উজবেকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে প্রাচীন শহর ওদিরমনের ধ্বংসাবশেষে একটি সম্ভাব্য জোরোয়াস্ট্রিয়ান অগ্নিবেদি ও একটি অস্থিকোষের সন্ধান পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। আবিষ্কারটি মধ্য এশিয়ার প্রাচীন ধর্মীয় আচার ও সংস্কৃতির ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের এই খননকাজ পরিচালিত হচ্ছে সামরকন্দ প্রত্নতাত্ত্বিক ইনস্টিটিউট এবং উজবেকিস্তানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে। গবেষক দলের নেতৃত্বে রয়েছেন সানজার আবদুরাখিমভ। তবে এখনো অগ্নিবেদি ও অস্থিকোষ—দুটিরই সুনির্দিষ্ট সময়কাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
প্রাচীন শহর ওদিরমন
দক্ষিণ উজবেকিস্তানে অবস্থিত প্রাচীন ওদিরমন ছিল প্রতিরক্ষা প্রাচীর, সড়ক এবং একটি আয়তাকার দুর্গ বা নগরকেন্দ্রসমৃদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ বসতি। প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক পর্যন্ত শহরটিতে মানুষের বসবাস ছিল।
এই দীর্ঘ সময় ধরে শহরটির ব্যবহার হওয়ায় এখানে পাওয়া স্থাপনা ও নিদর্শনগুলো প্রাচীন মধ্য এশিয়ার জীবনযাপন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে।
আগুনের চিহ্ন ঘিরে রহস্য
যে কক্ষে অগ্নিবেদিটি পাওয়া গেছে, সেখানে ইটের তৈরি মেঝে ছিল। একই স্থানে আগুন ব্যবহারেরও বেশ কিছু চিহ্ন শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। কক্ষটির দেয়ালে মাটির প্রলেপ ছিল এবং সেটি একাধিকবার নতুন করে দেওয়া হয়েছিল।
দেয়ালের বারবার সংস্কারের এই চিহ্ন থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ধারণা করছেন, কক্ষটি অল্প সময়ের জন্য নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে সেখানে আগুন ব্যবহারের উদ্দেশ্য এখনো নিশ্চিত নয়। গবেষকদের মতে, অগ্নিবেদির চারপাশে পাওয়া আগুনের প্রমাণ জোরোয়াস্ট্রিয়ান ধর্মের সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু এটিকে এখনই নিশ্চিতভাবে জোরোয়াস্ট্রিয়ান ধর্মীয় বেদি হিসেবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।
অস্থিকোষে হরিণ ও জুনিপার গাছের ছবি
অগ্নিবেদির কাছাকাছি আবিষ্কৃত হয়েছে একটি অস্থিকোষ। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, মৃত মানুষের হাড় সংরক্ষণের জন্য এ ধরনের পাত্র বা কাঠামো ব্যবহারের প্রথা প্রাচীন মধ্য এশিয়ার কিছু সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
অস্থিকোষটি পরিষ্কার ও সংরক্ষণের কাজ করতে গিয়ে এর গায়ে হরিণ এবং একটি জুনিপার গাছের ছবি শনাক্ত করেছেন সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরা। অস্থিকোষের পৃষ্ঠে আরও কিছু চিত্র বা নকশা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুনরুদ্ধার ও পরিষ্কারের কাজ এগিয়ে গেলে সেগুলোও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
এই চিত্রগুলোর অর্থও এখনো নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। ফলে অস্থিকোষটি কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং এর সঙ্গে অগ্নিবেদির কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না—সেটিও এখনো গবেষণার বিষয়।
একই সময়ের কি না, সেটিও অজানা
অগ্নিবেদি ও অস্থিকোষ একই স্থানে পাওয়া গেলেও দুটির ব্যবহার একই সময়ে হয়েছিল কি না, তা এখনো জানা যায়নি। প্রত্নতাত্ত্বিকদের সামনে এটিই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কারণ, দুটি নিদর্শন একই সময়ের হলে প্রাচীন ওদিরমনে ধর্মীয় আচার এবং মৃতদেহ-সংক্রান্ত প্রথার মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা বোঝার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আবার ভিন্ন সময়ের হলে একই স্থানের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অন্য একটি চিত্র সামনে আসতে পারে।
জোরোয়াস্ট্রিয়ান ধর্মের সম্ভাব্য যোগসূত্র
জোরোয়াস্ট্রিয়ান ধর্ম প্রাচীন ইরান ও মধ্য এশিয়ার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য। এই ধর্মীয় ধারায় আগুন বিশেষ মর্যাদা বহন করে। তাই কোনো প্রত্নস্থানে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আগুন ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে সেটি জোরোয়াস্ট্রিয়ান ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, তা নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়।
ওদিরমনে পাওয়া অগ্নিবেদির ক্ষেত্রেও গবেষকেরা এমন সম্ভাবনার কথা বলছেন। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের আরও বিশ্লেষণ, নিদর্শনের সময়কাল নির্ধারণ এবং স্থাপনাটির ব্যবহার সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য পাওয়ার পরই এ বিষয়ে শক্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
নতুন আবিষ্কারটি তাই শুধু একটি অগ্নিবেদি বা অস্থিকোষ উদ্ধারের ঘটনা নয়; এটি মধ্য এশিয়ায় কয়েক হাজার বছর আগে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ কীভাবে গড়ে উঠেছিল, সেই বৃহত্তর ইতিহাস অনুসন্ধানেরও একটি নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















