০১:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার, আগস্টেই আক্রান্ত ১২০২ হিমালয়ের হিমবাহে দূষণের কালো আস্তরণ, বাড়ছে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রাশিয়ার কারাগার থেকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে তিউনিসীয় তরুণরা, নিয়োগের নেপথ্যে কী? নেপালে ভয়াবহ বন্যায় টেলিযোগাযোগ বিপর্যয়, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের পুরোনো কৌশলই কি ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি? নেপালের বন্যা শুধু দুর্যোগ নয়, জলবায়ু ন্যায়ের কঠিন পরীক্ষা আশির কোঠাতেও মানুষের পাশে, সেবাকেই তারুণ্যের রহস্য বলছেন দুই স্বেচ্ছাসেবী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় কাজ বাড়ছে, কিন্তু বেতন নয়—এশিয়ার তরুণ কর্মীদের নতুন দুশ্চিন্তা গুদামে সার, মাঠে সংকট: বাংলাদেশের বোরো কি বৈশ্বিক সার-যুদ্ধের নতুন ঝুঁকিতে? প্রচলিত পুরুষত্বের ধারণায় বদল, তরুণদের মধ্যে বাড়ছে রক্ষণশীল মানসিকতা

গুদামে সার, মাঠে সংকট: বাংলাদেশের বোরো কি বৈশ্বিক সার-যুদ্ধের নতুন ঝুঁকিতে?

ব্রহ্মপুত্রের দুই পাড়ে একই গল্প। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর কৃষক সময়মতো সার না পেয়ে ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে গেছেন; রৌমারীর কৃষককে সরকারি দামের চেয়ে ৫০০-৬০০ টাকা বেশি দিয়ে এক বস্তা ডিএপি কিনতে হচ্ছে। রাজশাহীতে ডিলাররা বলছেন, বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কম। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় টিএসপি খুঁজে পাওয়া কঠিন। অথচ ঢাকার সরকারি হিসাব বলছে—দেশে প্রায় ১২ লাখ ৮৬ হাজার টন সার মজুত আছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়েও বেশি।

এই আপাত-বিরোধই বাংলাদেশের বর্তমান সার সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সমস্যাটি শুধু গুদামে কত টন সার আছে, সেই প্রশ্নে আটকে নেই। প্রশ্ন হলো—সঠিক সময়ে, সঠিক জেলায়, সঠিক দামে, সঠিক কৃষকের কাছে সেই সার পৌঁছাচ্ছে কি না। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় একটি ঝুঁকি: আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য ও সরবরাহের অস্থিরতা, চট্টগ্রামে গ্যাসের অভাবে সার কারখানা বন্ধ থাকা এবং আসন্ন বোরো মৌসুমের বিশাল চাহিদা।

অর্থাৎ বাংলাদেশের সার সংকট এখন তিন স্তরের—বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট, দেশীয় উৎপাদন সংকট এবং বিতরণ ব্যবস্থার সংকট।

গুদামে মজুত, কৃষকের হাতে নেই—সংকটের আসল চেহারা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সার, ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপিসহ বিভিন্ন ধরনের সারের চাহিদা ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টন। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রধান চার ধরনের সার মিলে মজুত ছিল প্রায় ১২ লাখ ৮৬ হাজার ১০০ টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টন, টিএসপি ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯০০ টন, ডিএপি ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টন এবং এমওপি ১ লাখ ৩৮ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে মজুত ছিল প্রায় ১২ লাখ টন। অর্থাৎ জাতীয় মজুতের হিসাবে এবার ঘাটতি নয়, বরং প্রায় ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি রয়েছে।

কিন্তু মাঠের বাস্তবতা অন্য কথা বলছে।

রাজশাহীতে সেপ্টেম্বর মাসের জন্য টিএসপির বরাদ্দ মাত্র ১ হাজার ৪৫ টন। জেলার ৪ লাখ ১২ হাজারের বেশি কৃষকের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করলে প্রত্যেকের ভাগে আনুমানিক ২ দশমিক ৫ কেজি টিএসপি পড়ে। এমওপি ও ডিএপির ক্ষেত্রেও বরাদ্দ কৃষকের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় কম বলে অভিযোগ উঠেছে।

এখানেই বাংলাদেশের সার ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সামনে আসে: জাতীয় মজুতের হিসাব আর কৃষকের নাগালের হিসাব এক নয়।

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ গোলাম রসুলের ভাষায়, জাতীয় পর্যায়ে মজুত ঠিক থাকলেও ডিলারের গুদামে কত সার ঢুকল এবং সেখান থেকে কতটা কৃষকের কাছে গেল—এই তথ্য স্বচ্ছভাবে দেখা যায় না। ফলে সরবরাহের মাঝখানে তৈরি হচ্ছে একটি ‘অদৃশ্য বাজার’, যেখানে সরকারি দামের সার কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

সরকারি দামের সার কেন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি?

