০৯:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হালদওয়ানির ঘটনাই দেখাল, জাতিভিত্তিক অপমান ঠেকানোর আইনে কোথায় কাঠামোগত দুর্বলতা পাকিস্তান-সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্পর্ক: ভূরাজনীতির টানাপোড়েন পেরিয়ে নতুন সহযোগিতার সম্ভাবনা বন্যার পানি কমলেও দৌলতপুরে বাড়ছে দুর্ভোগ, বিশুদ্ধ পানির সংকটে ৫০ হাজার মানুষ মেক্সিকোয় স্প্যানিশ ছাত্রী খুন, নারীবিদ্বেষের অভিযোগে তদন্ত গ্যাস সংকটে এখনো বন্ধ হয়নি কোনো পোশাক কারখানা, তবে বড় চাপের শঙ্কা হামে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, দেশে প্রাণহানি ১,০৪৬ ইরানের কারাগারে নির্যাতনের ভয়াবহ স্মৃতি, সব জেনেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা নোবেলজয়ী নার্গিস মোহাম্মাদির ডেঙ্গুতে আরও ৫ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১,৪৮৪ রোগী ডায়ানার মৃত্যুর পর চার্লস বলেছিলেন, ‘শিগগিরই আমরা তাকে ভুলে যাব’—ভাইয়ের বইয়ে বিস্ফোরক দাবি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: যুদ্ধ জেতা আর যুদ্ধ শেষ করার ক্ষমতা এক নয়

ইরানের কারাগারে নির্যাতনের ভয়াবহ স্মৃতি, সব জেনেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা নোবেলজয়ী নার্গিস মোহাম্মাদির

ইরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারে বন্দি থাকার সময়ও থামেনি লেখালেখি। কারাগারের কঠোর নজরদারি, নির্যাতন আর ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যেও নিজের অভিজ্ঞতা লিখে রাখতেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মাদি। কখনো বন্ধু ও সহবন্দিদের মাধ্যমে সেই লেখা কারাগারের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। কখনো নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে সেই লেখা ধরা পড়েছে। আবার কখনো নির্যাতনের পর অন্য কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়ার সময় হারিয়ে গেছে তার লেখা খাতা।

তবু লেখা থামাননি ৫৪ বছর বয়সী এই ইরানি মানবাধিকারকর্মী। বরং কারাগারে পাওয়া সেই বিচ্ছিন্ন স্মৃতি, নির্যাতনের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের কথাগুলো একত্র করে তিনি লিখেছেন নিজের স্মৃতিকথা—‘A Woman Never Stops Fighting’। চলতি মাসে ইউরোপের কয়েকটি দেশে বইটি প্রকাশিত হচ্ছে।

কারাগারে নিজের ওপর চালানো নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কেও বইটিতে নতুন কিছু তথ্য তুলে ধরেছেন মোহাম্মাদি। তার মতে, নির্যাতনের পদ্ধতিগুলো গোপন না রেখে প্রকাশ্যে বলা জরুরি। কারণ এসব ঘটনা নথিবদ্ধ করা এবং বিশ্বের সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি সিএনএনের সঙ্গে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মাদি বলেন, কারাগারে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো প্রকাশ করার অর্থ ঝুঁকি নেওয়া। তারপরও তিনি কথা বলতে চান। কারণ তার কাছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা একটি দায়িত্ব।

তিন পৃষ্ঠা কাগজও ছিল বড় ঝুঁকি

Narges Mohammadi's Nobel Renews Hope for Iranian Women and Human Rights  Supporters

এভিন কারাগারে বন্দি থাকার সময় মোহাম্মাদি নিয়মিত লিখতেন। কিন্তু সেই লেখা বাইরে নিয়ে যাওয়া ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক।

তিনি জানান, একবার তার এক বন্ধু সাক্ষাতের দিনে মাত্র তিন পৃষ্ঠা লেখা কারাগারের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কারাগারের নিরাপত্তাকর্মীরা সেই কাগজগুলো জব্দ করে ফেলেন।

আরেকবার ২০টিরও বেশি খাতা হারিয়ে যায়। মোহাম্মাদির ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে মারধরের পর অন্য একটি কারাগারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় তার অনেক লেখা আর খাতা হারিয়ে যায়।

