প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর কয়েক দিন পর তৎকালীন প্রিন্স অব ওয়েলস চার্লস তার ভাই চার্লস স্পেন্সারকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আমরা শিগগিরই তাকে ভুলে যাব’—এমন বিস্ফোরক দাবি করেছেন ডায়ানার ছোট ভাই।
প্রায় তিন দশক আগের সেই কথোপকথনের বর্ণনা উঠে এসেছে চার্লস স্পেন্সারের আসন্ন স্মৃতিকথা Swan Song-এ। বইটি আগামী সপ্তাহে প্রকাশিত হওয়ার কথা। তবে এর কিছু অংশ ইতিমধ্যে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলে প্রকাশিত হয়েছে। এরপরই ডায়ানার মৃত্যু এবং রাজপরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে স্পেন্সারের এই দাবিকে বাকিংহাম প্যালেস মেনে নেয়নি। বরং এক বিরল ও বেশ কঠোর প্রতিক্রিয়ায় প্রাসাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাছের স্বজন হারানোর গভীর শোক মানুষের বিচারবোধ ও স্মৃতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
ডায়ানার মৃত্যুর পর সেই উত্তপ্ত ফোনালাপ
১৯৯৭ সালের আগস্টে প্যারিসে একটি ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান প্রিন্সেস ডায়ানা। দুর্ঘটনায় গাড়িটি উচ্চগতিতে চলছিল এবং এতে ডায়ানা গুরুতর অভ্যন্তরীণ আঘাত পান। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
ডায়ানার মৃত্যু শুধু ব্রিটেন নয়, সারা বিশ্বের মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তার শেষকৃত্য হয়ে ওঠে বিশাল এক জনসমাগম ও শোকের ঘটনা। লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন তাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনে সেই শেষযাত্রা দেখেছিলেন।
ডায়ানার দুই ছেলে, উইলিয়াম ও হ্যারি, তখন খুবই অল্পবয়সী। উইলিয়ামের বয়স ছিল ১৫ বছর, আর হ্যারির ১২। শেষকৃত্যের শোভাযাত্রায় তাদের মায়ের কফিনের পেছনে হাঁটতে হয়েছিল।
চার্লস স্পেন্সারের দাবি, ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। তার মনে হয়েছিল, ডায়ানা হয়তো চাইতেন না তার দুই কিশোর সন্তানকে এত বিশাল জনসমাগমের সামনে মায়ের শেষযাত্রায় হাঁটতে।
এই বিষয়টি নিয়েই তৎকালীন প্রিন্স অব ওয়েলস চার্লসের সঙ্গে তার ফোনে তীব্র কথাকাটাকাটি হয় বলে দাবি করেছেন স্পেন্সার।
‘রাগের পর রাগ প্রকাশ করছিলেন চার্লস’
নিজের স্মৃতিকথায় স্পেন্সার লিখেছেন, ফোনে চার্লস দীর্ঘ সময় ধরে তার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। তিনি নীরবে সেই কথা শুনছিলেন এবং মাঝখানে বাধা দেননি।
একপর্যায়ে চার্লস কিছুক্ষণের জন্য থেমে যান। স্পেন্সার ভেবেছিলেন, হয়তো তিনি নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তার বর্ণনা অনুযায়ী, এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
স্পেন্সারের দাবি, চার্লস তখন ডায়ানাকে নিয়ে নিজের জমে থাকা ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি আরও লিখেছেন, চার্লসের কথায় ডায়ানার মৃত্যুর পর মানুষের প্রবল আবেগ ও ভালোবাসা নিয়ে এক ধরনের বিরক্তি প্রকাশ পেয়েছিল।
এরপর চার্লস এমন একটি কথা বলেন, যা স্পেন্সারের ভাষ্য অনুযায়ী তাকে গভীরভাবে হতবাক করে দেয়।
স্পেন্সারের দাবি, ফোনে চার্লস বলেছিলেন, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা শিগগিরই তাকে ভুলে যাব।’
এই কথা শুনে স্পেন্সার নাকি অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি এইমাত্র যা বললেন, তা আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না।’
এরপর তিনি ফোন রেখে দেন।

বাকিংহাম প্যালেসের পাল্টা বক্তব্য
স্পেন্সারের এই দাবি প্রকাশের পর বাকিংহাম প্যালেসের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। রাজপরিবারকে নিয়ে প্রকাশিত বই সম্পর্কে প্রাসাদ সাধারণত সরাসরি মন্তব্য করে না। কিন্তু এবার তারা ব্যতিক্রমীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
প্রাসাদের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা নীতিগতভাবে বই নিয়ে মন্তব্য করে না। তবে রাজা চার্লসের পক্ষ থেকে তিনি বলেন, কাছের স্বজনের মৃত্যুতে যে গভীর শোক তৈরি হয়, তা অনেক সময় মানুষের যুক্তিবোধ, বিচার করার ক্ষমতা এবং বহু বছর আগের ঘটনাকে মনে রাখার ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।
