২৬ আগস্ট সকালে ভুটে কোসি নদীর ওপর নেমে আসা আকস্মিক বন্যা কয়েক মিনিটের মধ্যে নেপালের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের চেহারা বদলে দিয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগে ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ৪ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ—এমন এক মানবিক বিপর্যয়, যার অভিঘাত শুধু নেপালের সীমানার মধ্যে আটকে থাকার কথা নয়।
কারণ এটি কেবল একটি নদীর হঠাৎ ফুলে ওঠার ঘটনা নয়। এর ভেতরে আছে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো, নদীর স্বাভাবিক গতিপথে হস্তক্ষেপ এবং উন্নয়নের নামে দীর্ঘদিনের পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরির এক জটিল সমীকরণ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই হলো—যে দেশ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য সামান্যই দায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির সবচেয়ে বড় মূল্য তাদেরই কেন দিতে হবে?
নেপালের অবদান সামান্য, ঝুঁকি অসামঞ্জস্যপূর্ণ
বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান ০.০১ শতাংশেরও কম। অথচ হিমালয়ের দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। গত তিন দশকে দেশটি তার বনভূমির পরিমাণ দ্বিগুণ করেছে, ফলে কার্বন শোষণের সক্ষমতাও বেড়েছে। বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নেপাল বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারও সেখানে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে নেপালকে নিছক ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। সীমিত সম্পদের মধ্যেও দেশটি প্রকৃতি সংরক্ষণ ও কম কার্বন নির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়েছে।
তারপরও বৈশ্বিক অর্থনীতির উচ্চ নিঃসরণকারী দেশ ও করপোরেট কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট উষ্ণতা যখন হিমালয়ের বরফ, মাটি ও নদী ব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে, তখন ক্ষতির বোঝা এসে পড়ছে নেপালের মতো দেশগুলোর ওপর।

এখানেই জলবায়ু ন্যায়ের প্রশ্নটি অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরে গিয়ে নৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়।
‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বললেই দায় শেষ হয় না
ভুটে কোসির এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত ঘটানো বরফ ও পাথরের বিশাল ধস দেখিয়েছে, হিমালয়ের পরিবেশ কতটা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু শুধু এটিকে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করলে বিপদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়ালে থেকে যায়।
নদীর প্লাবনভূমিতে বসতি স্থাপন, পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা না করে অবকাঠামো নির্মাণ এবং উন্নয়নের নামে পাহাড় ও নদীর ওপর ক্রমাগত চাপ—এসব মানুষের তৈরি ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
জলবায়ু পরিবর্তন হয়তো বিপদের মাত্রা বাড়াচ্ছে, কিন্তু বিপর্যয় কতটা প্রাণঘাতী হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে একটি সমাজ কীভাবে ভূমি, নদী, পাহাড় ও অবকাঠামো পরিচালনা করে তার ওপর।
তাই ক্ষয়ক্ষতির দায় নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় শুধু কার্বন নিঃসরণের হিসাব যথেষ্ট নয়। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বাস্তব ক্ষতি, তাদের পুনর্গঠনের সক্ষমতা এবং অতীতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বর্তমান বিপর্যয়ের সম্পর্ক—সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হবে।
ঋণ নয়, ক্ষতির ন্যায্য অর্থায়ন
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ‘অভিযোজন অর্থায়ন’, ‘সহায়তা’ কিংবা ‘অনুদান’—এসব শব্দ বহুদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু বিপর্যয়ের পর একটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ যদি পুনর্গঠনের জন্য নতুন ঋণ নেয়, তাহলে সংকটের একটি অংশ কেবল ভবিষ্যতের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়।
একদিকে দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে সেই ক্ষতি সামাল দিতে তাকে ধার করতে হচ্ছে। আরও অস্বস্তিকর বাস্তবতা হলো, বৈশ্বিক উচ্চ-নিঃসরণকারী অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক সংস্থাগুলো সেই ঋণের অর্থদাতা বা ঋণদাতা হিসেবে লাভবান হতে পারে।
এ কারণেই ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ অর্থায়নের ধারণাটি কেবল সহানুভূতির বিষয় নয়। এটি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