তবে এসব ঘটনা তাকে থামাতে পারেনি। বরং তিনি মনে করেছেন, নিজের সঙ্গে যা ঘটেছে তা লিখে রাখা এবং প্রকাশ করা আরও বেশি জরুরি।

গ্রেপ্তার, মারধর ও নিঃসঙ্গ কারাবাস

মানবাধিকার ও নারীর অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা মোহাম্মাদি গত দুই দশকের বড় একটি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। এর ফলে নিজের সন্তানদের কাছ থেকেও দীর্ঘদিন দূরে থাকতে হয়েছে তাকে।

তার ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন মামলায় তাকে মোট ৪৪ বছরের বেশি কারাদণ্ড এবং ১৫৪ বার বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কারাগারে থাকার সময়ও তাকে ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

নরওয়ের নোবেল কমিটি ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছিল, মোহাম্মাদির ওপর নির্যাতনের বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তারের সময় তাকে কাঠের লাঠি ও ব্যাটন দিয়ে বারবার মারধর করা হয়। চুল ধরে তাকে মাটির ওপর টেনে নেওয়া হয়। এতে মাথায় গুরুতর ক্ষত হয়।

Nobel Peace Prize winner announced and bedbug infestation fears: Morning  Rundown

এ ছাড়া তার কোমর ও যৌনাঙ্গের আশপাশে বারবার লাথি মারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তিনি প্রচণ্ড ব্যথায় ভুগেছেন এবং স্বাভাবিকভাবে বসা বা দৈনন্দিন কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।

মোহাম্মাদি জানান, এই অবস্থাতেই তাকে দুই মাস একাকী কারাবন্দি রাখা হয়েছিল।

সে সময় পরিবারের সদস্য, আইনজীবী বা বাইরের কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগও দেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।

কারাগারে অসুস্থতা, ওজন কমে ২০ কেজি

কারাগারে দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও চিকিৎসার অভাবে মোহাম্মাদির শারীরিক অবস্থারও মারাত্মক অবনতি ঘটে।

মার্চে তার সম্ভাব্য হৃদ্‌রোগজনিত গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। মাত্র কয়েক মাসে তার ওজন কমে যায় প্রায় ২০ কেজি। এপ্রিলে তার ফাউন্ডেশন সতর্ক করে বলেছিল, তার শারীরিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তার জীবন তাৎক্ষণিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে চিকিৎসা দিতে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও ওঠে। পরে ১৮ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় তাকে।

তার ফাউন্ডেশনের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ও মানসিক চাপের কারণে তার হৃদ্‌যন্ত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

তখন ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম তার শারীরিক অবস্থার অবনতির খবরগুলো নাকচ করেছিল।

পরবর্তীতে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে সাময়িকভাবে বাড়ি ফেরার অনুমতি পান মোহাম্মাদি। বর্তমানে তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

Nargis Mohammadi

‘নিঃসঙ্গ কারাবাস মানুষকে ভেঙে ফেলার অস্ত্র’

মোহাম্মাদির মতে, ইরানের কারাগারে একাকী বন্দিত্ব শুধু একজন বন্দিকে অন্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থা নয়; বরং এটি একজন মানুষকে মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে ফেলার একটি পদ্ধতি।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় একা রেখে একজন মানুষের পরিচয়, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক অনুভূতিকে দুর্বল করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে তার মানসিক শক্তি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

চিকিৎসা দিতে দেরি করাকেও তিনি কারাগারে ব্যবহৃত আরেকটি ভয়ংকর পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তার ভাষায়, সময়মতো চিকিৎসা না দেওয়ার কারণে বন্দিদের স্বাস্থ্য গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমনকি কারও মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। তিনি এ ধরনের মৃত্যুকে ‘নীরব মৃত্যুদণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইরান সরকার ও দেশটির সরকারি বা আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম অবশ্য মোহাম্মাদির নির্যাতনের অভিযোগগুলোকে খাটো করে দেখেছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ তার অভিযোগকে ঘিরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর নতুন আন্দোলন

মোহাম্মাদির সংগ্রামের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক নারী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