অর্থাৎ, বাকিংহাম প্যালেসের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—স্পেন্সার যে কথোপকথনের কথা বলেছেন, সেটি তার বহু বছর পরের স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে লেখা। সেই সময় তিনি তার বোনের আকস্মিক মৃত্যুতে প্রচণ্ড শোকের মধ্যে ছিলেন। ফলে সেই সময়ের ঘটনা তিনি আজ যেভাবে মনে করছেন, তা পুরোপুরি নির্ভুল নাও হতে পারে—এমন ইঙ্গিতই দিয়েছে প্রাসাদ।
তবে প্রাসাদের বিবৃতিতে ফোনালাপে ওই কথাগুলো বলা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সরাসরি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ডায়ানার মৃত্যু ঘিরে পুরোনো ক্ষত আবার সামনে
প্রিন্সেস ডায়ানার জীবন ও মৃত্যু ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। রাজপরিবারের সদস্য হয়েও তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতেন। দাতব্য কাজ, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রচলিত রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতার বাইরে তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব তাকে বিশ্বের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
১৯৯৭ সালে তার মৃত্যুর পর সেই জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ব্রিটেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানুষ শোক প্রকাশ করেন। লন্ডনের রাস্তায় ফুলের স্তূপ জমে যায়। ডায়ানার শেষকৃত্যের দিনও বিপুলসংখ্যক মানুষ তাকে শেষ বিদায় জানাতে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন।
তার দুই ছেলে উইলিয়াম ও হ্যারি তখনও শিশু-কিশোর। মায়ের মৃত্যুর পর তাদের প্রকাশ্যে শোক পালন এবং শেষযাত্রায় অংশ নেওয়া নিয়েও সেই সময় ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।
স্পেন্সারের নতুন বই সেই পুরোনো ঘটনাগুলোকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

বইটি প্রকাশের আগেই শুরু বিতর্ক
- S wan Song* এখনো প্রকাশিত হয়নি। আগামী সপ্তাহে বইটি প্রকাশ পাওয়ার কথা। তবে ডেইলি মেইল বইটির কিছু অংশ প্রকাশের অধিকার পেয়েছে এবং সেখান থেকেই ফোনালাপের এই দাবি প্রকাশ্যে আসে।
প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসের একজন মুখপাত্র সিএনএনকে জানিয়েছেন, ডেইলি মেইলে যে অংশগুলো উদ্ধৃত করা হয়েছে, সেগুলো বইটির প্রকৃত বক্তব্যের সঙ্গে সঠিক।
স্পেন্সারের বইয়ে রাজপরিবার নিয়ে আরও সমালোচনা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে বইটি প্রকাশের পর ডায়ানার সঙ্গে রাজপরিবারের সম্পর্ক, তার মৃত্যুর পর পরিবারের ভেতরের পরিস্থিতি এবং তার উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—চার্লসের কথিত মন্তব্যের কোনো স্বাধীন প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। ঘটনাটি স্পেন্সারের নিজের স্মৃতিকথায় দেওয়া বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে সামনে এসেছে। তাই বইটির পুরো বক্তব্য, প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট অন্য তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পরই এই দাবিকে আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
ডায়ানার মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর পরও তাকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ এতটুকু কমেনি। তার জীবন, রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক, বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আকস্মিক মৃত্যু—সবই এখনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর মধ্যে রয়েছে।
স্পেন্সারের নতুন স্মৃতিকথায় উঠে আসা এই ফোনালাপ সেই পুরোনো অধ্যায়ে নতুন একটি প্রশ্ন যোগ করেছে—ডায়ানার মৃত্যুর পর রাজপরিবারের ভেতরে আসলে কী ঘটেছিল?
এর উত্তর নিয়ে বিতর্ক হয়তো বইটি প্রকাশের পর আরও বাড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















