প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিও এই সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হতে পারে।
তবে সম্পর্কের সামনে ভূরাজনৈতিক জটিলতাও রয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্ক, আব্রাহাম চুক্তিতে আমিরাতের অংশগ্রহণ, সৌদি আরবের সঙ্গে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকে আরও জটিল করেছে। ইয়েমেন, লিবিয়া, সুদান, সোমালিয়া ও আলজেরিয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমিরাতের নীতি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের জন্ম দিয়েছে।
এই বাস্তবতায় পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। ভারত, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান প্রত্যেক দেশের নিজস্ব স্বার্থকে বিবেচনায় নিতে পারে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখার নীতি পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক পরিসরও তৈরি করতে পারে।
নিরাপত্তায় অভিন্ন স্বার্থ
সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃদেশীয় সংগঠিত অপরাধ দুই দেশের জন্যই অভিন্ন উদ্বেগ। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আমিরাত মাদক পাচার ও সীমান্তপারের অপরাধের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আফগানিস্তান থেকে উদ্ভূত মাদকবাণিজ্য এই ঝুঁকিকে আরও জটিল করেছে।
এ ক্ষেত্রে দুই দেশের সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমিরাতের আর্থিক নজরদারি, সীমান্ত নিরাপত্তা, বিমান চলাচল নিরাপত্তা ও সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা যুক্ত হলে আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
একইভাবে করাচি, পোর্ট কাসিম ও গোয়াদর বন্দরের সক্ষমতা আমিরাতের বন্দরগুলোর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার পরিবর্তে আঞ্চলিক পণ্য পরিবহনব্যবস্থাকে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে ঝুঁকি ও চাপ বাড়লে বিকল্প বন্দর ও সরবরাহপথের গুরুত্ব আরও বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ককে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণের আলোকে দেখলে এর দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। অর্থনীতি, জনশক্তি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় দুই দেশের যে বাস্তব স্বার্থ তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য একটি বিস্তৃত ভিত্তি তৈরি করেছে।
ভূরাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে। কিন্তু সেই মতপার্থক্যের পাশাপাশি যে অভিন্ন স্বার্থগুলো রয়েছে, সেগুলোকে কার্যকর সহযোগিতায় রূপ দিতে পারলে পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
ড. রাশিদ ওয়ালি জানজুয়া 



