২০২২ সালে ২২ বছর বয়সী মাহসা জিনা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার পর আমিনির মৃত্যু দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বড় সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্ম দেয়।

‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন নামে পরিচিত সেই প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও এতে অংশ নেন। আন্দোলন দমনে কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপের অভিযোগ ওঠে।

এরপর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানে আরও বড় আকারের বিক্ষোভ হয়েছে। মোহাম্মাদি বলেন, এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছে যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করলেও তাদের একটি শক্তি রয়েছে।

তার মতে, প্রতিবাদকারীরা জানতেন যে তাদের মারধর করা হতে পারে, হত্যা করা হতে পারে, কারাগারে পাঠানো হতে পারে, এমনকি মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। তারপরও তারা রাস্তায় নেমেছেন।

তিনি মনে করেন, এই সাহসই সরকারকে অনেক ক্ষেত্রে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।

Nobel laureate's smuggled memoir details beatings and neglect in Iranian  prisons | Iran | The Guardian

‘আমি আবারও একই পথ বেছে নিতাম’

মোহাম্মাদি জানেন, নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার কারণে তার বিরুদ্ধে আবারও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। নতুন বই প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কথা বলাও তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

তবু তিনি ভয় পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন।

তার বক্তব্য, তিনি যদি নিজের সংগ্রামের শুরুর দিনটিতে ফিরে যেতে পারতেন, এমনকি আগে থেকেই জানতেন যে তাকে গ্রেপ্তার হতে হবে, নির্যাতনের শিকার হতে হবে এবং বছরের পর বছর কারাগারে থাকতে হবে—তবুও তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন।

তবে একজন মা হিসেবে তার মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অন্য জায়গায়।

তার যমজ সন্তান আলী ও কিয়ানা এখন ১৯ বছরের। তারা বহু বছর ধরে ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবনে রয়েছে। মায়ের দীর্ঘ কারাবাসের কারণে তাদের স্বাভাবিক শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি অংশ মায়ের সান্নিধ্য ছাড়া কেটেছে।

এই জায়গাটিই মোহাম্মাদির মনে সবচেয়ে গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি করে।

তিনি বলেন, নিজের সন্তানদের দিকে তাকালে তার মনে প্রশ্ন জাগে—তিনি কি সত্যিই তাদের কাছ থেকে একটি সাধারণ জীবন এবং তাদের মায়ের উপস্থিতি কেড়ে নেওয়ার অধিকার রাখতেন?

এই প্রশ্নের উত্তর তিনি নিশ্চিতভাবে দিতে পারেন না।

মা ও আন্দোলনকর্মী—দুই পরিচয়ের টানাপোড়েন

মোহাম্মাদির নতুন বই শুধু একজন রাজনৈতিক ও মানবাধিকারকর্মীর কারাজীবনের বিবরণ নয়। এটি একজন মায়ের ব্যক্তিগত কষ্টের কথাও।

তিনি বলেছেন, তার সন্তানরাই তাকে বারবার বেঁচে থাকার শক্তি দিয়েছে। কারাগারের অন্ধকার সময়েও আলী ও কিয়ানার কথা তাকে আশা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।

Joint Letter: Free Unjustly Imprisoned Nobel Laureate Narges Mohammadi -  Center for Human Rights in Iran

এ কারণেই বইটিকে তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা মানুষের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি একজন মায়ের লেখা হিসেবেও দেখেন।

তার দুই সন্তান যখন ফ্রান্সে নির্বাসনে, তখন কারাগারের ভেতরে বসে তিনি লিখেছেন এই স্মৃতিকথা।

এখন তার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি হলো সন্তানদের আবার কাছে পাওয়া।

মোহাম্মাদি বলেন, তিনি তাদের দেখতে চান, জড়িয়ে ধরতে চান, দেখতে চান তারা কতটা বড় হয়েছে। এমনকি মজা করে তিনি ভাবেন—এখন তিনি কি সন্তানদের কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবেন, নাকি সন্তানরাই তার চেয়ে লম্বা হয়ে গেছে।

কিন্তু সেই ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি তার সংগ্রামও থেমে নেই।

