০৮:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হালদওয়ানির ঘটনাই দেখাল, জাতিভিত্তিক অপমান ঠেকানোর আইনে কোথায় কাঠামোগত দুর্বলতা পাকিস্তান-সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্পর্ক: ভূরাজনীতির টানাপোড়েন পেরিয়ে নতুন সহযোগিতার সম্ভাবনা বন্যার পানি কমলেও দৌলতপুরে বাড়ছে দুর্ভোগ, বিশুদ্ধ পানির সংকটে ৫০ হাজার মানুষ মেক্সিকোয় স্প্যানিশ ছাত্রী খুন, নারীবিদ্বেষের অভিযোগে তদন্ত গ্যাস সংকটে এখনো বন্ধ হয়নি কোনো পোশাক কারখানা, তবে বড় চাপের শঙ্কা হামে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, দেশে প্রাণহানি ১,০৪৬ ইরানের কারাগারে নির্যাতনের ভয়াবহ স্মৃতি, সব জেনেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা নোবেলজয়ী নার্গিস মোহাম্মাদির ডেঙ্গুতে আরও ৫ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১,৪৮৪ রোগী ডায়ানার মৃত্যুর পর চার্লস বলেছিলেন, ‘শিগগিরই আমরা তাকে ভুলে যাব’—ভাইয়ের বইয়ে বিস্ফোরক দাবি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: যুদ্ধ জেতা আর যুদ্ধ শেষ করার ক্ষমতা এক নয়

গ্যাস সংকটে এখনো বন্ধ হয়নি কোনো পোশাক কারখানা, তবে বড় চাপের শঙ্কা

দেশে সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)। তবে সংকটের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব বুঝতে আরও তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরা বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ব্যাটেক্সপো ২০২৬’, আসন্ন হংকং রোডশো এবং দেশের তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমকে অবহিত করতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

মাহমুদ হাসান খান বলেন, পোশাক খাতে কোনো সংকটের প্রভাব সাধারণত তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। একটি কারখানা বন্ধ করতে হলে আগে হাতে থাকা অর্ডার শেষ করা, শ্রমিকদের আইনগত ক্ষতিপূরণ পরিশোধ এবং ব্যাংকের দায়-দেনা নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এসব কারণে একটি কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রায় ছয় মাসের পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়।

তাই কোনো কারখানা যদি এখন বন্ধ হয়, সেটিকে সরাসরি সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বর্তমান সময়ে বন্ধ হওয়া কোনো কারখানার সমস্যার সূত্র ছয় মাস বা এক বছর আগের ঘটনাতেও থাকতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিজিএমইএ সভাপতি জানান, কম গ্যাসের চাপের কারণে তৈরি পোশাক শিল্পের পশ্চাৎ সংযোগ খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে ডাইং ও ওয়াশিং কারখানাগুলোতে গ্যাসের স্বল্প চাপ উৎপাদন ব্যাহত করেছে।

তবে সম্প্রতি ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর শিল্প খাতে আগের মাত্রায় গ্যাস সরবরাহ পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং এরই মধ্যে তা কার্যকর হয়েছে বলে জানান তিনি।

স্বাভাবিক সময়ে একটি পোশাক কারখানা দিনে প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা উৎপাদন কার্যক্রম চালায়। কিন্তু গ্যাস সংকটের সময় অনেক কারখানাকে উৎপাদন সচল রাখতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়েছে। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং সময়মতো রপ্তানি পণ্য পাঠানোর চাপও বাড়িয়েছে।

গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে বিজিএমইএ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। সংগঠনটির মতে, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের বড় ধরনের জ্বালানি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আরও দুটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট বা এফএসআরইউ স্থাপনের দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে স্থলভিত্তিক এলএনজি সংরক্ষণ টার্মিনালের দিকে যাওয়ার ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি।

মাহমুদ হাসান খান জানান, চীনের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে একটি এফএসআরইউ আনার বিষয়ে ইতোমধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তবে একের পর এক এফএসআরইউ স্থাপনের পরিবর্তে বিজিএমইএ স্থলভিত্তিক গ্যাস সংরক্ষণ অবকাঠামোকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়।