নেপাল এবার সেই অবস্থানটিই স্পষ্ট করেছে। ১ সেপ্টেম্বর দেশটির সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে লস অ্যান্ড ড্যামেজ মোকাবিলার জন্য গঠিত তহবিলের পরিচালনা পর্ষদের কাছে ভুটে কোসি বন্যার পর জরুরি ও সরাসরি সহায়তা চেয়েছে। সরকার বলেছে, বৈশ্বিক নিঃসরণে নেপালের অবদান নগণ্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি দেশটিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বহন করতে হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহও বলেছেন, এই দুর্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বৈশ্বিক অবদান যেমন রয়েছে, এর মোকাবিলার দায়িত্বও বৈশ্বিক।
এটি নেপালের জন্য প্রথম এমন আবেদন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাঠামোটি নেপালকে ঋণ দেবে, নাকি ক্ষতিপূরণধর্মী সহায়তা দেবে—এই পার্থক্যটি এখন বাস্তব পরীক্ষার মুখে।
জরুরি পরিস্থিতিতে ধীর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
নেপাল ডিসেম্বরের নিয়মিত বৈঠক পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত চেয়েছে। এই দাবির গুরুত্ব এখানেই যে দুর্যোগের পর পুনর্গঠনের সময়ই সবচেয়ে মূল্যবান সময়।
যদি একটি আন্তর্জাতিক তহবিল এমন সংকটেও নির্ধারিত আমলাতান্ত্রিক সময়সূচির বাইরে যেতে না পারে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এই ব্যবস্থা কি সত্যিই জরুরি জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য তৈরি, নাকি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক ধীরগতির প্রশাসনিক কাঠামোর আরেকটি অংশ?
নেপালকে অবশ্যই অপেক্ষা করে বসে থাকার সুযোগ নেই। উদ্ধার, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন চলতেই হবে। কিন্তু একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের ন্যায্যতা ও জবাবদিহির দাবিও অব্যাহত রাখতে হবে।
এখানে নেপালের আগের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তোলার পর এবার সরাসরি লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলের দ্বারস্থ হওয়া দেখায়, একটি দেশ কীভাবে ধারাবাহিকভাবে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে।
সার্বভৌমত্ব শুধু বিদেশের বিরুদ্ধে দাবি নয়
দুর্যোগের সময় আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই সহায়তা কীভাবে আসবে এবং কে তা পরিচালনা করবে—সেটিও সার্বভৌমত্বের অংশ।
২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর বিদেশি উদ্ধারকারী দলের বিপুল উপস্থিতি নেপালের জন্য সমন্বয়ের বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। সে সময় ৭৬টি আন্তর্জাতিক দল এবং ২ হাজার ২০০-এর বেশি সদস্য কাঠমান্ডুর এক রানওয়ের বিমানবন্দরে জড়ো হয়েছিল। ৫৩টি বিদেশি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল সম্মিলিতভাবে ধ্বংসস্তূপ থেকে মাত্র ১৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে পেরেছিল, যখন স্থানীয় অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কগুলো অনেক ক্ষেত্রে দ্রুততরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছেছিল।
এই অভিজ্ঞতার পর এবারের বিপর্যয়ে বিদেশি উদ্ধারকারী দলের প্রস্তাব গ্রহণে নেপালের সতর্কতা কেবল জাতীয়তাবাদী অবস্থান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং স্থানীয় সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও এখানে আছে।
তবে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের আরেকটি দিক রয়েছে—নিজের নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়।

কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা
বন্যার পর প্রায় ২০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে এবং ৮ হাজার ৭৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। নাগরিক সমাজ, স্থানীয় সংগঠন ও ব্যবসায়ীরাও ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণে সক্রিয় হয়েছে।
কিন্তু ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় সবকিছু কেন্দ্রের দিকে টেনে নেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। অর্থ ও সহায়তা একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনার নীতি হয়তো জরুরি সময়ে বিশৃঙ্খলা কমাতে পারে, কিন্তু স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যদি দুর্বল থাকে, তাহলে একই কাঠামো পুনর্বাসনের সময় সমস্যাও তৈরি করতে পারে।
কারণ দুর্যোগের আগে যে বৈষম্য ছিল, বন্যার পর তা হঠাৎ তৈরি হয়নি। জাতপাত, ভূমির মালিকানা, লিঙ্গ এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে যে অসমতা বিদ্যমান ছিল, দুর্যোগ কেবল সেটিকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
রসুয়ার মতো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের চাপ রয়েছে। উন্নয়ন ও সবুজ প্রবৃদ্ধির নামে স্থানীয় মানুষের মতামত যদি বারবার উপেক্ষিত হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—কোন উন্নয়ন কার জন্য এবং তার পরিবেশগত মূল্য কে দিচ্ছে?
