দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য। এসব ভুয়া দাবি জনমনে আতঙ্ক, সামাজিক বিভাজন এবং সহিংসতা উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এপ্রিল ২০২৬ থেকে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসীবিরোধী কয়েক ডজন বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে। কিছু ঘটনায় সহিংসতাও ঘটেছে। অনিবন্ধিত অভিবাসীদের দেশ ছাড়ার জন্য ৩০ জুনকে সময়সীমা হিসেবে ঘোষণা করেছিল কিছু অভিবাসীবিরোধী গোষ্ঠী। এর আগে হামলার আশঙ্কায় হাজারো মানুষ বিভিন্ন শহরে দূতাবাসের কাছে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে জড়ো হন এবং অনেকে নিজ দেশে ফেরতও যান।
এই পরিস্থিতিতে পুরোনো ভিডিও, সম্পাদিত দৃশ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পরিবর্তিত বক্তব্য ব্যবহার করে বর্তমান বিক্ষোভের নামে নানা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
রামাফোসার বক্তব্য নিয়ে বিভ্রান্তি
একটি ভিডিওতে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাকে বলতে দেখা যায়, ইউরোপীয় দেশগুলো নাকি দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের ইউরোপ ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেছে। দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
ভিডিওটি আসলে ২০২১ সালের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে রামাফোসার দেওয়া বক্তব্য থেকে নেওয়া। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ধরন শনাক্ত হওয়ার পর ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা ও আশপাশের দেশগুলোর ওপর সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
ভিডিওটি এমনভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে, যাতে মনে হয় সাম্প্রতিক অভিবাসীবিরোধী সহিংসতার কারণে ইউরোপ দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ২০২৬ সালের জুন বা জুলাইয়ে এমন কোনো ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ব্যবসায়ীর বক্তব্য
আরেকটি ভিডিওতে এক শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যবসায়ীকে বলতে দেখা যায়, তিনি অলস ও মদ্যপ দক্ষিণ আফ্রিকানদের সঙ্গে কাজ করতে চান না এবং নিজের প্রতিষ্ঠান জিম্বাবুয়েতে সরিয়ে নেবেন।
তদন্তে দেখা যায়, ভিডিওটির শব্দ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পরিবর্তন করা হয়েছে। মূল ভিডিওতে ওই ব্যক্তির দক্ষিণ আফ্রিকান উচ্চারণ ছিল। তিনি বরং একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির সঙ্গে তর্ক করছিলেন, যিনি বিদেশিদের নিয়োগ দেওয়ার কারণে তার ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন।
মূল ভিডিওতে প্রতিষ্ঠান জিম্বাবুয়েতে সরিয়ে নেওয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকানদের সঙ্গে কাজ না করার এমন কোনো বক্তব্য নেই।
স্পারে ১৫ হাজার চাকরির দাবি মিথ্যা
অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভের পর সুপারমার্কেট প্রতিষ্ঠান স্পার নাকি ১৫ হাজার নতুন চাকরি ঘোষণা করেছে—এমন দাবিও ছড়িয়েছে।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এ দাবি অস্বীকার করেছে। চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রতিষ্ঠানটির নির্ধারিত নিয়োগব্যবস্থার মাধ্যমেই প্রকাশ করা হয় এবং বিক্ষোভের কারণে বিদেশি কর্মীরা চলে যাওয়ায় ১৫ হাজার পদ খালি হয়েছে—এমন কোনো তথ্য নেই।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বেকারত্বের সমস্যা গুরুতর হলেও বিদেশি কর্মীরাই এর প্রধান কারণ—এমন দাবির পক্ষে গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ নেই।
পুরোনো সহিংসতার ভিডিও নতুন বলে প্রচার
একটি ভিডিওতে শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের কয়েকজনকে মারধরের দৃশ্য দেখিয়ে দাবি করা হচ্ছে, অভিবাসীরা তাদের ওপর হামলা করেছে। ভিডিওটি অন্তত ২০২১ সাল থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত।
ভিডিওটির প্রকৃত ঘটনার বিস্তারিত নিশ্চিত করা না গেলেও এটি ২০২৬ সালের ঘটনা হতে পারে না। কারণ একই দৃশ্য কয়েক বছর আগেই অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছিল।
আরেকটি ভিডিওতে একটি বিপণিবিতানে লুটপাটের দৃশ্যকে ২০২৬ সালের অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সেটিও মিথ্যা। ভিডিওটি ২০২১ সালে ডারবানের ওয়াটারক্রেস্ট বিপণিবিতানে সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক লুটপাটের সময় ধারণ করা হয়েছিল।
সেনাবাহিনীর পুরোনো কুচকাওয়াজও নতুন ঘটনা হিসেবে ছড়িয়েছে