তিনি বলেন, শুধু নতুন এফএসআরইউ স্থাপন করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি দেশের গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন করতে হবে। সরবরাহ অবকাঠামোর উন্নয়ন ছাড়া গ্যাস আমদানি ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো হলেও শিল্প খাতে তার পূর্ণ সুবিধা পৌঁছাবে না।

জ্বালানি খাতে আরও কয়েকটি দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের কারখানাগুলোকে গ্যাস সংযোগ ও গ্যাস বরাদ্দে অগ্রাধিকার দেওয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে কম সুদের ‘সবুজ ঋণ’ চালু করা এবং উপকূলীয় এলাকায় স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত করা।

এদিকে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পরবর্তী সময় নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিজিএমইএ সভাপতি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের উত্তরণকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগ চলতি মাসের শেষ দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অনুমোদন করবে।

তার মতে, অতিরিক্ত তিন বছর সময় পাওয়া গেলে এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবে। এ প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতও সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের নেতৃত্বে নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে সুবিধা ধরে রাখার বিষয়ে মাহমুদ হাসান খান বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ করা পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। জিএসপি প্লাস সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বিজিএমইএ।

ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে কোম্পানি আইন ও শুল্ক আইন আধুনিকায়নেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সম্পন্ন করা এবং এলডিসি উত্তরণের পর অন্তত পাঁচ বছর বিশেষ নীতিগত সহায়তা ও শুল্ক সুবিধার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে বিজিএমইএ।

রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রেও নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে পোশাক খাত। বিজিএমইএ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার বাইরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের মোট প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুড়ির মধ্যে অপ্রচলিত বাজারগুলো থেকেই এখন প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার আসে।

নতুন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড আকৃষ্ট করতে হংকংয়ে এইচএসবিসির আয়োজিত একটি রোডশোতে অংশ নেবে বিজিএমইএ। পাশাপাশি জাপানের ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে জাপানি ভাষায় দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি আলাদা ‘জাপান ডেস্ক’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে জাপানে বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। আগামী কয়েক বছরে এই রপ্তানি ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে বিজিএমইএ।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে বিশ্ববাজারে শুধু কম খরচের উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং আধুনিক ও উদ্ভাবননির্ভর শিল্প হিসেবে তুলে ধরতেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের সঙ্গে একটি কৌশলগত চুক্তি করেছে বিজিএমইএ। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের নতুন ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামাল দেওয়া গেলেও আগামী কয়েক মাসে এর প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হতে পারে—বিজিএমইএর বক্তব্যে সেই সতর্কতাই উঠে এসেছে। তাই শিল্পের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং এলডিসি-পরবর্তী বাজার সুবিধা নিশ্চিত করাকে বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

হালদওয়ানির ঘটনাই দেখাল, জাতিভিত্তিক অপমান ঠেকানোর আইনে কোথায় কাঠামোগত দুর্বলতা

গ্যাস সংকটে এখনো বন্ধ হয়নি কোনো পোশাক কারখানা, তবে বড় চাপের শঙ্কা

০৮:০৯:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশে সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)। তবে সংকটের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব বুঝতে আরও তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরা বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ব্যাটেক্সপো ২০২৬’, আসন্ন হংকং রোডশো এবং দেশের তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমকে অবহিত করতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

মাহমুদ হাসান খান বলেন, পোশাক খাতে কোনো সংকটের প্রভাব সাধারণত তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। একটি কারখানা বন্ধ করতে হলে আগে হাতে থাকা অর্ডার শেষ করা, শ্রমিকদের আইনগত ক্ষতিপূরণ পরিশোধ এবং ব্যাংকের দায়-দেনা নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এসব কারণে একটি কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রায় ছয় মাসের পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়।

তাই কোনো কারখানা যদি এখন বন্ধ হয়, সেটিকে সরাসরি সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বর্তমান সময়ে বন্ধ হওয়া কোনো কারখানার সমস্যার সূত্র ছয় মাস বা এক বছর আগের ঘটনাতেও থাকতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিজিএমইএ সভাপতি জানান, কম গ্যাসের চাপের কারণে তৈরি পোশাক শিল্পের পশ্চাৎ সংযোগ খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে ডাইং ও ওয়াশিং কারখানাগুলোতে গ্যাসের স্বল্প চাপ উৎপাদন ব্যাহত করেছে।