সরকারি হিসাবে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়ার দাম ১ হাজার ১০০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০, ডিএপি ১ হাজার ৫০ এবং এমওপি ১ হাজার টাকা। কিন্তু মাঠের কৃষকের অভিযোগ, টিএসপি কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। ডিএপির ক্ষেত্রে দাম উঠছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত।

অর্থাৎ ডিএপিতে সরকারি দামের চেয়ে কৃষককে অতিরিক্ত ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা দিতে হচ্ছে। টিএসপিতেও বাড়তি ব্যয় ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা।

এটি শুধু একটি পণ্যের দাম বাড়ার ঘটনা নয়। ধান, আলু, পেঁয়াজ, ভুট্টা—সব ফসলের উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর একটি সরাসরি পথ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশে সার নিয়ে 'সংকট' কতটা গভীর? - BBC News বাংলা

সরকার অবশ্য বিষয়টি অস্বীকার করছে না যে স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়ম রয়েছে। আগস্ট মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি, অবৈধ মজুত, লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা এবং ভেজাল সার বিক্রির অভিযোগে জরিমানা ও সার জব্দ করা হয়েছে। যশোরের চৌগাছায় ১৩ হাজার ৫৫০ কেজি এবং ঈশ্বরগঞ্জে প্রায় ৩২ টন সার অবৈধ মজুদের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

ফলে ‘সার নেই’ এবং ‘সার পাওয়া যাচ্ছে না’—এই দুটি বাক্যের মধ্যে পার্থক্যটি এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারও বাংলাদেশের পক্ষে স্বস্তিদায়ক নয়

দেশের ভেতরের সমস্যার সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজার।

বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর পণ্যবাজার বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বৈশ্বিক সার মূল্যসূচক আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মার্চে সার মূল্য ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল, ২০২৬ সালে সার মূল্য ৩০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে এবং ইউরিয়ার দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়তে পারে।

এর পেছনে বড় কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বিঘ্ন। বিশ্বব্যাংক বলছে, হরমুজ দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৫ শতাংশ যায়। সেই রুটে বিঘ্ন শুধু জ্বালানি বাজারকে নয়, সার উৎপাদনের কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয়কেও আঘাত করেছে।

বিশেষ করে ইউরিয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি, কারণ অ্যামোনিয়া উৎপাদনের ব্যয়ের ৮০-৯০ শতাংশ পর্যন্ত প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে গ্যাসের দাম বা সরবরাহে বড় ধাক্কা মানেই ইউরিয়ার উৎপাদন ব্যয়ে চাপ।

তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সংকট সরলরৈখিক নয়। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পণ্যবাজারের তথ্যে জুলাই ২০২৬-এ সার মূল্যসূচক ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ এপ্রিলের চরম অস্থিরতা থেকে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে ভূরাজনৈতিক সংঘাত আবার বাড়লে সরবরাহ ও দাম উভয়ই দ্রুত উল্টো দিকে যেতে পারে।

সুতরাং বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিটি ‘বিশ্ববাজারে সার নেই’—এমন নয়; বরং দাম, সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং আমদানির সময়—তিনটিই অনিশ্চিত।

চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, ভারতের বড় কেনাকাটা—বাংলাদেশের ঝুঁকি কোথায়?

বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য আরেকটি সমস্যা হলো বড় ক্রেতাদের আচরণ।

সরকারি দামে মিলছে না সার, দিশাহারা কৃষক!

চীন ২০২৬ সালে সার রপ্তানিতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক সরবরাহ আরও সংকুচিত করেছে। অন্যদিকে ভারত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর সরবরাহের ঝুঁকি কমাতে রাশিয়া, বেলারুশ, মরক্কো ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে সার সংগ্রহের চেষ্টা করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সমস্যা হলো দরকষাকষির ক্ষমতা সীমিত। ভারত বা চীনের মতো বড় বাজার যখন একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সার কিনতে যায়, তখন ছোট আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য একই দামে ও একই সময়ে পণ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এর একটি উদাহরণ পাওয়া যায় ভারতের ইউরিয়া কেনাকাটায়। এপ্রিলে ভারত ২৫ লাখ টন ইউরিয়া কেনার একটি বড় চুক্তি করে। প্রতি টনের দাম ছিল প্রায় ৯৩৫-৯৫৯ ডলার, যেখানে মাত্র দুই মাস আগে তারা প্রায় ৫০৮-৫১২ ডলারে ইউরিয়া কিনেছিল।

এই ধরনের মূল্য-ঝাঁকুনি বাংলাদেশের মতো ভর্তুকিনির্ভর বাজারে দ্বিমুখী চাপ তৈরি করে—একদিকে সরকারের আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকি বাড়ে, অন্যদিকে কৃষকের জন্য সরকারি মূল্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

দেশের কারখানা বন্ধ: সমস্যাটি আমদানি দিয়ে কতটা সামলানো যাবে?

বাংলাদেশের সার সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো দেশীয় উৎপাদনের অনিশ্চয়তা।

৪ মার্চ গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানা এবং কর্ণফুলী সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানা দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০-১ হাজার ২০০ টন ইউরিয়া এবং কর্ণফুলী সার কারখানা দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭২৫ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রাখত।

এর প্রভাব পড়ে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ডিএপি কারখানাতেও।

চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানা ও কর্ণফুলী সার কারখানা থেকে অ্যামোনিয়া না পাওয়ায় চট্টগ্রামের ডিএপি সার কারখানার উৎপাদন এপ্রিল মাসে বন্ধ হয়ে যায়। কারখানাটির দুটি ইউনিটের সম্মিলিত দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৮০০ টন।

অর্থাৎ একটি কারখানার গ্যাস সংকট আরেকটি কারখানার কাঁচামাল সংকট তৈরি করেছে। তারপর সেই ঘাটতি পূরণ করতে আমদানির ওপর চাপ বেড়েছে।