জলবায়ু ন্যায়বিচার তাই একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়।
বিশ্বের দায় আছে, নেপালেরও আছে
আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নেপালের বরফ গলন থামাতে পারবে না। বায়ুমণ্ডলে ইতোমধ্যে জমে থাকা গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব রাতারাতি দূর হবে না। হিমালয়ের চিরতুষার ও পারমাফ্রস্টের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিও ক্ষতিপূরণের অর্থ দিয়ে সরাসরি ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
সুতরাং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেপালের জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি যেমন জরুরি, দেশের ভেতরে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনাও ততটাই জরুরি।
রাষ্ট্রকে তার নাগরিকদের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতে হবে—হিমালয়ের ভবিষ্যৎ বদলে গেছে। সামনে আরও অনিশ্চয়তা আসতে পারে। নদী, পাহাড়, বসতি ও অবকাঠামো পরিকল্পনার পুরোনো ধারণা দিয়ে নতুন বাস্তবতার মোকাবিলা সম্ভব নয়।
শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শক্তিশালী বক্তৃতা দিয়ে এই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না।
নেপালের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথও তাই পুরোনো প্রবৃদ্ধির মডেলকে অন্ধভাবে অনুসরণ করার মধ্যে নয়। এমন অর্থনৈতিক কাঠামো প্রয়োজন, যা প্রকৃতির সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে। স্থানীয় অর্থনীতি, নদীভিত্তিক অঞ্চল পরিকল্পনা, ভূমি অধিকারের নতুন ধারণা, বৃত্তাকার অর্থনীতি এবং স্থানীয়ভাবে টেকসই উৎপাদনব্যবস্থাকে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার পথ খুঁজতে হবে।

এই বিপর্যয় নেপালের জন্য শুধু পুনর্গঠনের পরীক্ষা নয়। এটি বিশ্বব্যবস্থারও পরীক্ষা।
যদি সামান্য কার্বন নিঃসরণকারী একটি দেশ জলবায়ু বিপর্যয়ের পরও ঋণ নিয়ে নিজের ক্ষতি সারাতে বাধ্য হয়, তাহলে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ শব্দটি অর্থহীন হয়ে পড়বে। আর যদি নেপাল আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি নিজের উন্নয়নব্যবস্থার ভেতরের ঝুঁকিগুলোও মোকাবিলা করতে পারে, তাহলে এই ভয়াবহ বিপর্যয় ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক নীতির সূচনা করতে পারে।
আজকের প্রশ্ন তাই শুধু বিশ্ব নেপালের কাছে কতটা ঋণী—তা নয়। প্রশ্ন হলো, নেপাল নিজেই তার নাগরিকদের জন্য আগামী দিনের নেপালকে কতটা নিরাপদ করে তুলতে প্রস্তুত।
*আস্থা গুরাগাইন,গবেষক ও অর্থনীতি শিক্ষাবিদ; স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ
আস্থা গুরাগাইন 


