তার জীবন যেন একই সঙ্গে দুইটি গল্প বহন করছে—একদিকে কারাগার, নির্যাতন ও বিচ্ছিন্নতার ভয়াবহ স্মৃতি; অন্যদিকে স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অদম্য প্রত্যয়।

মোহাম্মাদির কাছে কারাগারের অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত যন্ত্রণা নয়। তিনি মনে করেন, সেই অভিজ্ঞতার কথা বলা জরুরি, কারণ নীরবতা অন্যায়কে আড়াল করে। তাই শাস্তি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা থাকলেও তিনি কথা বলে যেতে চান।

তার নতুন স্মৃতিকথা সেই নীরবতা ভাঙারই আরেকটি প্রচেষ্টা।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

হালদওয়ানির ঘটনাই দেখাল, জাতিভিত্তিক অপমান ঠেকানোর আইনে কোথায় কাঠামোগত দুর্বলতা

ইরানের কারাগারে নির্যাতনের ভয়াবহ স্মৃতি, সব জেনেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা নোবেলজয়ী নার্গিস মোহাম্মাদির

০৮:০১:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারে বন্দি থাকার সময়ও থামেনি লেখালেখি। কারাগারের কঠোর নজরদারি, নির্যাতন আর ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যেও নিজের অভিজ্ঞতা লিখে রাখতেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মাদি। কখনো বন্ধু ও সহবন্দিদের মাধ্যমে সেই লেখা কারাগারের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। কখনো নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে সেই লেখা ধরা পড়েছে। আবার কখনো নির্যাতনের পর অন্য কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়ার সময় হারিয়ে গেছে তার লেখা খাতা।

তবু লেখা থামাননি ৫৪ বছর বয়সী এই ইরানি মানবাধিকারকর্মী। বরং কারাগারে পাওয়া সেই বিচ্ছিন্ন স্মৃতি, নির্যাতনের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের কথাগুলো একত্র করে তিনি লিখেছেন নিজের স্মৃতিকথা—‘A Woman Never Stops Fighting’। চলতি মাসে ইউরোপের কয়েকটি দেশে বইটি প্রকাশিত হচ্ছে।

কারাগারে নিজের ওপর চালানো নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কেও বইটিতে নতুন কিছু তথ্য তুলে ধরেছেন মোহাম্মাদি। তার মতে, নির্যাতনের পদ্ধতিগুলো গোপন না রেখে প্রকাশ্যে বলা জরুরি। কারণ এসব ঘটনা নথিবদ্ধ করা এবং বিশ্বের সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি সিএনএনের সঙ্গে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মাদি বলেন, কারাগারে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো প্রকাশ করার অর্থ ঝুঁকি নেওয়া। তারপরও তিনি কথা বলতে চান। কারণ তার কাছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা একটি দায়িত্ব।

তিন পৃষ্ঠা কাগজও ছিল বড় ঝুঁকি

Narges Mohammadi's Nobel Renews Hope for Iranian Women and Human Rights  Supporters

এভিন কারাগারে বন্দি থাকার সময় মোহাম্মাদি নিয়মিত লিখতেন। কিন্তু সেই লেখা বাইরে নিয়ে যাওয়া ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক।

তিনি জানান, একবার তার এক বন্ধু সাক্ষাতের দিনে মাত্র তিন পৃষ্ঠা লেখা কারাগারের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কারাগারের নিরাপত্তাকর্মীরা সেই কাগজগুলো জব্দ করে ফেলেন।

আরেকবার ২০টিরও বেশি খাতা হারিয়ে যায়। মোহাম্মাদির ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে মারধরের পর অন্য একটি কারাগারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় তার অনেক লেখা আর খাতা হারিয়ে যায়।

তবে এসব ঘটনা তাকে থামাতে পারেনি। বরং তিনি মনে করেছেন, নিজের সঙ্গে যা ঘটেছে তা লিখে রাখা এবং প্রকাশ করা আরও বেশি জরুরি।

গ্রেপ্তার, মারধর ও নিঃসঙ্গ কারাবাস

মানবাধিকার ও নারীর অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা মোহাম্মাদি গত দুই দশকের বড় একটি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। এর ফলে নিজের সন্তানদের কাছ থেকেও দীর্ঘদিন দূরে থাকতে হয়েছে তাকে।

