যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের মধ্যে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে একটি সাম্প্রতিক জরিপের ফল প্রকাশের পর। ক্যাটো ইনস্টিটিউটের জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ৩৮ শতাংশ কমিউনিজম সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। একই বয়সী ৫৩ শতাংশ সমাজতন্ত্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন, যেখানে পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে এই হার ৪৫ শতাংশ।
বয়সভেদে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট। ক্যাটোর জরিপে দেখা গেছে, ৩০ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের মধ্যে কমিউনিজমের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ২৯ শতাংশ, ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৯ শতাংশ এবং ৫৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৩ শতাংশ। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এই হার মাত্র ৫ শতাংশ। একই জরিপে দেখা যায়, সামগ্রিকভাবে আমেরিকানদের মধ্যে পুঁজিবাদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ৫২ শতাংশ এবং সমাজতন্ত্রের প্রতি ৩৭ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। ‘ফরচুন’-এ প্রকাশিত একটি মতামতধর্মী লেখায় লেখক লুবা কাসোভা নিজের কমিউনিস্ট শাসিত বুলগেরিয়ায় বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তার কাছে কমিউনিজম মানে ছিল অর্থনৈতিক সংকট, পণ্যের ঘাটতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতার অভিজ্ঞতা। ফলে তরুণ আমেরিকানদের একটি অংশের কমিউনিজমের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তাকে বিস্মিত করেছিল।
তবে কাসোভার সঙ্গে কথা বলা তরুণদের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। ১৮ বছর বয়সী ফেনলি স্কারলক এবং ১৭ বছর বয়সী হার্পার ব্রুনারের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ সোভিয়েত যুগ বা পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট শাসনের সরাসরি অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হয়নি। ফলে ‘কমিউনিজম’ বা ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দগুলো তাদের কাছে অনেক সময় ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক সমতা, সম্পদ বণ্টন ও সামাজিক নিরাপত্তার ধারণা হিসেবে হাজির হয়।
হার্পার ব্রুনারের মতে, তরুণরা রাজনীতিবিদ ও সংবাদমাধ্যমে কমিউনিজম, সমাজতন্ত্র, কর্তৃত্ববাদ ও অন্যান্য রাজনৈতিক শব্দের ব্যবহার শুনছে। কিন্তু এসব ধারণার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তাদের অনেকের কাছেই অস্পষ্ট। ফলে তারা বিষয়গুলো বোঝার জন্য গুগল সার্চ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিচ্ছে।
এখানে রাজনৈতিক ভাষার প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন ওই তরুণরা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিতর্কে স্বাস্থ্যসেবা বা সবার জন্য কিছু সরকারি সুবিধার মতো নীতিকেও কখনো কখনো ‘সমাজতন্ত্র’ বা ‘কমিউনিজম’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। ফলে তরুণদের কেউ কেউ শব্দ দুটিকে কেবল নেতিবাচক অর্থে না দেখে সংশ্লিষ্ট নীতির সুবিধা-অসুবিধার দিকে বেশি নজর দিচ্ছেন।
তবে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম একই ধারণা নয়—এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তাধারায় ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটির অর্থ ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়। আবার ঐতিহাসিক কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক কাঠামো, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার বাস্তব অভিজ্ঞতাও একেক দেশে একেক রকম ছিল। ফলে একটি শব্দের প্রতি ইতিবাচক বা নেতিবাচক মনোভাব থেকে কোনো ব্যক্তি ঠিক কোন ধরনের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চান, তা সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না।
তরুণদের সমাজতন্ত্রের প্রতি আগ্রহের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন ব্যয়, শিক্ষা ও ছাত্রঋণ, জীবনযাত্রার খরচ এবং আয়-বৈষম্য নিয়ে তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। জাতীয় আবাসন বাজারের তথ্যও দেখাচ্ছে, তরুণদের জন্য বাড়ির মালিকানা অর্জন কঠিন হয়ে উঠেছে।
ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব রিয়েলটরসের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো বাড়ি কেনা মানুষের মধ্যম বয়স বেড়ে ৪০ বছরে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে প্রথমবারের ক্রেতাদের সাধারণ বয়স ছিল ২০-এর শেষভাগে। একই সময়ে মোট বাড়ি ক্রেতাদের মধ্যে প্রথমবারের ক্রেতাদের অংশ ২১ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ১৯৮১ সালে তথ্য সংগ্রহ শুরুর পর সর্বনিম্ন। (