কর্ণফুলী সার কারখানা অবশ্য মে মাসে গ্যাস ফিরে পাওয়ার পর উৎপাদন শুরু করে এবং দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৮০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন করছিল। অন্যদিকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ ছিল।

আগস্টের শেষদিকে চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানা পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নেওয়ার খবর আসে এবং ৪ সেপ্টেম্বর থেকে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়।

এই সময়রেখাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে সার সংকট দেখা দেওয়ার পর কারখানা বন্ধ, কাঁচামাল সংকট, আমদানি এবং পুনরায় উৎপাদন—প্রতিটি ধাপেই সময় লেগেছে। কৃষির ক্যালেন্ডার কিন্তু এতটা অপেক্ষা করে না।

বাংলাদেশে সার সংকট আছে নাকি নেই? | জাতীয় নিউজ

সরকার কি কিছুই করছে না?

এখানেও বাস্তবতা দ্বিমুখী।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে সার সংকট নেই। ১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জানান, দেশে ১২ লাখ ৮৬ হাজার টন সার মজুত রয়েছে এবং কিছু এলাকায় বিতরণজনিত সমস্যা থাকলেও তা সমাধান করা হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর কৃষিমন্ত্রীও সংসদে বলেন, প্রায় ১৩ লাখ টন সার মজুত আছে এবং জাতীয় পর্যায়ে সংকট নেই।

সরকার আমদানিও বাড়িয়েছে। ২৪ আগস্ট ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়—এর মধ্যে ৮০ হাজার টন ইউরিয়া, ১ লাখ ১৫ হাজার টন এমওপি, ৮০ হাজার টন ডিএপি এবং ৬০ হাজার টন টিএসপি। এসব সার সৌদি আরব, রাশিয়া, মরক্কো, কানাডা ও কর্ণফুলী সার কারখানা থেকে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়।

জুলাইয়ে জরুরি ভিত্তিতে সার উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময় ৪২ দিন থেকে ২১ দিনে নামানোর নীতিগত অনুমোদনও দেওয়া হয়।

তাই সমস্যাটি সরকারের ‘কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি’—এভাবে বলা পুরোপুরি সঠিক হবে না।

বরং বড় প্রশ্ন হলো: সিদ্ধান্তগুলো কি যথেষ্ট দ্রুত, সমন্বিত এবং আগাম নেওয়া হয়েছে?

কারণ আমন মৌসুমে সংকট দেখা দেওয়ার পর আমদানি বাড়ানো এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা। বোরো মৌসুম শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে আন্তর্জাতিক বাজার, গ্যাস সরবরাহ, কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ, আমদানির সময় এবং জেলা-ভিত্তিক চাহিদা একসঙ্গে হিসাব করে আগাম পরিকল্পনা করা ছিল আরও কার্যকর পদ্ধতি।

বোরো চাষে সার প্রয়োগ করতে হবে সঠিক মাত্রায়

বোরোর সামনে আসল পরীক্ষা

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখানেই।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান আমন মৌসুমের স্থানীয় সংকট যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে বোরোতে তা জাতীয় সংকটে পরিণত হতে পারে। কারণ বোরো বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার কেন্দ্রীয় ফসল। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো থেকে।

বোরোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—এর উৎপাদন অত্যন্ত নিবিড়। বীজতলা থেকে জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সেচ এবং পরবর্তী পর্যায়ের পরিচর্যায় কৃষকের নগদ ব্যয় বেশি। সারের দাম বাড়লে শুধু উৎপাদন ব্যয়ই বাড়ে না, সময়মতো সার না পেলে ফলনও কমতে পারে।

গোলাম রসুলের হিসাবে দেশের মোট ব্যবহৃত সারের প্রায় ৬০ শতাংশ বোরো মৌসুমেই প্রয়োজন হয়। নভেম্বর থেকেই বোরোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।

অর্থাৎ আজকের টিএসপি বা ডিএপির সংকট কেবল সেপ্টেম্বরের সমস্যা নয়। এটি আগামী কয়েক মাসের খাদ্য উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি কী হতে পারে?

একটি সম্ভাব্য চিত্র এমন:

প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে সার সংকট বাড়বে। কৃষক সরকারি দামে সার না পেয়ে খোলা বাজারে বেশি দামে কিনবেন। উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। যাদের আর্থিক সক্ষমতা কম, তারা প্রয়োজনের তুলনায় কম সার ব্যবহার করতে পারেন। ফলে জমির উৎপাদনশীলতা কমার ঝুঁকি তৈরি হবে।

এরপর যদি আন্তর্জাতিক বাজারে আবার দাম বাড়ে এবং একই সময়ে দেশের কয়েকটি সার কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকে, তাহলে সরকারকে বেশি দামে আমদানি করতে হবে।

সেখানে আবার একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হবে: কৃষকের জন্য সরকারি দাম অপরিবর্তিত রাখতে হলে ভর্তুকির চাপ বাড়বে; আর দাম বাড়ালে খাদ্য উৎপাদনের ব্যয় সরাসরি বাড়বে।

শেষ ধাক্কাটি আসতে পারে চালের বাজারে।

বোরোর ফলন কমলে চালের সরবরাহে চাপ তৈরি হবে। তখন বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমদানি বাড়াতে হতে পারে। অর্থাৎ সার সংকট প্রথমে কৃষকের সমস্যা, পরে খাদ্য উৎপাদনের সমস্যা এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার খাদ্য মূল্যস্ফীতির সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা: সরবরাহ ব্যবস্থার অস্বচ্ছতা

কৃষি - বোরো ধান চাষে সার ব্যবস্থাপনা। ভালো ফলনের জন্য সুষম সারের  প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সার প্রয়োগ করতে দুটি বিষয়ের প্রতি বিশেষ নজর ...

বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা হলো—শুধু বড় গুদাম বানিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।

সরকারের হাতে ১২ লাখ ৮৬ হাজার টন সার থাকতে পারে। কিন্তু যদি রাজশাহীর কৃষক টিএসপি না পান, কুড়িগ্রামের কৃষক ডিএপি কিনতে গিয়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি দাম দেন, কিংবা দূরের ইউনিয়নের কৃষককে ২৫ কিলোমিটার গিয়ে সার আনতে হয়, তাহলে জাতীয় মজুত কৃষকের কাছে বাস্তব নিরাপত্তা তৈরি করছে না।

বাংলাদেশের সার ব্যবস্থাপনায় তাই এখন প্রয়োজন ‘কত টন মজুত আছে’ থেকে ‘কোথায় কত টন প্রয়োজন এবং কত টন পৌঁছেছে’—এই প্রশ্নে যাওয়া।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চাহিদার সঙ্গে বরাদ্দের মিল না থাকার অভিযোগও এসেছে। একজন কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই সময়ে একই ধরনের ফসলের চাহিদা থাকে না, অথচ বরাদ্দ অনেক সময় প্রায় একই কাঠামোয় দেওয়া হয়।

এটি প্রশাসনিক সমস্যা হলেও এর অর্থনৈতিক ফল বড়।

এখন সরকারের সামনে তিনটি জরুরি সিদ্ধান্ত

প্রথমত, বোরোর জন্য এখনই জেলা-ভিত্তিক সার চাহিদার নতুন হিসাব করতে হবে। পুরোনো বর্ষপঞ্জি দিয়ে নতুন বাজার ও আবহাওয়ার বাস্তবতা সামলানো যাবে না।

দ্বিতীয়ত, গ্যাস ও সার উৎপাদনকে আলাদা নীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানার মতো কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তার প্রভাব শুধু শিল্পখাতে নয়, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তাতেও পড়ে। গ্যাস সংকটের সময় কোন কারখানাকে কতটা গ্যাস দেওয়া হবে—এটি আসলে খাদ্যনিরাপত্তার সিদ্ধান্তও।

তৃতীয়ত, ডিলার পর্যায়ের সরবরাহকে ডিজিটাল ও জনসম্মুখে আনতে হবে। কোন ডিলার কত সার পেলেন, কত বিক্রি করলেন এবং কোন ইউনিয়নে কত বরাদ্দ গেল—এই তথ্য প্রকাশিত হলে কালোবাজারির সুযোগ অনেকটাই কমবে।

চতুর্থত, উদ্বৃত্ত এলাকা থেকে ঘাটতি এলাকায় দ্রুত সার পুনর্বণ্টন করা।

কারণ একই সময়ে একটি জেলায় সার পড়ে থাকবে আর অন্য জেলার কৃষক বেশি দামে সার কিনবেন—এটি জাতীয় মজুত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রমাণ।

শেষ কথা: আজকের সার সংকট আসলে আগামী বছরের চালের প্রশ্ন

বাংলাদেশে এখনই জাতীয় পর্যায়ে সার শেষ হয়ে গেছে—এমন কথা বলার মতো তথ্য নেই। বরং সরকারি গুদামে গত বছরের তুলনায় বেশি সার রয়েছে এবং নতুন করে আমদানিও অনুমোদন করা হয়েছে।

কিন্তু একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক সরকারি দামে সার পাচ্ছেন না, কালোবাজারে বাড়তি দাম দিচ্ছেন, ডিলার পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে এবং গ্যাস সংকটে দেশীয় উৎপাদন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এই দুই বাস্তবতা একসঙ্গে সত্য হতে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান সার সংকট তাই ‘সার আছে কি নেই’—এই সরল প্রশ্নের সংকট নয়। এটি সরবরাহের সময়, জায়গা, মূল্য, উৎপাদন সক্ষমতা এবং নীতিগত প্রস্তুতির সংকট।

আন্তর্জাতিক বাজার সাময়িকভাবে কিছুটা শান্ত হলেও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে সার মূল্য এখনও বড় ধরনের ঊর্ধ্বচাপের মধ্যে থাকতে পারে। অন্যদিকে বোরো সামনে, যে মৌসুমে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে বড় অংশ নির্ভর করে।

এখন সরকারের হাতে সময় আছে—কিন্তু সময় খুব বেশি নেই।

আমন মৌসুমের স্থানীয় সংকটকে যদি শুধু ‘কোথাও কোথাও বিতরণ সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে বোরোর বড় চাহিদা সামনে এসে একই সমস্যা বহুগুণে বড় হতে পারে।

আর যদি এখনই গুদামের হিসাবের সঙ্গে মাঠের হিসাব মেলানো না যায়, কারখানার গ্যাস নিশ্চিত না করা যায়, আমদানির বিকল্প উৎস আগে থেকে নিরাপদ না করা যায় এবং ডিলার পর্যায়ে স্বচ্ছতা না আনা যায়—তাহলে আজকের বাড়তি দামে কেনা এক বস্তা সার আগামীকাল বাংলাদেশের বাজারে বাড়তি দামের এক বস্তা চাল হয়ে ফিরে আসতে পারে।

সার সংকট তখন আর কৃষকের সমস্যা থাকবে না। হয়ে উঠবে খাদ্যনিরাপত্তার সংকট।

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার, আগস্টেই আক্রান্ত ১২০২

গুদামে সার, মাঠে সংকট: বাংলাদেশের বোরো কি বৈশ্বিক সার-যুদ্ধের নতুন ঝুঁকিতে?