দক্ষিণ আফ্রিকার সেনাবাহিনীর যানবাহনের একটি বহরের ভিডিওতে লেখা হয়েছে, এগুলো কেপটাউনে ৩০ জুনের বিক্ষোভের জন্য প্রস্তুত সেনাদের বহর।
তদন্তে দেখা গেছে, ভিডিওটি ২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সশস্ত্র বাহিনী দিবসের কুচকাওয়াজের অংশ। অনুষ্ঠানটি হয়েছিল লিম্পোপো প্রদেশের থোহোয়ানদু শহরে, কেপটাউনে নয়।
পুলিশের নামে ভুয়া সতর্কবার্তা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের নামে একটি সতর্কবার্তাও ছড়ানো হয়েছে। সেখানে বাড়ির মালিকদের অনিবন্ধিত বিদেশিদের ভাড়া না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
কিন্তু বার্তাটি ভুয়া। এতে পুলিশের সরকারি ওয়েব ঠিকানার বদলে এমন একটি ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে, যা দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি ওয়েব ঠিকানার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পুলিশও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, প্রচারিত নোটিশটি তাদের নয়।
পুলিশ ও অভিবাসীদের সংঘর্ষের ভিডিওতেও বিভ্রান্তি
আরেকটি ভিডিওতে অভিবাসীদের পুলিশকে আক্রমণ করতে দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, ঘটনাটি ৩০ জুন ঘটেছে।
আসলে ভিডিওটি ১৭ জুন ডারবানের শেরউড এলাকায় ধারণ করা হয়েছিল। ওই এলাকায় মালাউই থেকে ফেরত পাঠানোর অপেক্ষায় থাকা অভিবাসীদের জন্য অস্থায়ী শিবির তৈরি করা হয়েছিল। জায়গা পরিবর্তন ও ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হলে সংঘর্ষ হয়।
অর্থাৎ ভিডিওটি বাস্তব সংঘর্ষের হলেও ৩০ জুনের বিক্ষোভে অভিবাসীদের পুলিশকে আক্রমণের দৃশ্য নয়।
২৫০ র্যান্ড পুরস্কারের নোটিশও ভুয়া
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নামে একটি নোটিশে দাবি করা হয়েছে, কেউ অনিবন্ধিত বিদেশিকে ধরে কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়ে গেলে তাকে ২৫০ র্যান্ড পুরস্কার দেওয়া হবে।
সরকারি নীতির সঙ্গে এই দাবি সাংঘর্ষিক। প্রেসিডেন্ট রামাফোসা জনগণকে নিজের হাতে আইন তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগের দায়িত্ব অনুমোদিত কর্মকর্তাদের ওপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন।
নোটিশটিতে ভাষাগত ভুল, সন্দেহজনক ঠিকানা ও ভুল যোগাযোগের তথ্যও রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি এটিকে ভুয়া বলে জানিয়েছে।
২০১৯ সালের পুলিশের ওপর হামলার ভিডিওও নতুন বলে প্রচার
একটি সাঁজোয়া পুলিশ গাড়িকে জনতার পাথর নিক্ষেপের মুখে পিছু হটতে দেখা যায় এমন ভিডিওকে জোহানেসবার্গে বিদেশিদের আত্মরক্ষামূলক বাহিনী গঠনের ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
ভিডিওটি আসলে ২০১৯ সালের। জোহানেসবার্গের কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক এলাকায় নকল পণ্য বিক্রির বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযানের সময় দোকানমালিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে ঘটনাটি ঘটে। অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
মহিলার বক্তব্যও কৃত্রিমভাবে বদলে দেওয়া
আরেকটি সম্পাদিত ভিডিওতে এক নারীকে বলতে শোনা যায়, তিনি দক্ষিণ আফ্রিকানদের সঙ্গে কাজ করতে পারেন না এবং ৩০০ কর্মীর কারখানা মোজাম্বিকে সরিয়ে নেবেন।
মূল সাক্ষাৎকারে এমন কোনো বক্তব্য নেই। মূল ভিডিওতে ওই নারী ধীরগতিতে কথা বলেছিলেন এবং জিম্বাবুয়ের কিছু মানুষকে তিনি কর্মী হিসেবে নিয়োগ করেছেন বলে উল্লেখ করেছিলেন। পরে তার কণ্ঠ দ্রুত করা হয়, উচ্চারণ পরিবর্তন করা হয় এবং মুখের সঙ্গে কথার অসামঞ্জস্য তৈরি করা হয়। এমনকি সাক্ষাৎকারের মূল গণমাধ্যমের বদলে অন্য প্রতিষ্ঠানের প্রতীকও যুক্ত করা হয়।
মিথ্যা তথ্য কীভাবে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্তমান অভিবাসীবিরোধী উত্তেজনার মধ্যে পুরোনো সহিংসতার দৃশ্যকে নতুন ঘটনা হিসেবে দেখানো, সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া নোটিশ তৈরি করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানুষের বক্তব্য পরিবর্তন করা হচ্ছে।
এসব প্রচারের উদ্দেশ্য শুধু বিভ্রান্তি সৃষ্টি নয়; বরং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ভয়, ক্ষোভ ও সামাজিক বৈরিতা বাড়ানোর মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলার ঝুঁকি রয়েছে।
বাস্তব ঘটনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো দাবির মধ্যে পার্থক্য যাচাই না করে কোনো ভিডিও বা সরকারি নোটিশ বিশ্বাস ও প্রচার করলে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে তা আরও বড় সামাজিক সংঘাতের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















