ভিয়েতনাম থেকে ইরাক, তারপর আফগানিস্তান—তিনটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র নিজের শর্তে প্রত্যাহারের পথ তৈরি করেছিল। ১৯৭৩ সালের প্যারিস চুক্তি ভিয়েতনাম থেকে মার্কিন প্রস্থানের পথ তৈরি করে। ২০০৮ সালের চুক্তিতে ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময়সূচি নির্ধারিত হয়। আর ২০২০ সালের দোহা চুক্তি আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার কাঠামো তৈরি করে।
কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রত্যাহারের পরের বাস্তবতা ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি। সাইগনের পতন ঘটে চুক্তির দুই বছরের মধ্যে। ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই দেশটি নতুন বিদ্রোহ ও নিরাপত্তা সংকটে জড়িয়ে পড়ে। আর ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন প্রত্যাহারের শেষ পর্যায়েই তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এই অভিজ্ঞতাগুলো একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা সামনে আনে। যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়বে, তা অনেক সময় নির্ধারণ করতে পারে; কিন্তু চলে যাওয়ার পর ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাবে, তা এককভাবে নির্ধারণ করা অনেক কঠিন।
ইরান সেই ব্যবধানকেই নিজের কৌশলের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে ভৌগোলিক শক্তি
ইরানের সিদ্ধান্তকে শুধু সামরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে সংঘাতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুক্তির বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে ক্রমাগত চাপে রেখেছে। সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য না দিয়েই তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানো ছিল এই কৌশলের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ইরানের সামনে তখন মূলত দুটি পথ ছিল। একদিকে নিষেধাজ্ঞার চাপ সহ্য করে অপেক্ষা করা, অন্যদিকে এমন একটি সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করা যেখানে অর্থনৈতিক আকারের চেয়ে ভৌগোলিক অবস্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তেহরান দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি সেই হিসাবের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের তেল সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারও সরাসরি চাপে পড়ে।
ইরানের মাইন স্থাপন, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন এবং প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা তাই নিছক সামরিক পদক্ষেপ নয়। এগুলো এমন এক কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জবাবে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টি করা যায়।
নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য যেখানে ইরানের অর্থনীতিকে সংকুচিত করা, সেখানে তেহরানের পাল্টা হিসাব হচ্ছে—তার ওপর চাপের মূল্য যেন অন্যদেরও দিতে হয়।
দেশের ভেতরের রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ
এই সংঘাতের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি।
দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে কোনো সরকার যদি কেবল নিষেধাজ্ঞার চাপ সহ্য করতে থাকে, তাহলে জনগণের কাছে তার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিপরীতে সরকার যদি দেখাতে পারে যে সে শুধু চাপ গ্রহণ করছে না, পাল্টা চাপ তৈরির ক্ষমতাও রাখে, তাহলে সংঘাতের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বদলে যায়।
ইরানের নেতৃত্ব তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে নিছক টিকে থাকার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং শক্তি ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছে। এই বার্তার শ্রোতা ওয়াশিংটন যতটা, ইরানের জনগণও ততটাই।
আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তারও এই কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত। সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে হুথিদের অভিযান তেহরানের দৃষ্টিতে দেখিয়েছে যে সংঘাতকে ইরানের সীমান্তের মধ্যে আটকে রাখা সহজ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো, সমুদ্রপথ ও সামরিক ঘাঁটি—সবকিছুই বৃহত্তর চাপের সমীকরণের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
কার হাতে কত সময়
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সময়।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা মূলত সময়নির্ভর অস্ত্র। এর কার্যকারিতা নির্ভর করে প্রতিপক্ষ কতদিন চাপ সহ্য করতে পারে তার ওপর। কিন্তু একইভাবে দীর্ঘ সামরিক সংঘাতও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক ব্যয় তৈরি করতে পারে।
ওয়াশিংটন যদি দ্রুত ও নির্ধারক ফল অর্জন করতে না পারে, তাহলে সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার মূল্য তত বাড়তে পারে। নির্বাচনী সময়সূচি, জনমত এবং যুদ্ধের আর্থিক ব্যয় তখন কৌশলগত হিসাবের অংশ হয়ে ওঠে।
তেহরানের হিসাবও সম্ভবত এখানেই। ইরানের অর্থনীতি নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঘড়িও থেমে নেই। ফলে প্রশ্নটি কেবল কে বেশি শক্তিশালী তা নয়; বরং কে বেশি সময় ধরে চাপ বহন করতে পারবে।
কাতার, ওমান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় জুনে হওয়া সমঝোতা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙে পড়া এই অবিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে। পারস্পরিক অভিযোগের মধ্যে সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর তেহরানের কাছে এমন ধারণা শক্তিশালী হতে পারে যে বাস্তবায়নের কার্যকর নিশ্চয়তা ছাড়া নতুন কোনো সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
যুদ্ধের শুরু নিয়ন্ত্রণ করা আর শেষ নিয়ন্ত্রণ করা এক নয়
বর্তমান সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা তাকে বিপুল আঘাত হানার শক্তি দেয়। কিন্তু সেই শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করা যায় না। একটি দেশের সামরিক অবকাঠামো দুর্বল করা এবং যুদ্ধের পর সেই দেশের আচরণ কিংবা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
ইরান প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়। কিন্তু তেহরান এমন একটি ক্ষেত্রকে সংঘাতের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে যেখানে তার সবচেয়ে বড় সম্পদ সেনাবাহিনীর আকার নয়, ভূগোল।
হরমুজ প্রণালি সেই ভৌগোলিক শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
এই কারণেই সংঘাতের শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কোন পক্ষ বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে কিংবা কার বিমানবাহিনী বেশি শক্তিশালী, তা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কে কখন সংঘাত থেকে বের হবে, কোন শর্তে বের হবে এবং তার পর কী ধরনের আঞ্চলিক বাস্তবতা তৈরি হবে।
ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজের শর্তে বেরিয়ে আসা আর যুদ্ধ-পরবর্তী ফল নিজের শর্তে নির্ধারণ করা একই বিষয় নয়।
ইরান সেই ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতাকেই বর্তমান সংঘাতে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে। সামরিক শক্তিতে অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে তাই তেহরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়তো তার ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা নয়; বরং এমন একটি ভৌগোলিক অবস্থান, যা সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ কখন, কীভাবে এবং কোন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে শেষ হবে—সেই সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অনেক বেশি দুর্লভ।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত সেই পুরোনো সত্যটিকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
আবদেলরহিম শালাবি 


