১২:৩৭:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্রহ্মপুত্রের দুই পাড়ে একই গল্প। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর কৃষক সময়মতো সার না পেয়ে ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে গেছেন; রৌমারীর কৃষককে সরকারি দামের চেয়ে ৫০০-৬০০ টাকা বেশি দিয়ে এক বস্তা ডিএপি কিনতে হচ্ছে। রাজশাহীতে ডিলাররা বলছেন, বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কম। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় টিএসপি খুঁজে পাওয়া কঠিন। অথচ ঢাকার সরকারি হিসাব বলছে—দেশে প্রায় ১২ লাখ ৮৬ হাজার টন সার মজুত আছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়েও বেশি।

এই আপাত-বিরোধই বাংলাদেশের বর্তমান সার সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সমস্যাটি শুধু গুদামে কত টন সার আছে, সেই প্রশ্নে আটকে নেই। প্রশ্ন হলো—সঠিক সময়ে, সঠিক জেলায়, সঠিক দামে, সঠিক কৃষকের কাছে সেই সার পৌঁছাচ্ছে কি না। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় একটি ঝুঁকি: আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য ও সরবরাহের অস্থিরতা, চট্টগ্রামে গ্যাসের অভাবে সার কারখানা বন্ধ থাকা এবং আসন্ন বোরো মৌসুমের বিশাল চাহিদা।

অর্থাৎ বাংলাদেশের সার সংকট এখন তিন স্তরের—বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট, দেশীয় উৎপাদন সংকট এবং বিতরণ ব্যবস্থার সংকট।

গুদামে মজুত, কৃষকের হাতে নেই—সংকটের আসল চেহারা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সার, ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপিসহ বিভিন্ন ধরনের সারের চাহিদা ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টন। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রধান চার ধরনের সার মিলে মজুত ছিল প্রায় ১২ লাখ ৮৬ হাজার ১০০ টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টন, টিএসপি ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯০০ টন, ডিএপি ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টন এবং এমওপি ১ লাখ ৩৮ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে মজুত ছিল প্রায় ১২ লাখ টন। অর্থাৎ জাতীয় মজুতের হিসাবে এবার ঘাটতি নয়, বরং প্রায় ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি রয়েছে।

কিন্তু মাঠের বাস্তবতা অন্য কথা বলছে।

রাজশাহীতে সেপ্টেম্বর মাসের জন্য টিএসপির বরাদ্দ মাত্র ১ হাজার ৪৫ টন। জেলার ৪ লাখ ১২ হাজারের বেশি কৃষকের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করলে প্রত্যেকের ভাগে আনুমানিক ২ দশমিক ৫ কেজি টিএসপি পড়ে। এমওপি ও ডিএপির ক্ষেত্রেও বরাদ্দ কৃষকের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় কম বলে অভিযোগ উঠেছে।

এখানেই বাংলাদেশের সার ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সামনে আসে: জাতীয় মজুতের হিসাব আর কৃষকের নাগালের হিসাব এক নয়।

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ গোলাম রসুলের ভাষায়, জাতীয় পর্যায়ে মজুত ঠিক থাকলেও ডিলারের গুদামে কত সার ঢুকল এবং সেখান থেকে কতটা কৃষকের কাছে গেল—এই তথ্য স্বচ্ছভাবে দেখা যায় না। ফলে সরবরাহের মাঝখানে তৈরি হচ্ছে একটি ‘অদৃশ্য বাজার’, যেখানে সরকারি দামের সার কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

সরকারি দামের সার কেন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি?

সরকারি হিসাবে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়ার দাম ১ হাজার ১০০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০, ডিএপি ১ হাজার ৫০ এবং এমওপি ১ হাজার টাকা। কিন্তু মাঠের কৃষকের অভিযোগ, টিএসপি কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। ডিএপির ক্ষেত্রে দাম উঠছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত।

অর্থাৎ ডিএপিতে সরকারি দামের চেয়ে কৃষককে অতিরিক্ত ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা দিতে হচ্ছে। টিএসপিতেও বাড়তি ব্যয় ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা।

এটি শুধু একটি পণ্যের দাম বাড়ার ঘটনা নয়। ধান, আলু, পেঁয়াজ, ভুট্টা—সব ফসলের উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর একটি সরাসরি পথ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশে সার নিয়ে 'সংকট' কতটা গভীর? - BBC News বাংলা