তার ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন মামলায় তাকে মোট ৪৪ বছরের বেশি কারাদণ্ড এবং ১৫৪ বার বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কারাগারে থাকার সময়ও তাকে ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

নরওয়ের নোবেল কমিটি ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছিল, মোহাম্মাদির ওপর নির্যাতনের বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তারের সময় তাকে কাঠের লাঠি ও ব্যাটন দিয়ে বারবার মারধর করা হয়। চুল ধরে তাকে মাটির ওপর টেনে নেওয়া হয়। এতে মাথায় গুরুতর ক্ষত হয়।

Nobel Peace Prize winner announced and bedbug infestation fears: Morning  Rundown

এ ছাড়া তার কোমর ও যৌনাঙ্গের আশপাশে বারবার লাথি মারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তিনি প্রচণ্ড ব্যথায় ভুগেছেন এবং স্বাভাবিকভাবে বসা বা দৈনন্দিন কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।

মোহাম্মাদি জানান, এই অবস্থাতেই তাকে দুই মাস একাকী কারাবন্দি রাখা হয়েছিল।

সে সময় পরিবারের সদস্য, আইনজীবী বা বাইরের কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগও দেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।

কারাগারে অসুস্থতা, ওজন কমে ২০ কেজি

কারাগারে দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও চিকিৎসার অভাবে মোহাম্মাদির শারীরিক অবস্থারও মারাত্মক অবনতি ঘটে।

মার্চে তার সম্ভাব্য হৃদ্‌রোগজনিত গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। মাত্র কয়েক মাসে তার ওজন কমে যায় প্রায় ২০ কেজি। এপ্রিলে তার ফাউন্ডেশন সতর্ক করে বলেছিল, তার শারীরিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তার জীবন তাৎক্ষণিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে চিকিৎসা দিতে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও ওঠে। পরে ১৮ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় তাকে।

তার ফাউন্ডেশনের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ও মানসিক চাপের কারণে তার হৃদ্‌যন্ত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

তখন ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম তার শারীরিক অবস্থার অবনতির খবরগুলো নাকচ করেছিল।

পরবর্তীতে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে সাময়িকভাবে বাড়ি ফেরার অনুমতি পান মোহাম্মাদি। বর্তমানে তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

Nargis Mohammadi

‘নিঃসঙ্গ কারাবাস মানুষকে ভেঙে ফেলার অস্ত্র’

মোহাম্মাদির মতে, ইরানের কারাগারে একাকী বন্দিত্ব শুধু একজন বন্দিকে অন্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থা নয়; বরং এটি একজন মানুষকে মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে ফেলার একটি পদ্ধতি।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় একা রেখে একজন মানুষের পরিচয়, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক অনুভূতিকে দুর্বল করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে তার মানসিক শক্তি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

চিকিৎসা দিতে দেরি করাকেও তিনি কারাগারে ব্যবহৃত আরেকটি ভয়ংকর পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তার ভাষায়, সময়মতো চিকিৎসা না দেওয়ার কারণে বন্দিদের স্বাস্থ্য গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমনকি কারও মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। তিনি এ ধরনের মৃত্যুকে ‘নীরব মৃত্যুদণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইরান সরকার ও দেশটির সরকারি বা আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম অবশ্য মোহাম্মাদির নির্যাতনের অভিযোগগুলোকে খাটো করে দেখেছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ তার অভিযোগকে ঘিরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর নতুন আন্দোলন

মোহাম্মাদির সংগ্রামের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক নারী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

২০২২ সালে ২২ বছর বয়সী মাহসা জিনা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার পর আমিনির মৃত্যু দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বড় সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্ম দেয়।

‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন নামে পরিচিত সেই প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও এতে অংশ নেন। আন্দোলন দমনে কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপের অভিযোগ ওঠে।

এরপর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানে আরও বড় আকারের বিক্ষোভ হয়েছে। মোহাম্মাদি বলেন, এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছে যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করলেও তাদের একটি শক্তি রয়েছে।

তার মতে, প্রতিবাদকারীরা জানতেন যে তাদের মারধর করা হতে পারে, হত্যা করা হতে পারে, কারাগারে পাঠানো হতে পারে, এমনকি মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। তারপরও তারা রাস্তায় নেমেছেন।

