মা হওয়া যেন শুধু সন্তানকে ভালোবাসা, যত্ন আর নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয় নয়—সমাজের চোখে এটি প্রতিনিয়ত পরীক্ষায় বসার মতোও হয়ে উঠেছে। সন্তান কী খাচ্ছে, কতক্ষণ মোবাইল বা টেলিভিশন দেখছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, মা কী পোশাক পরছেন, চাকরি করছেন কি না—প্রায় সবকিছু নিয়েই মায়েদের বিচার করা হয়। কোনো একটি বিষয়ে প্রচলিত ধারণা থেকে সামান্য সরে গেলেই জুটতে পারে ‘খারাপ মা’ হওয়ার তকমা।
এই সংস্কৃতি নিয়েই নতুন বই লিখেছেন নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের ‘দ্য কাট’-এর জ্যেষ্ঠ লেখক ইজ ডিকসন। তাঁর বই ‘ওয়ান ব্যাড মাদার: ইন প্রেইজ অব সাইকো হাউসওয়াইভস, স্টেজ পেরেন্টস, মমফ্লুয়েন্সার্স, অ্যান্ড আদার উইমেন উই লাভ টু হেট’-এ জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে মায়েদের কীভাবে বিচার করা হয়, সেই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ডিকসন বলেন, আমাদের সংস্কৃতিতে ‘খারাপ মা’ হওয়ার সংজ্ঞা এতটাই বিস্তৃত যে প্রায় যেকোনো নারীই কোনো না কোনোভাবে এই তকমার মুখোমুখি হতে পারেন। তাঁর মতে, একজন মা সন্তানকে বেশি স্বাধীনতা দিলে তিনি খারাপ, আবার বেশি নিয়ন্ত্রণ করলেও খারাপ। কেউ খুব আকর্ষণীয় পোশাক পরলে প্রশ্ন ওঠে, আবার খুব রক্ষণশীল পোশাক পরলেও সমালোচনা হতে পারে। নিজের চেহারা নিয়ে বেশি সচেতন হলেও সমস্যা, আবার নিজের চেহারার দিকে নজর না দিলেও প্রশ্ন।
অর্থাৎ প্রচলিত আমেরিকান মাতৃত্বের ছাঁচ থেকে সামান্য বিচ্যুত হলেই একজন নারীকে ‘খারাপ মা’ হিসেবে দেখা হতে পারে।
ইন্টারনেট যেন বিচার করার নতুন মঞ্চ
ডিকসনের মতে, বর্তমান সময়ে এই বিচার আরও তীব্র হয়েছে ইন্টারনেটের কারণে। তিনি দার্শনিক জেরেমি বেনথামের ‘প্যানঅপটিকন’ ধারণার সঙ্গে বিষয়টির তুলনা করেছেন। এই ধারণায় এমন একটি কারাগারের কথা বলা হয়, যেখানে কেন্দ্রীয় একটি জায়গা থেকে পাহারাদার বন্দিদের দেখতে পারেন। বন্দিরাও জানেন না ঠিক কখন তাদের দেখা হচ্ছে।
ডিকসনের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মানুষ যেন সবসময় একই সঙ্গে অন্যকে দেখছে এবং নিজেও অন্যের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। ফলে মানুষ নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি অন্যের আচরণও বিচার করতে শুরু করে।
মায়েদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও বেশি। কারণ সন্তান পালনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা আগে থেকেই সামাজিক চাপের মধ্যে থাকেন। ইন্টারনেট সেই চাপকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ইন্টারনেটে মায়েদের সামান্য ভুল নিয়েও তীব্র সমালোচনা দেখা যায়। কোনো ‘মমফ্লুয়েন্সার’-এর ঘর একটু অগোছালো হলে কেউ কেউ শিশুসুরক্ষা সংস্থায় অভিযোগ করার হুমকি দেন। সন্তানকে সকালের নাশতায় গুঁড়ো চিনি দেওয়া ডোনাট খাওয়ালেও শুরু হয়ে যায় সমালোচনা। এমনকি যারা সামাজিকভাবে প্রচলিত ‘আদর্শ মা’-এর ধারণা মেনে চলার চেষ্টা করেন, তারাও ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আক্রমণের শিকার হন।
বাবাদের ক্ষেত্রে কেন একই মানদণ্ড নেই?