সরকার অবশ্য বিষয়টি অস্বীকার করছে না যে স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়ম রয়েছে। আগস্ট মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি, অবৈধ মজুত, লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা এবং ভেজাল সার বিক্রির অভিযোগে জরিমানা ও সার জব্দ করা হয়েছে। যশোরের চৌগাছায় ১৩ হাজার ৫৫০ কেজি এবং ঈশ্বরগঞ্জে প্রায় ৩২ টন সার অবৈধ মজুদের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

ফলে ‘সার নেই’ এবং ‘সার পাওয়া যাচ্ছে না’—এই দুটি বাক্যের মধ্যে পার্থক্যটি এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারও বাংলাদেশের পক্ষে স্বস্তিদায়ক নয়

দেশের ভেতরের সমস্যার সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজার।

বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর পণ্যবাজার বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বৈশ্বিক সার মূল্যসূচক আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মার্চে সার মূল্য ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল, ২০২৬ সালে সার মূল্য ৩০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে এবং ইউরিয়ার দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়তে পারে।

এর পেছনে বড় কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বিঘ্ন। বিশ্বব্যাংক বলছে, হরমুজ দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৫ শতাংশ যায়। সেই রুটে বিঘ্ন শুধু জ্বালানি বাজারকে নয়, সার উৎপাদনের কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয়কেও আঘাত করেছে।

বিশেষ করে ইউরিয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি, কারণ অ্যামোনিয়া উৎপাদনের ব্যয়ের ৮০-৯০ শতাংশ পর্যন্ত প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে গ্যাসের দাম বা সরবরাহে বড় ধাক্কা মানেই ইউরিয়ার উৎপাদন ব্যয়ে চাপ।

তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সংকট সরলরৈখিক নয়। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পণ্যবাজারের তথ্যে জুলাই ২০২৬-এ সার মূল্যসূচক ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ এপ্রিলের চরম অস্থিরতা থেকে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে ভূরাজনৈতিক সংঘাত আবার বাড়লে সরবরাহ ও দাম উভয়ই দ্রুত উল্টো দিকে যেতে পারে।

সুতরাং বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিটি ‘বিশ্ববাজারে সার নেই’—এমন নয়; বরং দাম, সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং আমদানির সময়—তিনটিই অনিশ্চিত।

চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, ভারতের বড় কেনাকাটা—বাংলাদেশের ঝুঁকি কোথায়?

বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য আরেকটি সমস্যা হলো বড় ক্রেতাদের আচরণ।

সরকারি দামে মিলছে না সার, দিশাহারা কৃষক!

চীন ২০২৬ সালে সার রপ্তানিতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক সরবরাহ আরও সংকুচিত করেছে। অন্যদিকে ভারত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর সরবরাহের ঝুঁকি কমাতে রাশিয়া, বেলারুশ, মরক্কো ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে সার সংগ্রহের চেষ্টা করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সমস্যা হলো দরকষাকষির ক্ষমতা সীমিত। ভারত বা চীনের মতো বড় বাজার যখন একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সার কিনতে যায়, তখন ছোট আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য একই দামে ও একই সময়ে পণ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এর একটি উদাহরণ পাওয়া যায় ভারতের ইউরিয়া কেনাকাটায়। এপ্রিলে ভারত ২৫ লাখ টন ইউরিয়া কেনার একটি বড় চুক্তি করে। প্রতি টনের দাম ছিল প্রায় ৯৩৫-৯৫৯ ডলার, যেখানে মাত্র দুই মাস আগে তারা প্রায় ৫০৮-৫১২ ডলারে ইউরিয়া কিনেছিল।

এই ধরনের মূল্য-ঝাঁকুনি বাংলাদেশের মতো ভর্তুকিনির্ভর বাজারে দ্বিমুখী চাপ তৈরি করে—একদিকে সরকারের আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকি বাড়ে, অন্যদিকে কৃষকের জন্য সরকারি মূল্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

দেশের কারখানা বন্ধ: সমস্যাটি আমদানি দিয়ে কতটা সামলানো যাবে?

বাংলাদেশের সার সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো দেশীয় উৎপাদনের অনিশ্চয়তা।

৪ মার্চ গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানা এবং কর্ণফুলী সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানা দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০-১ হাজার ২০০ টন ইউরিয়া এবং কর্ণফুলী সার কারখানা দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭২৫ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রাখত।

এর প্রভাব পড়ে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ডিএপি কারখানাতেও।

চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানা ও কর্ণফুলী সার কারখানা থেকে অ্যামোনিয়া না পাওয়ায় চট্টগ্রামের ডিএপি সার কারখানার উৎপাদন এপ্রিল মাসে বন্ধ হয়ে যায়। কারখানাটির দুটি ইউনিটের সম্মিলিত দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৮০০ টন।

অর্থাৎ একটি কারখানার গ্যাস সংকট আরেকটি কারখানার কাঁচামাল সংকট তৈরি করেছে। তারপর সেই ঘাটতি পূরণ করতে আমদানির ওপর চাপ বেড়েছে।

কর্ণফুলী সার কারখানা অবশ্য মে মাসে গ্যাস ফিরে পাওয়ার পর উৎপাদন শুরু করে এবং দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৮০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন করছিল। অন্যদিকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ ছিল।

আগস্টের শেষদিকে চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানা পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নেওয়ার খবর আসে এবং ৪ সেপ্টেম্বর থেকে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়।

এই সময়রেখাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে সার সংকট দেখা দেওয়ার পর কারখানা বন্ধ, কাঁচামাল সংকট, আমদানি এবং পুনরায় উৎপাদন—প্রতিটি ধাপেই সময় লেগেছে। কৃষির ক্যালেন্ডার কিন্তু এতটা অপেক্ষা করে না।

বাংলাদেশে সার সংকট আছে নাকি নেই? | জাতীয় নিউজ

সরকার কি কিছুই করছে না?