তিনি মনে করেন, এই সাহসই সরকারকে অনেক ক্ষেত্রে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।

Nobel laureate's smuggled memoir details beatings and neglect in Iranian  prisons | Iran | The Guardian

‘আমি আবারও একই পথ বেছে নিতাম’

মোহাম্মাদি জানেন, নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার কারণে তার বিরুদ্ধে আবারও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। নতুন বই প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কথা বলাও তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

তবু তিনি ভয় পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন।

তার বক্তব্য, তিনি যদি নিজের সংগ্রামের শুরুর দিনটিতে ফিরে যেতে পারতেন, এমনকি আগে থেকেই জানতেন যে তাকে গ্রেপ্তার হতে হবে, নির্যাতনের শিকার হতে হবে এবং বছরের পর বছর কারাগারে থাকতে হবে—তবুও তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন।

তবে একজন মা হিসেবে তার মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অন্য জায়গায়।

তার যমজ সন্তান আলী ও কিয়ানা এখন ১৯ বছরের। তারা বহু বছর ধরে ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবনে রয়েছে। মায়ের দীর্ঘ কারাবাসের কারণে তাদের স্বাভাবিক শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি অংশ মায়ের সান্নিধ্য ছাড়া কেটেছে।

এই জায়গাটিই মোহাম্মাদির মনে সবচেয়ে গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি করে।

তিনি বলেন, নিজের সন্তানদের দিকে তাকালে তার মনে প্রশ্ন জাগে—তিনি কি সত্যিই তাদের কাছ থেকে একটি সাধারণ জীবন এবং তাদের মায়ের উপস্থিতি কেড়ে নেওয়ার অধিকার রাখতেন?

এই প্রশ্নের উত্তর তিনি নিশ্চিতভাবে দিতে পারেন না।

মা ও আন্দোলনকর্মী—দুই পরিচয়ের টানাপোড়েন

মোহাম্মাদির নতুন বই শুধু একজন রাজনৈতিক ও মানবাধিকারকর্মীর কারাজীবনের বিবরণ নয়। এটি একজন মায়ের ব্যক্তিগত কষ্টের কথাও।

তিনি বলেছেন, তার সন্তানরাই তাকে বারবার বেঁচে থাকার শক্তি দিয়েছে। কারাগারের অন্ধকার সময়েও আলী ও কিয়ানার কথা তাকে আশা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।

Joint Letter: Free Unjustly Imprisoned Nobel Laureate Narges Mohammadi -  Center for Human Rights in Iran

এ কারণেই বইটিকে তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা মানুষের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি একজন মায়ের লেখা হিসেবেও দেখেন।

তার দুই সন্তান যখন ফ্রান্সে নির্বাসনে, তখন কারাগারের ভেতরে বসে তিনি লিখেছেন এই স্মৃতিকথা।

এখন তার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি হলো সন্তানদের আবার কাছে পাওয়া।

মোহাম্মাদি বলেন, তিনি তাদের দেখতে চান, জড়িয়ে ধরতে চান, দেখতে চান তারা কতটা বড় হয়েছে। এমনকি মজা করে তিনি ভাবেন—এখন তিনি কি সন্তানদের কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবেন, নাকি সন্তানরাই তার চেয়ে লম্বা হয়ে গেছে।

কিন্তু সেই ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি তার সংগ্রামও থেমে নেই।

তার জীবন যেন একই সঙ্গে দুইটি গল্প বহন করছে—একদিকে কারাগার, নির্যাতন ও বিচ্ছিন্নতার ভয়াবহ স্মৃতি; অন্যদিকে স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অদম্য প্রত্যয়।

মোহাম্মাদির কাছে কারাগারের অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত যন্ত্রণা নয়। তিনি মনে করেন, সেই অভিজ্ঞতার কথা বলা জরুরি, কারণ নীরবতা অন্যায়কে আড়াল করে। তাই শাস্তি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা থাকলেও তিনি কথা বলে যেতে চান।

তার নতুন স্মৃতিকথা সেই নীরবতা ভাঙারই আরেকটি প্রচেষ্টা।