ডিকসনের মতে, মায়েদের তুলনায় বাবাদের প্রতি সামাজিক প্রত্যাশা ঐতিহাসিকভাবেই অনেক কম ছিল। সন্তান লালন-পালনের প্রায় সব দায়িত্বের জন্য দীর্ঘদিন মায়েদের জবাবদিহির আওতায় রাখা হলেও বাবাদের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়নি।
সময়ের সঙ্গে অনেক বাবা সন্তান পালন ও ঘরের কাজে আরও সক্রিয় হয়েছেন। তবে ডিকসনের বক্তব্য, বাবাদের সামাজিক মূল্যায়নের মানদণ্ড সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সমানভাবে বদলায়নি।
ফলে একজন বাবা সন্তানের সঙ্গে সময় কাটালেই অনেক সময় প্রশংসা পান, যেখানে একজন মা একই কাজ করলেও তাঁর সিদ্ধান্তের আরও অনেক দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
‘ইনটেনসিভ প্যারেন্টিং’ কী?
ডিকসন আধুনিক সন্তান পালনের আরেকটি প্রবণতা হিসেবে ‘ইনটেনসিভ প্যারেন্টিং’-এর কথা বলেছেন। সহজভাবে বলতে গেলে, সন্তান জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে পড়াই এর বৈশিষ্ট্য।
সন্তান কী খাবে, কতক্ষণ পর্দার সামনে থাকবে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, অবসর সময়ে কী করবে—সবকিছু নিয়েই কঠোরভাবে পরিকল্পনা ও নজরদারি করা হতে পারে।
ডিকসনের মতে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ফলে শিশুর নিজের মতো করে শেখার সুযোগ কমে যেতে পারে। বড় হওয়ার অংশ হিসেবেই শিশুর ভুল করা, সেই ভুল থেকে শেখা এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। সবকিছু আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করে দিলে সেই অভিজ্ঞতার জায়গা সংকুচিত হতে পারে।
তিনি আরও মনে করেন, মায়েদের ওপর অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি হলে তার প্রভাব তাদের মানসিক সুস্থতার ওপরও পড়তে পারে। সন্তানের জীবনের প্রতিটি বিষয় নিখুঁতভাবে পরিচালনা করার চেষ্টা এমন এক মানদণ্ড তৈরি করে, যা বাস্তবে পূরণ করা কঠিন।
ডিকসন তাঁর নিজের বসবাসের এলাকা ব্রুকলিনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে তিনি মায়েদের মধ্যে সন্তান পালনের বিষয়ে প্রচণ্ড চাপ দেখতে পান। তাঁর মতে, এই অতিরিক্ত চাপ কখনো কখনো সন্তান পালনের আনন্দকেও কমিয়ে দিতে পারে।
চাকরি করলে ‘খারাপ মা’—এই অপরাধবোধ কোথা থেকে?
নিজের অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন ডিকসন। তিনি বলেন, একজন মা হিসেবে তাঁকেও প্রায়ই ভাবতে হয়—সবকিছু একসঙ্গে সামলানো সম্ভব কি না, চাকরি ছেড়ে দেওয়া উচিত কি না, কিংবা কর্মজীবনে থাকার কারণে তাঁর সন্তানরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না।
তবে বইটি লেখার সময় মাতৃত্বের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, নারীরা মানব ইতিহাসের বড় একটি সময়জুড়েই ঘরের বাইরে কাজ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। যুদ্ধের সময় পুরুষেরা বাইরে থাকায় নারীরা কর্মক্ষেত্রে আরও বেশি যুক্ত হয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তাদের আবার ঘরে ফিরে সন্তান পালনের দিকে মনোযোগ দেওয়ার জন্য সামাজিক চাপ তৈরি হয়।
ডিকসনের মতে, এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানা তাঁকে নিজের অপরাধবোধকে অন্যভাবে দেখতে সাহায্য করেছে। ফলে কোনো মঙ্গলবার দুপুরে সন্তানের স্কুল ছুটির সময় একটি বৈঠকে থাকতে না পারলেও তিনি নিজেকে সবসময় ব্যর্থ মা মনে করেন না।
সন্তান কোথায় পড়ছে, কী চাকরি করছে—এটাই কি সাফল্যের মাপকাঠি?
ডিকসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সন্তান বড় হয়ে কোথায় পড়ল বা কী চাকরি পেল—এসব দিয়ে কি একজন মা-বাবার সাফল্য মাপা উচিত?
তাঁর মতে, এমন মাপকাঠি খুবই সরলীকৃত। সন্তানকে ভালোবাসা, তাকে সমর্থন করা এবং তার বিকাশের সুযোগ তৈরি করাই সন্তান পালনের মূল বিষয়। সন্তান ভবিষ্যতে কোন পেশা বেছে নেবে বা কোন ধরনের জীবন কাটাবে, সেটিকে বাবা-মায়ের সাফল্যের একমাত্র প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বিশেষ করে শিশুর ছোট বয়সে তার স্বাস্থ্য ও সুখকে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলেছেন তিনি।
মায়েদের অনিরাপত্তাকে ঘিরে বড় বাজার
ডিকসন মনে করেন, মায়েদের উদ্বেগ ও অনিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে একটি বড় বাণিজ্যিক বাজার তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন পণ্য ও সেবা বিক্রির সময় মায়েদের ভয়, অপরাধবোধ কিংবা সন্তান পালনের সমস্যা নিয়ে তাদের দুর্বল জায়গাগুলোকে লক্ষ্য করা হয়।
তিনি মায়েদের প্রতি এমন বিজ্ঞাপন দেখলে একটু থেমে ভাবার পরামর্শ দেন—কী বিক্রি করার চেষ্টা করা হচ্ছে, কোন ধরনের দুর্বলতাকে লক্ষ্য করে পণ্যটি সামনে আনা হচ্ছে এবং সত্যিই সেটি সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারবে কি না।
অর্থাৎ সন্তান পালনের প্রতিটি সমস্যার জন্য নতুন কোনো পণ্য বা সেবা কেনার প্রয়োজন নেই। বিজ্ঞাপনের ভাষা ও নিজের উদ্বেগ—দুটিকেই একটু দূর থেকে দেখার প্রয়োজন আছে।
সন্তানকে কিছুক্ষণ টেলিভিশনের সামনে রাখলেই কি ক্ষতি?
ডিকসনের বক্তব্যের আরেকটি দিক হলো, সন্তানকে কয়েক মিনিট টেলিভিশনের সামনে বসিয়ে রাখা কিংবা মা নিজে কিছুক্ষণ ফোন স্ক্রল করা মানেই খারাপ অভিভাবকত্ব নয়।
তিনি মনে করেন, বর্তমান সন্তান পালনের সংস্কৃতিতে মায়েদের উদ্বেগকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক মা মনে করেন, সন্তানকে আরও বেশি সময় দিতে হবে, আরও বেশি সক্রিয় থাকতে হবে এবং প্রতিটি মুহূর্তে সন্তানের জন্য কিছু করতে হবে।
কিন্তু ডিকসনের মতে, প্রায় প্রতিটি মায়েরই হয়তো আরও বেশি সক্রিয় হওয়ার বদলে মাঝে মাঝে একটু বিরতি প্রয়োজন।
এই বক্তব্যের মূল প্রশ্নটি তাই সন্তান পালনের নিখুঁত কোনো সূত্র খোঁজা নয়। বরং মায়েদের ওপর তৈরি হওয়া সেই সামাজিক চাপকে প্রশ্ন করা—যেখানে সন্তানকে ভালোভাবে বড় করার দায়িত্ব ধীরে ধীরে এমন এক অসম্ভব মানদণ্ডে পরিণত হচ্ছে, যা পূরণ করতে গিয়ে মায়ের নিজের স্বস্তি, আনন্দ ও স্বাধীনতার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।
মাতৃত্ব নিঃসন্দেহে দায়িত্বের বিষয়। কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সামাজিক পরীক্ষায় পরিণত করলে সেই দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত ভালোবাসা ও আনন্দও চাপের নিচে পড়ে যেতে পারে। ডিকসনের বই সেই জায়গাতেই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—একজন ‘ভালো মা’ হওয়ার অর্থ আসলে কী, এবং কে সেই মানদণ্ড ঠিক করে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