এখানেও বাস্তবতা দ্বিমুখী।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে সার সংকট নেই। ১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জানান, দেশে ১২ লাখ ৮৬ হাজার টন সার মজুত রয়েছে এবং কিছু এলাকায় বিতরণজনিত সমস্যা থাকলেও তা সমাধান করা হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর কৃষিমন্ত্রীও সংসদে বলেন, প্রায় ১৩ লাখ টন সার মজুত আছে এবং জাতীয় পর্যায়ে সংকট নেই।

সরকার আমদানিও বাড়িয়েছে। ২৪ আগস্ট ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়—এর মধ্যে ৮০ হাজার টন ইউরিয়া, ১ লাখ ১৫ হাজার টন এমওপি, ৮০ হাজার টন ডিএপি এবং ৬০ হাজার টন টিএসপি। এসব সার সৌদি আরব, রাশিয়া, মরক্কো, কানাডা ও কর্ণফুলী সার কারখানা থেকে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়।

জুলাইয়ে জরুরি ভিত্তিতে সার উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময় ৪২ দিন থেকে ২১ দিনে নামানোর নীতিগত অনুমোদনও দেওয়া হয়।

তাই সমস্যাটি সরকারের ‘কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি’—এভাবে বলা পুরোপুরি সঠিক হবে না।

বরং বড় প্রশ্ন হলো: সিদ্ধান্তগুলো কি যথেষ্ট দ্রুত, সমন্বিত এবং আগাম নেওয়া হয়েছে?

কারণ আমন মৌসুমে সংকট দেখা দেওয়ার পর আমদানি বাড়ানো এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা। বোরো মৌসুম শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে আন্তর্জাতিক বাজার, গ্যাস সরবরাহ, কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ, আমদানির সময় এবং জেলা-ভিত্তিক চাহিদা একসঙ্গে হিসাব করে আগাম পরিকল্পনা করা ছিল আরও কার্যকর পদ্ধতি।

বোরো চাষে সার প্রয়োগ করতে হবে সঠিক মাত্রায়

বোরোর সামনে আসল পরীক্ষা

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখানেই।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান আমন মৌসুমের স্থানীয় সংকট যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে বোরোতে তা জাতীয় সংকটে পরিণত হতে পারে। কারণ বোরো বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার কেন্দ্রীয় ফসল। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো থেকে।

বোরোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—এর উৎপাদন অত্যন্ত নিবিড়। বীজতলা থেকে জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সেচ এবং পরবর্তী পর্যায়ের পরিচর্যায় কৃষকের নগদ ব্যয় বেশি। সারের দাম বাড়লে শুধু উৎপাদন ব্যয়ই বাড়ে না, সময়মতো সার না পেলে ফলনও কমতে পারে।

গোলাম রসুলের হিসাবে দেশের মোট ব্যবহৃত সারের প্রায় ৬০ শতাংশ বোরো মৌসুমেই প্রয়োজন হয়। নভেম্বর থেকেই বোরোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।

অর্থাৎ আজকের টিএসপি বা ডিএপির সংকট কেবল সেপ্টেম্বরের সমস্যা নয়। এটি আগামী কয়েক মাসের খাদ্য উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি কী হতে পারে?

একটি সম্ভাব্য চিত্র এমন:

প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে সার সংকট বাড়বে। কৃষক সরকারি দামে সার না পেয়ে খোলা বাজারে বেশি দামে কিনবেন। উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। যাদের আর্থিক সক্ষমতা কম, তারা প্রয়োজনের তুলনায় কম সার ব্যবহার করতে পারেন। ফলে জমির উৎপাদনশীলতা কমার ঝুঁকি তৈরি হবে।

এরপর যদি আন্তর্জাতিক বাজারে আবার দাম বাড়ে এবং একই সময়ে দেশের কয়েকটি সার কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকে, তাহলে সরকারকে বেশি দামে আমদানি করতে হবে।

সেখানে আবার একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হবে: কৃষকের জন্য সরকারি দাম অপরিবর্তিত রাখতে হলে ভর্তুকির চাপ বাড়বে; আর দাম বাড়ালে খাদ্য উৎপাদনের ব্যয় সরাসরি বাড়বে।

শেষ ধাক্কাটি আসতে পারে চালের বাজারে।

বোরোর ফলন কমলে চালের সরবরাহে চাপ তৈরি হবে। তখন বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমদানি বাড়াতে হতে পারে। অর্থাৎ সার সংকট প্রথমে কৃষকের সমস্যা, পরে খাদ্য উৎপাদনের সমস্যা এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার খাদ্য মূল্যস্ফীতির সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা: সরবরাহ ব্যবস্থার অস্বচ্ছতা

কৃষি - বোরো ধান চাষে সার ব্যবস্থাপনা। ভালো ফলনের জন্য সুষম সারের  প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সার প্রয়োগ করতে দুটি বিষয়ের প্রতি বিশেষ নজর ...

বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা হলো—শুধু বড় গুদাম বানিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।

সরকারের হাতে ১২ লাখ ৮৬ হাজার টন সার থাকতে পারে। কিন্তু যদি রাজশাহীর কৃষক টিএসপি না পান, কুড়িগ্রামের কৃষক ডিএপি কিনতে গিয়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি দাম দেন, কিংবা দূরের ইউনিয়নের কৃষককে ২৫ কিলোমিটার গিয়ে সার আনতে হয়, তাহলে জাতীয় মজুত কৃষকের কাছে বাস্তব নিরাপত্তা তৈরি করছে না।

বাংলাদেশের সার ব্যবস্থাপনায় তাই এখন প্রয়োজন ‘কত টন মজুত আছে’ থেকে ‘কোথায় কত টন প্রয়োজন এবং কত টন পৌঁছেছে’—এই প্রশ্নে যাওয়া।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চাহিদার সঙ্গে বরাদ্দের মিল না থাকার অভিযোগও এসেছে। একজন কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই সময়ে একই ধরনের ফসলের চাহিদা থাকে না, অথচ বরাদ্দ অনেক সময় প্রায় একই কাঠামোয় দেওয়া হয়।

এটি প্রশাসনিক সমস্যা হলেও এর অর্থনৈতিক ফল বড়।

এখন সরকারের সামনে তিনটি জরুরি সিদ্ধান্ত

প্রথমত, বোরোর জন্য এখনই জেলা-ভিত্তিক সার চাহিদার নতুন হিসাব করতে হবে। পুরোনো বর্ষপঞ্জি দিয়ে নতুন বাজার ও আবহাওয়ার বাস্তবতা সামলানো যাবে না।

দ্বিতীয়ত, গ্যাস ও সার উৎপাদনকে আলাদা নীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চিটাগং ইউরিয়া সার কারখানার মতো কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তার প্রভাব শুধু শিল্পখাতে নয়, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তাতেও পড়ে। গ্যাস সংকটের সময় কোন কারখানাকে কতটা গ্যাস দেওয়া হবে—এটি আসলে খাদ্যনিরাপত্তার সিদ্ধান্তও।

তৃতীয়ত, ডিলার পর্যায়ের সরবরাহকে ডিজিটাল ও জনসম্মুখে আনতে হবে। কোন ডিলার কত সার পেলেন, কত বিক্রি করলেন এবং কোন ইউনিয়নে কত বরাদ্দ গেল—এই তথ্য প্রকাশিত হলে কালোবাজারির সুযোগ অনেকটাই কমবে।

চতুর্থত, উদ্বৃত্ত এলাকা থেকে ঘাটতি এলাকায় দ্রুত সার পুনর্বণ্টন করা।

কারণ একই সময়ে একটি জেলায় সার পড়ে থাকবে আর অন্য জেলার কৃষক বেশি দামে সার কিনবেন—এটি জাতীয় মজুত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রমাণ।

শেষ কথা: আজকের সার সংকট আসলে আগামী বছরের চালের প্রশ্ন

বাংলাদেশে এখনই জাতীয় পর্যায়ে সার শেষ হয়ে গেছে—এমন কথা বলার মতো তথ্য নেই। বরং সরকারি গুদামে গত বছরের তুলনায় বেশি সার রয়েছে এবং নতুন করে আমদানিও অনুমোদন করা হয়েছে।

কিন্তু একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক সরকারি দামে সার পাচ্ছেন না, কালোবাজারে বাড়তি দাম দিচ্ছেন, ডিলার পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে এবং গ্যাস সংকটে দেশীয় উৎপাদন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এই দুই বাস্তবতা একসঙ্গে সত্য হতে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান সার সংকট তাই ‘সার আছে কি নেই’—এই সরল প্রশ্নের সংকট নয়। এটি সরবরাহের সময়, জায়গা, মূল্য, উৎপাদন সক্ষমতা এবং নীতিগত প্রস্তুতির সংকট।

আন্তর্জাতিক বাজার সাময়িকভাবে কিছুটা শান্ত হলেও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে সার মূল্য এখনও বড় ধরনের ঊর্ধ্বচাপের মধ্যে থাকতে পারে। অন্যদিকে বোরো সামনে, যে মৌসুমে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে বড় অংশ নির্ভর করে।

এখন সরকারের হাতে সময় আছে—কিন্তু সময় খুব বেশি নেই।

আমন মৌসুমের স্থানীয় সংকটকে যদি শুধু ‘কোথাও কোথাও বিতরণ সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে বোরোর বড় চাহিদা সামনে এসে একই সমস্যা বহুগুণে বড় হতে পারে।

আর যদি এখনই গুদামের হিসাবের সঙ্গে মাঠের হিসাব মেলানো না যায়, কারখানার গ্যাস নিশ্চিত না করা যায়, আমদানির বিকল্প উৎস আগে থেকে নিরাপদ না করা যায় এবং ডিলার পর্যায়ে স্বচ্ছতা না আনা যায়—তাহলে আজকের বাড়তি দামে কেনা এক বস্তা সার আগামীকাল বাংলাদেশের বাজারে বাড়তি দামের এক বস্তা চাল হয়ে ফিরে আসতে পারে।

সার সংকট তখন আর কৃষকের সমস্যা থাকবে না। হয়ে উঠবে খাদ্যনিরাপত্তার সংকট।