তবে সম্প্রতি ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর শিল্প খাতে আগের মাত্রায় গ্যাস সরবরাহ পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং এরই মধ্যে তা কার্যকর হয়েছে বলে জানান তিনি।

স্বাভাবিক সময়ে একটি পোশাক কারখানা দিনে প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা উৎপাদন কার্যক্রম চালায়। কিন্তু গ্যাস সংকটের সময় অনেক কারখানাকে উৎপাদন সচল রাখতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়েছে। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং সময়মতো রপ্তানি পণ্য পাঠানোর চাপও বাড়িয়েছে।

গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে বিজিএমইএ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। সংগঠনটির মতে, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের বড় ধরনের জ্বালানি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আরও দুটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট বা এফএসআরইউ স্থাপনের দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে স্থলভিত্তিক এলএনজি সংরক্ষণ টার্মিনালের দিকে যাওয়ার ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি।

মাহমুদ হাসান খান জানান, চীনের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে একটি এফএসআরইউ আনার বিষয়ে ইতোমধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তবে একের পর এক এফএসআরইউ স্থাপনের পরিবর্তে বিজিএমইএ স্থলভিত্তিক গ্যাস সংরক্ষণ অবকাঠামোকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়।

তিনি বলেন, শুধু নতুন এফএসআরইউ স্থাপন করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি দেশের গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন করতে হবে। সরবরাহ অবকাঠামোর উন্নয়ন ছাড়া গ্যাস আমদানি ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো হলেও শিল্প খাতে তার পূর্ণ সুবিধা পৌঁছাবে না।

জ্বালানি খাতে আরও কয়েকটি দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের কারখানাগুলোকে গ্যাস সংযোগ ও গ্যাস বরাদ্দে অগ্রাধিকার দেওয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে কম সুদের ‘সবুজ ঋণ’ চালু করা এবং উপকূলীয় এলাকায় স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত করা।

এদিকে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পরবর্তী সময় নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিজিএমইএ সভাপতি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের উত্তরণকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগ চলতি মাসের শেষ দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অনুমোদন করবে।

তার মতে, অতিরিক্ত তিন বছর সময় পাওয়া গেলে এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবে। এ প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতও সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের নেতৃত্বে নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে সুবিধা ধরে রাখার বিষয়ে মাহমুদ হাসান খান বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ করা পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। জিএসপি প্লাস সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বিজিএমইএ।

ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে কোম্পানি আইন ও শুল্ক আইন আধুনিকায়নেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সম্পন্ন করা এবং এলডিসি উত্তরণের পর অন্তত পাঁচ বছর বিশেষ নীতিগত সহায়তা ও শুল্ক সুবিধার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে বিজিএমইএ।

রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রেও নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে পোশাক খাত। বিজিএমইএ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার বাইরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের মোট প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুড়ির মধ্যে অপ্রচলিত বাজারগুলো থেকেই এখন প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার আসে।

নতুন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড আকৃষ্ট করতে হংকংয়ে এইচএসবিসির আয়োজিত একটি রোডশোতে অংশ নেবে বিজিএমইএ। পাশাপাশি জাপানের ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে জাপানি ভাষায় দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি আলাদা ‘জাপান ডেস্ক’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে জাপানে বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। আগামী কয়েক বছরে এই রপ্তানি ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে বিজিএমইএ।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে বিশ্ববাজারে শুধু কম খরচের উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং আধুনিক ও উদ্ভাবননির্ভর শিল্প হিসেবে তুলে ধরতেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের সঙ্গে একটি কৌশলগত চুক্তি করেছে বিজিএমইএ। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের নতুন ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামাল দেওয়া গেলেও আগামী কয়েক মাসে এর প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হতে পারে—বিজিএমইএর বক্তব্যে সেই সতর্কতাই উঠে এসেছে। তাই শিল্পের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং এলডিসি-পরবর্তী বাজার সুবিধা নিশ্চিত করাকে বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।