রাশিয়ায় পড়াশোনা ও কাজের আশায় যাওয়া তিউনিসিয়ার তরুণদের কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন মাদক মামলায়, কেউ দীর্ঘদিন কারাগারে থেকেছেন। পরে তাদের সামনে এসেছে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পথ। পরিবারগুলোর দাবি, কারাগারের চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে এই নিয়োগ কতটা স্বেচ্ছায় হয়েছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
আয়মান ও মনতাসারের একই রকম পরিণতি
তিউনিসিয়ার মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের সেবেইতলায় আয়মান পড়তে গিয়েছিলেন রাশিয়ায়। ব্যবসা প্রশাসন পড়ার পাশাপাশি জীবিকা চালাতে কাজ করতেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে রাশিয়ায় যাওয়ার পর তিনি ভোরোনেজ অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন এবং রুশ ভাষার প্রস্তুতিমূলক শিক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। কাজের সন্ধানে টেলিগ্রামের মাধ্যমে এক রুশ ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের পর একটি প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে তিনি মাদকসংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার হন।
অন্যদিকে, ২০২১ সালের নভেম্বরে কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়তে রাশিয়ায় যান মনতাসার। তারও বর্ণনা অনুযায়ী, টেলিগ্রামে পাওয়া পণ্য সরবরাহের কাজ পরে মাদক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত বলে তিনি জানতে পারেন। কাজটি ছেড়ে দিতে চাওয়ার পর তাকে পুলিশের কাছে ফাঁসানো হয় বলে তার বোনের দাবি। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ সময় তিনি কারাগারে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ছয় বছরের সাজা পান।
কারাগার থেকে সেনাবাহিনীতে
আয়মানের ক্ষেত্রে প্রায় নয় মাস আটক থাকার পর ২০২৫ সালের আগস্টে রুশ আদালতের নথিতে তার সেনাবাহিনীতে যোগদানের চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়। চুক্তির ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে চলা ফৌজদারি কার্যক্রম স্থগিত এবং হেফাজতের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। পরদিনই সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করে তিনি রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেন।
এরপর ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত এগোয়। ১৪ সেপ্টেম্বর তাকে একটি একে-৭৪ রাইফেল দেওয়া হয়। ১৯ সেপ্টেম্বরের আদেশে তাকে লুহানস্ক অঞ্চলে যুদ্ধ মিশনে পাঠানোর কথা বলা হয়। পরদিন পরিবারকে পাঠানো বার্তায় আয়মান জানান, তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ইন্টারনেটবিহীন থাকতে পারেন। ২৩ সেপ্টেম্বর ছিল তার শেষ বার্তা। এরপর পরিবার আর তার কোনো খোঁজ পায়নি।
মনতাসারও ২০২৫ সালের আগস্টে কারাগার থেকে বের হয়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তাকে ব্রিয়ানস্ক অঞ্চলের ক্লিনৎসে একটি সামরিক ইউনিটে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ভয়াবহ ড্রোন হামলার আশঙ্কা, পরিখায় আশ্রয় নেওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রের অনিশ্চয়তার কথা পরিবারকে জানান। ১২ সেপ্টেম্বরের পর তার সঙ্গে আর সরাসরি যোগাযোগ হয়নি। রুশ কর্তৃপক্ষ তাকে নিখোঁজ হিসেবে জানিয়েছে; তার মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পরিবার পায়নি।
আফ্রিকা থেকে রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ
ইনপ্যাক্টের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে রুশ সেনাবাহিনীতে অন্তত ১ হাজার ৪১৭ আফ্রিকান নাগরিকের যুক্ত হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তালিকায় অন্তত সাতজন তিউনিসীয় নাগরিকের নাম রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি ও অভিবাসনের সুযোগের সন্ধানে থাকা তরুণদের লক্ষ্য করে ভুয়া ভ্রমণ সংস্থা, কাল্পনিক চাকরির প্রস্তাব এবং প্রশাসনিক বৈধতার প্রতিশ্রুতিসহ বিভিন্ন নিয়োগপথ ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।

হায়কাল এসিদের ক্ষেত্রেও এমন একটি সূত্র পাওয়া গেছে। একটি নথিতে তাকে রুশ সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে দেখিয়ে ২০২৪ সালের ৩০ জুন যুদ্ধে নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। তবে নথিটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
তিউনিসিয়া থেকে রাশিয়ায় পড়াশোনা ও কাজের সুযোগ করে দেওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এসব সেনা নিয়োগের সরাসরি যোগসূত্রের প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি। তবে তদন্তে উঠে এসেছে, এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে যাওয়া তরুণদের অনেকেই রাশিয়ায় গিয়ে আর্থিকভাবে অনিশ্চিত, ভাষাগতভাবে দুর্বল এবং আইনি সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়েন। এ ধরনের দুর্বল অবস্থাই তাদের ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
রুশ দূতাবাস জানিয়েছে, বিদেশি নাগরিকদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগের চুক্তি সম্পাদনের সঙ্গে দূতাবাস জড়িত নয় এবং বিষয়টি রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তদন্তের সময় কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
আয়মান, মনতাসার ও হায়কাল এসিদের পরিবারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তাদের সন্তানরা কোথায়, তারা বেঁচে আছেন কি না, আর রাশিয়ায় পড়াশোনা ও জীবিকার সন্ধানে যাওয়া তরুণরা কীভাবে একটি বিদেশি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