আবাসন সংকটের পাশাপাশি উচ্চ ভাড়া, শিক্ষাঋণ ও বাড়ির মূল্য তরুণদের সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করছে। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব রিয়েলটরস বলছে, প্রথমবারের বাড়ি ক্রেতাদের ক্ষেত্রে উচ্চ ভাড়া ও ছাত্রঋণ সঞ্চয়ের পথে বড়এই পরিস্থিতিতে তরুণদের একটি অংশ বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প নিয়ে ভাবছে। ব্রুনারের বক্তব্য অনুযায়ী, যখন একজন তরুণ দেখতে পান যে সমাজের কারও কাছে উন্নত শিক্ষা, বাড়ি ও প্রযুক্তির সুযোগ রয়েছে, অথচ অন্য কারও কাছে প্রয়োজনীয় মৌলিক সামগ্রীও নেই, তখন সম্পদ পুনর্বণ্টন বা অর্থনৈতিক সমতার ধারণা তার কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে।

স্কারলকের যুক্তি আরও বিস্তৃত। তার মতে, তরুণদের একটি অংশ বড় করপোরেশনের রাজনৈতিক প্রভাব, ধনীদের নির্বাচনী অর্থায়ন, একচেটিয়া ব্যবসা এবং কম মজুরির শ্রমবাজারকে বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমস্যা হিসেবে দেখছে। তার ভাষায়, তারা এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামো দেখতে পাচ্ছে যেখানে বড় প্রতিষ্ঠান ও অতি ধনী ব্যক্তিদের প্রভাব অনেক বেশি।
তবে এগুলো তরুণ প্রজন্মের সবার মতামত নয়। ক্যাটো ইনস্টিটিউটের একই জরিপে দেখা যায়, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যেও পুঁজিবাদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম নিয়ে ইতিবাচক ধারণা থাকা এবং বর্তমান ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা সমর্থন করা—দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয়।
এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ—জরিপে কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক শব্দের প্রতি মানুষের মনোভাব মাপা হয়েছে, কিন্তু সেই শব্দের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের অর্থ প্রত্যেক উত্তরদাতার কাছে একই নয়। একজন ‘সমাজতন্ত্র’ বলতে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বা সামাজিক নিরাপত্তা বোঝাতে পারেন, অন্যজন রাষ্ট্রীয় মালিকানা বা সম্পদ পুনর্বণ্টনের বৃহত্তর ধারণা বোঝাতে পারেন। তাই শুধু একটি শব্দের প্রতি সমর্থনের হার দিয়ে তরুণদের পূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন নির্ধারণ করা কঠিন।
তবু জরিপের প্রবণতা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। পুরোনো প্রজন্মের কাছে কমিউনিজমের সঙ্গে যে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তরুণ প্রজন্মের বড় অংশের কাছে তা সরাসরি নেই। ফলে তারা সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম ও পুঁজিবাদকে অনেক ক্ষেত্রে ইতিহাসের স্মৃতি দিয়ে নয়, নিজেদের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা দিয়ে বিচার করছে।
এ কারণেই আবাসন ব্যয়, শিক্ষা ব্যয়, ছাত্রঋণ, আয়-বৈষম্য, কর্মসংস্থান এবং বড় করপোরেশনের প্রভাবের মতো বিষয় তরুণদের রাজনৈতিক চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাদের কাছে প্রশ্নটি শুধু ‘কোন মতবাদ ভালো’—এমন নয়; বরং বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ, স্বাধীন ও সম্ভাবনাময় মনে করছে, সেটিও বড় বিষয়।
ফরচুনের ওই মতামতধর্মী লেখার শেষাংশে লেখক মনে করেন, তরুণদের উদ্বেগকে রাজনৈতিক নেতাদের গুরুত্ব দিয়ে শোনা উচিত। তবে সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম নিয়ে ইতিবাচক মনোভাবের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে—ঐতিহাসিক জ্ঞানের পার্থক্য, রাজনৈতিক ভাষার ব্যবহার, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈষম্য সম্পর্কে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করলেই বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের জেন জেডের একটি অংশের সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের প্রতি আগ্রহকে কেবল কোনো পুরোনো মতাদর্শের পুনরুত্থান হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। একই সঙ্গে এটিকে শুধু অর্থনৈতিক হতাশার ফল বলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। জরিপ ও তরুণদের বক্তব্য বরং দেখাচ্ছে, তারা নিজেদের সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে প্রচলিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধারণাগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















